ধর্ষণ: পোশাক, মানসিক বিকৃতি না পুরুষতান্ত্রিক ক্ষমতার বহিঃপ্রকাশ|252439|Desh Rupantor
logo
আপডেট : ১৬ অক্টোবর, ২০২০ ১৭:৫০
ধর্ষণ: পোশাক, মানসিক বিকৃতি না পুরুষতান্ত্রিক ক্ষমতার বহিঃপ্রকাশ
স্নিগ্ধা রেজওয়ানা

ধর্ষণ: পোশাক, মানসিক বিকৃতি না পুরুষতান্ত্রিক ক্ষমতার বহিঃপ্রকাশ

ধর্ষণ নিয়ে আমি সাধারণত কোনো কিছু কোনো পত্রিকায় লিখিনি। লিখিনি তার একটা অন্যতম কারণ হচ্ছে ধর্ষণের সামাজিক ক্ষমতা চক্র, পিতৃতান্ত্রিক মানসপট ও সামাজিক স্বাভাবিকীকরণ প্রক্রিয়ার রাজনীতি আমাকে মানসিকভাবে এমন বিপন্ন করে দেয় যে, এ বিষয় নিয়ে লেখার জন্য যে মানসিক দৃঢ়তা প্রয়োজন সেটা আদৌ আমি রক্ষা করতে পারব কি না তা নিয়ে সন্দিহান ছিলাম, আজও আছি। তবে বিগত কয়েক সপ্তাহে ধর্ষণের কিছু ঘটনা, ধর্ষণের সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদণ্ডবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের অধ্যাদেশ জারি এ বিষয়গুলো এমনভাবে আমাকে নাড়া দেয় যে, মনের গভীর থেকে আওয়াজ উঠেছে, আজ যদি চুপ করে থাকি তবে নিজের বিবেকের কাছেই আর হয়তো নিজের মুখ দেখাতে পারব না।

শুরুতেই বলে রাখি, এ লেখাটি কেবল নারী অথবা কন্যা শিশু ধর্ষণের নিমিত্তে লেখা। প্রসঙ্গত উল্লেখ্য যে, আমাদের সমাজে ছেলে বাচ্চার যৌন সহিংসতার শিকার হওয়াকে ভাষাগত লিঙ্গীয় ক্ষমতা কাঠামোর বলে সাধারণত ‘বলাৎকার’ হিসেবে  উল্লেখ করা হয়। যাই হোক সে প্রসঙ্গে আজ না যাই। আজ যে লেখাটি লিখছি সেটা কেবলই নারী ও কন্যা শিশুকে মাথায় রেখে। আমি মূলত তিনটি বিষয়ে আলোকপাত করছি। প্রথমত: ধর্ষণ সংজ্ঞায়নের সংকট; দ্বিতীয়ত: ধর্ষণের ধারণায়নের রাজনীতি; এবং তৃতীয়: ধর্ষণের সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদণ্ডের আনুমানিক ফলাফলসমূহ।

লেখার শুরুতে খুব স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন করতে হয় ধর্ষণ কি? এর  উত্তর আমরা কমবেশি সবাই জানি। সাদামাটাভাবে বললে ধর্ষণ হচ্ছে নারীর প্রতি যৌন সহিংসতার সর্বোচ্চ রূপ। আরো স্পষ্ট করে বললে কোনো নারীর সম্মতি ব্যতীত তার সঙ্গে যৌন সম্পর্কে লিপ্ত হওয়াকে ধর্ষণ বলা হয়। এ জাতীয় সাধারণ সংজ্ঞায়নের কতগুলো সংকট আছে। এর প্রথম ও প্রধান সংকট হলো,  এ জাতীয় সংজ্ঞায়নে মনে হতে পারে কেবল যৌন কাম বা যৌনতার কারণে নারী ধর্ষণের শিকার হয়। অন্যভাবে  বললে নারীকে ধর্ষণের মূল কারণ দাঁড়ায় কেবল পুরুষের যৌনবৃত্তি, লালসা ও পৈশাচিক কাম।

বাংলাদেশের আইনে ধর্ষণের সংজ্ঞায় বলা হয়, ‘যদি কোনো পুরুষ বিবাহ বন্ধন ব্যতীত ষোলো বৎসরের অধিক বয়সের কোনো নারীর সঙ্গে তার সম্মতি ছাড়া বা ভীতি প্রদর্শন বা প্রতারণামূলকভাবে তার সম্মতি আদায় করে, অথবা ষোলো বৎসরের কম বয়সের কোনো নারীর সঙ্গে তার সম্মতিসহ বা সম্মতি ব্যতিরেকে যৌনসংগম করেন, তাহলে তিনি উক্ত নারীকে ধর্ষণ করেছেন বলে গণ্য হবেন’।

প্রথমে উপরিউক্ত সংজ্ঞায়নের কতগুলো সংকট তুলে ধরি। প্রথমেই বলা হয়েছে, যদি পুরুষ বিবাহ বন্ধন ব্যতীত ১৬ বছরের অধিক বয়সের কোনো নারীর সঙ্গে তার সম্মতি ছাড়া যৌনসংগম করে তাহলে সেটি ধর্ষণ বলে গণ্য হবে।  অর্থাৎ বিষয়টি এ রকম যে, বন্ধনে আবদ্ধ নারীর সম্মতি ছাড়া যদি তার স্বামী জোরপূর্বক স্ত্রীর সঙ্গে যৌনসংগমে লিপ্ত হয় সেটি ধর্ষণের শিকার বিবেচিত হবে না। তার মানে পরিষ্কারভাবেই এখানে ‘ম্যারিটাল রেপ’  বা বৈবাহিক ধর্ষণের প্রসঙ্গটি এড়িয়ে যাওয়া হয়েছে।

দ্বিতীয়, এখানে বলা হয়েছে ভয়ভীতি প্রদর্শন অথবা  ‘প্রতারণামূলকভাবে’ যদি  সম্মতিসহ অথবা সম্মতি ব্যতিরেকে যৌনসংগম করেন, সেটি ধর্ষণ হিসেবে বিবেচিত হবে। এখানে প্রতারণামূলকভাবে বলতে কী বোঝানো হয়েছে তা পরিষ্কার ভাষায় কোথাও বলা হয়নি। প্রশ্ন হলো, প্রাপ্তবয়স্ক কোনো নারী-পুরুষের প্রণয়ের সম্পর্কের মাঝে যদি বিবাহের শর্তসাপেক্ষে উভয় পক্ষের সম্মতিতে যৌনসংগম হয়ে থাকে সেটি কি করে বা কোন পরিসরে ধর্ষণ হিসেবে বিবেচিত হতে পারে? কারণ যে কোনো পক্ষই যেকোনো বাস্তবিক পরিসরে বিবাহ নামক চুক্তিতে আবদ্ধ হওয়া থেকে নিজেকে বিরত করতে পারেন। আর কোনটিকে প্রতারণা বলা যায় না সেটি নিয়ে যেমন তর্কের অবকাশ রয়েছে একইভাবে প্রাপ্তবয়স্ক কোনো নারীর বিবাহ প্ররোচনায় প্ররোচিত হয়ে যৌনসঙ্গমের সম্মতি দেওয়ার বিষয়টি আদৌ ধর্ষণের মতো সহিংস নির্যাতন হিসেবে বিবেচনা করা যায় কিনা সেটি  পুনর্বিবেচনা করা প্রয়োজন।

এরপর যে বিষয়টি আলোচনা করা প্রয়োজন তা হলো  ধর্ষণ নিয়ে আমাদের সাধারণ জনগণের বোঝাপড়ার ঘাটতি। ধর্ষণবিষয়ক আমাদের সাধারণ স্বাভাবিক বোঝাপড়ায় অনেকেরই ধারণা পুরুষের যৌন বিকৃতি ও মানসিক সমস্যার ফসল হচ্ছে ধর্ষণ। আবার  কেউ কেউ বলেন নারীর পোশাক ধর্ষণের কারণ, নারীর শারীরিক অবয়ব পুরুষের যৌন উত্তেজনা ও উদ্দীপনা তৈরি করে- সেটি হচ্ছে ধর্ষণের মূল কারণ। অন্যভাবে বললে তাদের দাবি, নারীদের পোশাকই তাদের ধর্ষণের শিকার হওয়ার একটি অন্যতম কারণ যা সাম্প্রতিক সময়ের  চলচ্চিত্র অভিনেতা অনন্ত জলিলের ভিডিও বার্তায় সুনিপুণভাবে ফুটে উঠেছে।

যাই হোক, প্রথমেই বলে রাখি, ধর্ষণ পুরুষের যৌন বিকৃতির ফসল অথবা পোশাকের কারণে নারী ধর্ষণের শিকার হয়- উভয় প্রকার বক্তব্যই অসম্পূর্ণ, আপত্তিকর ও বিভ্রান্তিমূলক।

এখন আসি ধর্ষণ একটি ‘মানসিক বিকৃতি’ এই বক্তব্যের রাজনৈতিক বিশ্লেষণে। বিকৃতি শব্দটির বিশেষণ পদ হলো ‘বিকৃত’। যার আভিধানিক অর্থ হলো, যার স্বাভাবিক রূপ অবস্থা বা ভাব নষ্ট হয়েছে এমন, বিকারপ্রাপ্ত বা বিকারগ্রস্ত বা দোষ যুক্ত বা ‘অসুস্থ’ হয়েছে এমন বিকৃতি বোঝাতে শব্দটি ব্যবহার করা হয়ে থাকে। এখন ধর্ষণকে যদি ‘মানসিক বিকৃতি’ হিসেবে দেখা হয় তাহলে আমার প্রশ্ন, ধর্ষণ কি কেবলই ধর্ষকের মানসিক অসুস্থতার বহিঃপ্রকাশ, নাকি ধর্ষণ পিতৃতান্ত্রিক সমাজব্যবস্থায় ক্ষমতা প্রদর্শনের ও নারীর প্রতি সহিংস নির্যাতনের এক মোক্ষম হাতিয়ার? ধর্ষণবিষয়ক বিবর্তনিক ধারা মতে, গোত্র ব্যবস্থার শুরুতে এক গোত্র আরেক গোত্রের ওপর আক্রমণকালে ক্ষমতা ও বংশবৃদ্ধির নিমিত্তে প্রতিহিংসা স্বরূপ নারীকে ধর্ষণ করে তার বংশবিস্তারের উদ্দেশ্যে। নারী শরীরকে ব্যবহার করা হয় ক্ষমতার বিস্তারের হাতিয়ার হিসেবে, যা কিনা বর্তমান সময়ের যুদ্ধে বিশেষভাবে লক্ষণীয়।

তা ছাড়া শরীর ও যৌনতাকে নিয়ন্ত্রণে, নারীর ওপর পুরুষতন্ত্রের ক্ষমতার বহিঃপ্রকাশের এক অন্যতম মাধ্যম ধর্ষণ। এ ক্ষেত্রে ধর্ষণকে পুরুষের মানসিক অসুস্থতা বা বিকৃতি বলার মধ্য দিয়ে মূলত এ বাস্তবতাকেই আড়ালের চেষ্টা করা হয়।

ধর্ষণকে ব্যক্তির মানসিক বিকৃতি বলার মধ্য দিয়ে সামাজিক পরিসরে নির্মিত নারীর বিপক্ষে চর্চিত  ধারণাসমূহ, নারীকে অধস্তন করে রাখা ও নারীর যৌনতাকে নিয়ন্ত্রণের কৌশলসমূহ সমাজ যে সুচারুভাবে উৎপাদন ও চর্চা করে, সে বিষয়টিকে আড়াল করা হয়। যাতে মনে হয় ধর্ষণ কেবল একটি ব্যক্তিক বিষয়। মনে রাখা ভালো, ধর্ষণ যদিও ব্যক্তির যৌন সহিংসতা হলেও তা মূলত একটি সঙ্গবদ্ধ পুরুষতান্ত্রিক মতাদর্শেরই  বহিঃপ্রকাশ। তা ছাড়া ধর্ষণের সঙ্গে নিবিড়ভাবে যুক্ত ক্ষমতায়িত পৌরুষের ধারণা। যেখানে মেসকুলিনিটির অধ্যয়নে বলা হয়ে থাকে ‘আলফা ম্যান’ হয়ে ওঠার সামাজিক চাপ পুরুষকে নারীর ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রকাশে তথা ধর্ষণে উৎসাহিত করে।

এবার আসি পোশাককে ধর্ষণের কারণ বলা হয় সে বিষয়ে। শুনতে তেতো হলেও সত্যি যে, বাংলাদেশের মতো পুরুষতান্ত্রিক সমাজব্যবস্থায় বলতে গেলে প্রায় অর্ধেকের বেশি মানুষ এটাই ভাবেন নারীর পোশাক ও নারীর আচরণ ধর্ষণের একটি কারণ। মজা এই, পোশাককে ধর্ষণের কারণ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করার নেপথ্যে কাজ করে বাংলাদেশ রাষ্ট্রের রাষ্ট্রীয় ব্যর্থতার দায় ও ধর্মীয় মতাদর্শ চাপানোর একটি সুকৌশল রাজনীতি।  উত্তরাধুনিক নারীবাদীদের মতে, রাষ্ট্র তার ব্যর্থতা ঢাকতে কতগুলো কলা ও কৌশল অবলম্বন করে, যার মধ্য দিয়ে সে তার নিয়ন্ত্রণ নিশ্চিত করতে চায়, তার ক্ষমতাকে টিকিয়ে রাখতে চায়- যেটাকে বলা হয় ‘টেকনোলজি অব ডমিনেশন’। রাষ্ট্রে যখন বিচারবিহীন অরাজকতার একটি পরিবেশ বিরাজমান, আইনের সুশাসন দৃশ্যত অদৃশ্য, রাষ্ট্র খুব সূক্ষ্মভাবে ডিসকোর্স রচনার মদদ জোগায়। রাষ্ট্রের এই আসল রাজনীতিতে আমরা একেকজন হয়ে উঠি রাষ্ট্রীয় এজেন্ট, যার প্রেক্ষিতে রাস্তায় রাষ্ট্রের ব্যর্থতার আলাপ প্রসঙ্গ সামনে না নিয়ে এসে, ব্যক্তির ঘাড়ে দায় আরোপ করা হয় এবং সমাজ ও অপরাপর প্রতিষ্ঠানসমূহ, বিশেষত বাংলাদেশ রাষ্ট্রের বাস্তবতায় তার ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানসমূহ, নারীর পোশাককে, তার আচার আচরণকে ধর্ষণের  কারণ হিসেবে উল্লেখ করে তার প্রোপাগান্ডা চালিয়ে যেতে থাকে। এতে করে রাষ্ট্রের সুবিধা হলো, সে তার ব্যর্থতার দায় থেকে মুক্তি লাভ করে। আর ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের সুবিধা হলো সে তার ধর্মীয় মূল্যবোধের নামে ও রাজনীতিকে হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহারের মধ্য দিয়ে নারীর ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার বৈধতা লাভ করে।

এবার আসি সর্বশেষ বিষয়, যেখানে দেশবাসীর  চলমান ধর্ষণবিরোধী আন্দোলনের প্রতিক্রিয়াস্বরূপ বর্তমান সরকার ধর্ষণের সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদণ্ড করার যে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছে সেই প্রসঙ্গে। ধর্ষণের সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদণ্ড  কোনোভাবে ধর্ষণের হার কমাতে সহায়ক হতে পারে না। কারণ যে দেশে আইনের তেমন প্রয়োগ হয় না, যে দেশে সুশাসনের চর্চা হয় না, জবাবদিহির সংস্কৃতি  নাই, সে দেশে আইন কেবলই কাগজ-কলম সর্বস্ব। তা ছাড়া ধর্ষণের সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদণ্ড, ভিকটিমের জীবনাশঙ্কা বৃদ্ধি করে, আইনের সুশাসনকে আরো কঠোর করে তুলবে। কারণ এতে করে মৃত্যুদণ্ডের ভয়ে ধর্ষকের ভিকটিমকে বাঁচিয়ে রাখার সম্ভাবনা হ্রাস পাবে, আইনি জটিলতা বৃদ্ধি  পাবে এবং অপরাধ দমনে আইনের প্রায়োগিকতার পথ রুদ্ধ করা হবে।

মনে রাখা প্রয়োজন, মৃত্যুদণ্ড কোনোভাবে আধুনিক সমাজের অপরাধ বিনাশের কোনো কার্যকর ভূমিকা পালন করে না।

উপরন্তু বিদ্যমান ধর্ষণ আইনের ধারা সমূহ; যেমন সাক্ষ্য ধারা, হাইকোর্টের ১৮০ দিনের মধ্যে ধর্ষণের রায় বিষয়ক নির্দেশনাবলি কার্যকরে পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়নি সেসব বিষয়কে এড়িয়ে যাওয়া হয়েছে। সর্বোপরি, যখন গত নয় মাসে, প্রায় হাজারের অধিক ধর্ষণের মামলা পরিলক্ষিত হয় এবং সেই রাষ্ট্রের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ব্যর্থতার কোনো জবাবদিহি জনগণের সামনে উন্মোচিত হয় না,  আইনের প্রয়োগ দৃশ্যত হয় না, সেখানে ধর্ষণের সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদণ্ড নামক আইন আদতে কেবলই কি আমাদের  ভ্রমের মাঝে রাখা নয়?

স্নিগ্ধা রেজওয়ানা: শিক্ষক, নৃবিজ্ঞান  বিভাগ, জাহাঙ্গীরনগর  বিশ্ববিদ্যালয়।