ফিকে হওয়া জীবন হঠাৎ চঞ্চল|272172|Desh Rupantor
logo
আপডেট : ২২ জানুয়ারি, ২০২১ ০০:০০
ফিকে হওয়া জীবন হঠাৎ চঞ্চল
মুজিববর্ষে গৃহ উপহার
পাভেল হায়দার চৌধুরী, বাগেরহাটের শরণখোলা থেকে

ফিকে হওয়া জীবন হঠাৎ চঞ্চল

আইলা, আম্পান ও সিডরের মতো ঝড়-তুফানের সঙ্গে লড়াই করে বাঁচে বাগেরহাটের শরণখোলা উপকূলের মানুষ। প্রতি বছরই প্রাকৃতিক দুর্যোগ-ঘূর্ণিঝড় মোকাবিলা করতে হয় তাদের। প্রকৃতির সঙ্গে লড়াই-সংগ্রাম করে নিঃস্ব মানুষগুলো জলদস্যুদের হানায় হারায় স্বজনদেরও। তাদের নিরাশার জীবনে হঠাৎ আলোর ঝলকানির মতো এসেছে  সরকারের গৃহ উপহার প্রকল্প। ২০০৭ সালে সিডরের এক মাস পর সাগরে মাছ ধরতে গেলে জলদস্যুদের হামলায় স্বামী নাসির খাঁকে হারান মিনারা বেগম। ১নং ধানসাগর ইউনিয়নের উত্তর রাজাপুরের বাসিন্দা মিনারা মাত্র এক মাস আগে সিডরের আঘাতে হারান বসতঘর। মাথায় আকাশ ভেঙে পড়তে বাকি কি? দুই ছেলে ও এক মেয়ে নিয়ে সংসারের ঘানি টেনে কোনোভাবে বেঁচে আছেন একটি কুঁড়েঘরে। অবশ্য এরই মধ্যে বড় হয়ে উঠে দুই ছেলে ও এক মেয়ে। মেয়ে নাসরীনকে বিয়ে দেন ২০০৯ সালে। কিছুদিন সংসার করে স্বামী পরিত্যক্ত হয়ে ফেরেন বাপের বাড়িতে মায়ের কাছে। দুই ছেলের একজন চট্টগ্রামে এক গার্মেন্টসে চাকরি করেন অপর ছেলে এলাকায় রিকশা চালান। এক কুঁড়েঘরেই চলছিল তাদের জীবন। গত বছর আম্পান আঘাত করে ওই কুঁড়েঘরেও। এরই মধ্যে বঙ্গবন্ধুর জন্মশতবার্ষিকী উপলক্ষে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার উপহারের ঘর পেয়ে মিনারার চোখেমুখে বহু বছর আগে হারানো উচ্ছ্বাস। আত্মবিশ্বাসী মিনারা বলেন, এবার যত বড় সিডর হোক আর উড়িয়ে নিতে পারবে না এই ঘর। পাকাঘর কখনো স্বপ্নেও ভাবিনি কিন্তু বাস্তব হয়ে দেখা দিয়েছে। আগামী শনিবার কীভাবে ঘরে উঠবেন, থাকবেন সেই স্বপ্নই দেখছেন মিনারা। আনন্দ-উচ্ছ্বাসে পাকাঘরের সামনে চুলায় চা বানিয়ে খাওয়ান তিনি। মিনারা বলেন, ঝড়-তুফানে আর আশ্রয়কেন্দ্রে ছুটে যাওয়া লাগবে না তাদের। নাতিপুতি নিয়ে শেখ হাসিনার দেওয়া ঘরেই থেকে যাবেন।

তিনি বলেন, চিন্তা ছিল কুঁড়েঘরে থেকেই একদিন মরে যাব। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার জন্য দীর্ঘায়ু কামনা করে মিনারা বলেন, স্বপ্ন দেখেছি কুঁড়েঘর, পেয়েছি পাকাঘর, আর কি? গতকাল বৃহস্পতিবার শরণখোলা উপজেলা ঘুরে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার উপহার পাওয়া পরিবারগুলোর সঙ্গে কথা বলে উঠে এসেছে তাদের জীবনে অতীতে ঘটে যাওয়া বিভিন্ন দুর্বিষহ ঘটনা। শেখ হাসিনার উপহার পেয়ে আবেগাপ্লুত গৃহহীন পরিবারগুলো জানিয়েছে আনন্দ-উচ্ছ্বাসের কথাও। আগামী শনিবার শরণখোলার ৯২টি গৃহহীন পরিবারকে সরকারের পক্ষ থেকে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা তুলে দেবেন সরকারি খরচে নির্মিত পাকাঘরের চাবি। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তার সরকারি বাসভবন গণভবন থেকে আশ্রয়ণ-২ প্রকল্পের উদ্বোধন করবেন। ওইদিন সারা দেশের বিভিন্ন জেলা-উপজেলায় প্রায় ৭০ পাকাঘরের চাবি বুঝিয়ে দেওয়া হবে গৃহহীনদের মাঝে।

উত্তর রাজাপুরের বাসিন্দা কদবানু রাস্তায় নির্মাণের কাজ করেন। যা আয় হয় তা নিয়ে টানাটানির সংসার চলে। স্বামী এলফাজ হাওলাদার মারা যান ২০ বছর আগে। তিন ছেলে দুই মেয়ে সবাই বিয়ে করে সংসার করছেন। সন্তানদের আয় রোজগার দিয়ে কোনোভাবে দিনাতিপাত করছেন। নিজের আয়ে চলতে হয় ৬০ বছর বয়সী কদবানুকে। তবে সন্তানদের নিয়ে কোনো অভিযোগ নেই তার। এক নাতি রফিকুল ইসলামকে নিয়ে একটি ঝুপড়িঘরে রাত কেটে যায় তাদের। কোনো রকমের একটি ঘর থাকলেও সিডর আঘাত করে লণ্ডভণ্ড করে দেয়। এরপর থেকে ঝুপড়িঘরেই বসত করে আসছে কদবানু। প্রধানমন্ত্রীর উপহার পাওয়া ঘর পেয়ে সীমাহীন আনন্দ তার। প্রশ্ন করলে এই প্রতিবেদককে কদবানু বলেন, এ ঘর আমার হবে, এরকম ঘর তুলে আমি থাকব সেই ঘরে তা কখনো স্বপ্নেও ভাবিনি। শেখ হাসিনার অসিলায় একটি পাকাঘরের মালিক হয়েছি আমি। এই জীবনে আর কিছু চাই না। আল্লাহ শেখ হাসিনার ভালো করুক, দোয়া করি। এমন আনন্দ, উচ্ছ্বাস শরণখোলার ৯২টি পরিবারের মধ্যে। তাদের আনন্দের ভাষা প্রায় একই রকম।

বাগেরহাটে ৪৩৩টি পরিবারকে ঘর দেওয়া হবে। এর মধ্যে শনিবার ৩১৫টি ঘরের চাবি বুঝিয়ে দেওয়া হবে এবং বাকিগুলো দেওয়া হবে আগামী মাসে।

এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে শরণখোলা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মোস্তফা শাহীন দেশ রূপান্তরকে বলেন, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার যুগান্তকারী উদ্যোগ আশ্রয়ণ-২ প্রকল্প। ২৩ জানুয়ারি শরণখোলা উপজেলায় ৯২টি গৃহহীন পরিবারকে আমরা ঘরের চাবি বুঝিয়ে দেব। আগামী মাসে বাকি ১০৮টি পরিবারকে ঘর দেওয়া হবে।

তিনি বলেন, উপকূলীয় অঞ্চলে ঘর নির্মাণের ব্যয় আরও বাড়ানো উচিত। এ অঞ্চলের ব্যয় খরচ আর অন্য অঞ্চলের ব্যয় এক নয়। এখানে ঘর নির্মাণে প্রকৃতিক দুর্যোগগুলো মাথায় রেখে আমাদের দালানকোঠা নির্মাণ করতে হয়।

আশ্রয়ণ-২ প্রকল্প পরিচালক মো. মাহবুব হোসেন সাংবাদিকদের জানান, মুজিববর্ষে কেউ গৃহহীন থাকবে না সরকারের এ লক্ষ্য বাস্তবায়নের অংশ হিসেবে ২৩ জানুয়ারি প্রথম পর্যায়ে সারা দেশে ৬৯ হাজার ৯০৪ ভূমিহীন-গৃহহীন পরিবারকে ঘর দিচ্ছে সরকার। তিনি সাংবাদিকদের বলেন, ‘প্রধানমন্ত্রীর ঘোষণা অনুযায়ী ২৩ জানুয়ারি সারা দুনিয়াতে এটি প্রথম ঘটনা এবং একমাত্র ঘটনা একসঙ্গে ৬৬ হাজার ১৮৯টি ভূমিহীন-গৃহহীন পরিবারকে ২ শতাংশ খাসজমির মালিকানা দিয়ে বিনা পয়সায় দুই কক্ষবিশিষ্ট ঘর মুজিববর্ষের উপহার হিসেবে প্রধানমন্ত্রী প্রদান করবেন। একই সঙ্গে ব্যারাকের মাধ্যমে ২১টি জেলার ৩৬টি উপজেলায় ৪৪ প্রকল্পের মাধ্যমে ৩ হাজার ৭১৫টি পরিবারকে ব্যারাকে পুনর্বাসন করব।’

আশ্রায়ণের প্রকল্প পরিচালক বলেন, একটি ঘর শুধু একটি আশ্রয়স্থল নয়, যার কিছুই ছিল না এই ঘরটি তার জন্য আত্মমর্যাদার। আরও সেবা পাবে। তাদের শিক্ষা-স্বাস্থ্য, সুপেয় পানি সব নাগরিক সুবিধা দেওয়া হবে। প্রধানমন্ত্রী বলেছেন মুজিববর্ষে একজন মানুষও গৃহহীন থাকবে না। সবার জন্য ঘর নির্মাণ করে শেষ না হওয়া পর্যন্ত বরাদ্দ চলতে থাকবে। ২৩ জানুয়ারি প্রায় ৬৯ হাজার পরিবারের জন্য ঘর উদ্বোধনের পর থেকে আগামী এক মাসের মধ্যে আরও এক লাখ ঘর নির্মাণের জন্য বরাদ্দ দেওয়া হবে বলেও জানান মাহবুব হোসেন। মুজিববর্ষ উপলক্ষে দুই কক্ষবিশিষ্ট একটি ঘর উপহার দিচ্ছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। এতে একটি বারান্দা, রান্নাঘর ও টয়লেট রয়েছে।