বিশ্ব দেখেছে স্মরণকালের সবচেয়ে মন্দ ক্রিসমাস সেল|273360|Desh Rupantor
logo
আপডেট : ২৮ জানুয়ারি, ২০২১ ০০:০০
বিশ্ব দেখেছে স্মরণকালের সবচেয়ে মন্দ ক্রিসমাস সেল
আরিফুর রহমান তুহিন

বিশ্ব দেখেছে স্মরণকালের সবচেয়ে মন্দ ক্রিসমাস সেল

করোনার শুরুর দিকে সম্মুখসারির যোদ্ধা স্বাস্থ্যকর্মী, আইনপ্রয়োগকারী সংস্থাগুলোর সদস্যদের জন্য কোনো সুরক্ষাসামগ্রী ছিল না। আপনারা দেখেছেন, বিজিএমইএ সর্বপ্রথম স্বল্পতম সময়ে পর্যাপ্ত পরিমাণে মানসম্মত পিপিই ও মাস্ক বানিয়ে বিনামূল্যে উল্লিখিত যোদ্ধাদের মধ্যে বিতরণ করেছে। সুতরাং অন্য দেশগুলোর তুলনায় বিজিএমইএ এক্ষেত্রে ঐতিহাসিক ভূমিকা পালন করেছে বলেই বিশ্বাস করি। সুরক্ষাসামগ্রী বিতরণের পরিপ্রেক্ষিতে বিভিন্ন আইনপ্রয়োগকারী সংস্থা, স্বাস্থ্য সংস্থা এবং হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ আনুষ্ঠানিকভাবে আমাদের কাছে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেছে।

পোশাক কারখানা মালিকদের সংগঠন বাংলাদেশ তৈরি পোশাক প্রস্তুত ও রপ্তানিকারক সমিতির (বিজিএমইএ) প্রথম নারী সভাপতি ড. রুবানা হক। ২০১৯ সালের ২০ এপ্রিল সংগঠনটির দায়িত্ব গ্রহণ করেন তিনি। ২০১৩ সালের রানা প্লাজা ধসের পর সবচেয়ে বড় দুর্যোগ মহামারী করোনা দেশে আঘাত হানলে বড় ধরনের ধাক্কা আসে পোশাক রপ্তানিতে। প্রায় ২৫ হাজার কোটি টাকার ক্রয়াদেশ স্থগিত/বাতিল হয়ে যায়। করোনাকালে পোশাক খাতের অবস্থা নিয়ে রুবানা হকের সাক্ষাৎকার নিয়েছেন দেশ রূপান্তরের প্রতিবেদক আরিফুর রহমান তুহিন

দেশ রূপান্তর : করোনাকালীন পরিস্থিতি কীভাবে মোকাবিলা করছেন?

রুবানা হক : আমরা কৃতজ্ঞ যে প্রধানমন্ত্রী করোনা মোকাবিলায় স্বল্পসুদে প্রণোদনা প্যাকেজ ঘোষণা করায় শিল্প-কারখানা করোনা পরিস্থিতিতে অস্তিত্ব ধরে রাখতে পেরেছে। করোনার শুরুতেই আমরা কারখানাগুলোর জন্য স্বাস্থ্যবিধি/প্রটোকল প্রণয়ন করেছি। কারখানাগুলো স্বাস্থ্যবিধি মেনে পরিচালিত হচ্ছে কি না, তা প্রতিনিয়ত পর্যবেক্ষণ করছি। শ্রমিক ভাই-বোনদের জন্য সাভারে পিসিআর ল্যাব, আইসোলেশন সেন্টার স্থাপন, চট্টগ্রামে মাঠপর্যায়ে হাসপাতালের ব্যবস্থা, মায়া ও কমন হেলথের সহযোগিতায় হটলাইনের মাধ্যমে শ্রমিক ভাই-বোনদের চিকিৎসা পরামর্শ প্রদান এবং কভিড-১৯ প্রতিরোধে কারখানাগুলোকে সহায়তার জন্য বিজিএমইএর পক্ষ থেকে ইন্সপেক্টরিও এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছি। আমরা শ্রমিকদের সাধারণ ও মানসিক স্বাস্থ্য উন্নয়ন নিয়েও কাজ করছি। ক্রেতাদের সঙ্গে যুক্ত হয়ে মাল্টি-স্টেকহোল্ডার অ্যাপ্রোচের ভিত্তিতে ক্রেতাদের ওপর ক্রমাগত চাপ সৃষ্টি করেছি, যার ফলে ক্রেতারা বাতিল/স্থগিত করা অর্ডারের প্রায় ৯০ শতাংশ পুনর্বহাল করেছেন। যদিও অর্ডার পুনর্বহালের শর্ত, পদ্ধতিগুলো ক্ষেত্রভেদে ভিন্নতা রয়েছে। যেমন : শিপমেন্ট এক বছর পর্যন্ত স্থগিত, ১৮০ দিন পর্যন্ত পাওনা স্থগিত, উচ্চহারে মূল্যছাড় ইত্যাদি।

দেশ রূপান্তর : এই শিল্পের বর্তমান অবস্থা কী?

রুবানা হক : কভিড-১৯-এর প্রথম সংকট থেকে আমরা কিছুটা উত্তরণ করতে পারলেও এখন দ্বিতীয় সংকটে পড়েছি। আগের বারের তুলনায় ক্রেতারা এখন সাপ্লাই চেইন ব্যবস্থাপনায় ভিন্ন আচরণ করছেন। আমরা দেখছি, ক্রেতারা ক্রয়াদেশ বাতিলের পরিবর্তে ক্রয়াদেশ কমিয়ে দেওয়ার দিকেই ঝুঁকছেন। শিল্পের জন্য শঙ্কার বিষয় হলো, বিশ্ববাজারে পণ্যের চাহিদা ও মূল্য ক্রমাগতভাবে কমছে। ডিসেম্বর মাসে পোশাক রপ্তানিতে ধারাবাহিক পতন অব্যাহত থেকে পতন হয়েছিল ৯ দশমিক ৬৪ শতাংশ, যার কারণে ২০২০ সালের বার্ষিক রপ্তানিতে ১৬ দশমিক ৯৪ শতাংশ দৃষ্টান্তহীন পতন ঘটেছে। ২০২০-এর জুনের পর থেকে ওভেন পোশাক রপ্তানিতে সবচেয়ে খারাপ পরিস্থিতি হয়েছে ডিসেম্বর মাসে। রপ্তানি প্রবৃদ্ধি হয়েছে ঋণাত্মক ১৮ দশমিক শূন্য ৭ শতাংশ। উল্লিখিত মাসে নিটওয়্যার রপ্তানি ঋণাত্মক শূন্য দশমিক ৪৫ শতাংশ প্রবৃদ্ধি নিয়ে তুলনামূলকভাবে স্থিতিশীল অবস্থানে রয়েছে। গত দুই বছরের রপ্তানির প্রবণতার দিকে তাকালে আমরা দেখি যে, ডিসেম্বর মাসের রপ্তানিতে (দুই বছরের) প্রবৃদ্ধির পরিবর্তন হয়েছে ঋণাত্মক ৮ দশমিক ৫৫ শতাংশ। এর অর্থ হলো, আমরা ২০২০ সালে যা রপ্তানি করেছি, তা ২০১৮ সালে যা রপ্তানি করেছিলাম তার তুলনায় ৮ দশমিক ৫৫ শতাংশ কম। সমগ্র বিশ্ব দেখেছে, ইউরোপ ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে লকডাউনের প্রভাব কী এবং খুচরা বিক্রি ও চাহিদার ওপর সেগুলো কী প্রভাব রেখেছে। বিশ্ব দেখেছে স্মরণকালের সবচেয়ে মন্দ ক্রিসমাস সেল। এসবের প্রভাবে ২০২০-এর সেপ্টেম্বরের পর থেকে পণ্যের মূল্য কমেছে প্রায় ৫ শতাংশ। করোনার দ্বিতীয় ঢেউয়ের কারণে অনিশ্চয়তা আর শঙ্কায় আমরা বিপর্যস্ত। যেহেতু ভ্যাকসিন প্রাপ্যতা এখনো নিশ্চিত হয়নি এবং এর প্রভাব বিশ্ব অর্থনীতিতে বিরাজ করছে, তাই আমাদের আশঙ্কা, রপ্তানির এই নিম্নমুখী প্রবণতা সম্ভবত চলতি বছরের এপ্রিল পর্যন্ত বজায় থাকবে।

দেশ রূপান্তর : করোনায় পোশাক খাতে কী পরিবর্তন এসেছে?

রুবানা হক : করোনার দ্বিতীয় ঢেউয়ের ধাক্কায় আমাদের প্রধান রপ্তানি বাজারগুলোর অবস্থা ভালো নয়। পশ্চিমা অনেক ক্রেতা দেউলিয়াত্ব বরণ করেছে। এবারের বড়দিনে স্মরণকালের মধ্যে সবচেয়ে খারাপ সেল হয়েছে। সবাই ভেবেছিলেন, বড়দিনে কিছুটা ক্ষতি পুষিয়ে নেবেন, তা হয়নি। বর্তমানে নিটে ৮০ থেকে ৯০ শতাংশ ক্রয়াদেশ আসছে। ওভেন পোশাকে ৬০ থেকে ৬৫ শতাংশের মতো ক্রয়াদেশ আসছে।

দেশ রূপান্তর : করোনায় যে ক্ষতি হয়েছে, তা আদৌ পূরণ করা সম্ভব কি না? বিশেষ করে যেসব কারখানা রুগ্ণ হয়ে পড়েছে, তাদের জন্য কী করা যেতে পারে এবং আপনারা কী উদ্যোগ নেবেন?

রুবানা হক : করোনা মহামারীতে যে লোকসান হয়েছে, তা পূরণে সরকারি নীতি-সহায়তা অত্যন্ত প্রয়োজন। উদ্যোক্তা, ক্রেতা, সরকার, শ্রমিক সবারই ভূমিকা রয়েছে। কভিড-১৯-এর ধাক্কায় সবচেয়ে সমস্যায় পড়েছে ছোট ও মাঝারি কারখানাগুলো, যেগুলো মোট পোশাক কারখানার মধ্যে কমবেশি ৭০ শতাংশ। এ কারখানাগুলোর জন্য ব্যাংক ও ক্রেতাদের এগিয়ে আসতে হবে। তারা যেন সহজশর্তে ঋণ পায়, তা নিশ্চিত করতে হবে। চলমান পরিস্থিতি পোশাকশিল্পের ঋণ জটিলতা নিষ্পত্তির জন্য উপযুক্ত নয় বলে আমরা মনে করি। দেউলিয়াত্ববরণকারী ক্রেতাদের (উদাহরণস্বরূপ, জেসি পেনি, সিয়ার্স, ডেবেনহ্যামন, লা হালো ও ক্যামাইউ) কাছে পণ্য সরবরাহকারী কারখানাগুলোর দায়গুলো এবং ক্রয়াদেশ বাতিলের ফলে সৃষ্ট দায়গুলোর বিষয়ে সহযোগিতা চেয়ে আমরা বাংলাদেশ ব্যাংক বরাবর চিঠি দিয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে অনুরোধ করেছি। আগামী ১০ বছরের জন্য ব্লক অ্যাকাউন্ট সৃষ্টি এবং একক এক্সপোজার সীমা অক্ষুন্ন রেখে সুদমুক্ত ব্লক অ্যাকাউন্টের দায় স্থানান্তরের অনুরোধ জানিয়েছি বাংলাদেশ ব্যাংককে। আমরা টেকসই শিল্প নিয়ে কথা বলি। এই টেকসই শিল্পের অর্থ অনেক ব্যাপক। টেকসই শিল্প গড়তে হলে গ্লোবাল সাপ্লাই চেইনে অপেক্ষাকৃত দুর্বলদের সুরক্ষা দিতে হবে যে কাজটিতে সরকার, ব্র্যান্ড/ক্রেতাদের এগিয়ে আসতে হবে।

দেশ রূপান্তর : বাজার চাঙা করতে হলে কী কী উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন বলে মনে করেন?

রুবানা হক : বাজার চাঙা করার জন্য আমাদের প্রচলিত বাজারের পাশাপাশি নতুন বাজারের অনুসন্ধান করতে হবে, যা দেশের বৃহৎ খাতকে বর্তমান সংকট মোকাবিলায় সহায়তা করবে। এ বিষয়ে আমরা বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে কাজ করছি। আমাদের বাজার ও পণ্য দুটোরই বহুমুখীকরণের উদ্যোগ নিতে হবে। আমরা রপ্তানি পণ্যে ঐতিহ্য উপস্থাপনের উদ্যোগ নিয়েছি।

দেশ রূপান্তর : করোনার ধাক্কা, চতুর্থ শিল্প বিপ্লব ও সামনে এলডিসি থেকে উত্তরণ সব মিলে কী পরিস্থিতি সৃষ্টি হতে পারে?

রুবানা হক : চতুর্থ শিল্প বিপ্লবের বড় প্রভাব পড়বে পোশাকশিল্পে। বর্তমান শিক্ষাব্যবস্থা ও দক্ষতা এই ধাক্কা সামলাতে পারবে না। এজন্য করণীয় নির্ধারণ করতে হবে।

দেশ রূপান্তর : বিশ্বের অন্য দেশের শিল্পগুলো করোনায় সামাজিক দায়বদ্ধতা থেকে জনগণের পাশে দাঁড়িয়েছে। পোশাক খাত করোনাকালে সামাজিক দায়বদ্ধতা থেকে কী করেছে?

রুবানা হক : করোনার শুরুর দিকে সম্মুখসারির যোদ্ধা। স্বাস্থ্যকর্মী, আইনপ্রয়োগকারী সংস্থাগুলোর সদস্যদের জন্য কোনো সুরক্ষাসামগ্রী ছিল না। আপনারা দেখেছেন, বিজিএমইএ সর্বপ্রথম স্বল্পতম সময়ে পর্যাপ্ত পরিমাণে মানসম্মত পিপিই ও মাস্ক বানিয়ে বিনামূল্যে উল্লিখিত যোদ্ধাদের মধ্যে বিতরণ করেছে। সুতরাং অন্য দেশগুলোর তুলনায় বিজিএমইএ এ ক্ষেত্রে ঐতিহাসিক ভূমিকা পালন করেছে বলেই বিশ্বাস করি। সুরক্ষাসামগ্রী বিতরণের পরিপ্রেক্ষিতে বিভিন্ন আইনপ্রয়োগকারী সংস্থা, স্বাস্থ্য সংস্থা এবং হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ আনুষ্ঠানিকভাবে আমাদের কাছে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেছে।

দেশ রূপান্তর : শিল্পের এই ভঙ্গুর পরিস্থিতি মোকাবিলায় বিজিএমইএ কোনো পরিকল্পনা গ্রহণ করেছে কি?

রুবানা হক : করোনার দ্বিতীয় ঢেউয়ের কারণে শিল্প গভীর অনিশ্চয়তায় হাবুডুবু খাচ্ছে। এমতাবস্থায়, আপৎকালীন সহায়তা হিসেবে বর্তমান প্রণোদনা প্যাকেজের ঋণের সুদ অন্ততপক্ষে ছয় মাসের জন্য স্থগিতকরণ অথবা প্রণোদনা পরিশোধের মেয়াদ অন্ততপক্ষে আরও অতিরিক্ত এক বছর (বর্তমানে ২৪ মাস) সম্প্রসারণ করার জন্য আমরা সরকারকে অনুরোধ করেছি। পোশাকশিল্পের প্রতিযোগী সক্ষমতা বাড়ানোর লক্ষ্যে আমরা বিজিএমইএর পক্ষ থেকে কারখানাগুলোর জন্য উৎপাদনশীলতা, উদ্ভাবনী সক্ষমতার বিকাশ এবং পেশাগত নিরাপত্তা ও স্বাস্থ্যবিষয়ক একটি কেন্দ্র স্থাপন করছি।