ব্যাংকিং-২০২১ সালের চ্যালেঞ্জ|273340|Desh Rupantor
logo
আপডেট : ২৮ জানুয়ারি, ২০২১ ০০:০০
ব্যাংকিং-২০২১ সালের চ্যালেঞ্জ
মাসরুর আরেফিন

ব্যাংকিং-২০২১ সালের চ্যালেঞ্জ

কভিড-১৯ বিশ্ব অর্থনীতির জন্য এখনো এক বড় চ্যালেঞ্জ। করোনাভাইরাসের ভ্যাকসিন আবিষ্কারের পরেও প্রলম্বিত কভিডের দ্বিতীয় ঢেউ ২০২১ সালের বিশ্ব অর্থনীতিকে অনিশ্চয়তার মধ্যে ঠেলে দিয়েছে। বাংলাদেশের অর্থনীতিও দাঁড়িয়ে আছে একই জিনিসের সামনে, যার স্বরূপ বোঝা যায় ২০২১ সালে বাংলাদেশের জিডিপি নিয়ে নানান সংস্থার পরস্পরবিরোধী লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণের মধ্য দিয়ে। সরকার ২০২১ সালে জিডিপির লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে ৭.৮%। ওই একই জিনিস এডিবির হিসাবে ৬.৪%, আইএমএফের খাতায় ৪.৪%, আর ওদিকে বিশ্বব্যাংক বলছে যে জিডিপির প্রবৃদ্ধি হবে মাত্র ১.৬%। বিশ্ব অর্থনীতির মতো বাংলাদেশও এখন সরকারি প্রণোদনা, বেকারভাতা এবং ঋণ পরিশোধ স্থগিতাদেশের সুযোগের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে।

২০২০ সালে বিশ্ববাণিজ্য কমে গেছে ১০% যা ২০০৯ সালে বিশ্ব অর্থনৈতিক মন্দার সময়ের কাছাকাছি, আর ২০২১ সালে বিশ্ববাণিজ্য ৫-৭% কমবে বলে আশঙ্কা করছে আইএমএফ। বাংলাদেশের অর্থনীতি, আপনারা জানেন, মূলত দাঁড়িয়ে আছে তৈরি পোশাক খাতের ওপরে। কভিড-১৯ থেকে উদ্ভূত বিশ্ব অর্থনৈতিক সংকটের মধ্যে পড়ে এই তৈরি পোশাক খাতসংশ্লিষ্ট কলকারখানাগুলো মাত্র ৬০-৭০% উৎপাদন ক্ষমতা নিয়ে কাজ করতে বাধ্য হচ্ছে। আমাদের দেশ ২০২০ সালের ডিসেম্বর থেকে ২০২১ সালের মার্চ পর্যন্ত আগের বছরের তুলনায় ৩০% কার্যাদেশ কম পেয়েছে, এবং ইউরোপ ও আমেরিকায় তৈরি পোশাকের বিক্রি যথাক্রমে ৯% ও ১৩% কমে গেছে। ২০১৯ সালের তুলনায় ২০২০ সালে রপ্তানি বেড়েছে মাত্র ২.৫৮%, অন্যদিকে আমদানি কমে গেছে ১৩.৮০%। বিশ্বজুড়ে রেমিট্যান্স হ্রাস পেলেও বাংলাদেশে তা গত বছরের তুলনায় বেড়েছে ৪৮.৫৪%। এই রেমিট্যান্স বাড়ার কারণ ছিল সরকার ঘোষিত ২% প্রণোদনা ও অনানুষ্ঠানিক চ্যানেলে মানুষের অর্থ পাঠাতে না পারা।

করোনাকালীন লকডাউনে প্রায় ৩-৬ মাস সব ধরনের ব্যবসা-বাণিজ্যই কমবেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এই ধাক্কা কাটিয়ে ওঠার মতো প্রয়োজনীয় অর্থের সংস্থান অনেক প্রতিষ্ঠানই করতে পারেনি। এ অবস্থায় দেশের অর্থনীতির চাকা সচল রাখতে এবং কভিডের সংকট মোকাবিলায় সরকার বাংলাদেশ ব্যাংকের মাধ্যমে প্রণোদনা প্যাকেজের আওতায় বিভিন্ন টার্গেট গ্রুপকে সহায়তা করে যাচ্ছে। এই সহায়তার পরিমাণ জিডিপির প্রায় ৪%। এ সহায়তার একটা উল্লেখযোগ্য অংশ যাচ্ছে ক্ষুদ্র ও মাঝারি (সিএমএসএমই) শিল্প খাতে, যা আমাদের মতো বিকাশমান ও উন্নয়নশীল অর্থনীতির চালিকাশক্তি। বিষয়টির গুরুত্ব অনুধাবন করে এ খাতে সম্প্রতি সরকার উন্নয়ন সংস্থাগুলোর মাধ্যমে অতিরিক্ত ২৭০০ কোটি প্রণোদনা ঘোষণা করে। বাংলাদেশ ব্যাংকের তত্ত্বাবধানে বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো অর্থনীতির এই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখে চলেছে। ব্যাংকগুলোর সম্পদ ও ব্যালান্সশিট অনুযায়ী প্রণোদনার অর্থ বিতরণের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়ে গেছে। ক্ষেত্রবিশেষে বাংলাদেশ ব্যাংক এসব ঋণের ৫০% থেকে ১০০% পর্যন্ত পুনঃঅর্থায়নও করছে। এখানে উল্লেখ্য, রপ্তানিমুখী ও বড় বড় শিল্পপ্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রে এই প্রণোদনা প্যাকেজের অর্থ দ্রুত ছাড় করা গেলেও ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প প্রতিষ্ঠানগুলো এই প্রণোদনার অর্থ পেতে নানা সমস্যার সম্মুখীন হচ্ছে। সেই বিষয়গুলোতে সরকার বা বাংলাদেশ ব্যাংকের বিশেষ ভূমিকা পালনের সুযোগ আছে। যেমন প্রাথমিকভাবে ব্যাংকগুলোর মাধ্যমে ক্ষুদ্র ও মাঝারি খাতে ২০ হাজার কোটি টাকার যে প্রণোদনা ঘোষণা করা হয় তার মধ্যে বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোকে যে পরিমাণ ঋণের ছাড়পত্র দিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক, তা মোট বরাদ্দকৃত অর্থের ৪৯.৭৩%। একইভাবে ক্ষুদ্র ও মাঝারি খাতের শিল্পের ৬০ ভাগ ট্রেডিং ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত। বাকি ৪০ ভাগ সেবা ও উৎপাদন খাত সংশ্লিষ্ট। এই খাতের সবাই প্রণোদনার জন্য যোগ্য বিবেচিত হলেও ট্রেডিং খাতে যে সব কোম্পানির বার্ষিক বিক্রি ২০ কোটির কম শুধু তারাই প্রণোদনার জন্য যোগ্য বলে বিবেচিত হচ্ছে, যাদের সংখ্যা মাত্র ২০-২৫%। ফলে দেখা যাচ্ছে ক্ষুদ্র ও মাঝারি খাতের ৩৫-৪০% ব্যবসা এই প্রণোদনা প্যাকেজের বাইরে থেকে যাচ্ছে। অন্যদিকে বাংলাদেশ ব্যাংক ক্ষুদ্র ও মাঝারি খাতের ট্রেডিং ব্যবসায়ীদের জন্য প্রণোদনা প্যাকেজের সর্বোচ্চ বরাদ্দ দিয়েছিল ২০%, যা এখন ৩০% করা হয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্দেশনা ছিল একজন গ্রাহককে একবারই এই ঋণ প্রদান করা যাবে। সম্প্রতি বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে এ রকম মৌখিক নির্দেশনা আসে যে, আগে ঋণগ্রহণকারী গ্রাহকদের অতিরিক্ত ঋণ দেওয়া যাবে, তবে ঋণের সময়সীমা ইতিপূর্বে প্রদত্ত ঋণের সময়সীমার মধ্যে থাকতে হবে। ফলে যে গ্রাহক ৪ মাস আগে ১ বছরের জন্য ঋণ নিয়েছে এখন সেই গ্রাহক অতিরিক্ত ঋণ নিলে সেই অর্থ তাকে ৮ মাসে পরিশোধ করতে হবে। করোনাকালীন ক্ষুদ্র ও মাঝারি খাতের ব্যবসায়ীরা স্বল্পমেয়াদি ঋণের পরিবর্তে দীর্ঘমেয়াদি ঋণ পেতে আগ্রহী, যাতে ঋণের কিস্তি কম থাকে। ব্যাংকগুলোও এই খাতে স্বল্পমেয়াদি ঋণ দিতে অনাগ্রহী কারণ সেক্ষেত্রে এসব ঋণ খারাপ হওয়ার ঝুঁকি বেশি। আর ঋণের মান খারাপ হলে তার দায়ভার সংশ্লিষ্ট ব্যাংকের। ফলে ক্ষুদ্র ও মাঝারি খাতে প্রণোদনা প্যাকেজের আওতায় ঋণ প্রদান নিম্নগতিতে এগোচ্ছে। ফলে বাংলাদেশ ব্যাংকের কার্যকর পদক্ষেপ জরুরি হয়ে পড়েছে।

তবে কভিড-১৯ মোকাবিলার জন্য আমাদের দীর্ঘ ও স্বল্প, উভয় মেয়াদি পরিকল্পনার প্রয়োজন। প্রণোদনা প্যাকেজ স্বল্পমেয়াদি সমস্যার সমাধান করবে। দীর্ঘমেয়াদি সমস্যা সমাধানে যদি বৈদেশিক ঋণের প্রয়োজন পড়ে, আমাদের জিডিপির তুলনায় বৈদেশিক ঋণ কম হওয়ায় আমরা সেই সুযোগও নিতে পারি।

২০২১ সালে ব্যাংকগুলোর জন্য দ্বিতীয় গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জ হলো ঋণের শ্রেণিমান ধরে রাখা। এটা শুধু যে বাংলাদেশে তা নয়, এটা এখন বৈশ্বিক বিষয় হয়ে উঠেছে। কভিড-১৯ মোকাবিলায় আর্থিক প্রণোদনার পাশাপাশি বাস্তবতার নিরিখে ঋণের নিম্নমান কিছু সময়ের জন্য স্থগিত রাখাও অর্থনীতির জন্য ইতিবাচক বার্তা দেয় এবং ব্যবসায়ীরাও তাতে সব গুছিয়ে নিতে কিছুটা সময় পেয়েছে। এক পরিসংখ্যান বলছে যে, বাংলাদেশের বড় বড় ঋণগ্রহীতাদের ৪০-৪৫% এই সময়ে ব্যাংকের অর্থ পরিশোধ না করে কেন্দ্রীয় ব্যাংক ঘোষিত ‘ডেফার্ড পেমেন্টের’ সুযোগ নিয়েছে। মাঝারি খাতের ব্যবসায়ীরা এই সুযোগ নিয়েছে ২০-২৫%, আর মাত্র ৫% খুচরা গ্রাহক এই সুযোগ গ্রহণ করেছে। সেপ্টেম্বর ২০২০ অনুযায়ী দেশে খেলাপি ঋণের পরিমাণ ৯৪,৪৪০ কোটি টাকা। অর্থনীতিবিদ ও ব্যাংক বিশেষজ্ঞরা আশঙ্কা প্রকাশ করছেন যে, বাংলাদেশ ব্যাংকের বেঁধে দেওয়া সময়ের পর এই ২০২১ সালে অতিরিক্ত ৬০,০০০ কোটি টাকার ঋণ নতুন করে খেলাপি হতে পারে। ফলে ২০২১ সালে ব্যাংকগুলোর জন্য ঋণের শ্রেণিমান ধরে রাখা বিরাট এক চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখা দেবে। ২০২১ সালে তাই ঋণ আদায় ব্যাংকগুলোর সর্বোচ্চ মনোযোগ পাবে।

২০২১ সালের তৃতীয় গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জ হবে ব্যাংক ব্যবসায়ের মুনাফার হার ধরে রাখা। ব্যাংকগুলোর জন্য ঋণের সর্বোচ্চ সুদের হার বেঁধে দেওয়া হলেও আমানতের সুদের হার বেঁধে দেওয়া হয়নি। শুরুতে এক ব্যাংক থেকে উচ্চসুদে অন্য ব্যাংকে আমানত নেওয়ার প্রবণতা থাকলেও এখন সুদের হারে একটা শৃঙ্খলা ফিরে এসেছে। সব ব্যাংকই বড় ও ভালো করপোরেটকে ঋণ দিতে চায়। দেশের বড় বড় করপোরেটগুলোর যে পরিমাণ ঋণের প্রয়োজন ব্যাংকগুলো মিলে তার কয়েকগুণ বেশি ঋণের অনুমোদন দিয়ে রেখেছে। তাই এরা সহজে খেলাপিও হয় না, সংকটে পড়লে এক ব্যাংক থেকে ঋণ নিয়ে আরেক ব্যাংকের ঋণ পরিশোধ করে। এই সব বড় বড় করপোরেট প্রতিষ্ঠানের দরকষাকষির সুযোগ থাকে বিধায় কোনো কোনো ব্যাংক তাদের ৬.৩০ থেকে ৭% রেটে ঋণ দিচ্ছে। প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে অন্য ব্যাংকগুলোও ঋণের সুদ হার কমাতে বাধ্য হচ্ছে। অধিকাংশ ব্যাংকের সিংহভাগ ঋণই এসব বড় বড় করপোরেটকে দেওয়া। ফলে ব্যাংকগুলোর সুদ আয় ২০২১ সালে অনেক কমে যাবে।

এদিকে ব্যাংকিং খাতে তারল্য নিশ্চিত করতে বাংলাদেশ ব্যাংক ব্যাংকগুলোর সিআরআর বা নগদ সংরক্ষণের হার ৫.৫% থেকে কমিয়ে ৪% করেছে, ফলে ব্যাংকিং খাতে অতিরিক্ত প্রায় ১৮০০ কোটি টাকার তারল্য নিশ্চিত হয়েছে, যার সুফল আমরা ইতিমধ্যেই দেখতে পাচ্ছি। এর পাশাপাশি রেপো সুদ হার ৬% থেকে নেমে ৪.৭৫% হয়ে তারল্য প্রবাহকে আরও সুসংহত করেছে। এই মুহূর্তে ব্যাংকগুলোর অতিরিক্ত তারল্য ১ লাখ ৯৫ হাজার কোটি টাকার ওপরে। কলমানি থেকে অল্প সুদে টাকা পাওয়া যাচ্ছে। ব্যাংকগুলো মেয়াদি আমানতের ওপর সুদের হার কমাচ্ছে। মুদ্রাস্ফীতির হার এখন ৬.৪৪% (পয়েন্ট টু পয়েন্ট ভিত্তিক)। ফলে আমানতকারীদের প্রকৃত আয় নেগেটিভ, যার কারণে আমানতকারীরাও বিকল্প খুঁজছে। ফলে পুঁজিবাজার, সঞ্চয়পত্র, ব্যাংকের বাইরে অন্য আর্থিক প্রতিষ্ঠান বা রিয়েল এস্টেটে মানুষ অর্থ লগ্নি করছে। এসব কারণে ২০২১ সালে আমানতকারীদের অর্থ ব্যাংকিং চ্যানেলে ধরে রাখাও একটা চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখা দিতে পারে। ব্যাংকগুলো শুধু যে সুদ আয় কম করবে তাই না, কোনো কোনো ক্ষেত্রে বাংলাদেশ ব্যাংক ফি বা অন্যান্য চার্জ আরোপের ক্ষেত্রেও বিধিনিষেধ দিয়েছে। ফলে ব্যাংকের শক্তি ও সামর্থ্য ঝুঁকির মধ্যে পড়তে পারে। একদিকে খেলাপি ঋণের ঝুঁকি অন্যদিকে ব্যাংকগুলোর আয় কমে যাওয়ার আশঙ্কা। ২০২১ সালে অনেক ব্যাংক ক্ষতির মুখে পড়বে এবং ক্যাপিটাল হারানোর ঝুঁকিতে থাকবে বলে আমি মনে করি। এক্ষেত্রে ব্যাংকগুলোর সঙ্গে আলোচনা সাপেক্ষে বাংলাদেশ ব্যাংক ও সরকারের সমন্বিত পরিকল্পনা দরকার, অন্যথায় ব্যাংকগুলো ঝুঁকির মধ্যে পড়তে পারে।আরেকটি বড় চ্যালেঞ্জ হচ্ছে পুরো আর্থিক খাতের স্বাস্থ্য এবং এই খাতে সুশাসন নিশ্চিত করা। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের পক্ষ থেকে একের পর এক নির্দেশনা আসছে। ব্যাংকাররা এমনকি বুঝতে পারছেন না এর পরে কী আসতে যাচ্ছে। অতিরিক্ত রেগুলেশনও আর্থিক খাতের ঝুঁকি বাড়াতে পারে। সেটা মাথায় রেখে ব্যাংকগুলোতে সুশাসন প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নেওয়াটা জরুরি হয়ে পড়েছে।

কোভিড-১৯ ব্যাংকগুলোর সামনে এ বাস্তবতা তুলে ধরেছে যে, আগে ব্যাংকগুলো যেভাবে কাজ করত সেই গতানুগতিক ধারায় চললে ২০২১ সালের চ্যালেঞ্জ তারা মোকাবিলা করতে পারবে না। ব্যাংকের আয় ধরে রাখতে হলে কস্ট অব ফান্ড কমাতেই হবে। ব্যাংকগুলোর পরিচালনা ব্যয় কমিয়ে এবং নন-ফান্ডেড আয় বাড়িয়ে মোট আয় ধরে রাখতে হবে। তেমনিভাবে ঋণ আদায়ে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিতে হবে, আর একইসঙ্গে ব্যাংকগুলোকে ডিজিটালি এগোতে হবে।

কারণ কভিড-১৯ একদিকে আমাদের আর্থ-সামাজিক অবস্থানের ওপর যেমন আঘাত হেনেছে, আমাদের প্রিয়জনদের কেড়ে নিয়েছে, অন্যদিকে এটা আবার আমাদের রেজিলেন্স বা সহনশীলতার একটা এসিড টেস্টও বটে। কভিড আমাদের শিখিয়েছে কীভাবে হোম অফিস করেও উৎপাদনশীলতা বজায় রাখা যায়, কীভাবে জুম বা অন্যান্য অ্যাপের মাধ্যমে কাজ করা যায়। ব্যাংকগুলো ডিজিটাল চ্যানেলের মাধ্যমে গ্রাহকসেবা বৃদ্ধি করেছে। ঘরে বসেই ব্যাংক হিসাব খোলা থেকে শুরু করে জরুরি লেনদেন, কেনাকাটা, এমনকি লোন প্রদানের মতো গুরুত্বপূর্ণ গ্রাহক সেবা নিয়ে এখন ব্যাংকগুলো হাজির হয়েছে। সিটি ব্যাংকের ‘এখনই অ্যাকাউন্ট’ অ্যাপ ঘরে বসেই আপনাকে পাঁচ মিনিটে অ্যাকাউন্ট খোলার সুযোগ করে দিয়েছে। মোবাইল অ্যাপ ‘সিটি টাচ’ থেকে ঘরে বসেই জরুরি লেনদেন করা যাচ্ছে, এমনকি ঋণও পাওয়া যাচ্ছে। বিকাশের সহায়তায় সিটি ব্যাংক পাইলটভিত্তিক ‘ন্যানো লোন’ চালু করেছে, যা মুহূর্তের মধ্যে আপনার ঋণ অনুমোদন এবং ঋণ ছাড় করছে। ই-কমার্স এখন যে কোনো সময়ের তুলনায় জনপ্রিয় এবং ই-কমার্সে লেনদেন ব্যাপক বেড়েছে।

বাংলাদেশের পুঁজিবাজারও ঘুরে দাঁড়িয়েছে। ব্যাংকের তারল্য বৃদ্ধি ও আমানতের সুদ হার কমে যাওয়া এবং সরকারের নানামুখী উদ্যোগের ফলে মানুষ পুঁজিবাজারের দিকে ঝুঁকছে। ব্যাংকগুলোও পুঁজিবাজারে প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারী হিসেবে এগিয়ে এসেছে, যা সামগ্রিকভাবে পুঁজিবাজারের জন্য ইতিবাচক হয়ে উঠেছে। এখানে একটা বিষয় উল্লেখ করা যেতে পারে যে, আইএমএফ তার সর্বশেষ বিশ্ব অর্থনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি রিপোর্টে ২০৩০ সাল নাগাদ বাংলাদেশের মাথাপিছু জিডিপি প্রতিবেশী ভারতের চেয়ে বেশি হবে বলে আশাবাদ ব্যক্ত করেছে। করোনাকালীন বাংলাদেশের অর্থনীতির ওপর এটা নিঃসন্দেহে আস্থার একটা বড় নমুনা। সরকার ও বাংলাদেশ ব্যাংকের তত্ত্বাবধানে বাংলাদেশের ব্যাংকগুলো সেই লক্ষ্যেই কাজ করে যাচ্ছে।

আমি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি করোনা ও অর্থনৈতিক সংকট উত্তরণে ব্যাংকই বড় ভরসা। ২০২১ সালের চ্যালেঞ্জগুলো মোকাবিলার পাশাপাশি আমাদের সামনে যে সমস্ত সুযোগ এসেছে সেগুলোকে পরিপূর্ণভাবে কাজে লাগাতে পারলেই বাংলাদেশের ব্যাংকিং সেক্টর দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নে এবার তার ঐতিহাসিক ভূমিকাটা রাখতে পারবে।