সাতই মার্চের ভাষণই ছিল স্বাধীনতার ঘোষণা, মুক্তিযুদ্ধের ডাক|265832|Desh Rupantor
logo
আপডেট : ২১ ডিসেম্বর, ২০২০ ১৩:৫৯
সাতই মার্চের ভাষণই ছিল স্বাধীনতার ঘোষণা, মুক্তিযুদ্ধের ডাক

সাতই মার্চের ভাষণই ছিল স্বাধীনতার ঘোষণা, মুক্তিযুদ্ধের ডাক

অলীক কুমার গুপ্ত

মেজর (অব.) অলীক কুমার গুপ্ত, পিএসসি, বীরপ্রতীক রাজবাড়ী জেলার মহেন্দ্রপুর গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তার পিতার নাম মনোরঞ্জন গুপ্ত এবং মাতার নাম নমিতা গুপ্ত। ১৯৬৪ সালে রাজবাড়ীর আলিমুজ্জাম হাই স্কুল থেকে মাধ্যমিক, ১৯৬৭ সালে রাজবাড়ী কলেজ থেকে উচ্চ মাধ্যমিক এবং ১৯৬৯ সালে একই কলেজ থেকে বিএ পাস করেন তিনি। ছাত্রজীবন থেকেই রাজনীতিতে সক্রিয় ছিলেন। তৎকালীন ছাত্রলীগের স্থানীয় নেতা ছিলেন তিনি। ঊনসত্তরের ছাত্র-গণঅভ্যুত্থান এবং সত্তরের প্রাদেশিক পরিষদ ও জাতীয় পরিষদ নির্বাচনে প্রচারাভিযান পরিচালনা থেকে শুরু করে নানা রাজনৈতিক কর্মকা-ে সক্রিয় ভূমিকা পালন করেন অলীক কুমার গুপ্ত। একাত্তরে সশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধের সূচনালগ্নেই যুদ্ধে যোগ দেন এবং স্বাধীন বাংলাদেশের প্রবাসী সরকারের উদ্যোগে মুক্তিযুদ্ধের ‘ফার্স্ট ওয়ার কোর্স’-এর সদস্য নির্বাচিত হয়ে সামরিক প্রশিক্ষণ গ্রহণ করেন। যুদ্ধ চলাকালেই বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর অফিসার হিসেবে যোগ দেন এবং ৮ নম্বর সেক্টরের সহকারী সাব-সেক্টর কমান্ডার হিসেবে বীরত্বপূর্ণ অবদানের জন্য ‘বীরপ্রতীক’ খেতাবে ভূষিত হন। মুক্তিযুদ্ধের দিনগুলো আর রণাঙ্গনে সম্মুখ সমরের অভিজ্ঞতা নিয়ে স্মৃতিচারণ করেছেন এই বীর মুক্তিযোদ্ধা। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন দেশ রূপান্তর সম্পাদকীয় বিভাগের আহমেদ মুনীরুদ্দিন

দেশ রূপান্তর : মুক্তিযুদ্ধের সূচনালগ্নে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সাতই মার্চের ভাষণ এবং বঙ্গবন্ধুর নির্দেশে সমগ্র পূর্ববাংলায় অসহযোগ আন্দোলনের দিনগুলোর কথা শুনতে চাই আপনার কাছে।

অলীক কুমার গুপ্ত : আমাদের কাছে বঙ্গবন্ধুর সাতই মার্চের ভাষণই ছিল স্বাধীনতার ঘোষণা, মুক্তিযুদ্ধের ডাক। এরপর আমাদের আর বসে থাকার কোনো ফুরসত ছিল না। রাজবাড়ী তখন সাব-ডিভিশন। আমরা রাজবাড়ীতে অসহযোগ আন্দোলন সংঘটিত করতে নেমে পড়লাম। পঁচিশে মার্চের কালরাত্রিতে ঢাকায় নৃশংস গণহত্যা শুরু হলো। এর পরপরই ছাব্বিশ মার্চের প্রথম প্রহরে বঙ্গবন্ধু আনুষ্ঠানিকভাবে স্বাধীনতা ঘোষণা করলেন। বঙ্গবন্ধুর স্বাধীনতা ঘোষণা নিয়ে আমার একটা দারুণ স্মৃতি আছে। আমার বাড়ির কাছের রেলস্টেশনের নাম বেলগাছি। তখন বেলগাছির স্টেশন মাস্টার ছিলেন জনাব আবদুর রাজ্জাক। ২৬ মার্চ ভোরে তিনি অন ডিউটি ছিলেন। সকালে আমার বাসায় সাইকেলে করে রেলের একজন পোর্টার পাঠিয়ে তিনি বললেন অলীককে তাড়াতাড়ি আসতে বলো। আমি সঙ্গে সঙ্গেই গেলাম। গিয়ে দেখি টেলিগ্রামে আসা বঙ্গবন্ধুর স্বাধীনতার ঘোষণা মোর্স কোড থেকে ডিকোড করে হাতে লিখে নিয়ে তিনি আমার জন্য বসে আছেন। সেটার একটা কার্বন কপি রাজ্জাক সাহেব আমাকে দিলেন। আমি সেটা মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরকে দিয়েছিলাম।

দেশ রূপান্তর : ঢাকায় পাকিস্তানি বাহিনীর গণহত্যা এবং বঙ্গবন্ধুর স্বাধীনতা ঘোষণার পর রাজবাড়ীতে আপনারা কী পরিস্থিতি দেখেছেন?

অলীক কুমার গুপ্ত : ছাব্বিশে মার্চের পরের দুটো সপ্তাহ ছিল ভয়াবহ। জীবন রক্ষার্থে ঢাকা পালিয়ে আসা মানুষের ঢল শত শত, হাজার হাজার, নারী-পুরুষ-শিশুর যে অসহায়ত্ব আর আহাজারি তখন দেখেছি সেটা ভাষায় প্রকাশ করা সম্ভব নয়। তারা জীবন নিয়ে পালিয়ে এসেছে। কেউ আরও দূরের গ্রামে যাবে, কেউ নিরাপদ আশ্রয়ের সন্ধানে বেরিয়েছে, অনেকেই জানে না কী করবে। খাবার নেই, আশ্রয় নেই। অনেকে ততদিনে সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেছে ভারতে পাড়ি দেওয়ার। তখন আমরা অসহযোগ আন্দোলনের সময় করা সংগ্রাম কমিটিগুলোর মাধ্যমে সাব-ডিভিশন আর থানা, ইউনিয়ন পর্যায় পর্যন্ত এই অসহায় মানুষের স্রোত সামলানোর চেষ্টা করলাম। গাড়িঘোড়া নেই, যোগাযোগব্যবস্থা বিপর্যস্ত। তবু স্থানীয় জনগণকে সঙ্গে নিয়ে, যার যতটুকু সামর্থ্য আছে তা নিয়েই আমরা কাজ করে গেলাম।

দেশ রূপান্তর : এরপর কী করলেন? মুক্তিযুদ্ধের রণাঙ্গনে আপনার শুরুটা কীভাবে হয়েছিল?

অলীক কুমার গুপ্ত : ইতিমধ্যে আমরা জানতে পারলাম পাকিস্তান আর্মির ২২-বালুচ রেজিমেন্টের কয়েকটা কোম্পানি যশোর ক্যান্টনমেন্ট থেকে এসে কুষ্টিয়ায় মার্চের বিশ-বাইশ তারিখের দিকে কয়েকটা ক্যাম্প করেছে। আগেই কারফিউ দিলেও ছাব্বিশে মার্চের পর থেকে এরা জনতাকে অত্যাচার নির্যাতন শুরু করে দেয়। তখন চুয়াডাঙ্গায় ইস্ট পাকিস্তান রাইফেলসের চতুর্থ উইংয়ের কমান্ডার ছিলেন মেজর আবু ওসমান চৌধুরী। তার সেকেন্ড ইন কমান্ড ছিলেন ক্যাপ্টেন এ আর আজম চৌধুরী বীরবিক্রম। আবু ওসমান চৌধুরীরা তখন বিদ্রোহ করেছেন এবং তারা কুষ্টিয়া আক্রমণ করার সিদ্ধান্ত নিয়ে কুষ্টিয়া ঘিরে ফেলছেন। এ সময় রাজবাড়ী আর ফরিদপুর থেকে আর্মড আনসার সদস্যদের কুষ্টিয়া যুদ্ধের জন্য লজিস্টিকস আর খাবারদাবার দিয়ে পাঠানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়। ১১৭ জনের মতো আর্মড আনসার আর আমাদের মতো কিছু ভলান্টিয়ার মিলে আমরা কুষ্টিয়ার উদ্দেশে রওনা হই। একটা স্পেশাল ট্রেনের চার-পাঁচটা ওয়াগনে করে আমাদের পাঠানো হলো। কুষ্টিয়ার মিলপাড়া, মোহিনী মিলের কাছে ভয়াবহ যুদ্ধ হলো পাকিস্তানিদের সঙ্গে। মেজর আবু ওসমান চৌধুরীদের বিদ্রোহ সফল হলো যুদ্ধে পাকিস্তানিরা পরাস্ত হলো, কুষ্টিয়া জয় হলো। যুদ্ধ শেষে ক্যাপ্টেন এ আর আজম চৌধুরীর সঙ্গে পরিচয় হলো। এরপর দ্রুত অনেক ঘটনা ঘটতে লাগল। কদিন পর সাতই মে হরিণাকুণ্ডু দিয়ে আমি বর্ডার ক্রস করে ভারতে গেলাম।

দেশ রূপান্তর : আপনি এরপর মুক্তিযুদ্ধে বাংলাদেশের ‘ফার্স্ট ওয়ার কোর্স’-এর সদস্য নির্বাচিত হয়ে সামরিক প্রশিক্ষণ গ্রহণ করলেন। যুদ্ধের শেষদিকে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর অফিসার হিসেবে যোগ দিলেন। এই অভিজ্ঞতা জানতে চাই।

অলীক কুমার গুপ্ত : আমার কপাল খুবই ভালো ছিল। বর্ডার ক্রস করলাম এপারের এলাকাটা শিকারপুর, ভারতের দিকটা করিমপুর। আমরা চারজনের একটা গ্রুপ ছিলাম। সেখানে বিএসএসের একজন অফিসার কী মনে করে আমাদের ক্যাপ্টেন এ আর আজম চৌধুরীর কাছে নিয়ে গেলেন যারা সঙ্গে কুষ্টিয়া যুদ্ধেই আমার পরিচয় হয়েছিল। সে সময় বিএসএফ একটা আইডি কার্ড দিত, আমাদের চারজনকেও দেওয়া হলো। আমি ক্যাপ্টেন আজম চৌধুরীকে বললাম যে আমি মুক্তিবাহিনীতে যোগ দিতে চাই। কিন্তু তার আগে কলকাতায় আমার বোনকে দেখে আসতে চাই, অনেক দিন বোনকে দেখি না। তিনি বললেন যাও। বলে আমার যাতায়াত খাওয়াদাওয়ার জন্য কিছু টাকাপয়সাও দিয়ে দিলেন। ছয়-সাত দিন পরই আমি কলকাতা থেকে ফিরে এলাম। এসে প্রথমে সেখানেই অস্ত্রশস্ত্র চালানোর একটা প্রাথমিক প্রশিক্ষণ পেলাম। এটা মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে প্রাথমিক প্রশিক্ষণ, সেনাবাহিনীর ফার্স্ট ওয়ার কোর্স নয়। আমরা তখন বর্ডার ক্রস করে দেশে ঢুকতাম নানা খোঁজখবর নিয়ে আসতে হতো, নানাকিছু পৌঁছে দিয়ে আসতে হতো।

ক্যাপ্টেন আজম চৌধুরী এক দিন আমাকে বললেন তুমি এখানে না থেকে কলকাতায় থিয়েটার রোডে চলে যাও আমি রিকোমেন্ড করে দিচ্ছি। থিয়েটার রোডে তখন স্বাধীন বাংলদেশের অস্থায়ী সরকারের সদর দপ্তর। কলকাতায় শিয়ালদা স্টেশনের কাছে শান্তিনিকেতন নামে একটা হোটেল ছিল। খবর পেলাম সেখানে রাজবাড়ীর বর্তমান যে এমপি কাজী এবাদত হোসেনের বাবা তৎকালীন প্রাদেশিক পরিষদের সদস্য কাজী হেদায়েত হোসেন আছেন। এর আগে তাকে প্রোটেকশন দিয়ে আমরা ভারতে নিয়ে গিয়েছিলাম। আমি তার সঙ্গে দেখা করতে গেলাম। তাকে বললাম যে আমি সেনাবাহিনীর ফার্স্ট ওয়ার কোর্সে যোগ দিতে চাই। তিনি খুব খুশি হয়ে বললেন দাঁড়া, আমি তোকে একজন লোক দিয়ে দিচ্ছি। এর পরদিনই আমার ইন্টারভিউ হলো। ইন্টারভিউ নিলেন এয়ার ভাইস মার্শাল এ. কে. খন্দকার, তিনি তখন বিমানবাহিনীর গ্রুপ ক্যাপ্টেন। সঙ্গে ভারতীয় দুজন ছিলেন, একজন সেনাবাহিনীর, একজন বিমানবাহিনীর। সেখানে উপস্থিত ছিলেন খন্দকার ওবায়েদুর রহমান। ছাত্রলীগের নেতা ছিলেন, একসময় বঙ্গবন্ধুর খুব ঘনিষ্ঠ ছিলেন এবং স্বাধীনতার পর বঙ্গবন্ধুর মন্ত্রিসভার সদস্য ছিলেন। ওবায়েদ ভাই আমাকে আগে থেকেই চিনতেন। আসলে নকশাল বা কমিউনিস্ট কি না এসব যাচাইয়ের জন্য এমন পলিটিক্যাল ভেরিফিকেশন হতো মুক্তিযোদ্ধাদের। সেখানে আমরা ছয়-সাতজন ছিলাম। দীর্ঘ সাক্ষাৎকারের পর একসময় আমাদের নোটিস বোর্ড দেখতে যেতে বলল। গিয়ে দেখি এক নম্বরে আমি আর দুই নম্বরে শেখ কামালের নাম। বঙ্গবন্ধুর বড় ছেলে শেখ কামালের সঙ্গে সেদিনই আমার পরিচয় হলো। এভাবেই আমি বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর ফার্স্ট ওয়ার কোর্সের জন্য সিলেক্টেড হলাম। জলপাইগুড়ির মূর্তিতে আমাদের সামরিক প্রশিক্ষণ হলো।

দেশ রূপান্তর : প্রশিক্ষণ শেষে সেনাবাহিনীতে আপনার পোস্টিং কোথায় হলো? কোন সেক্টরে যোগ দিলেন?

অলীক কুমার গুপ্ত : ৯ অক্টোবর আমাদের পাসিং আউট হলো। আমাকে যোগ দিতে বলা হলো মুক্তিযুদ্ধের ৮ নম্বর সেক্টরে। সেখানে আমি আমি জয়েন করলাম ১৪ অক্টোবর। তিনটা ট্রাকের একটা কনভয় নিয়ে আমরা রওনা হলাম। বয়রা সীমান্তে পৌঁছে আমি আমার সেক্টর কমান্ডার মেজর নাজমুল হুদার কাছে রিপোর্ট করলাম। এবার রণাঙ্গনে সম্মুখ সমরের আরেক নতুন অভিজ্ঞতা শুরু হলো।

দেশ রূপান্তর : আপনি ৮ নম্বর সেক্টরের সহকারী সাব-সেক্টর কমান্ডার নিযুক্ত হয়েছিলেন। ওই রণাঙ্গনের স্মরণীয় দুয়েকটা লড়াইয়ের কথা বলুন? কী অভিজ্ঞতা হয়েছিল আপনার?

অলীক কুমার গুপ্ত : ৮ নম্বর সেক্টরের এক নম্বর সাব-সেক্টরে সহকারী সাব-সেক্টর কমান্ডার হিসেবে আমার যাত্রা শুরু হলো। একদম সীমান্তবর্তী বলে এই অঞ্চলটার ভৌগোলিক অবস্থান কৌশলগতভাবে খুব গুরুত্বপূর্ণ ছিল। আমি কাশিপুরে থাকা শুরু করলাম। কাশিপুরে আমরা একটা ডিফেন্স পজিশনে ছিলাম। আমার নেতৃত্বে ইপিআরের ডেল্টা কোম্পানির পঁচিশ থেকে ত্রিশজন সৈনিক এবং স্থানীয় আরও বেশকিছু মুক্তিযোদ্ধা। এখান থেকে দুই মাইল পূর্বদিকেই পাকিস্তানি মিলিটারির ক্যাম্প ছিল। কপোতাক্ষ নদীর একেবারে পাড়ে পাকিস্তানিদের ৩৮ এফএফ রেজিমেন্ট। এপারে মাঠের ছয়শো-সাতশো মিটার দূরেই আমরা মুখোমুখি অবস্থানে ছিলাম। প্রায়ই আমাদের মধ্যে গোলাগুলি বিনিময় হতো। যশোরে চৌগাছার পর গরীবপুর থেকে ঝিকরগাছা পর্যন্ত প্রায় দশ-বারো মাইলের একটা মুক্তাঞ্চল ছিল। এই মুক্তাঞ্চলটাকে মুক্ত রাখার দায়িত্ব ছিল আমার ওপর। যাতে পাকিস্তানিরা এখানকার নিয়ন্ত্রণ নিয়ে কোনো ডিফেন্স পজিশনে যেতে না পারে।

১১ নভেম্বর ১৯৭১ একটা বড় লড়াই হয়েছিল চৌগাছায়। মাসলিয়া বিওপির কাছে। সেখানকার ছাতেরশা আখড়া নামের একটা জায়গায় পাকিস্তানিদের ৩৮ এফএফ রেজিমেন্টের খুবই স্ট্রং ডিফেন্স পজিশন ছিল প্রায় এক কোম্পানি সৈন্য ছিল সেখানে। ওরা সেখানে নিয়মিত চার থেকে সাড়ে চার কিলোমিটারের একটা প্যাট্রল করত। মসলিয়া বিওপি থেকে গদাধরপুর, গয়রা গ্রাম হয়ে পশ্চিমের হিজলি বিওপি পর্যন্ত এই প্যাট্রল চলত। এই প্যাট্রল বা টহল দলটাকে আমি অ্যামবুশ করব বলে ঠিক করি। কৃষকের বেশে মাথায় মাথাল দিয়ে মাঠে জমি নিড়ানোর কাজ করতে করতে পরপর তিন দিন আমরা খুব কাছ থেকে ওদের মুভমেন্ট দেখি। আমার সঙ্গে ছিলেন আরও তিনজন ভ্যালিয়েন্ট মুুক্তিযোদ্ধা হাবিলদার আরব আলী বীরবিক্রম, হাবিলদার আবুল আর ল্যান্সনায়ক জলিল বীরপ্রতীক। তিন দিনের পর্যবেক্ষণে অ্যামবুশের পরিকল্পনা জায়গা নির্বাচন সব শেষ করি। ১১ নভেম্বর ভোররাতে আমরা অ্যামবুশ সেটআপ শেষ করি। সেদিন দেখলাম ওরা সংখ্যায় আরও অনেক বেশি এবং ওরা টহলও শুরু করল দেরি করে। আমরা ভয়াবহ বিপদের মধ্যে পড়ে গিয়েছিলাম। গুনতে গুনতে দেখলাম ওরা ৩৪ জন। অথচ আগের তিন দিন ওরা সংখ্যায় পঁচিশজনের বেশি ছিল না। আমাদের পরিকল্পনা ভেস্তে যাচ্ছিল। আমাদের কাভারেজ এরিয়া ছাড়িয়ে যাচ্ছিল ওরা। তাই আর দেরি না করে আমরা আক্রমণ শুরু করে দিলাম। ওরা পাল্টা প্রতিরোধ গড়ে তুলল।

সেখান থেকে মাত্র এক কিলোমিটার দূরেই ছিল মাসলিয়া বিওপি। সেখান থেকে রিইনফোর্সমেন্ট আসল। ওরা হেভি মর্টার শেল ছুড়তে শুরু করল। এরপর আর্টিলারি শেলিং শুরু করল। আমাদের মুক্তিযোদ্ধারা অসীম সাহসিকতা নিয়ে লড়াই চালিয়ে গেল। আমাদের তো কোনো কাভারেজ ছিল না। আমরা ভোররাতে গিয়ে ধানক্ষেতের মধ্যে শুয়েছিলাম। ভোররাতে চার-পাঁচটা অ্যান্টিপারসোনাল মাইন আমরা সেট করতে পেরেছিলাম সেগুলো খুব কাজে লাগল। অ্যামবুশ সাধারণত ১৫ থেকে ২০ মিনিট স্থায়ী হয়। সেখানে প্রায় ঘণ্টাখানেক আমাদের গোলাগুলি চলল। একপর্যায়ে পাকিস্তানিরা পিছু হঠতে বাধ্য হলো। তারপর ‘জয় বাংলা’ বলে স্লোগান দিয়ে আমরা যখন সার্চ করলাম তখন ডেডবডি গুনে দেখলাম ১১ পাকিস্তানি সৈন্য নিহত হয়েছে। আর আমাদের পক্ষে একজন মাত্র আহত তার হাতে গুলি লেগেছিল। সবমিলিয়ে এই সাফল্য তখন খুবই গুরুত্বপূর্ণ ছিল।

দেশ রূপান্তর : আপনাকে অনেক ধন্যবাদ।

অলীক কুমার গুপ্ত : আপনাকে এবং দেশ রূপান্তরকেও ধন্যবাদ।