ইতিহাসের ক্রান্তিকাল এবং আমরা|272273|Desh Rupantor
logo
আপডেট : ২৩ জানুয়ারি, ২০২১ ০০:০০
ইতিহাসের ক্রান্তিকাল এবং আমরা
সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী

ইতিহাসের ক্রান্তিকাল এবং আমরা

আমাদের সেরা ক্রিকেট খেলোয়াড় সাকিব আল হাসান, খেলার মাঠে তার মনের জোর অনন্য-সাধারণ। কৌশল উদ্ভাবন, দলের নেতৃত্বদান, প্রতিপক্ষকে কাবু করা এসব কাজে তিনি যেমন ক্ষিপ্র, তেমনি স্থিতধী। আকাশের তারার মতো উজ্জ্বল ও স্থিরনিশ্চয়। বিশ্বমাপে বাংলাদেশ এখন বেশ কিছু ক্ষেত্রে নিচের দিক থেকে প্রথম; ক্রিকেট তারকা হিসেবে সেখানে তিনি অতি উচ্চে, বিশ্বসেরাদেরই একজন। কিন্তু খেলার মাঠের বাইরে এবং মানসিক জোরের ক্ষেত্রে তো তিনিও দেখা গেল ওই গড়পড়তা বাঙালিই। জুয়া ব্যবসায়ীদের একজন তার সঙ্গে খাতির করতে চেয়েছিল, সে-খবর তিনি কর্তৃপক্ষের কাছে গোপন করেছেন এমন অভিযোগে অভিযুক্ত হয়ে এক বছরের জন্য মাঠ থেকে বহিষ্কৃত হয়ে যান। নিষেধাজ্ঞার সময় শেষ হলে ফিরে এলেন দেশে। ফিরলেন এক মধ্যরাতে, পরের দিন বেলা দ্বিপ্রহরে খেলার মাঠে যাবেন কী, গেলেন একটি সুপার শপ উদ্বোধনে। স্বাস্থ্যবিধির তোয়াক্কা করলেন না। তারপর রওনা দিলেন কলকাতায়। বিমানে যাবেন এমন উপায় ছিল না, গেলেন ক্লান্তিকর স্থলপথেই। কলকাতায় এক পূজামণ্ডপে উপস্থিত হয়ে হইচই সৃষ্টি করলেন। ফেইসবুকে খবরটা চলে এলো। ফেইসবুক তো সংবাদ-বুভুক্ষু। আর ফেইসবুকেই এক অপোগন্ড যুবক রাম দা উঁচিয়ে বলল, পূজায় কেন গেছেন, আপনাকে আমি বধ করব। পূজামণ্ডপে যাওয়াটা মোটেই কোনো অপরাধ নয়, যুগ যুগ ধরে বাংলার মুসলমানরা যায়, আমরা কে না গেছি; কিন্তু সাকিব আল হাসান ঘাবড়ে গেলেন, তিনি ইচ্ছা করে মন্ডপে যাননি এই অপ্রয়োজনীয় ব্যাখ্যাটা দিলেন। বললেন কলকাতায় তিনি অন্য একটি কাজে গিয়েছিলেন, ঘটনাক্রমে মন্ডপে তার উপস্থিতি ঘটেছে। কী কাজে গেছেন তা অবশ্য বলেননি। বলার কোনো দরকারও নেই। সেটা তার ব্যক্তিগত ব্যাপার। ব্যাপারটা সেখানেই শেষ হয়ে যেতে পারত। যে লোকটি রাম দা দেখিয়েছে সে অবশ্যই গ্রেপ্তার হতো। কিন্তু সাকিব সে পথে হাঁটলেন না। এখন প্রশ্ন হলো, খেলার মাঠে দুর্ধর্ষ প্রতিপক্ষের জন্য যিনি মূর্তিমান ত্রাস তিনি কি না সন্ত্রস্ত নামহীন এক অপোগন্ডের হাতে একটি ছায়া রাম দা দেখে? তারকা-খেলোয়াড়রা নিলামে বিক্রি হন, ব্যবসায়ীরা কিনে নেন, জুয়া ব্যবসায়ীরা তাদের পকেটে টাকা গুঁজে দেয়। শিল্পপতিরা তারকাদের পণ্যের বিজ্ঞাপন প্রচারের কাজে টেনে আনেন। বিশ্বময় এমনটা ঘটছে। তা বাংলাদেশের খেলোয়াড়রাই বা পিছিয়ে থাকবেন কেন? না, পিছিয়ে থাকবেন না। মোটেই না। স্বীয় কীর্তির ধ্বজা ধরে বাংলাদেশও এগোবে উন্নতির পথ ধরেই। তবে এই উন্নতিই যে বাংলাদেশের সর্বনাশ ঘটাবে এটাও ঠিক। কেবল বাংলাদেশের নয়, সমগ্র বিশ্বেরই।

বিশ্বজুড়ে উন্নতি অব্যাহত এবং ধারাবাহিকভাবেই এগোচ্ছে। এ উন্নতি পুঁজিবাদী চরিত্রের। যার ফলে যত উন্নতি তত বৈষম্য-বৃদ্ধি এবং ততই প্রাণ ও প্রকৃতির জন্য বিপদ। বেশ জোরেশোরেই বলা হচ্ছে বিশ্ব এখন চতুর্থ শিল্প-বিপ্লবের দিকে অগ্রসরমাণ। তা সে-বিপ্লবটা কেমন হবে? আগের তিনটি বিপ্লব ঘটেছে যথাক্রমে বাষ্পশক্তি, বিদ্যুৎশক্তি এবং কম্পিউটার প্রযুক্তির সাহায্যে। চতুর্থ শিল্প-বিপ্লবে আসবে কৃত্রিম বুদ্ধির শক্তি-বলে। মানুষের হয়ে আর্টিফিশিয়াল ইনটেলিজেন্স কাজ করে দেবে। মানুষের আর কোনো কষ্ট থাকবে না, কেবলই সুখ। কিন্তু এত সুখ তার সইবে কি? যন্ত্র যদি রাজত্ব করে তবে মানুষের জায়গাটা রইবে কোথায়? আবার যন্ত্র তো থাকবে কতিপয়ের মালিকানায়, বাদবাকিরা করবেটা কী?

উন্নতির নতুন স্তরে প্রায় সবকিছুরই গতিবৃদ্ধিটা নাকি হবে অবিশ্বাস্য রকমের। তা গতির বেগ তো এখনই দেখতে পাচ্ছি। মুহূর্তে খবর ছড়িয়ে যায় বিশ্বময়। খবর নয় শুধু, মিথ্যা খবরও এবং গুজবও। কোনটা সত্য কোনটা মিথ্যা যাচাই করা কঠিন হচ্ছে। হতে থাকবে। আর মানুষের চলাফেরা? সেটাও আরও দ্রুত ও স্বচ্ছন্দ হবে নিশ্চয়ই। কতটা? যাতায়াতে গতি বাড়বে, কিন্তু যাতায়াত যে অবাধ হবে তার নিশ্চয়তাটা কোথায়? নিশ্চয়তা নেই, তবে এটা নিশ্চিত যে চতুর্থ শিল্প-বিপ্লব আর যাই করুক এই পৃথিবীকে মনুষ্য বসবাসের জন্য উপযুক্ত রাখবে না।

ক্রান্তিকাল বলে একটা সময়ের কথা শোনা যায়; ইতিহাসের ধারাপ্রবাহে নানা ক্ষেত্রে ক্রান্তিকাল আসে। আসে শিল্পে, সাহিত্যে, দার্শনিক চিন্তায়, উৎপাদনে ও বিতরণ পদ্ধতির বেলায়। এসে যায়। পুরনো বিদায় নেয়, নতুনের অভ্যুদয় ঘটে। মানবসভ্যতার ইতিহাসে আজ তেমনি একটি ক্রান্তিকাল উপস্থিত। আজ প্রশ্ন দাঁড়িয়েছে নতুন একটি সভ্যতা কি জন্ম নেবে, নাকি পুরনো সভ্যতা মানুষকে ধ্বংসের দিকে টেনে নিয়ে যেতেই থাকবে। কোন পথে এগোবে মানবসভ্যতা; সৃষ্টির নাকি ধ্বংসের? সৃষ্টির পথে এগোতে হলে পুঁজিবাদকে বিদায় করে দিয়ে সমাজতান্ত্রিক ব্যবস্থার দিকে যেতে হবে; ব্যক্তিমালিকানার জায়গায় প্রতিষ্ঠা করতে হবে সামাজিক মালিকানার। হয় এটা, না হয় অপরটা, মাঝখানে কিছু নেই। সমঝোতা কালক্ষেপণের চেষ্টা হবে মাত্র। সৃষ্টির পথে না এগোলে ধ্বংসের তৎপরতা আরও নিষ্ঠুর ও সর্বগ্রাসী হয়ে উঠবে। উদারনীতিকে একসময়ে প্রগতিশীল মনে করা হতো। সে কাল এখন আর নেই। রাজনীতিতে মেরুকরণ অনিবার্য হয়ে পড়ছে। বার্নি স্যান্ডার্স ডেমোক্রেটিক পার্টির ভেতর থেকেই কাজ করবেন ভেবেছিলেন; চেষ্টাও করলেন; কিছুটা সফলতাও পেলেন, কিন্তু তা সামান্যই। ভবিষ্যতে তাকে এবং তার মতো ঘোষিত সমাজতন্ত্রীদের পক্ষে নিজেদের পার্টি গঠন ছাড়া এগোনোর উপায় থাকবে না। গ্রেট ব্রিটেনের লেবার পার্টির প্রধান জেরেমি করবিন প্রাণপণে চেষ্টা করেছিলেন টনি ব্লেয়াররা ওই পার্টিকে রক্ষণশীলতার যে-দ্বারপ্রান্তে নিয়ে গিয়েছিলেন, সেখান থেকে উদ্ধার করে তাকে সমাজতান্ত্রিক ধারায় ফিরিয়ে আনতে। পারেননি। উল্টো তিনি নিজেই অপসারিত হয়ে গেছেন। থাইল্যান্ডে যে তরুণরা গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার জন্য রাজপথে সংগ্রাম করছে, তারাও নিশ্চয়ই বুঝবে যে বুর্জোয়া কিসিমের নির্বাচন দিয়ে ক্ষমতা হস্তান্তর হয়তো ঘটবে, কিন্তু গণতন্ত্রের প্রতিষ্ঠায় সবার জন্য যে সমান অধিকার ও সুযোগ প্রতিষ্ঠা প্রয়োজন, তা কখনোই অর্জন করা সম্ভব হবে না। সেটা অর্জনের জন্য প্রয়োজন সামাজিক বিপ্লবের, যে বিপ্লব পুঁজিবাদকে বিদায় করে দিয়ে নতুন এক সভ্যতার জন্মকে সম্ভবপর করে তুলবে। আর নির্বাচন? হ্যাঁ, হবে, কিন্তু ক্ষমতা সেখানেই রয়ে যাবে যেখানে ছিল শ্রেণিগতভাবেই শুধু নয়, একেবারে দলীয়ভাবেই, এমন ঘটনা তো হরদমই ঘটছে। নির্বাচিত জো বাইডেন পরাজিত ট্রাম্পকে শেষ পর্যন্ত সরাতে পেরেছেন, হোয়াইট হাউজ তার দখলে এসেছে, কিন্তু তিনিও তো সেই জাতীয়তাবাদীই। ট্রাম্প বলতেন আমেরিকা ফার্স্ট, বাইডেন বলছেন আমেরিকা ইজ ব্যাক। দুজনেই আমেরিকার পক্ষে, আর তাদের আমেরিকা পুঁজিবাদীই, অন্য কিছু নয়। লাউ ও কদু একই বস্তু, নামেরই যা ব্যবধান। পুঁজিবাদও পুঁজিবাদই, অন্য কিছু নয়। করোনাভাইরাসের দূত পাঠিয়ে পুঁজিবাদ জানিয়ে দিয়েছে যে সারা বিশ্বের মানুষের ওপরই মৃত্যুদন্ডাদেশ জারি হয়ে গেছে; বিশ্ববাসী পারলে এখন বাঁচবে, নয় তো মরবে। বিশ্বের মানুষ নিশ্চয়ই মরতে রাজি হবে না। খবর পাওয়া গেল দেশের ছয়টি রাষ্ট্রীয় চিনির কল বন্ধ হয়ে গেছে। তা পাটকল যদি যেতে পারে তাহলে চিনিকলের দোষ কী? রাষ্ট্রীয় খাত থেকে আরও অনেক কিছুই খসে পড়বে। উন্নতির ধারা সে-কথাই বলছে। তবে ভালো খবরও আছে। এসেছে হিন্দুত্ববাদী মোদি শাসনে-কবলিত ভারতের ভেতর থেকেই। সেখানে কৃষকরা রাজধানী দিল্লি অবরোধ করে রেখেছে। ‘চলো চলো দিল্লি চলো’ আওয়াজ আগেও বহুবার উঠেছে। তবে আবার উঠল একেবারে ভিন্নভাবে। উঠল কোনো দলের পক্ষ থেকে নয়, মেহনতি মানুষদের পক্ষ থেকে। শুরু হয়েছে সেই পাঞ্জাব থেকে, যে-পাঞ্জাবে ১৯৪৭-এ হাজার হাজার মানুষ প্রাণ হারিয়েছে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার নিকৃষ্টতম এক ঘটনায়। হিন্দু-মুসলমানের বিরোধ বাধিয়ে দেওয়া হয়েছিল। তার ফলেই দাঙ্গা ঘটে। এবার কিন্তু হিন্দু-মুসলমান-শিখ সবাই এক হয়ে গেছে। চলে এসেছে অভিন্ন এক স্রোতে। যেমনটা ঘটেছিল ১৮৫৭ সালের সিপাহি অভ্যুত্থানে। সিপাহিরাই কৃষকই ছিল; ইউনিফর্ম পরিয়ে তাদের কোম্পানির সিপাহি বানানো হয়েছিল।

মোদি সরকারের প্রধান ভিত্তিটাই হচ্ছে সাম্প্রদায়িক ব্যবধান, কৃষকরা সেই ব্যবধান ভেঙে খান খান করে ফেলেছে। তাদের একটাই পরিচয়; তারা কৃষক, তারা মেহনতি এবং বঞ্চিত। দিল্লির কেন্দ্রীয় সরকার ঠিক করেছিল আইন করবে কৃষিকে পুরোপুরি বণিকদের অধীনে নিয়ে যাওয়ার। সবই সেই ‘উন্নতি’র জন্য। তিনটি আইন। একটিতে কৃষকদের উৎপাদিত নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যগুলোর মজুদ করার ব্যাপারে কোনো ঊর্ধ্বসীমা থাকবে না। অর্থাৎ উৎপাদনের পরে বড় বণিক কোম্পানিগুলো অল্প দামে পণ্য কিনে গুদাম ভরে ফেলবে। পরে দাম বাড়িয়ে সেগুলো বাজারে ছাড়বে এবং অন্যদের সঙ্গে কৃষকরাও তা কিনবে, বেশি দামে। দ্বিতীয় আইনটির সাহায্যে বড় কোম্পানিগুলো কৃষকদের অগ্রিম চুক্তিবদ্ধ করে ফেলতে পারবে, পণ্য সংগ্রহের ব্যাপারে। অর্থাৎ বায়না দেওয়া; দাদনও বলা যায়, নীলকররা যা দিয়ে বেঁধে ফেলত নীলচাষিদের। তিন নম্বর আইনটি হবে মুক্তবাজারের। কৃষিপণ্যের দাম ঠিক করার ব্যাপারে রাষ্ট্র কোনো ধরনের হস্তক্ষেপ করবে না। কৃষক ‘স্বাধীন’ভাবে বণিক কোম্পানিগুলোর সঙ্গে দর-কষাকষির মাধ্যমে দাম ঠিক করবে। অর্থটা পরিষ্কার। দাম কৃষক ঠিক করবে কী করে? সে তো একা; তার পণ্য তো দ্রুত বিক্রি করা চাই, নইলে নষ্ট হয়ে যাবে এবং বিনিয়োগ উঠে আসবে না। দাম ঠিক করবে কোম্পানিগুলো। অর্থাৎ বলবৎ হবে কোম্পানির শোষণ। মোদি সরকার অনড়, কারণ সরকার তো আসলে ওই বণিকদেরই সম্প্রতি যারা ধর্মের লেবাস পরেছে। তবে মেহনতিরা যে তাদের চিনে ফেলেছে; ভরসা ওইখানেই যে মেহনতিরা তাদের শত্রুদের চিনে ফেলবে বিশ্বজুড়ে এবং নতুন এক সত্যতার জন্ম হবে ওই পথেই।

ভারতে আন্দোলনরত কৃষকরা ভগৎ সিং-এর ছবি নিয়ে এসেছেন সঙ্গে। যোগ দিয়েছেন ভগৎ সিং-এর নিকট আত্মীয়রাও। ভগৎ সিং তাদেরই লোক, শুধু পাঞ্জাবের নয় মেহনতিদেরও। ইংরেজ শাসকরা তাকে ফাঁসি দেয় ১৯৩১ সালে। ভগৎ সিং কেবল যে সাম্রাজ্যবাদবিরোধী ছিলেন তা নয়, ছিলেন সমাজতন্ত্রীও। আদালতে সে কথা তিনি ঘোষণা করেছিলেন। বলেছিলেন, ‘আমাদের কোনো দুঃখ নেই। আনন্দিত চিত্তে আমরা বিপ্লবের জন্য প্রতীক্ষা করব।’ আওয়াজ দিয়েছিলেন, ইনকিলাব জিন্দাবাদ-বিপ্লব দীর্ঘজীবী হোক। ভগৎ সিং-এর প্রাণদানের পরে ইংরেজরা শাসন করেছে ১৬ বছর, তারপরে স্বাধীন ভারতের জাতীয়তাবাদীরা ৭২ বছর। বিপ্লব আসেনি। কিন্তু বিপ্লবীরা আছেন। বিপ্লবের বিকল্প হচ্ছে মৃত্যু; মানুষ তো মরতে চাইবে না, তারা বাঁচতেই চাইবে। ভগৎ সিংরা সে ঘোষণাই জারি করে গেছেন এবং জারি রেখেছেন।

লেখক ইমেরিটাস অধ্যাপক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়