আকামা সংকট কাটছে!|247367|Desh Rupantor
logo
আপডেট : ২৩ সেপ্টেম্বর, ২০২০ ০০:০০
আকামা সংকট কাটছে!
সরোয়ার আলম

আকামা সংকট কাটছে!

সৌদি প্রবাসী নাজির মামুদ রাজধানীর সোনারগাঁও হোটেলে সাউদিয়া এয়ারের টিকিট কাউন্টারের সামনে দুদিন ধরে কনফার্মড টিকিট হাতে অবস্থান করেন। আগামী ৩০ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত থাকা ভিসার মেয়াদের মধ্যে দেশটিতে পৌঁছতে না পারলে তার চাকরি শেষ। কিশোরগঞ্জের পাকুন্দিয়ার পাটুয়াভাঙ্গা বাগপাড়া গ্রামের নাজির গত ২ মার্চ রিটার্ন টিকিটসহ সৌদি আরব থেকে দেশে আসেন। গত সোমবার দুপুর থেকে নাজির টিকিট রিকনফার্মের জন্য অপেক্ষা করেও তা পারেননি। উপরন্তু খোলা আকাশের নিচে এক রাত এক দিন দুর্ভোগের শিকার হয়ে ক্ষোভ-অভিমানে গতকাল মঙ্গলবার বাড়ি চলে যান। তার মতো শত শত সৌদি প্রবাসী গতকাল সোনারগাঁও হোটেলে সাউদিয়া এয়ারের টিকিট কাউন্টার এবং বিমানের মতিঝিল অফিসের সামনে বিক্ষোভ ও সড়ক অবরোধ করেন।

এদিকে সৌদি আরবে বাংলাদেশি শ্রমিকদের আকামার মেয়াদ বাড়ানোর চেষ্টা করছে সরকার। আটকেপড়া বাংলাদেশিদের সৌদি আরবে যাওয়া নিশ্চিত করতে সে দেশের সরকারকে তিন মাসের জন্য আকামার মেয়াদ বাড়ানোর অনুরোধ জানানো হয়েছে। গতকাল দেশটিতে বাংলাদেশ দূতাবাস এ অনুরোধ জানিয়ে সৌদি পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে চিঠি দিয়েছে। চিঠিতে বাংলাদেশ অনুরোধ জানিয়েছে, আকামা কিংবা ভিসা, বাংলাদেশের নাগরিকদের যার যেটা প্রয়োজন সেই অনুযায়ী মেয়াদ তিন মাসের জন্য যেন বাড়ানো হয়। গতকাল পররাষ্ট্রমন্ত্রী এ কে আবদুল মোমেন দেশ রূপান্তরকে এসব তথ্য জানিয়েছেন।

জানা গেছে, বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অনুরোধে সৌদি কর্র্তৃপক্ষ ইতিবাচক সাড়া দিয়েছে। দুই দেশের নিয়মিত বাণিজ্যিক ফ্লাইট চালুর ওপর জোর দেওয়া হয়েছে। তাছাড়া ফ্লাইট চালুর বিষয়ে বেসামরিক বিমান চলাচল কর্র্তৃপক্ষ (বেবিচক) নানাভাবে চেষ্টা চালাচ্ছে বলে জানিয়েছেন সংস্থাটির চেয়ারম্যান এয়ার ভাইস মার্শাল মফিদুর রহমান।

সংশ্লিষ্টরা দেশ রূপান্তরকে জানান, উদ্ভূত পরিস্থিতিতে আকামার মেয়াদ বাড়ানোর জন্য সৌদি আরবে বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত ড. মোহাম্মদ জাবেদ পাটোয়ারী, বেবিচক চেয়ারম্যান এয়ার ভাইস মার্শাল মফিদুর রহমান, জ্যেষ্ঠ সচিব মহিবুল হক এবং পররাষ্ট্র সচিবসহ অন্য কর্মকর্তারা উদ্যোগ নিয়েছেন। তারা যেভাবেই হোক আটকেপড়া প্রবাসীদের আকামার মেয়াদ বাড়ানোর জন্য সৌদিকে রাজি করানোর চেষ্টা চালাচ্ছেন।

এরই মধ্যে গতকাল দুপুরে কয়েকশ প্রবাসী পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের দিকে যাওয়ার চেষ্টা করেন। পুলিশ তাদের ফিরিয়ে দিলে আবারও টিকিট কাউন্টারের সামনে অবস্থান নেন তারা। গতকাল রাত ১০টায় এ প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত তাদের সোনারগাঁও হোটেলের প্রবেশমুখ ও মতিঝিলে অবস্থান করতে দেখা যায়। অবশ্য অনেকে ইতিমধ্যে একরাশ ভোগান্তি নিয়ে ফিরে গেছেন বাড়িতে। আন্দোলনকারীদের অভিযোগ, দুদিন ধরে ভোগান্তির শিকার হলেও সরকারের সংশ্লিষ্ট দপ্তরের দায়িত্বশীল কেউই তাদের খোঁজ নেননি, সবাই নির্বিকার।

দুদিন চেষ্টা করেও টিকিট না পেয়ে ফিরে যাওয়ার সময় গতকাল নাজির মামুদ দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘৩০ সেপ্টেম্বরের মধ্যে সৌদি যেতে না পারলে আমার আর যাওয়া হবে না। কারণ ভিসার মেয়াদ নেই। ভিসার মেয়াদ না বাড়ালে আমার মতো হাজারো যুবক সর্বস্ব হারাবে।’

অভিযোগ উঠেছে, সৌদি এয়ারলাইনসের অফিসে গত শনিবার থেকে টিকিটের জন্য ঘুরছেন প্রবাসীরা। লাইনে দাঁড়ালেও টিকিট দেওয়া হচ্ছে না। রিটার্ন টিকিট থাকার পরও অতিরিক্ত ২৫ হাজার টাকা রি-ইস্যু করতে চাইছে এয়ারলাইনসটি। একই সঙ্গে টিকিট বিক্রি করছে ৯৫ হাজার টাকায়। এতে ক্ষোভ প্রকাশ করে বিক্ষোভ করেন প্রবাসীরা। তাদের অভিযোগ, ভিসার মেয়াদ শেষ হওয়ার আগে যেতে না পারলে চাকরি থাকবে না। অথচ লাইনে দাঁড়িয়েও তারা টিকিট পাচ্ছেন না। তাদের দাঁড় করিয়ে রেখে গোপনে বাইরে টিকিট বিক্রি করা হচ্ছে।

প্রবাসী আবদুস সালাম বলেন, ‘আমাদের টিকিট আগেই কাটা, এখন রি-ইস্যু করতে ২৫ হাজার টাকা নেওয়া অন্যায়।’ এ বিষয়ে যোগাযোগ করা হলে সৌদি এয়ারলাইনসের কর্মকর্তারা গণমাধ্যমের সঙ্গে কথা বলতে অপারগতা প্রকাশ করেন।

ঢাকায় সাউদিয়া এয়ারের সেলস ইনচার্জ ওমরের বিরুদ্ধে টিকিট নিয়ে কমিশন বাণিজ্যের অভিযোগ করেছেন অনেকেই। হাসান নামে এক যুবক বলেন, ‘আমার ভিসার মেয়াদ শেষ ৩০ সেপ্টেম্বর। আমাকে রিটার্ন টিকিটের রি-ইস্যু টোকেন দেওয়া হয়নি গত দুদিনও। অথচ অক্টোবরের যাত্রীদের দেওয়া হয়েছে টোকেন। শুধু টাকার বিনিময়ে এটা সম্ভব হচ্ছে। রিটার্ন টিকিট থাকা সত্ত্বেও ২০-২৫ হাজার খরচ করে অনেকেই টিকিটের টোকেন পেয়েছে। প্রকাশ্যে এমন দুর্নীতির ভূরি ভূরি প্রমাণ থাকা সত্ত্বেও কেউ কোনো ব্যবস্থা নেয়নি।’ সাউদিয়ার সেলস ইনচার্জ ওমরের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনিও কথা বলতে রাজি হননি।

বেসামরিক বিমান ও পর্যটন মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব মহিবুল হক বলেন, ‘টিকিট কাটা হয়েছে সৌদি আরব থেকে। ঢাকা থেকে সাউদিয়াকে দুটি ফ্লাইটের অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। তাতে বড়জোর হাজারখানেক শ্রমিক যেতে পারবে। কিন্তু যাত্রী আটকা পড়েছে কয়েক হাজার। সংকট তো হবেই। আমরা সৌদির সঙ্গে আলোচনা করে সর্বাত্মক চেষ্টা চালাচ্ছি ফ্লাইটের অনুমোদন নেওয়ার জন্য।’ তিনি আরও বলেন, ‘প্রবাসীদের বিষয়টি পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে অবহিত করেছি। প্রবাসীদের ভিসার মেয়াদ বাড়াতে কাজ করা হচ্ছে। এ ছাড়া সৌদি এয়ারলাইনসকে সৌদি কর্র্তৃপক্ষ ফ্লাইট পরিচালনার অনুমতি দিয়েছে। আমাদের সিভিল এভিয়েশনও অনুমতি দিয়েছে। আর সৌদি আরব বাংলাদেশকে ফ্লাইটের অনুমতি দিলেও ল্যান্ডিংয়ের অনুমতি দেয়নি। আমরা পুরো বিষয়টি সমাধানে কাজ করছি। আশা করি দ্রুতই সমাধান হয়ে যাবে।’

সৌদি আরবে বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত ড. মোহাম্মদ জাবেদ পাটোয়ারী দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘দুই দেশের নিয়মিত ফ্লাইট চালু ও প্রবাসীদের আকামার মেয়াদ বাড়ানোর জন্য সৌদি কর্র্তৃপক্ষের সঙ্গে আমরা কথা বলছি। তারা ইতিবাচক সাড়া দিয়েছে। বাংলাদেশ সরকারও নানাভাবে চেষ্টা চালাচ্ছে। আশা করছি অল্প সময়ের মধ্যে বিষয়টির সমাধান হবে।’

বেবিচক চেয়ারম্যান এয়ার ভাইস মার্শাল মো. মফিদুর রহমান দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘সৌদি আরব সাতটি ফ্লাইট চেয়েছিল। তবে তাদের দুটি ফ্লাইট চলার অনুমতি দেওয়া হয়েছে। প্রয়োজনে আরও দেওয়া হবে। তবুও যেন আটকেপড়া প্রবাসীদের দ্রুততম সময়ে পাঠানোর ব্যবস্থা করা যায়।’ তিনি আরও বলেন, ‘এ বিষয়ে সৌদিরও উচিত বিমানকে নিয়মিত বাণিজ্যিক ফ্লাইটের অনুমতি দেওয়া। বেবিচকের পক্ষ থেকে সর্বাত্মক সহযোগিতা করা হবে। আমরা প্রবাসীদের আকামার মেয়াদ বৃদ্ধির জন্য কাজ করছি।’

ভুক্তভোগীদের সঙ্গে আলাপ করে জানা যায়, করোনার আগে দেশে ফেরা প্রায় ২৫ হাজার সৌদি প্রবাসী আটকা পড়েছেন। তাদের অনেকেরই ভিসার মেয়াদ শেষ চলতি মাসেই। অগ্রাধিকার ভিত্তিতে তাদের পাঠানো উদ্যোগ সরকার নিলে পরিস্থিতি সামাল দেওয়া যেতে পারে বলে মনে করেন আটাব নেতা তসলিম হোসেন শাহাদত। তিনি বলেন, ‘ঢাকা ও সৌদি আরবের মধ্যে দ্বিপক্ষীয় উদ্যোগ নেওয়া হলে এ সংকট আগেভাগেই মেটানো সম্ভব ছিল।’

গতকাল সরেজমিন দেখা যায়, সকাল থেকে সোনারগাঁও হোটেলে সৌদি এয়ারলাইনসের অফিসের বাইরে অবস্থান নেন প্রবাসীরা। এ সময় সোনারগাঁও হোটেলের গেট বন্ধ করে রাখা হয়। প্রবাসীদের একটি অংশ গেটের সামনের রাস্তায় অবস্থান নেন। এতে যান চলাচল বিঘ্নিত হয়। তখন প্রবাসীদের পাশাপাশি পুলিশও শক্ত অবস্থান নিলে প্রবাসীরা মূল রাস্তা থেকে সরে বিভিন্ন জায়গায় অবস্থান নেন। প্রবাসীরা রাস্তা থেকে সরে গেলে যান চলাচল স্বাভাবিক হয়।

এদিকে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসের মতিঝিল কার্যালয় অবরুদ্ধ করেন প্রবাসীরা। প্রথমে তারা কারওয়ানবাজারে সৌদি এয়ারলাইনস এবং বিমান কার্যালয়ের সামনে বিক্ষোভ করেন। পরে মতিঝিলে বিমানের কার্যালয় অবরুদ্ধ এবং পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ঘেরাওয়ের চেষ্টা চালান। ওই সময় টিকিটের দাবিতে তারা বিভিন্ন সেøাগান দেন। গত সোমবারও তারা বিক্ষোভ করেন। প্রবাসীদের বিক্ষোভের মুখে গত সোমবার ১০ জন প্রতিনিধিকে ভেতরে নিয়ে যায় সৌদি এয়ারলাইনস কর্র্তৃপক্ষ। তাদের মাধ্যমে অন্যদের টিকিট সংগ্রহের সিরিয়ালের টোকেন দেওয়া হয়। এরপর গতকাল কোনো ঘোষণা ছাড়াই অনির্দিষ্টকালের জন্য অফিস বন্ধ করে দেওয়া হয়।

শরীয়তপুরের রাজু বলেন, ‘সোমবার ২৭৫৪ নম্বর সিরিয়ালের একটি টোকেন দেওয়া হয়েছে। আমাকে আগামী ৫ অক্টোবর এসে টিকিট সংগ্রহ করতে বলেছে। অথচ আমার ভিসার মেয়াদ শেষ হবে ২৬ সেপ্টেম্বর। এখন কী করব বুঝতে পারছি না।’

তেজগাঁও থানার ওসি সালাউদ্দিন মিয়া বলেন, ‘টিকিট জটিলতা সমাধানের দাবিতে প্রবাসীরা সড়ক অবরোধ করে বিক্ষোভ করেন। ঘটনাস্থলে গিয়ে সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে বসে সমাধানের পরামর্শ দিলে তারা অবরোধ প্রত্যাহার করে চলে যান।’

বেবিচকের এক কর্মকর্তা জানান, সৌদি এয়ারলাইনসের সঙ্গে বিমানের ফ্লাইট চালু করার জন্য বলেছিল ঢাকার সিভিল এভিয়েশন। এতে সৌদি এয়ারলাইনস বলেছে, আপাতত তারা একটি ফ্লাইট চালু করতে চায়। কিন্তু বেবিচক মানতে রাজি হয়নি। পরে আলোচনা করে আগামী ১ অক্টোবর থেকে সৌদিতে বাণিজ্যিক ফ্লাইটের অনুমতি পায় বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনস। তবে ল্যান্ডিং পারমিশন এখনো পায়নি। আশা করা হচ্ছে দ্রুত অনুমতি পেয়ে যাবে। তিনি আরও জানান, বিমানকে ফ্লাইট পরিচালনার অনুমতি না দেওয়ায় ঝুলে আছে সৌদির ফ্লাইট পরিচালনা।