করোনায় হোম অফিস|273350|Desh Rupantor
logo
আপডেট : ২৮ জানুয়ারি, ২০২১ ০০:০০
করোনায় হোম অফিস
সৈয়দ আখতারুজ্জামান

করোনায় হোম অফিস

কভিড-১৯ আমাদের সব ধারণা পাল্টে দিয়েছে। ইতিবাচক এবং নেতিবাচক দুই দিক থেকেই। এর বিস্তৃতি এতই ব্যাপক যে সুই থেকে যুদ্ধ আর উড়োজাহাজ থেকে ঢেঁকিছাঁটা চাল কিছুই বাদ যায় না। আমরা বিষয়বস্তু নির্ধারণ না করলে আলোচনা অশেষ হয়ে দাঁড়ায়। তাই আজ দৃষ্টি নিক্ষেপ করব কভিড-১৯ এর ফলে আমাদের পেশাগত জীবন যাত্রায় এবং বাণিজ্যিক প্রেক্ষাপটে কী কী প্রধান পরিবর্তন এসেছে। এই বৈশ্বিক প্যানডেমিকের ফলে পুরো বিশ্বের এবং মানব সভ্যতার যে অপূরণীয় ক্ষতি হয়েছে তাতে কোনো সন্দেহ নেই কিন্তু কোনো কোনো ক্ষেত্রে অনেক গুরুত্বপূর্ণ ইতিবাচক পরিবর্তনও এসেছে। দুরবস্থার আঁস্তাকুড়কে পাশ কাটিয়ে আজ মূলত ইতিবাচক দিকগুলোর প্রতিই বেশি মনোযোগী হব।

মূল কারণ কভিড-১৯ এর ফলে মানুষের যাতায়াত ব্যবস্থা সীমিত হয়ে পড়া। যোগাযোগ মাধ্যম স্থবির হয়ে পড়া। আর এর সঙ্গে মানুষের শঙ্কা, উৎকণ্ঠা, স্বাস্থ্যগত নিরাপত্তা এবং যারা আক্রান্ত হয়েছেন তাদের জীবনের বিপদ ও বিপর্যয় এই পরিস্থিতি তৈরিতে প্রধান ভূমিকা পালন করেছে। লকডাউনের ফলে তাই ক্রেতা এবং বিক্রেতা উভয়েই এই সীমাবদ্ধতার শিকার হয়েছেন। আর তার ফলে অনলাইন বিজনেসে যুগান্তকারী পরিবর্তন এসেছে। অনলাইনে হাজার হাজার বিক্রয় প্লাটফর্ম তৈরি হয়েছে। যে প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে শাড়ি চুড়ি থেকে শুরু করে খাবার-দাবার, ইলেকট্রনিক্স, পোশাক-পরিচ্ছদ, দেশি-বিদেশি ইত্যাকার পণ্যসামগ্রী বেচাকেনা হয়েছে।

অনলাইন ব্যবসায়ীদের মোটাদাগে চারটি ভাগে ভাগ করা যায়। এবং আমরা দেখে নেব কীভাবে তারা এই পরিবর্তনের সঙ্গে খাপ খাওয়াতে গিয়ে উপকৃত হয়েছেন।

প্রথমত, যারা ব্যবসায়ী হিসেবে চলমান ছিলেন কিন্তু অফিস বা শোরুম বা দোকান বন্ধ রাখতে হয়েছে। তারা তাদের ব্যবসার ধরন পরিবর্তন না করে একই ব্যবসাকে অনলাইন মাধ্যমে প্রসারিত করেছেন। ফলে তার পণ্যে কোনোরকম পরিবর্তন হয়নি, শুধু ক্রেতার সঙ্গে যোগাযোগের এবং বিক্রয়ের পদ্ধতি পাল্টে গেছে। উদাহরণ স্বরূপ কাপড় চোপড়ের শোরুমের কথা বলা যেতে পারে। এই দোকানগুলো এখন অনলাইনেও ভালো বিক্রি করছে। যা আগে এতটা সচল ছিল না।

এবার যখন প্যানডেমিক থেকে বিশ্ব মুক্তি পাবে, সব আবার স্বাভাবিক হয়ে যাবে তখন এই ব্যবসায়ীদের অফিস, শোরুম, দোকান খুলে যাবে। তখন এই অফলাইন ব্যবসার পাশাপাশি অনলাইন মাধ্যমটি আগের চেয়ে অনেক বেশি সচল ও সচ্ছল থাকবে। যা কভিড-১৯ এর অবদান বলে স্বীকার করতেই হবে।

দ্বিতীয়ত, যাদের ব্যবসা ছিল এক খাতে কিন্তু প্যানডেমিকের কারণে ব্যবসার ধরণ পরিবর্তন করে নতুন ব্যবসা শুরু করতে হয়েছে। উদারহণ স্বরূপ, পর্যটন খাত। এই খাত পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যাওয়ায় ব্যাবসায়ীরা অন্য খাতে নতুন ব্যবসা শুরু করেছেন। কেউ খাদ্যপণ্য, কেউ কৃষিপণ্য, কেউ অন্যান্য নতুন খাতে ব্যবসা করার দিকে মনোনিবেশ করেছেন।

এবার যখন পরিস্থিতি স্বাভাবিক হয়ে যাবে তখন আবার পর্যটন ব্যবসা চালু হবে, পাশাপাশি আরেকটি নতুন ব্যবসা প্রতিষ্ঠানও তার বিকল্প আয়ের পথ হিসেবে ভরসা দিতে থাকবে। এই দুরবস্থায় অনেকেই বুঝতে পেরেছেন, বিকল্প আয়ের পথ থাকা কতটা জরুরি। ফলে এটাকে কভিডের সুফল না ভেবে উপায় কি!

তৃতীয়ত, এক ধরনের অনলাইন ব্যবসায়ী আছেন যারা আগে ব্যবসায়ীই ছিলেন না, সম্পূর্ণ নতুনভাবে এই ব্যবসায় এসেছেন। হয়তো চাকরিজীবী ছিলেন বা পেশাজীবী ছিলেন তারা পারিপার্শ্বিক পরিস্থিতি বিচার করে এই চলমান ধারাকে অনুসরণ করে নিজেও একটি নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ বেছে নিয়েছেন এবং অনলাইনে আয় রোজগার শুরু করেছেন। উদারহণ স্বরূপ, নতুন সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান এবং ব্যক্তি উদ্যোগে শত শত খাদ্যপণ্য বিক্রেতা যারা এর আগে বেকার ছিলেন যখন দেখলেন অনেকেই করছে এবং ভালো অর্ডারও পাচ্ছে তখন নিজেও এগিয়ে এলেন এবং এখন ভালো করছেন। কভিড এই ব্যবসায়ীদের জন্য এক বিরাট আশীর্বাদ।

এছাড়া চতুর্থ আরেকটি অনলাইন ব্যবসায়ী দলকে খুঁজে পাওয়া যায় যারা আগে থেকেই অনলাইনে বিজনেস করতেন, এখনো করছেন তবে কভিড-১৯ এর প্রভাবমুক্ত নন। কারও ব্যবসা পথে বসে গেছে, কারও ব্যবসা ফুলেফেঁপে উঠেছে। আর যাদের কোনো রকম পরিবর্তন হয়নি তাদের সংখ্যা খুবই কম। এই দলটির মূলত ব্যবসার সংকোচন অথবা প্রসারণ ব্যাপকভাবে হয়েছে।

এই চারটি ব্যবসা খাতের ওপর ভিত্তি করে অনেকগুলো সেবা খাত তৈরি হয়েছে। পণ্য সরবরাহ ব্যবস্থা একটি ব্যাপকভাবে প্রসারিত ব্যবসা খাত। লকডাউনের ফলে যখন মানুষ ঘর থেকে বের হতে পারছিল না তখন ব্যবসায়ীরা যে রকম পণ্য সংগ্রহ করতে পারছিল না তেমনি সরবরাহ করতে পারছিল না। ফলে দুই দিকেই ব্যাপক চাহিদা তৈরি হয়। ফলে কাঁচামালের জোগান দেওয়ার জন্য যে রকম ডেলিভারি সার্ভিসের গুরুত্ব হয়ে পড়ে তেমনি পণ্য তৈরি হয়ে যাওয়ার পর ক্রেতার কাছে পৌঁছে দেওয়ার জন্য সরবরাহ ব্যবস্থার কোনো বিকল্প ছিল না। এর ফলে দেশের প্রচুর বেকার যুবক সরবরাহকর্মী হিসেবে আয় রোজগারের সুযোগ খুঁজে পান। অনেক প্রতিষ্ঠান তৈরি হয়েছে যারা সরবরাহ ব্যবস্থা দিয়ে অনলাইনভিত্তিক ব্যবসা প্রতিষ্ঠানগুলোর পাশে দাঁড়াতে সক্ষম হয়েছেন। উপকৃত হয়েছেন উভয়েই।

কভিড-১৯ এর কারণে একটি নতুন ব্যবসা শৃঙ্খল তৈরি হয়েছে যারা একে অপরের ওপর নির্ভরশীল। এই নির্ভরশীলতা সবার অগোচরে একটি বিপ্লব ঘটিয়ে দিয়েছে। এই ব্যবসা শৃঙ্খল মূলত শতভাগই দেশের অভ্যন্তরীণ। এর ফলে আগে যেমন শুধু রাজধানীকেন্দ্রিক ব্যবসা প্রসার লাভ করত, সেটা বিকেন্দ্রীকরণ হয়ে ছড়িয়ে পড়েছে। এই পরিস্থিতিতে দেশের প্রান্তিক ও ক্ষুদ্র-মাঝারি ব্যবসায়ীরাও মনোযোগের কেন্দ্রবিন্দুতে চলে এসেছেন। দেশের নানা অঞ্চলের ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরা তাদের প্রস্তুতকৃত পণ্য বিভিন্ন জেলা শহরের বড় বড় দোকানে, মেগাসিটির বড় বড় শোরুমে, নতুন-পুরনো মাঝারি-বড় বিভিন্ন ধরনের প্রতিষ্ঠানের কাছে তাদের পণ্য ও সেবা বিক্রি করতে পেরেছেন। এর ফলে দেশের অর্থনৈতিক অবকাঠামো অনেক মজবুত হয়েছে। আমাদের দেশের অর্থনীতির চাকা ব্যাপকভাবে ঘুরে না দাঁড়ালেও যতটা পিছিয়ে পড়ার কথা ছিল ততটা পিছিয়ে পড়েনি। বিভিন্ন মানুষ কিছু না কিছু করার পথ খুঁজে পেয়েছে। কেউ কেউ রাতারাতি অনেক ভালো মুনাফা অর্জন করে প্রতিষ্ঠানের মজবুত ভিত্তি স্থাপন করতে পেরেছেন। দেশের এই নিভু নিভু প্রতিষ্ঠানগুলোর ঘুরে দাঁড়ানো এবং দেশের অর্থনীতিতে অবদান রাখতে পারা নিঃসন্দেহে কভিড-১৯ এর অবদান।

এর মধ্যে ব্যক্তি প্রাতিষ্ঠানিক ও স্বাস্থ্যগত নিরাপত্তাজনিত পণ্যসামগ্রী ছাড়া বস্তুগত পণ্যের পরিবর্তে সেবা খাত বেশি সম্প্রসারিত হয়েছে। খাঁটি খাদ্যপণ্য, সুস্বাস্থ্যের জন্য ব্যবহৃত সরঞ্জামাদি, স্বাস্থ্য ও চিকিৎসা খাত ইত্যাদি আরও সম্প্রসারিত হয়েছে। কভিড-১৯ আমাদের চোখ খুলে দিয়েছে। সবার চোখ না খুললেও অনেকের জীবনে পরিবর্তন এনে দিয়েছে, যারা আগে মাস্ক পরতেন না, এখন পড়ছেন। যারা এখন স্বাস্থ্য-সচেতন হয়েছেন। বিশুদ্ধ খাবার খুঁজে খুঁজে সপরিবারে খাওয়ার চেষ্টা করছেন। রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ানোর জন্য নিয়মিত শরীরচর্চা করছেন। ম্যারাথন দৌড়াচ্ছেন। সাঁতার কাটছেন। ফলে এই স্বাস্থ্যসচেতন জনগোষ্ঠীর সঙ্গে যত ব্যবসা খাত জড়িত তারাও নতুনভাবে আয়ের পথ খুঁজে পেয়েছেন। উদাহরণ স্বরূপ, দেশে এখন ব্যাপকভাবে পনির, যবের ছাতু, ঢেঁকিছাঁটা চাল, চালের রুটি, ঘানিভাঙা সরিষার তেল, লাল আটা, খাঁটি গুড়, গাওয়া ঘি ইত্যাদি উল্লেখযোগ্য হারে বিক্রি হচ্ছে। এসবই কভিড-১৯ এর অবদান।

এমনি আরও হাজারো ক্ষেত্র তৈরি হয়েছে এবং হচ্ছে যা কভিড চলে গেলেও বহমান থাকবে। মানুষ অন্ধকারের মধ্যেও উজ্জ্বল শিখার মতো একটা নতুন পথ খুঁজে পেল যা জীবনজুড়ে শুধু আলোই দিয়ে যাবে।