ম্যাজেস্টিক মাজিদ খান|248398|Desh Rupantor
logo
আপডেট : ২৮ সেপ্টেম্বর, ২০২০ ০০:০০
ম্যাজেস্টিক মাজিদ খান
জগন্নাথ বিশ্বাস

ম্যাজেস্টিক মাজিদ খান

পাকিস্তান ক্রিকেটে অক্সফোর্ড-কেমব্রিজে পড়া, চোস্ত ইংরেজি বলা যে অভিজাত শ্রেণি আছে, তাদের উজ্জ্বলতম প্রতিনিধি হলেন মাজিদ খান। দেশভাগের ঠিক আগের বছর (১৯৪৬ সালের ২৮ সেপ্টেম্বর) পাঞ্জাবের জলন্ধরে এমন এক পরিবারে জন্ম তার, যারা ক্রিকেটকে আভিজাত্য প্রকাশের অন্যতম মাধ্যম হিসেবে দেখতেন। পাকিস্তান ক্রিকেটকে দাঁড় করিয়েছিল খান পরিবার। বাবা ডক্টর জাহাঙ্গীর খান ছিলেন কেমব্রিজ ব্লু। ভারতের হয়ে চারটি টেস্ট খেলেছেন। দেশভাগের পরে হন পাকিস্তান ক্রিকেটের প্রতিষ্ঠাতা। তার সময়েই টেস্ট অভিষেক ছেলে মাজিদের। মাজিদের চাচাতো ভাই ইমরান খান (বর্তমান প্রধানমন্ত্রী) পাকিস্তানকে বিশ্বকাপ এনে দেন। আরেক ভাই জাভেদ বার্কিও টেস্ট খেলেছিলেন পাকিস্তানের পক্ষে।

লাহোরের সেন্ট অ্যান্থনিস স্কুলে পড়ার সময় পেস বোলার হিসেবে সাড়া ফেলেছিলেন মাজিদ। পরে বিখ্যাত অ্যাটকিনসন্স কলেজে পড়ার সময় তার নাম আরও ছড়িয়ে পড়ে। মাত্র ১৫ বছর বয়সে লাহোর ‘বি’ দলের হয়ে ফার্স্ট ক্লাস ক্রিকেটে মাজিদ খানের অভিষেক। ৬৭ রানে ৬ উইকেট নেওয়ার পর ৭ নম্বরে ব্যাট করতে নেমে অপরাজিত ১১১ করেছিলেন। ১৮ বছর বয়সে অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে করাচিতে তার টেস্ট অভিষেক। জীবনের প্রথম ইনিংসে ৮ নম্বরে নেমে শূন্য করেন। দ্বিতীয় ইনিংসে ব্যাট ধরার সুযোগ পাননি। বল হাতে তিন উইকেট নিয়েছিলেন। দুই ইনিংসেই কিংবদন্তির বিল লরিকে আউট করেন। এরপর নিউজিল্যান্ড এসেছিল পাকিস্তান সফরে। দ্বিতীয় টেস্ট হয়েছিল লাহোরে। ৮ নম্বরে নেমে ৮০ রানের ইনিংস খেলেছিলেন মাজিদ। স্ট্রোকের ফুলঝুরি তেমন ছিল না। ১৯৬৭ সালে ইংল্যান্ড সফরে যা প্রথম টের পান গ্ল্যামারগনের বোলার রজার ডেভিস। ট্যুর ম্যাচে এক ওভারে তাকে টানা পাঁচ ছক্কা মেরেছিলেন মাজিদ। অপরাজিত ছিলেন ১৪৭ রানে। ছক্কা মেরেছিলেন ১৩টি। সম্ভবত ঐ ইনিংস দেখেই গ্ল্যামারগন তাকে সই করায়। টানা আট মৌসুম দলটির হয়ে কাউন্টি খেলেন মাজিদ। তিন বছর ছিলেন অধিনায়ক। শেফিল্ড শিল্ডে কুইন্সল্যান্ডের হয়েও খেলেছেন তিনি। এছাড়া লাহোর, পাঞ্জাব এবং রাওয়ালপিন্ডি তো ছিলই। মোট ৪১০টি ফার্স্ট ক্লাস ম্যাচে রান তার ২৭,৪৪৪। সেঞ্চুরি ৭৩, হাফসেঞ্চুরি ১২৮। ফুটওয়ার্ক ছাড়াও যে সফল ব্যাটসম্যান হওয়া যায় তার প্রথম উদাহরণ ছিলেন তিনি। একবার বলেছিলেন, ‘ব্যাটিংয়ে ফুটওয়ার্কের দরকার নেই, কেবল হাত আর চোখের সমন্বয় থাকাই যথেষ্ট।’ সেই অর্থে আধুনিক ক্রিকেটে বীরেন্দ্র শেওয়াগের প্রথম সংস্করণ ছিলেন মাজিদ খান।

ওয়ানডেতে পাকিস্তানের প্রথম সেঞ্চুরিয়ান মাজিদ খান। ১৯৭৪’র আগস্টে ইংল্যান্ডের বিপক্ষে মাত্র ৯৩ বলে করেন ১০৯ রান। তার কৃতিত্বে পাকিস্তান মাত্র ৪৩ ওভারে ২৪৫ রান তাড়া করে জিতেছিল। সেই সময়ের হিসাবে যা ছিল অসম্ভব টার্গেট। ১৯৭৬’র ৩০ অক্টোবর নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে করাচি টেস্টের প্রথম দিন লাঞ্চের আগেই মাত্র ৭৪ বলে সেঞ্চুরি করেছিলেন মাজিদ। এমন কীর্তি স্যার ডন ব্রাডম্যানের পর প্রথম মাজিদই গড়েছিলেন। পেস বোলিংয়ের বিপক্ষে তার ব্যাটিং দক্ষতা ছিল ঈর্ষণীয়। সত্তরের দশকে উইন্ডিজের রবার্টস, ক্রফট, হোল্ডার, গার্নারের বিপক্ষে বারবার সফল হয়েছেন। ৭৭-এ পাকিস্তান উইন্ডিজ সফরে ৩-১ টেস্টে সিরিজ হেরেছিল। ব্যাটসম্যান হিসেবে মাজিদ ছিলেন সফল। ৫৩ গড়ে ৫৩০  রান করেছিলেন মাজিদ খান। ১৯৭৯-র বিশ্বকাপ সেমিফাইনালে উইন্ডিজের বিপক্ষে ২৯৪ রান তাড়ায় দ্বিতীয় উইকেটে জহির আব্বাসের সঙ্গে ১৬৬ রান যোগ করে পাকিস্তানকে জয়ের দিকে নিয়ে যান মাজিদ। কিন্তু ১৭৬ রানের মাথায় কলিন ক্রফট জহির আব্বাসকে আউট করে জুটি ভাঙার সঙ্গে মাজিদ ও মিয়াঁদাদকে আউট করলে, আর পারেনি পাকিস্তান। ২৫০ রানে অলআউট হয়। ৮১ রান করেন মাজিদ।

চাচাতো ভাই ইমরান এবং জাভেদ বার্কির মতো পাকিস্তান দলকে নেতৃত্ব দিয়েছেন মাজিদ খান। যদিও মাত্র ৩ টেস্ট আর ২ ওয়ানডের অধিনায়ক ছিলেন। সব মিলিয়ে খেলেছেন ৬৩ টেস্ট। ৩৮.৯২ গড়ে রান করেছেন ৩৯৩১। সেঞ্চুরি ৮টি। উইকেট নিয়েছেন ২৭টি। ৩৭.৪২ গড়ে ২৩টি একদিনের ম্যাচে করেছেন মাত্র ৭৮৬ রান। বলা হয় নিজের প্রতিভার প্রতি সুবিচার করতে পারেননি মাজিদ খান। সীমিত ওভারের ক্রিকেটে তার পারফরমেন্স আরও ভালো হতে পারত। হয়নি কি তার ব্যাটিং দর্শনের কারণে? মাজিদ খান একবার বলেছিলেন, ‘ব্যাটিংকে আমি বোলারের সঙ্গে ব্যক্তিগত যুদ্ধ মনে করতাম। সব সময় মনে করতাম বলটা পেটানোর জিনিস। ভিন্ন ভিন্ন উইকেটে কৌশল পরিবর্তনের কথা মাথায় আনিনি। আমি সহজাত আক্রমণাত্মক মেজাজেই সবসময় খেলার চেষ্টা করেছি।’ এটা করতে গিয়েই অনেক ক্ষেত্রে বিফল হয়েছেন মাজিদ খান। তাই পরিসংখ্যান দেখে তাকে কিংবদন্তি মনে হয় না।

অথচ তিনি পাকিস্তান ক্রিকেটের কিংবদন্তিই ছিলেন। ব্যাটিংয়ে অভূতপূর্ব আড়ম্বর দেখে যাকে ডাকা হতো ‘ম্যাজেস্টিক মাজিদ’ নামে।