বুদ্ধিজীবী হত্যাযজ্ঞের পূর্বাপর|271798|Desh Rupantor
logo
আপডেট : ২০ জানুয়ারি, ২০২১ ০০:০০
বাঙালির বুদ্ধিবৃত্তিক সংগ্রামে আঘাত ।। ১৪ ডিসেম্বর ১৯৭১
বুদ্ধিজীবী হত্যাযজ্ঞের পূর্বাপর
এ কে এম শাহনাওয়াজ

বুদ্ধিজীবী হত্যাযজ্ঞের পূর্বাপর

পাকিস্তানি বাহিনী ও তাদের এ দেশীয় দোসরদের গণহত্যা, নারী নির্যাতন, ধ্বংসযজ্ঞের কথা এই লেখায় উপস্থাপন করতে চাচ্ছি না। বর্তমান লেখায় পাকিস্তানি শাসকদের বৈষম্যমূলক নীতি, বাঙালির ওপর নির্যাতনের পথ ধরে বুদ্ধিজীবী হত্যার পরিকল্পনা ও খল নায়কদের অন্তর্গত উদ্দেশ্য এবং ভবিষ্যৎ পরিণতি সম্পর্কে সামান্য নিবেদন করতে চাই।

যতই ঘৃণ্য হোক, পাকিস্তানি বাহিনীর গণহত্যা ও বাঙালির প্রতি অমানবিক নির্যাতনের একটি রাজনৈতিক উদ্দেশ্য দৃশ্যমান ছিল। পাকিস্তানের জন্মলগ্ন থেকে তৎকালীন পশ্চিম পাকিস্তানের শাসকরা পূর্ব পাকিস্তানের মানুষকে প্রতারিত করেছে পরিকল্পনামাফিক। ধর্মের দোহাই দিয়ে আবেগে মুহ্যমান করে রাখতে চেয়েছিল মুসলমান বাঙালিকে। তবে ক্ষমতাসীন কূটকুশলী পাকিস্তানি নেতৃত্ব এটুকু বুঝেছিল যে, দীর্ঘ সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য লালন করা বাংলার মানুষ অধিকারসচেতন। তাই পরবর্তী বাঙালি প্রজন্ম যাতে আত্মপরিচয়, সাংস্কৃতিক শক্তি এবং ইতিহাস-বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়, সেই ব্যবস্থাটি নিতে হবে শুরুতেই। সে উদ্দেশ্যে ১৯৪৭-এ পাকিস্তানের জন্মলগ্নেই সবকিছু বাদ দিয়ে ভাষা প্রশ্নে বিরোধে জড়িয়ে পড়ল শাসকগোষ্ঠী।

সারা পৃথিবীতে উপনিবেশ স্থাপন করার যোগ্যতা রাখতে পেরেছিল ইংরেজ শাসকরা। সূক্ষ্মদর্শী ছিল বলেই তারা তাদের উদ্দেশ্য অনেক ক্ষেত্রে সফল করতে পেরেছিল। তাই পলাশীর যুদ্ধের মধ্য দিয়ে প্রথমে বাংলার আর তার পরে সারা ভারতের ক্ষমতায় প্রতিষ্ঠিত হলেও তারা এই বাস্তবতা ঠিকই অনুভব করেছিল যে, বহু ভাষা ও সংস্কৃতির ভারতবর্ষ এবং দীর্ঘ সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য লালন করা ও সাহিত্যের ভা-ার সমৃদ্ধ করা স্থানীয় ভাষার সঙ্গে নাড়ির সম্পর্ক আছে ভারতবাসীর। এ কারণে শুরুতে নাড়ি ধরে টানলে এর ফল শুভ হবে না। তাই অপেক্ষা করটাই বুদ্ধিমানের কাজ হবে। এ কারণে চার শতাধিক বছর ধরে প্রতিষ্ঠিত রাষ্ট্রভাষা ফার্সিতে তারা হাত দিল না। শাসকরা ইংরেজ প্রশাসকদের অনেককে ফার্সি শেখাল, অনেক ফার্সি জানা ভারতীয়কে মুনশি হিসেবে প্রশাসনে চাকরি দিল এবং অপেক্ষা করল সেই দিনের জন্য, যেদিন আধুনিকতা ও প্রগতির স্বার্থে নিজেদের যুক্ত করার জন্য রাষ্ট্রভাষা হিসেবে ইংরেজিকে স্বাগত জানাবে ভারতীয়রাই। তাই ১৭৫৭ সালে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি ক্ষমতায় এলেও ইংরেজিকে দাপ্তরিক ভাষার মর্যাদায় নিয়ে এলো ১৮৩৫ সালে।

অন্যদিকে, স্থূলবুদ্ধির পাকিস্তানি শাসকদের তর সইছিল না। নিজেদের অসৎ উদ্দেশ্য চরিতার্থ করার জন্য বাঙালির দীর্ঘদিনের বুদ্ধিবৃত্তিক ও সংগ্রামী ঐতিহ্য আমলে না এনে নতুন দেশের জন্মলগ্নেই ভাষা প্রশ্নে জটিল বিতর্ক তৈরি করে ফেলল। বায়ান্নের প্রবল ঝাঁকুনির পরও তাদের বোধোদয় হলো না। বাঙালিকে পদদলিত করার জন্য একের পর এক ষড়যন্ত্রের জাল বিস্তার করল। কেড়ে নিতে থাকল তার রাজনৈতিক, সামাজিক, অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক অধিকার। তাই বাঙালি সময়ের বাস্তবতায় আইয়ুবের শাসনের বিরুদ্ধে সোচ্চার হয়েছিল। মুসলমান ভাই বলে শাসন করতে আসা পশ্চিম পাকিস্তানি শাসকদের ভেতরকার প্রতারকের চেহারাটি ততক্ষণে স্পষ্ট বাঙালির কাছে। অধিকার ফিরিয়ে দেওয়ার বদলে শাসকরা নির্যাতকের কুৎসিত হাত প্রসারিত করল।

যে বাঙালি সাধের পাকিস্তান গড়তে অগ্রণী ছিল শুরুতেই মোহভঙ্গের পর এবার তারা স্বায়ত্তশাসনের দাবিতে উত্তাল আন্দোলন গড়ে তুলল। ১৯৫৪-এর নির্বাচনের পর থেকেই শাসকগোষ্ঠী বুঝেছিল, মুসলিম লীগ দিয়ে রাজনৈতিক প্রতিরক্ষাব্যূহ রচনা সম্ভব নয়। পূর্ব পাকিস্তানে মুসলিম লীগ তার গ্রহণযোগ্যতা হারিয়েছে। তাই এখন শেষ রক্ষা পেতে হলে অন্ধকার পথে হাঁটতে হবে। এ ক্ষেত্রে কিছুটা শিক্ষা হয়তো ইংরেজ প্রভুদের কাছ থেকে তারা নিয়েছিল। কারণ ১৯০৫-এ বঙ্গভঙ্গ ঘোষণার পর থেকেই বাঙালির ব্রিটিশ শাসনবিরোধী মনোভাব শাসক ইংরেজরা স্পষ্ট অনুভব করে। তখন থেকেই তারা ‘ডিভাইড অ্যান্ড রুল’ অর্থাৎ ‘ভাগ কর শাসন কর’ নীতি প্রয়োগ করতে থাকে। মুসলিম শাসনের দীর্ঘকাল পর্বে হিন্দু-মুসলমান উভয় গোষ্ঠীর সামাজিক সংস্পর্শ ছিল বন্ধুত্বপূর্ণ। এদের ঐক্যবদ্ধ শক্তিকে খ-িত করার জন্য এখানেই খড়্গ চালাতে চাইল শাসকগোষ্ঠী। এ কাজে দরকার অন্ধকারের জীব। অর্থ ও ক্ষমতালোভী মোল্লা আর পুরোহিত খুঁজে পেতে দেরি হলো না। তাদের কানে কুমন্ত্রণা দেওয়া হলো, মুসলমান কীভাবে হিন্দুর ধর্ম অপমানিত করছে আর হিন্দু কীভাবে কলুষিত করছে মুসলমানের ধর্ম। ভুল ব্যাখ্যায় দুই সম্প্রদায়ের সরল ধার্মিকদের উত্তেজিত করল। লাঠি আর তলোয়ার নিয়ে তারা একে অন্যের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ল। ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলন ভুলিয়ে এভাবে বাঙালিকে সাম্প্রদায়িক সংঘাতে ব্যস্ত করে তুলতে লাগল।

যখন দাঙ্গার আগুন ছড়িয়ে পড়ছিল, তখন ইংরেজ শাসকদের তাঁবেদার স্বার্থলোভী মোল্লা আর পুরোহিতরা ইংরেজ শিবিরে বসে গলাগলি হয়ে চর্ব-চোষ্য-লেহ্য উদরস্থ করছে হয়তো এই শ্রেণিচরিত্রটি পছন্দ হয়েছিল পাকিস্তানি শাসকদেরও। তাই মুসলিম লীগ স্বার্থপূরণের যথেষ্ট যোগ্য নয়, বুঝতে পেরে অন্ধকারের জীব খুঁজতে মনোযোগ দিল তারা। শাসকদের এ বিষয়টি বুঝতে অসুবিধা হয়নি যে, এ দেশের স্বল্পশিক্ষিত আর অশিক্ষিত মুসলমান যথেষ্ট ধর্মপ্রবণ। ধর্মের নামে এই কোমল জায়গাটিকে প্রতারণা করে তাদের বিভ্রান্ত করে ফেলতে হবে। আর এ কাজে মওদুদীবাদের তালিম নেওয়া জামায়াতে ইসলামীর চেয়ে আর যোগ্য কে! ফলে পাকিস্তানি শাসকরা জামায়াতে ইসলামীসহ কয়েকটি ইসলামী নামধারী গোষ্ঠীকে কানপড়া দিয়ে মাঠে নামিয়ে দেয়। এর ধারাবাহিকতাতেই একাত্তরে বাঙালির মুক্তিযুদ্ধকে স্তব্ধ করে দিতে জামায়াত আর ইসলামী নামধারী তাদের অন্য সহযোগীরা বাঙালি নিধন, নারী ধর্ষণ আর সম্পদ ধ্বংসে পাকিস্তানি বাহিনীর একান্ত দোসর হয়ে গেল। সবচেয়ে বড় ইসলামবিরোধী কাজগুলো করতে লাগল প্রতারকের মতো ইসলামের দোহাই দিয়েই।

ধর্মীয় আবেগকে উসকে দিয়ে জেনেশুনে মিথ্যাচারের মাধ্যমে এই প্রতারণার ফাঁদ এখনো পেতে চলছে তারা। মনে পড়ে এক যুগেরও আগে পিরোজপুরে নির্বাচনী প্রচারের শুরুতে সমাবেশে বয়ান রাখতে গিয়ে একাত্তরের রাজাকার জামায়াত নেতা দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদী সাত পুরনো সুরেই বলেছিলেন ‘আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় গেলে টুপি, দাড়ি নিয়ে চলা যাবে না, মাদ্রাসা বন্ধ হবে।’ লম্বা দাড়ি, চমৎকার পাঞ্জাবি আর কাজ করা বাহারি টুপি মাথায় সাঈদী সব জেনেই সাধারণ মুসলমানকে বোকা বানাতে ডাহা মিথ্যা বললেন। তার জোটনেত্রী একই ভাষায় একসময় বলেছিলেন ‘আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় গেলে মসজিদে উলুধ্বনি হবে।’ কিন্তু বাস্তবে এর কোনো আলামত কেউ দেখেনি। বরং সাঈদী ভালো করেই জানেন, আওয়ামী লীগ সরকারের আমলেই ইসলামী একাডেমিকে ইসলামী ফাউন্ডেশন করা হয়েছিল। সাঈদীদের নিশ্চয় না জানার কথা নয়, পাকিস্তান আমলে পশ্চিমা সরকার সতর্ক ছিল, যাতে পূর্ব পাকিস্তানের মানুষ প্রকৃত ইসলাম জানতে না পারে। তাই ইসলামী একাডেমির উদ্যোগে কোরআনের তফসির প্রকাশের পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি। আমি বুঝে পাই না, অগ্রগতির এই আধুনিক যুগেও সাঈদীরা মানুষদের প্রাগৈতিহাসিক যুগের অজ্ঞ মানুষ ভেবেছিলেন কি না। তারা মিথ্যাচার করবেন আর মানুষ মন্ত্রমুগ্ধের মতো বিশ্বাস করবেন এবং তাদের ভোট দেবেন এমন ধারণা তাদের কী করে হলো!

মূল প্রসঙ্গে ফিরে আসি। একাত্তরে পাকিস্তানি শাসকরা না হয় পূর্ব পাকিস্তানের মাটিটুকু যাতে হাতছাড়া না হয় তাই গণহত্যা, নারী নির্যাতন আর ধ্বংসযজ্ঞ চালিয়েছে। এদের অপকর্মে সহযোগিতা করেছে জামায়াত ও সমমনা ইসলামী দল পরিচালিত রাজাকার, আলবদর, আলশামসের তরুণ তুর্কিরা। কিন্তু ১৪ ডিসেম্বরের আগে থেকেই শুধু ঢাকা নয়, অনেক বিভাগীয় শহরেই আলবদরের নেতৃত্বে হত্যাকা- চলছিল। মুক্তিযোদ্ধা নয়, হিন্দু নয় শিক্ষক, চিকিৎসক, সাংবাদিক এবং এ ধারার বুদ্ধিবৃত্তির সঙ্গে যুক্ত মানুষদের বাসা থেকে ধরে এনে নির্মম নির্যাতন চালিয়ে হত্যা করা হলো কেন? আর হত্যা করা হলো এমন একসময়, যখন পাকিস্তানি জান্তার পরাজয় মেনে নেওয়া ছাড়া আর কোনো পথ ছিল না। যেহেতু বুদ্ধিজীবী হত্যা পাকিস্তানি শাসকদের যুদ্ধজয়ে প্রভাব ফেলবে না, তাই এখানে ‘গাজি’ হওয়া বা ‘শহীদ’ হওয়ার কোনো গৌরব নেই। যুদ্ধাবস্থায় প্রতিপক্ষকে হত্যা করায় পাপ নেই বলারও সুযোগ নেই। পরাজয় মেনে আত্মসমর্পণের পূর্বক্ষণে ঠান্ডা মাথায় পরিকল্পনামাফিক সহস্রাধিক বাঙালি বুদ্ধিজীবীকে জামায়াতনিয়ন্ত্রিত আলবদর বাহিনীর সদস্যরা খুন করল।

যে খুনে বাহিনীর নেতারা এখন আবার এ দেশের মাটিতে রাজনীতি করছেন, মন্ত্রী হয়েছেন। বুদ্ধিজীবী হত্যাকারী আলবদর বাহিনী তথা জামায়াত যে এ দেশকে কখনোই ভালোবাসেনি বুদ্ধিজীবী হত্যার মধ্য দিয়ে তারা এর প্রমাণ রেখেছে। কারণ তারা যখন বুঝতে পারল, বাংলাদেশের স্বাধীনতা এখন সময়ের ব্যাপার, তাই এই নতুন দেশটি গড়ে তুলতে, এর সামাজিক, সাংস্কৃতিক, অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক উন্নয়ন ঘটাতে প্রধান চালিকাশক্তি হবে বুদ্ধিজীবী সমাজ। ফলে স্বাধীনতা পেলেও বাঙালি যাতে পঙ্গু হয়ে যায় এ কারণে বেছে বেছে বুদ্ধিজীবীদের মেরে ফেলতে হবে। আর এই ভয়ংকর হত্যাকারীরা এমন পৈশাচিক উদ্দেশ্যই চূড়ান্তভাবে বাস্তবায়ন করল প্রধানত ১৪ ডিসেম্বরে। যেটা ছিল বাঙালির বুদ্ধিবৃত্তিক সংগ্রামে সবচেয়ে বড় আঘাত।

আজ বিএনপিকে কলঙ্কিত করে তাদের ঘাড়ে বসে জামায়াত আর তাদের আলবদর কমা-াররা যতই পেশিশক্তি বাড়াতে থাক না কেন, তাদের জানা উচিত ১৪ ডিসেম্বর প্রতি বছরই ফিরে আসবে। যতই বিকৃত করা হোক, স্বয়ংক্রিয় পথে মুক্তিযুদ্ধের প্রকৃত ইতিহাস বর্তমান ও অনাগত প্রজন্মের সামনে উপস্থাপিত হবেই। গণহত্যার দোসর আর বুদ্ধিজীবী হত্যার নায়করা কারও আশ্রয়েই শেষ পর্যন্ত নিজেদের রক্ষা করতে পারেনি, পারবেও না। জঙ্গিবাদ উসকে দিয়ে নয় শুধু অপরাধ স্বীকার করে জাতির কাছে করজোড়ে ক্ষমাভিক্ষার মধ্য দিয়ে যদি কিছুটা পাপ স্খলন করা যায়, এটুকুকেই প্রাপ্তি মানতে হবে। এই বাস্তব বোধোদয় কি এদের হবে?

লেখক : জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ও লেখক

[email protected]