মধ্যপ্রাচ্যের রাজনীতিতে বাংলাদেশ|260283|Desh Rupantor
logo
আপডেট : ২৪ নভেম্বর, ২০২০ ০০:০০
মধ্যপ্রাচ্যের রাজনীতিতে বাংলাদেশ
মারুফ মল্লিক

মধ্যপ্রাচ্যের রাজনীতিতে বাংলাদেশ

কোনো রাখঢাক না করেই পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী ইমরান খান সরাসরি বলে দিলেন ইসরায়েলকে স্বীকৃতি দেওয়ার জন্য সৌদি আরব চাপ দিচ্ছে। সৌদি আরব বেশ কিছুদিন ধরেই ইসরায়েলের পক্ষে দূতিয়ালি করছে। ইসরায়েলের সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্ক স্থাপনের জন্য বিভিন্ন মুসলিম দেশগুলোকে চাপ দিচ্ছে। সুদানকে পেট্রো ডলারের লোভ দেখিয়ে ইসরায়েলের পক্ষে আনার জন্য সৌদি সরকার জোরালোভাবেই কাজ করেছে। কখনো অর্থ, কখনো চাপ দিয়ে ইসরায়েলের পক্ষে বিভিন্ন মুসলিম দেশকে নিয়ে আসার জন্য সৌদি আরব কূটনীতির মাঠে খুবই সক্রিয়। সৌদি আরবের সঙ্গে পাকিস্তানের ঘনিষ্ঠতা বেশ গভীর। কিন্তু পাকিস্তানের সঙ্গে সৌদি আরবের সম্পর্ক ইদানীং বেশ শীতল অবস্থায় আছে। পাকিস্তানও সৌদি আরবের বিকল্প হিসেবে ইরান ও চীনের দিকে ঝুঁকে পড়ছে। আর শুধু পাকিস্তানই নয় অন্য মুসলিম দেশগুলোকেও সৌদি আরব নানাভাবে চাপে রাখার চেষ্টা করছে।

যেমন কোনো আলোচনা ছাড়াই সৌদি আরব হুট করে ৫৪ হাজার রোহিঙ্গাকে বাংলাদেশি পাসপোর্ট দেওয়ার জন্য বাংলাদেশকে চাপ দিয়েছিল। এটা সেপ্টেম্বর মাসের ঘটনা। এই রোহিঙ্গারা ৩০-৪০ বছর ধরে সৌদি আরবেই অবস্থান করছে। এদের বেশিরভাগকেই সৌদি আরব নিজ উদ্যোগে নিয়ে গিয়েছিল। এখন নাগরিকত্ব দিতে বাংলাদেশকে কূটনৈতিকভাবে চাপ প্রয়োগ করছে সৌদি আরব। অন্যথায় সৌদি আরবে কর্মরত বাংলাদেশিদের ফেরত পাঠানোরও হুমকি দিয়েছিল মধ্যপ্রাচ্যের দেশটি। অনেকের কাছেই সৌদি আরবের চাপ বিস্ময়কর মনে হয়েছে। মিয়ানমারকে চাপ না দিয়ে বাংলাদেশকে কেন পাসপোর্ট দিতে বলছে সৌদি আরব? অনেকেই সন্দেহ করছেন মধ্যপ্রাচ্যের আঞ্চলিক রাজনীতিতে বাংলাদেশকে নিজেদের পক্ষভুক্ত করতে সৌদি আরব কৌশল হিসেবে এই চাপ প্রয়োগের উদ্যোগ নিয়েছিল। বাংলাদেশ সৌদি আরবের পক্ষে বরাবরই আছে। তাহলে এই প্রস্তাব কেন? হতে পারে বাংলাদেশকে চাপে ফেলে ইসরায়েলের স্বীকৃতি আদায় করে নেওয়ার কাজটি করতে চাইছে সৌদি আরব।

রোহিঙ্গাদের কেন এবং কোন অবস্থার পরিপ্রেক্ষিতে সৌদি আরব গত শতাব্দীতে নিয়েছিল এটা সবারই জানা। সৌদি আরব রোহিঙ্গাদের মিয়ানমার থেকে বিতাড়িত জনগোষ্ঠী হিসেবেই নিয়েছিল। বাংলাদেশের রোহিঙ্গা ক্যাম্পগুলোতে সৌদি আরবের সাহায্য-সহযোগিতাও এসেছে যথেষ্ট। সৌদি আরব বরাবরই রোহিঙ্গাদের প্রতি সহানুভূতিশীল ছিল। আইন অনুসারে রোহিঙ্গাদের পাসপোর্ট দেবে মিয়ানমার। চাপ দিতে হলে তারা মিয়ানমারকে দেবে। এখানে বাংলাদেশের প্রসঙ্গ আসে কীভাবে? অবশ্য পাসপোর্ট দিলেও সৌদি আরব রোহিঙ্গাদের বাংলাদেশে ফেরত পাঠাবে বলে মনে হয় না। বাংলাদেশ রোহিঙ্গাদের পাসপোর্ট দিতে রাজি হবে না, এটাও সৌদি আরব জানে। তারপরও সৌদি আরব কূটনৈতিক চাল হিসেবে রোহিঙ্গা ঘুঁটি নিয়ে বাংলাদেশের সামনে উপস্থিত হয়েছে।

কূটনীতিতে এটা বহুল প্রচলিত কৌশল। অপেক্ষাকৃত সুবিধাজনক অবস্থানে থাকা দেশ নির্ভরশীল দেশটির ওপর অবাস্তব ও প্রায় অসম্ভব শর্ত প্রয়োগ করে। অন্য কোনো সুবিধা আদায় করাই এই ধরনের শর্ত প্রয়োগের উদ্দেশ্য। বাংলাদেশের জন্য ৫৪ হাজার রোহিঙ্গাকে পাসপোর্ট প্রদান একরকম অবাস্তব ও অসম্ভব এক শর্ত। এখন বাংলাদেশ সৌদি আরবের অন্য কোনো শর্ত পূরণ করে এক ধরনের ভারসাম্য আনতে পারে। বাংলাদেশ ইতিমধ্যেই সৌদি আরবের নেতৃত্বাধীন সামরিক জোটে যোগ দিয়েছে। দেশটিতে নিয়মিত নারী শ্রমিকসহ শ্রমিক সরবরাহ করছে। বৈশ্বিক রাজনীতিতে বাংলাদেশ সৌদি আরবের কোনো অবস্থানের বিরোধিতাও করেনি। সৌদি আরবের সঙ্গে বাংলাদেশ বরাবরই ভারসাম্যের কূটনীতি বজায় রেখেছে।

এখন প্রশ্ন হচ্ছে সৌদি আরব কেন বাংলাদেশকে রোহিঙ্গাদের পাসপোর্ট প্রদানের শর্ত দিচ্ছে? এর উত্তর অনুসন্ধান করতে হলে সৌদি আরবের রাজনীতির গতিধারা বিশ্লেষণ করতে হবে। প্রথমত, সৌদি আরবের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে ওলটপালট গত কয়েক বছর ধরেই চলছে। সেখানে হরহামেশাই বিরোধী পক্ষকে আটক, গুম করে দেওয়া হচ্ছে। সম্প্রতি প্রবাসী সৌদি নাগরিকরা এক বৈশ্বিক জোট গঠন করেছেন সৌদিতে গণতন্ত্র আনার লক্ষ্যে। কিন্তু সৌদির ক্ষমতার পালাবদলের অভ্যন্তরীণ রাজনীতির সঙ্গে বাংলাদেশের বিন্দুমাত্র সম্পর্ক নেই।

এবার দেখা যাক সৌদি আরবের সাম্প্রতিক পররাষ্ট্রনীতির গতিধারা কোন পথে যাচ্ছে। সৌদি আরবের মধ্যপ্রাচ্য নীতির লক্ষ্য খুবই পরিষ্কার। সেখানে দেশটির প্রথম লক্ষ্য হচ্ছে যে কোনো উপায়ে ইরান ও তুরস্কের ক্রমবর্ধমান প্রভাব প্রতিহত করা। দ্বিতীয়ত ইসরায়েলের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। ইসরায়েলবিরোধী জোটকে দুর্বল করে দেওয়া। দ্বিতীয় লক্ষ্য বাস্তবায়নের জন্য সৌদি আরব গত বেশ কিছুদিন ধরেই কাজ করে যাচ্ছে নিষ্ঠা সহকারে। এজন্য প্রথমেই তারা একটি সামরিক জোট গঠন করে বিভিন্ন মুসলিম দেশকে একটি ছাতার নিচে নিয়ে এসেছে।

এসব দেশকে ইসরায়েলের সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিকীকরণের জন্য উৎসাহ দেওয়া হচ্ছে। বিভিন্ন ধরনের সহযোগিতার প্রতিশ্রুতিও আছে এর সঙ্গে। এর আগে ইসরায়েলের সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিকীকরণ বা স্থাপনের দূতিয়ালি যুক্তরাষ্ট্র বা ইউরোপের দেশগুলো সরাসরি করতো। এক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্রের পাশাপাশি ফ্রান্সের ভূমিকা ছিল উল্লেখযোগ্য। পরিবর্তিত কৌশল হিসেবে এখন প্রথমে সৌদি আরবকে দিয়ে প্রাথমিক কাজ সম্পন্ন করা হচ্ছে। এই টোটকা ভালোই কাজে দিচ্ছে। আরব আমিরাত ও বাহরাইন সেপ্টেম্বরেই ইসরায়েলের সঙ্গে চুক্তি স্বাক্ষর করেছে। সুদানও সম্পর্ক স্থাপনের ঘোষণা দিয়েছে। ইসরায়েলসহ পশ্চিমারা এই চুক্তিকে ঐতিহাসিক বলে উল্লেখ করলেও অনেকে একে ফিলিস্তিনিদের সঙ্গে সরাসরি বিশ্বাসঘাতকতা বলে চিহ্নিত করছেন। সৌদি আরব এই রকম বিশ্বাসঘাতকদের সংখ্যা বৃদ্ধির জন্য মাঠ পর্যায়ে কাজ করছে।

আরব দেশগুলোর পাশাপাশি অনারব দেশগুলোর সমর্থন আদায়ের কাজটিও সৌদি আরব নিবিড়ভাবেই করছে। এই প্রকল্পের অংশ হিসেবেই বাংলাদেশকে প্রথমে চাপে ফেলার কাজটি করেছে সৌদি আরব। এখন হয়তো তারা বাংলাদেশের সঙ্গে দরকষাকষি শুরু করবে। বাংলাদেশের পক্ষে সৌদি আরবের কোনো পরামর্শ বা শর্ত এড়িয়ে যাওয়া সম্ভব না। বিদেশে শ্রমিক পাঠানোর ক্ষেত্রে বাংলাদেশ অনেকটাই সৌদি শ্রমবাজারের ওপর নির্ভরশীল। এই মুহূর্তে ২২ লাখ বাংলাদেশি সৌদি আরবে কর্মরত আছে। তাই বাংলাদেশ সৌদি আরবের শ্রমবাজার হাতছাড়া করতে চাইবে না। সেক্ষেত্রে অন্য কোনো শর্ত পূরণ করে সৌদি আরবকে বশে আনার চেষ্টা করবে। কূটনীতির ভাষায় যাকে বলে ‘ট্রেড অফ’।

বাংলাদেশের হাতে এমন কিছু নেই যা দিয়ে সৌদি আরবের রোহিঙ্গাদের পাসপোর্ট দেওয়ার শর্ত ‘ট্রেড অফ’ করতে পারে। ট্রেড অফের শর্তও ঠিক করে দিতে পারে সৌদি আরব। সেই শর্ত হতে পারে ইসরায়েলের সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্ক স্থাপন। হতে পারে ইতিমধ্যেই সৌদি আরব বাংলাদেশকে এই প্রস্তাব দিয়ে রেখেছে। এ নিয়ে বিভিন্ন ধরনের কানাঘুষাও শোনা যায়। বাংলাদেশের ভেতরেও ইসরায়েলের সঙ্গে কেন সম্পর্ক গড়ে তোলা হচ্ছে না তা নিয়ে বিভিন্ন মহলে আলাপ-আলোচনা শুরু হয়েছে। বাংলাদেশে ইসরায়েলের লবি দিন দিন সক্রিয় ও শক্তিশালী হচ্ছে। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে এটা খুবই স্পষ্ট। কিন্তু বাংলাদেশ রাজি না হওয়ায় নতুন নতুন বিভিন্ন অযৌক্তিক, অদ্ভুত প্রস্তাব নিয়ে আসছে সৌদি আরব। শ্রমিক ফিরিয়ে দেওয়ার হুমকি দিচ্ছে। শুধু সৌদি আরবই নয়, এই কূটনীতিতে সৌদি আরবের সঙ্গে ভারতও যোগ দিতে পারে। ভারতের সঙ্গে ইসরায়েলের সম্পর্ক খুবই মজবুত। এক্ষেত্রে বাংলাদেশকে শক্ত এক চাপের মুখে পড়তে হবে।

সৌদি আরবের এই মুহূর্তের লক্ষ্য হচ্ছে আরবের বাইরে কোনো মুসলিম দেশ থেকে ইসরায়েলকে স্বীকৃতি এনে দেওয়া। ধারণা করা হচ্ছে, এক্ষেত্রে বাংলাদেশই সৌদি আরব ও পশ্চিমাদের লক্ষ্য। পাকিস্তান, মালদ্বীপ, মালয়েশিয়া বা ইন্দোনেশিয়াও লক্ষ্য হিসেবে আছে। কিন্তু সামরিক শক্তি, জনশক্তি, জনসংখ্যা, অভ্যন্তরীণ রাজনীতির অবস্থা, অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা সবকিছু মিলিয়ে বাংলাদেশকেই সহজ লক্ষ্য হিসেবে নির্ধারণ করেছে। এখন দেখার বিষয় বাংলাদেশ কীভাবে এই চাপ সামাল দেয়।

লেখক রাজনৈতিক বিশ্লেষক