জয়ী হলে বাইডেন ইনক্লুসিভ পররাষ্ট্রনীতি অনুসরণ করবেন|256719|Desh Rupantor
logo
আপডেট : ৬ নভেম্বর, ২০২০ ১৩:৪৪
জয়ী হলে বাইডেন ইনক্লুসিভ পররাষ্ট্রনীতি অনুসরণ করবেন

জয়ী হলে বাইডেন ইনক্লুসিভ পররাষ্ট্রনীতি অনুসরণ করবেন

এম হুমায়ুন কবির

কূটনীতিক এম হুমায়ুন কবির ১৯৫১ সালের ৭ ডিসেম্বর ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় জন্মগ্রহণ করেন। ব্রাহ্মণবাড়িয়া ও চাঁদপুরে স্কুল-কলেজের লেখাপড়া শেষে তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে উচ্চশিক্ষা গ্রহণ করেন। রাষ্ট্রবিজ্ঞানে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি নেওয়ার পর হুমায়ুন কবির এই বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যাপনার মধ্য দিয়েই কর্মজীবন শুরু করেন। পরবর্তীকালে তিন দশকেরও বেশি সময় কূটনৈতিক দায়িত্ব পালনকালে তিনি যুক্তরাষ্ট্র, অস্ট্রেলিয়া, নিউজিল্যান্ড, ফিজি ও নেপালে বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত ও কলকাতায় উপ-হাইকমিশনারসহ বিভিন্ন উচ্চতর পদে আসীন ছিলেন। কাজ করেছেন জাতিসংঘে। বর্তমানে গবেষণা প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ এন্টারপ্রাইজ ইনস্টিটিউটের অ্যাক্টিং প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন তিনি। যুক্তরাষ্ট্রের নির্বাচন, বাংলাদেশের রোহিঙ্গা সংকটে যুক্তরাষ্ট্র, চীন ও ভারতের ভূমিকাসহ সাম্প্রতিক আন্তর্জাতিক ও কূটনৈতিক বিষয়াবলি নিয়ে কথা বলেছেন মুক্তিযোদ্ধা এই কূটনীতিক। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন দেশ রূপান্তর সম্পাদকীয় বিভাগের আহমেদ মুনীরুদ্দিন

দেশ রূপান্তর : যুক্তরাষ্ট্রের নির্বাচন নিয়েই কথা শুরু করি। সর্বশেষ ফল বলছে ডেমোক্র্যাট দলের প্রার্থী জো বাইডেন হোয়াইট হাউজের পথে অনেকটাই এগিয়ে রয়েছেন এবং সম্ভবত দেশটির প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হওয়ার। যদি তা-ই হয়, সেক্ষেত্রে রিপাবলিকান প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রনীতির ক্ষেত্রে যে পরিবর্তনগুলো এনেছিলেন সেটা কতটা বদলাতে পারে? আর ডেমোক্র্যাট জো বাইডেন কোন বিষয়গুলোকে প্রাধান্য দিতে পারেন বলে আপনি মনে করেন?

এম হুমায়ুন কবির : প্রথমত, যেহেতু এখনো ভোট গণনা চলছে বা চূড়ান্ত ফল ঘোষিত হয়নি, তাই এ বিষয়ে সরাসরি কোনো মন্তব্য করা যাচ্ছে না। তবে জো বাইডেন যদি সত্যিই ২৭০-এর ম্যাজিক নম্বরটি পেয়ে যান তাহলে ডেমোক্র্যাটদের নেতৃত্বে যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রনীতি কেমন হতে পারে তা নিয়ে কথা বলা যেতে পারে। প্রশ্নের সংক্ষিপ্ত জবাব হচ্ছে অনেক ক্ষেত্রেই পরিবর্তন হবে। ডেমোক্র্যাট পার্টি যে প্ল্যাটফর্ম ঘোষণা করেছে যেটাকে আমরা মেনিফেস্টো বা ইশতেহার বলি, সেখানে কিন্তু তারা স্পষ্ট করেই বলেছে, তারা ইউরোপীয় মিত্র, ন্যাটোর সদস্য, বিভিন্ন আন্তর্জাতিক জোটে যুক্তরাষ্ট্রের যে বন্ধুরা আছে তাদের সঙ্গে আবার সহযোগিতার ক্ষেত্রগুলো পুনরায় সম্প্রসারিত করবে।

জো বাইডেনের গত চল্লিশ বছরের যে রাজনৈতিক ধারা ও দৃষ্টিভঙ্গি সেটা থেকেও কিন্তু এটা বোঝা যায়। নীতিগতভাবেও তারা জাতিসংঘসহ অন্যান্য আন্তর্জাতিক ফোরামগুলোকে শক্তিশালী করতে চাইবে। বিশেষ করে সাম্প্রতিককালে কভিড-১৯ মহামারীর প্রেক্ষাপটে ডব্লিউএইচও বা বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার সঙ্গে কাজ করার বিষয়টি বাইডেন তার নির্বাচনী প্রচারাভিযানেও উল্লেখ করেছেন। একই সঙ্গে জলবায়ু প্রশ্নে ট্রাম্পের অবস্থানের বিপরীতে আবার বিশ্ব জলবায়ু চুক্তিতে ফেরত আসার কথাটিও বাইডেন বলে রেখেছেন। এখানে একটা কথা বিশেষভাবে উল্লেখ করা দরকার। জো বাইডেনের যে তরুণ সমর্থকগোষ্ঠী রয়েছে তাদের বেশিরভাগই জলবায়ু ও স্বাস্থ্যব্যবস্থার প্রশ্নে একটা শক্তিশালী অবস্থানকে সমর্থন করেন। ফলে বাইডেনের ওপর তাদের দৃষ্টিভঙ্গির একটা ভবিষ্যৎমুখী চাপও নিশ্চিতভাবেই থাকবে। অনেকে বলছেন যে, বাইডেন প্রশাসন কি ‘ওবামা-২০’ হবে কি না? কিন্তু যেটা মনে হচ্ছে যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরে বাইডেন যে কোয়ালিশন গড়ে তুলেছেন তার সদস্যদের দৃষ্টিভঙ্গি কিন্তু বলছে তারা ‘ওবামা-২০’ চাচ্ছেন না; তারা এমন একটা ভবিষ্যৎমুখী একবিংশ শতাব্দীর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র চান যেটা জলবায়ু প্রশ্নে সংবেদনশীল হবে, মানুষের মধ্যে সমতার প্রশ্নে যত্নশীল হবে, বিশ্বে যুক্তরাষ্ট্রের যে নেতৃস্থানীয় অবস্থান ছিল তারা অন্তর্ভুক্তিমূলকভাবে সেটাকে আবার পুনঃপ্রতিষ্ঠা করার বিষয়ে মনোযোগী হবে; বাইরে ‘অহেতুক যুদ্ধ’ বন্ধের বিষয়ে তারা চেষ্টা করবে। অর্থাৎ জো বাইডেন প্রশাসন দায়িত্ব নিলে হয়তো আমরা একটা ইনক্লুসিভ বা অন্তর্ভুক্তিমূলক একটা পররাষ্ট্রনীতির ইঙ্গিত পাচ্ছি।

দেশ রূপান্তর : এবারের নির্বাচনে জো বাইডেনের তরুণ সমর্থকগোষ্ঠী এবং র‌্যাডিকাল সমর্থকগোষ্ঠীর কথা বিশেষভাবে আলোচিত হচ্ছে। বাইডেন আসলে তাদের স্বপ্ন পূরণের জন্য কোন কোন ক্ষেত্রে বড় ধরনের পরিবর্তন আনার চেষ্টা করতে পারেন?

এম হুমায়ুন কবির : বার্নি স্যান্ডার্সের যে সমর্থকরা, যাদের একটা অংশ এখন বাইডেন শিবিরে কাজ করছেন, তারা একটু র‌্যাডিকাল বা বামঘেঁষা বলতে পারেন, তারা যে বিষয়গুলো নিয়ে বেশি আগ্রহী, এক্ষেত্রে সেগুলো বিবেচনা করা যেতে পারে। যেমন উচ্চশিক্ষা উচ্চশিক্ষার ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্রের ছাত্রদের একটা বড় অংশই ঋণের কবলে পড়ে যায়, জীবনের অর্ধেক সময় তাদের পার হয়ে যায় শিক্ষাকালের ঋণ শোধ করতে করতে। শিক্ষার্থীরা যাতে ঋণগ্রস্ত হয়ে না পড়ে সেলক্ষ্যে সহায়তা দেওয়ার কথা বাইডেন শিবির ইতিমধ্যেই বলেছে। তারা বলছে ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে যদি আর্থিক চিন্তা থেকে মুক্তি দেওয়া যায় তবেই তাদের বিজ্ঞানমনস্ক, সৃজনশীল ও ভবিষ্যৎমুখী করে গড়ে তোলা যাবে। এই পরিকল্পনা হয়তো রাজনৈতিকভাবে খুব আকর্ষণীয় নয়, কিন্তু এর একটা দীর্ঘমেয়াদি সামাজিক-সাংস্কৃতিক ও বৈজ্ঞানিক অভিঘাত আছে বলে মনে করি। দ্বিতীয় আরেকটি বিষয় হলো, স্বাস্থ্যসেবার প্রশ্নে বহুল আলোচিত ‘ওবামা কেয়ার’ বাতিল করার জন্য ট্রাম্প প্রশাসন অনেক চেষ্টা করেছে। এটা বাতিলের চেষ্টা এখনো সুপ্রিমকোর্টে বিচারাধীন। বাইডেন কিন্তু বলছেন তারা ‘ওবামা কেয়ার’-এ সীমিত থাকতে চান না, আরও অনেকদূর এগোতে চান। অর্থাৎ যুক্তরাষ্ট্রের সবার জন্য স্বাস্থ্যসেবার নিশ্চয়তা দেওয়ার বিষয়টি তারা অর্জন করতে চান। এক্ষেত্রে মনে রাখা দরকার যে, যুক্তরাষ্ট্র হচ্ছে একমাত্র শিল্পোন্নত দেশ, যে দেশে মানুষ এখনো স্বাস্থ্যের জন্য বিপদগ্রস্ত হতে পারে, অর্থাৎ রাষ্ট্র এর নিশ্চয়তা দেয় না। বাইডেন তা পারবেন কি না সেটা আরেক প্রশ্ন, কেননা এর সঙ্গে বড় বড় ফার্মাসিউটিক্যালস কোম্পানি ও ইনস্যুরেন্স কোম্পানির স্বার্থের প্রশ্ন জড়িয়ে আছে।

দেশ রূপান্তর : আমরা বাংলাদেশ প্রসঙ্গে আসি। আমরা জানি যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশের রপ্তানিপণ্যের একক বৃহত্তম বাজার। অন্যদিকে চীন বাংলাদেশের আমদানিপণ্যের একক বৃহত্তম উৎস। এই করোনা মহামারীর মধ্যেও আমরা চীন-যুক্তরাষ্ট্র বাণিজ্যযুদ্ধ তীব্র হতে দেখছি। অন্যদিকে বাংলাদেশ এ দুই বৃহৎ পরাশক্তির সঙ্গেই ভারসাম্য রক্ষা করে চলছে। যুক্তরাষ্ট্রে নতুন প্রশাসন এলে বাংলাদেশের সঙ্গে এ দেশ দুটির বাণিজ্যিক বা অর্থনৈতিক সম্পর্কের কোনো টানাপড়েন তৈরি হতে পারে বলে মনে করেন?

এম হুমায়ুন কবির : বিষয়টাকে দুটো স্তরে দেখতে হবে। প্রথমত, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের মধ্যে যে ট্যারিফ যুদ্ধ চলছে বা প্রতিযোগিতা চলছে এটাকে প্রিমিয়ার লিগের খেলা বলতে পারেন। অর্থাৎ তারা যে লিগে খেলছে সেখানে বিলিয়ন নয়, ট্রিলিয়ন ডলারের খেলা। আর যে বিষয়গুলো নিয়ে তারা প্রতিযোগিতা করছে সে বিষয়গুলোতে আমরা ধারেকাছেও নেই টেকনোলজি, আর্টিফিসিয়াল ইন্টেলিজেন্স, রোবোটিক্স, ফিউচারিস্টিক ইউজ অব টেকনোলজি, ইন্টেলেকচুয়াল রাইট কাদের থাকবে কাদের থাকবে না এসব। এগুলো নিয়ে তারা যুদ্ধ করছে। যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের মধ্যে বাণিজ্যের যে কারবার সেটা হাফ ট্রিলিয়ন ডলারের। চীনের কাছে ৪০০ বিলিয়ন ডলারের ডেফিসিয়েটই আছে যুক্তরাষ্ট্রের। ফলে ট্রাম্প প্রশাসন এতদিন যে খেলা খেলেছে বাইডেন এলে সেটা হয়তো বদলাবেন। কিন্তু প্রতিযোগিতা থাকবেই। বাইডেন হয়তো প্রতিদ্বন্দ্বিতার পাশাপাশি সহযোগিতার ক্ষেত্রগুলোও প্রসারিত করতে চাইবেন।

দ্বিতীয়ত, বাংলাদেশের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের যে বাণিজ্য সম্পর্ক সেটা সব মিলিয়ে সাত-আট বিলিয়নের ব্যবসা। আমরা ছয়-সাত বিলিয়ন রপ্তানি করি আর তারা এক-দেড় বিলিয়ন দেয়। যে প্রশাসনই আসুক এটা নিয়ে তেমন কোনো পরিবর্তনই হবে না। আর যুক্তরাষ্ট্র তো এখন আমাদের কোনো শুল্কমুক্ত সুবিধা দিচ্ছে না। আমরা যেটুকু রপ্তানি করছি সেটা শুল্ক দিয়েই পাঠাচ্ছি। জিএসপি যেটা আমাদের ছিল সেটা এখন স্থগিত আছে। সেটা ফেরৎ পেলে আমরা লাভবান হব। কিন্তু বাইডেন প্রশাসন সেদিকে যাবে বলে আমার মনে হয় না। কারণ বাইডেনের শিবিরে প্রচুর পরিমাণে ট্রেড ইউনিয়ন, বিভিন্ন লবি গ্রুপ, মানবাধিকার গ্রুপগুলো সক্রিয় থাকবে। জিএসপি নিয়ে যে সমস্যা তৈরি হয়েছিল সেগুলোর নজরদারিতেও তারা সক্রিয় থাকবে বলেই মনে করি। এক্ষেত্রে তারা যে ১৬টি অ্যাকশন প্ল্যান দিয়েছিল তার সবগুলো শর্ত পূরণ করে যদি আমরা তাদের কাছে যেতে পারি কেবল সেক্ষেত্রেই হয়তো এটা বদলাতে পারে।  

দেশ রূপান্তর : সাম্প্রতিককালে রোহিঙ্গা সংকটকে কেন্দ্র করে বাংলাদেশ আঞ্চলিক এবং আন্তর্জাতিক বহুপক্ষীয় কূটনীতির ক্ষেত্রে একটা নতুন পরিস্থিতিতে উপনীত হয়েছে। কিন্তু আমরা বিপুলসংখ্যক রোহিঙ্গা শরণার্থীকে আশ্রয় দিয়ে একটা মানবিক দৃষ্টান্ত হাজির করতে পারলেও রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনের ক্ষেত্রে এখনো তেমন কোনো সাফল্য পাচ্ছি না। এদিকে, কিছুদিন আগে ঢাকা সফর শেষে রোহিঙ্গা সংকটে চীনের ভূমিকা নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের উপ-পররাষ্ট্রমন্ত্রী স্টিফেন ই বিগানের মন্তব্যে ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া জানিয়েছে ঢাকাস্থ চীনা দূতাবাস। এক্ষেত্রে বৃহৎ প্রতিবেশী ভারত আর চীন এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ভূমিকাকে আপনি কীভাবে মূল্যায়ন করবেন?

এম হুমায়ুন কবির : রোহিঙ্গা সংকটে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র আগাগোড়াই বাংলাদেশকে সমর্থন দিয়ে যাচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্র মিয়ানমার সেনাবাহিনীর জেনারেলদের কয়েকজনের বিরুদ্ধে ইতিমধ্যেই নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে। ইন্টারন্যাশনাল কোর্ট অব জাস্টিসে যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশকে সহায়তা করছে। জাতিসংঘে আমাদের সহায়তা করছে। রোহিঙ্গা সংকট নিরসনে যুক্তরাষ্ট্রের ভূমিকা স্পষ্ট এবং সক্রিয়। আর এক্ষেত্রে ভূমিকার প্রশ্নে ভারত ও চীন দুই দেশই এ বিষয়ে দোদুল্যমান অবস্থায় আছে। তবে চীন বেশি সক্রিয় আছে। সেজন্য চীন গত বছর বাংলাদেশ-মিয়ানমার-চীন ত্রিপক্ষীয় সংলাপের যে উদ্যোগ নিয়েছিল সেটি উল্লেখযোগ্য। জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের অধিবেশনের সময় এই তিন দেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রীরা বৈঠক করেছেন এবং এর পরও বৈঠকের কথা ছিল, যা কভিড মহামারীর কারণে এখনো হয়নি। চীনের সেই ত্রিপক্ষীয় সংলাপের প্রস্তাব এখনো আছে। আমি মনে করি চীনের এই উদ্যোগকেও আমাদের কাজে লাগানো প্রয়োজন। ভারত এ বিষয়ে কথা বললেও ভারতের ভূমিকা স্পষ্ট নয়। আগামী জানুয়ারিতে ভারত জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের অস্থায়ী সদস্যপদ লাভ করবে তখন যদি তারা মনে করে যে, তারা কোনো ভূমিকা রাখবে তাহলে সেটা তারা করতে পারে। সেটাকে আমরা স্বাগত জানাব। 

দেশ রূপান্তর : বঙ্গোপসাগরে সম্প্রতি ভারত-যুক্তরাষ্ট্র-অস্ট্রেলিয়া-জাপান চতুর্দেশীয় সামরিক মহড়া শুরু হলো। অতীতে চীনের আপত্তির কারণে সিঙ্গাপুর ও জাপান এই মহড়া থেকে বিরত থাকলেও ‘মালাবার মহড়া’ এবার বেশ আড়ম্বরের সঙ্গেই শুরু হলো। দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় ভূ-রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে এই মহড়াকে কতটা গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছেন?

এম হুমায়ুন কবির : এটা দুই দশকের বেশি সময় ধরেই চলছে। ভারত করছে। আর চাইছে অন্যরা এখানে যোগ দিক। সাম্প্রতিককালে কভিড মহামারীতে চীনের সঙ্গে ভারতের দ্বন্দ্ব, এ অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রের উপস্থিতির আগ্রহ এসব কারণে আমরা দেখছি যে, অস্ট্রেলিয়া ও জাপানও এখানে এসেছে। তবে এখানে প্রধান নিয়ামক শক্তি হচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র। এখন তারা যদি এই অঞ্চলে এ ধরনের সামরিকীকরণ প্রক্রিয়া থেকে অন্যত্র মনোযোগ সরায়, তাহলে এখন আমরা যে অস্থিরতার আশঙ্কাটা করছি সেটা হয়তো দূরীভূত হবে আর স্থিতিশীলতাও আসবে।

দেশ রূপান্তর : মানুষ ইতিপূর্বে সারা পৃথিবীতে একই সঙ্গে এতবড় মহামারীর কবলে আর পড়েনি। বলা হচ্ছে এই মহামারীতে দুনিয়ার অর্থনীতি, রাজনীতি এমনকি সামরিক ভারসাম্যও পাল্টে যেতে পারে। এদিকে, বাংলাদেশের অর্থনীতি অগ্রসরমাণ থাকলেও মধ্যপ্রাচ্য ও ইউরোপে অভিবাসী শ্রমিকদের নিয়ে সংকট, বিপুল রোহিঙ্গা শরণার্থী নিয়ে সংকট এবং দেশের অভ্যন্তরেও নানা সংকট সামাল দিতে হচ্ছে বাংলাদেশকে। কূটনীতিক হিসেবে দীর্ঘ অভিজ্ঞতা থেকে আপনার কি মনে হয় যে, পররাষ্ট্রনীতি এবং কূটনৈতিক তৎপরতায় কোনো গুণগত বদল বাংলাদেশকে এসব সংকট উত্তরণে সহায়তা করতে পারে?

এম হুমায়ুন কবির : মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে একটা কথা শুনেছি। ইদানীং বেশি শুনি। তারা বলেফরেন পলিসি স্টার্টস উইথ ডমিস্টিক পলিসি। অর্থাৎ পররাষ্ট্র নীতিটা অভ্যন্তরীণ শক্তি থেকেই উৎসারিত হতে হবে। বাংলাদেশ পরিপ্রেক্ষিত দেখলে আমিও এ কথার ওপর জোর দিতে চাই। নিজেদের অভ্যন্তরীণ জায়গাটাকে প্রথমে আমাদের আরও সংহত করা দরকার। এজন্য নানামুখী সংস্কার প্রয়োজন। আগে যে দৃষ্টিভঙ্গিতে আমরা উন্নয়নকে দেখতাম, সেই ধারণা এবং চর্চা যদি আমরা বদলাতে না পারি এবং এখন বাংলাদেশ বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে যে জায়গায় উপনীত হয়েছে সেটিকে যদি যথাযথভাবে উপলব্ধি ও অনুধাবন না করতে পারি তাহলে, পররাষ্ট্রনীতির ক্ষেত্রেও আমরা কাক্সিক্ষত সাফল্যের পথে এগোতে পারব না। পররাষ্ট্রনীতির সাফল্য অভ্যন্তরীণ সংস্কার থেকেই শুরু হতে পারে।