শিশুদের শিক্ষায় ইগনাইট ইয়ুথ ফাউন্ডেশন|252788|Desh Rupantor
logo
আপডেট : ১৮ অক্টোবর, ২০২০ ০০:০০
শিশুদের শিক্ষায় ইগনাইট ইয়ুথ ফাউন্ডেশন
শফিকুল ইসলাম

শিশুদের শিক্ষায় ইগনাইট ইয়ুথ ফাউন্ডেশন

শিশুদের বিনামূল্যে লেখাপড়ার ব্যবস্থা করে যুক্তরাজ্যের ‘ডায়ানা অ্যাওয়ার্ড -২০২০’ পেয়েছেন মোহাম্মদ জহিরুল ইসলাম। নারীর ক্ষমতায়ন, লিঙ্গবৈষম্য দূরীকরণ, বিনামূল্যে রক্তদান, দারিদ্র্য নিরসন, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, স্বাস্থ্য সুরক্ষা, সামাজিক সচেতনতা ও যুব ক্ষমতায়ন নিয়ে কাজ করছে ‘ইগনাইট ইয়ুথ ফাউন্ডেশন’। লিখেছেন শফিকুল ইসলাম

শুরুর দিনগুলো

ছাত্রাবস্থা থেকেই বিভিন্ন সামাজিক সংগঠনের সঙ্গে কাজ করতেন জহিরুল ইসলাম । এই কাজের সুবাদে নিম্নবিত্ত মানুষের কষ্ট দেখেছেন। কাজ করতে গিয়ে একটা সময় উপলব্ধি করলেন এবার নিজেকে কিছু করতে হবে। সেই সময় বন্ধুদের নিয়ে ঢাকা এয়ারপোর্ট থেকে টঙ্গী রেলস্টশনের রেললাইনের পাশের মানুষদের রাতের বেলা শীতবস্ত্র বিলি করতেন। একদিন হঠাৎ একটি শিশু দৌড়ে এসে বলল, ‘স্যার, আমরা পড়তে চাই, কাপড়  চাই না’। দশ বছরের শিশুটি পাশের ভবন আঙুল দিয়ে দেখিয়ে বলল, ‘স্যার, এমন বিল্ডিংয়ে মাকে নিয়ে থাকতে চাই। বাবাকে রাখব না। মা আর আমি টাকা না দিলে বাবা প্রতিদিন মারে। আমি কাজ করে দিনে একশ আর মাকে ২শ টাকা করে দিতে হয়। স্যার আমাকে পড়াবেন?’ তখন জহির সিদ্ধান্ত নিলেন, এমন শিশুদের পড়ালেখা শেখাবেন। তাদের জন্য স্কুল বানাবেন।

সেই স্বপ্ন থেকেই জন্ম হলো স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন ‘ইগনাইট ইয়ুথ ফাউন্ডেশন’-এর। ইগনাইট মানে জ্বলে ওঠা। দেশের গন্ডি পেরিয়ে পাঁচটি দেশে স্বেচ্ছাসেবায় সংগঠনের কর্মীরা পড়ালেখা শেখান। কানাডিয়ান ইউনিভার্সিটি অব বাংলাদেশে (সিইইউবি) ইলেকট্রিক্যাল অ্যান্ড ইলেকট্রনিক ইঞ্জিনিয়ারিং (ইইই)’র ৮ম সেমিস্টারে পড়াশোনা করছেন জহিরুল ইসলাম। যুক্তরাজ্যে উচ্চতর লেখাপড়ার সুযোগ পেয়েও যাননি। স্বপ্ন হলো দেশে থাকবেন, দেশের মানুষের জন্য কাজ করবেন। 

‘ইগনাইট ইয়ুথ ফাউন্ডেশন’ অলাভজনক সংগঠন। তরুণ স্বেচ্ছাসেবকরা কাজ করেন এই সংগঠনে। বাংলাদেশের দুস্থ ও গরিব শিশুদের জীবনের মান উন্নয়নে কাজ করেন। এখন ‘ইগনাইট ইয়ুথ ফাউন্ডেশন স্কুল’, ‘ইগনাইট ব্লাড ব্যাংক’, স্বাস্থ্য ও চিকিৎসা সহায়তা প্রকল্প ‘নিরাময়’, ‘ইয়ুথ ডেভেলপমেন্ট প্রোগ্রাম’, ‘ইগনাইট বর্জ্য ব্যবস্থাপনা’, দারিদ্র্য দূরীকরণের জন্য ‘স্বাবলম্বী’, হস্তশিল্পের সামাজিক উদ্যোগ ‘ক্রাফটনাইট বা নৈপুণ্য’ নামের পাঁচটি সংগঠন আছে। ইগনাইট ইয়ুথ ফাউন্ডেশন ২০১৬ সালের ২ ফেব্রুয়ারি থেকে যেসব দরিদ্র বাবা-মা তাদের সন্তানদের পড়াশোনা করাতে চান। তাদের পড়াশোনার দায়িত্ব নিল। আর সেইসব পরিবারের অভাব-অনটন দূর করতে দীর্ঘমেয়াদি প্রকল্প চালু করলেন। রিকশা, ভ্যান, গরু, ছাগল দান ও নানা ধরনের প্রশিক্ষণ দিয়ে স্বাবলম্বী করলেন। শিশুদের মায়েদের সেলাই শিখিয়ে সেলাই মেশিন দিলেন।

শিক্ষার আলো ছড়িয়ে

২০১৬ সালের মে মাসে ২০ জন সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের নিয়ে ঢাকার উত্তরার ৭ নম্বর সেক্টর পার্কে শুরু হয় ‘ইগনাইট ইয়ুথ ফাউন্ডেশন স্কুল’। প্রথম তিন মাস তারা পার্কেই শিশুদের লেখাপড়া শিখিয়েছেন। এরপর  জহির ও তার সংগঠনের স্বেচ্ছাসেবকরা ভাবলেন একটু গুছিয়ে কাজ করতে হবে। ৬ মাস জরিপ করলেন ঢাকার বাউনিয়া বাঁধ ও তুরাগ নদীর আশপাশে। সেই অভিজ্ঞতার আলোকে দরিদ্র পরিবার থেকে ৩২ জন শিশুকে নিয়ে ২০১৭ সালের ২ ফেব্রুয়ারি নার্সারি ও প্রথম  শ্রেণির ক্লাস শুরু করলেন বাউনিয়া এলাকায়। দুটি ছোট শ্রেণিকক্ষে চালু হলো প্রথম স্কুল। প্রথম ৩ মাস বিকাল ৪টা থেকে সন্ধ্যা ৬টা পর্যন্ত নিজেরা ক্লাস নিলেন। পরে নিয়োগ দিলেন ২ জন শিক্ষক। এখন স্কুলে স্থায়ী শিক্ষক আছেন বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ুয়া ৩ জন আর ৬ জন খন্ডকালীন। আছেন একজন নাচের শিক্ষকও। ক্লাসের বইয়ের পাশাপাশি অন্যন্যা বইও পড়াচ্ছেন। প্লে থেকে তৃতীয় শ্রেণিতে তাদের নিয়মিত ছাত্রছাত্রী মোট ৬৭ জন। পুষ্টিকর খাবার, ফ্রি চিকিৎসা, কম্পিউটার ক্লাস, বছরে ৩ সেট বিদ্যালয়ের পোশাক এদের দেওয়া হয়। মা-বাবাদের জন্য আছে আলাদা পরিবার-পরিকল্পনা কার্যক্রম। জহির জানালেন, ‘আমাদের ছাত্রছাত্রীদের প্রথম শ্রেণি থেকে কারিগরি ক্লাসও নিই। টেক্সটবুকের পাশাপাশি প্রয়োজনীয় আরও ৫টি বই ছাত্রছাত্রীদের পড়তে দিই।’ ২০১৯ সালে ইগনাইট ইয়ুথ ফাউন্ডেশন স্কুলের ৫ শিক্ষার্থী  ‘শেখ রাসেল সমাজকল্যাণ সংস্থা’র  প্রতিযোগিতায় অংশ নিয়ে নাচ ও ছবি আঁকায় ৫টি পুরস্কার পেয়েছে।

বাড়ছে কাজের পরিধি

‘আমি তোমার প্রয়োজনে রক্ত দেব। অন্যের প্রয়োজনে তোমাকেও রক্ত দিতে হবে’ এই স্লোগানে ইগনাইট ব্লাড ব্যাংকের কার্যক্রম সাফল্য লাভ করেছে। ২০১৯ সালে নিজেদের স্বেচ্ছাসেবীদের ২৮ ব্যাগ রক্তদানের মধ্য দিয়ে জন্ম এই সংগঠনের। জহির বললেন, ২০১৬ সালে তার বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রথম রক্তদান কর্মসূচি শুরু করেছেন। এ পর্যন্ত প্রায় ২ হাজার ব্যাগ রক্তদান করে মানুষের জীবন বাঁচিয়েছেন। অসংখ্য মানুষকে  স্বাবলম্বী করে সচ্ছলতা এনে দিয়েছেন। এ রকম একজন পঞ্চাশোর্র্ধ্ব হাসিদ মিয়া। তিন মেয়ে ও দুই ছেলেকে নিয়ে সাতজনের পরিবার। থাকেন ঢাকার বাউনিয়া বাজার বস্তিতে। রিকশা চালিয়ে তার সংসার চালানো কষ্টকর ছিল। ইগনাইট স্বাবলম্বী প্রকল্পের মাধ্যমে এই পরিবারকে ঘুরে দাঁড় করাতে সাহায্য করেছেন। হাসিদ মিয়া এখন পুরোপুরি সচ্ছল। রিকশার জমা দিতে হয় না। কোনো মহাজন নেই। নিজের রিকশা যতক্ষণ প্রয়োজন চালান। অভাব দূর হয়েছে। ছেলেমেয়েরা স্কুলে যাচ্ছে। ভবিষ্যতের জন্য তারা সঞ্চয় করছেন। দারিদ্র্য দূর করে আত্মনির্ভরশীল পরিবার গড়তে ইগনাইট ২০১৯ সালে প্রথমে তিনটি অসচ্ছল পরিবারকে ২টি রিকশা ও একটি করে সেলাই মেশিন দিয়েছেন। এই প্রকল্পের টাকা পেয়েছেন মানুষের জাকাত ফান্ড থেকে। উদ্দেশ্য অর্থ দিয়ে দুস্থ ও সুবিধাবঞ্চিত পরিবারগুলোকে স্বাবলম্বী করে গড়ে তোলা ।

বস্তির সুবিধাবঞ্চিত শিশুর স্বাস্থ্য ও চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করতে ফাউন্ডেশন হাতে নিয়েছে ‘নিরাময়’। প্রকল্পটির মাধ্যমে নানা ধরনের সচেতনতামূলক প্রচার করেন। শিশু ও তাদের পরিবারগুলোকে সুস্থ ও রোগমুক্ত রাখতে কমিউনিটি পর্যায়ে ওষুধ সরবরাহ করেন। ইগনাইট মেডিকেল দলে মোট ১২ জন চিকিৎসক আছেন। মহামারী করোনাভাইরাসের প্রাদুর্ভাবে ফাউন্ডেশনের মাধ্যমে তারা ৫শর বেশি রোগীর চিকিৎসা করেছেন। হযরত শাহজালাল (রহ.) আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের পাশের বস্তির মাহাবুব হোসেন কভিড-১৯ আক্রান্ত হয়ে কোথাও ডাক্তার দেখাতে পারছিলেন না। ফোন করে সমস্যার কথা জানালেন ফাউন্ডেশনে। সঙ্গে সঙ্গে চিকিৎসকের সঙ্গে যোগাযোগ করিয়ে দিলেন। এছাড়া গত রমজানে ১ হাজার অভাবী মানুষকে সাহরি ও ইফতার বিতরণ করেছেন ঢাকার উত্তরা, এয়ারপোর্ট, ধানম-ি, রামপুরা, মিরপুর, পুরানা পল্টন ও পুরান ঢাকায়। 

ইগনাইট ইয়ুথ ফাউন্ডেশন ‘ইয়ুথ ডেভেলপমেন্ট প্রোগ্রাম’-এর মাধ্যমে সংগঠনের স্বেচ্ছাসেবক, শিক্ষার্থী, উদ্যোক্তা, নারী ও দরিদ্র শিশুদের জীবনমুখী দক্ষতা বিকশিত করছে। প্রয়োজনীয় নানা ধরনের কর্মশালা ও প্রশিক্ষণ দিচ্ছেন। সংগঠনের প্রতিষ্ঠাতা মোহাম্মদ জহিরুল ইসলাম জানালেন, এ পর্যন্ত তারা মোট ১৫টি ইয়ুথ ডেভেলপমেন্ট প্রোগ্রামের আয়োজন করেছেন। এ বছর ড্যাফোডিল ইন্টারন্যাশনাল কলেজে (ডিআইসি) ‘বিদ্যা চেঞ্জ মেকার’ প্রোগ্রামে ২শ তরুণ-তরুণীকে এক্সপার্টদের মাধ্যমে আলোকচিত্র ও সিভি রাইটিংয়ের প্রশিক্ষণ দিয়েছেন।

বর্জ্য ব্যবস্থাপনা এবং পুনরায় ব্যবহারযোগ্য করতে ২০১৮ সালে ফাউন্ডেশন চালু করে ‘ইগনাইট বর্জ্য ব্যবস্থাপনা’। এই কার্যক্রমের সঙ্গে যুক্ত আছেন ছাত্রছাত্রী ও অভিভাবকরা। এ পর্যন্ত পাঁচ হাজার শিক্ষার্থী, শিক্ষক ও অভিভাবকসহ মোট ১৮৫ জন স্বেচ্ছাসেবক প্রকল্পের প্রশিক্ষণে অংশ নিয়েছেন। ঢাকার উত্তরা হাই স্কুল, মেগা সিটি স্কুল, মাইলস্টোন স্কুল, আইডিয়াল স্কুল, ড্যাফোডিল  ইন্টারন্যাশনাল স্কুলের মতো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। এসব স্কুলে তিনটি করে ময়লা ফেলার বিন দেওয়া হয়। যাতে শিক্ষার্থীদের মধ্যে বিনে ময়লা ফেলার অভ্যাস গড়ে ওঠে। প্রতিটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে গড়ে তুলেছেন ‘ইকো ক্লাব’। এই  ক্লাবের মাধ্যমে শিক্ষার্থীরা নিজেদের স্কুল পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাখছে। পরিবেশ পরিচ্ছন্ন রাখায় ২০১৯ সালে ‘গ্লোবাল স্টুডেন্টস এন্টারপ্রেনার অ্যাওয়ার্ড’ ২০১৯-’২০ লাভ করেছে ইগনাইট ইয়ুথ ফাউন্ডেশন।

নারীদের স্বাবলম্বী করে গড়ে তুলতে ফাউন্ডেশনের সহ-প্রতিষ্ঠান ‘ক্রাফটনাইট’ হস্তশিল্প প্রশিক্ষণ দিচ্ছে। এ প্রসঙ্গে জহির জানান, এ পর্যন্ত মোট ৪৫ জন নারীকে হস্তশিল্পের প্রশিক্ষণ দিয়েছেন। ফাউন্ডেশনের স্কুলের শিক্ষার্থীদের মায়েদের সেলাই শিখিয়ে সেলাই মেশিন দিয়েছেন। এমন বেশ কজন নারী এখন ক্রাফটনাইটের প্রডাক্ট ডিজাইনার। ক্রাফটনাইটকে অনলাইনের পাশাপাশি শোরুম করার মাধ্যমে প্রতিষ্ঠানিক রূপ দেওয়ার ইচ্ছে আছে।

দেশের সীমানা পেরিয়ে

সময়ের সঙ্গে তাল মিলিয়ে ফাউন্ডেশনের কাজের পরিধি বিস্তৃত হয়েছে, যুক্ত হয়েছেন অসংখ্য কর্মী স্বেচ্ছাসেবক তরুণ। মাত্র ৩৫ জন নিয়ে শুরু হয়েছিল পথচলা। এখন দেশের সাত জেলাঢাকা, কুমিল্লা, কিশোরগঞ্জ, বরিশাল, টাঙ্গাইল, সিলেট ও চাঁদপুরে মোট ২৩ হাজার স্বেচ্ছাসেবক আছেন সংগঠনের সঙ্গে। দেশের বাইরে দক্ষিণ কোরিয়া, ইংল্যান্ড, নেদারল্যান্ডস, কানাডা ও থাইল্যান্ডে কাজ করছেন ২শ আন্তর্জাতিক ইগনাইট ইয়ুথ ফাউন্ডেশন ভলান্টিয়ার। দেশের মোট ১৫টি বিশ্ববিদ্যালয়ে আছেন ৮৫ জন ‘ইগনাইট ক্যাম্পাস অ্যাম্বাসেডর’। শিক্ষার্থীদের সাংস্কৃতিক ও মানসিক বিকাশে কাজ করছেন তারা। ইগনাইটের রয়েছে ২৩ জনের বিশেষ প্রতিনিধিদল যারা পরিকল্পনা, কর্মপ্রক্রিয়া ও বাস্তবায়নের কাজে আছেন। কাজের স্বীকৃতি হিসেবে এ বছর ‘জাতিসংঘ বাংলাদেশ ভলান্টিয়ার্স’র বেস্ট ভলান্টিয়ার্স গ্রুপ অ্যাওয়ার্ড লাভ করেছে ফাউন্ডেশন। পরিচালক জহির বলেছেন, ‘আমাদের অনেক স্বেচ্ছাসেবক বিদেশে পড়তে গিয়েছেন। তাদের মাধমে সেখানেও ইগনাইটের কাজ হচ্ছে। যুব উন্নয়ন, বাংলাদেশের সংস্কৃতি, পরিবেশ রক্ষাসহ নানা বিষয়ে সভা, কাউন্সিলিং, শিক্ষালোচনা, নারীর ক্ষমতায়ন, ডোনেশন পাওয়া, নানা সচেতনতামূলক কর্মসূচিসহ দারিদ্র্য বিমোচনে বিভিন্ন পদক্ষেপ নিয়ে দেশকে তুলে ধরেছেন।’

শুরুতে ইগনাইট ইয়ুথ ফাউন্ডেশনে টিফিন ও টিউশনির টাকা দিতেন জহির ও তার বন্ধুরা। এখন স্কুল চালাতে বিভিন্ন কোম্পানি তাদের স্পন্সর করছে। বাকি সব কাজ সদস্যদের ব্যক্তিগত চাঁদায় চলছে। জহিরের মনে আছে, ‘২০১৭ সালের ফেব্রুয়ারিতে  স্কুলের কাজ মাত্র শুরু করেছি, হঠাৎ সন্ধ্যায় ফোন করে একজন হুমকি দিলেন, ৫০ হাজার টাকা না দিলে স্কুল বন্ধ করে দেবেন। আমাদের বাউনিয়া থেকে তুলে নেবেন। কিছুদিন ভয়ভীতি দেখালেন ওরা। আমরা ভয় পাইনি। ইউনিভার্সিটির ছাত্র বলে এলাকাবাসী ও তাদের মা-বাবারা মনে করতেন, আমরা তাদের বাচ্চাদের পাচার করে দেব। প্রথম এক বছর স্কুল চলাকালীন তারা পাহারা দিয়েছেন। আমরা প্রতিদিন বাচ্চাদের খাবার দিতাম। তারা মনে করতেন, আমরা শিশুদের ধর্মান্তরিত করব। ভয়ে স্কুলের দরজা-জানালার পাশে দাঁড়িয়ে থাকতেন। এখন সব সন্দেহ দূর হয়েছে। কোনো সমস্যা হয় না।’

মোহাম্মদ জহিরুল ইসলাম

ইগনাইট ইয়ুথ ফাউন্ডেশনের এই বিপুল কর্মযজ্ঞের প্রাণ ২১ বছরের মোহাম্মদ জহিরুল ইসলাম। চাঁদপুরের গোবিন্দিয়া গ্রামের ছেলে। এ পর্যন্ত তার অর্জনের ঝুলিতে আছে অসংখ্য পুরস্কার। চাঁদপুর শহরের আল আমিন অ্যাকাডেমি স্কুল অ্যান্ড কলেজে দশম শ্রেণিতে পড়াশুনাকালীন ২০১৩ সালে রাষ্ট্রপতি আবদুল হামিদের হাত থেকে নিয়েছেন স্কাউটের সর্বোচ্চ সম্মান ‘প্রেসিডেন্ট’স স্কাউট অ্যাওয়ার্ড’। ছিলেন সিইউবি’র রোটার‌্যাক্ট ক্লাব, ইনোভিশন ক্লাব’র সভাপতি। নিম্ন আয়ের মানুষদের স্বাবলম্বী করায় যুক্তরাষ্ট্রের ওয়ার্ল্ড কনফেডারেশন অব বিজনেস’র সংগঠন ‘দ্য বিজ’-এর ‘বিজ অ্যাওয়ার্ড-২০২০’, বাংলাদেশে স্টুডেন্ট স্টার্টআপ চ্যাপ্টার- প্রথম আসরে ১ম রানারআপ, আইইউবি (ইন্ডিপেনডেন্ট ইউনিভার্সিটি, বাংলাদেশ)’র অ্যারোফেস্ট-২০১৫’র ‘রোটারি উইং’ বিভাগে চ্যাম্পিয়ন, এমআইএসটি (মিলিটারি ইনস্টিটিউট অব সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজি)’র রোবোটিক্স ক্লাবের ২০১৬ সালের সিটি এয়ারপোর্ট প্রকল্প বিভাগে চ্যাম্পিয়ন, ২০১৬ সালে ইউনাইটেড কলেজ অব এভিয়েশন সায়েন্স অ্যান্ড ম্যানেজমেন্টের রিসার্চ অ্যান্ড ইনোভেশন সেন্টারের ডিজিটাল সিটি এয়ারপোর্ট প্রকল্প উপস্থাপন প্রতিযোগিতায় চ্যাম্পিয়ন হয়েছেন। এবার পেয়েছেন বিশ্বখ্যাত ‘ডায়ানা অ্যাওয়ার্ড-২০২০’।

অনেক স্বপ্ন ও পরিকল্পনা

মোহাম্মদ জহিরুল ইসলামের ইগনাইট ইয়ুথ ফাউন্ডেশন ঘিরে অনেক স্বপ্ন ও পরিকল্পনা আছে। আগামীর স্বপ্ন নিয়ে জহিরুল বলেন, ‘বাংলাদেশের প্রতিটি জেলায় ইগনাইট স্কুল করব। যে স্কুলে একেবারেই গরিব ছেলেমেয়েরা পড়ালেখার পাশাপাশি কারিগরি শিক্ষা নিয়ে ৬ষ্ঠ শ্রেণিতে পড়া অবস্থায় উপার্জন করবে। ঢাকার ইগনাইট স্কুলকে বিশ্ববিদ্যালয়ে রূপান্তরিত করব। ফাউন্ডেশনের মাধ্যমে গরিব ছেলেমেয়েদের বিনামূল্যে ভালোমানের আইটি সেন্টার খুলব। গ্রামাঞ্চলের শিক্ষার্থীদের প্রযুক্তি ও আধুনিক আইসিটি শিক্ষা ও প্রশিক্ষণ সহজ হবে। তৃতীয় লিঙ্গের মানুষদের জন্য কবরস্থান তৈরি করব। সঠিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনা সেন্টার করব। আমাদের সংগঠনকে এশিয়ার সবচেয়ে বড় স্বেচ্ছাসেবী ভলান্টিয়ার প্লাটফর্ম তৈরি করতে চাই। বাংলাদেশকে নতুনভাবে তুলে ধরতে চাই।’