প্রথিতযশা শিক্ষক পন্ডিত ও বুদ্ধিজীবী|274204|Desh Rupantor
logo
আপডেট : ১ ফেব্রুয়ারি, ২০২১ ০০:০০
প্রথিতযশা শিক্ষক পন্ডিত ও বুদ্ধিজীবী
মোহসীনা লাইজু

প্রথিতযশা শিক্ষক পন্ডিত ও বুদ্ধিজীবী

‘আনিসুজ্জামান ছিলেন সমাজের চেতনার বাতিঘর। কারণ সমাজ, সংস্কৃতি ও রাজনীতিভাবনার ক্ষেত্রে তিনি ছিলেন অগ্রগামী।’ তার মৃত্যুর পর ইতিহাসবিদ অধ্যাপক ড. সৈয়দ আনোয়ার হোসেন এভাবেই তাকে মূল্যায়ন করেছিলেন।

করোনাভাইরাস ভয়াল থাবায় প্রখ্যাত শিক্ষক জাতীয় অধ্যাপক আনিসুজ্জামানকে আমাদের চিরবিদায় জানাতে হয়েছে। তিনি বহুমাত্রিক ব্যক্তিত্বের অধিকারী ছিলেন। প্রথিতযশা এই শিক্ষক জন্মগ্রহণ করেছিলেন ১৮ ফেব্রুয়ারি ১৯৩৭ সালে আর  প্রয়াত হলেন ১৪ মে ২০২০ সালে।

তিনি ছিলেন ঔপনিবেশিক ব্রিটিশ ও পাকিস্তানি আমলে বিকশিত প্রগতিশীল মুসলিম জনগোষ্ঠীর উজ্জ্বলতম মানুষ। ভাষা আন্দোলন (১৯৫২), ঊনসত্তরের গণ-অভ্যুত্থান (১৯৬৯) এবং ১৯৭১-এর মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করেছিলেন। পাকিস্তানি শাসকদের বিরোধিতা সত্ত্বেও ১৯৬১ সালে রবীন্দ্র জন্মশতবর্ষ অনুষ্ঠানে তিনি সক্রিয়ভাবে অংশ নেন। ১৯৬৭ সালে রবীন্দ্রসংগীত পাকিস্তানের জাতীয় ভাবাদর্শের সঙ্গে সংগতিপূর্ণ নয় বলে বেতার ও টেলিভিশন কর্র্তৃপক্ষকে রবীন্দ্রসংগীতের প্রচার বন্ধ করতে নির্দেশ দেয়। এর প্রতিবাদে বুদ্ধিজীবীদের নিয়ে বিবৃতিতে আনিসুজ্জামান স্বাক্ষর সংগ্রহ করেন এবং সেটা বিভিন্ন পত্রিকায় ছাপতে দেন। এক কথায় বলা যায় তিনি ছিলেন মধ্যবিত্ত বাঙালির সাংস্কৃতিক আন্দোলনের অগ্রগণ্য পথিকৃৎ।

দেশের প্রতিটি সংকটকালে তার বক্তব্য, মন্তব্য ও ভূমিকা দিকনির্দেশক হিসেবে কাজ করেছে। দেশ স্বাধীন হওয়ার পর ১৯৭২ সালে ড. কুদরত-এ-খুদাকে প্রধান করে গঠিত জাতীয় শিক্ষা কমিশনের সদস্য হিসেবে কাজ করা কিংবা বাংলাদেশের সংবিধানের বাংলা সংস্করণে তার অবদান গুরুত্বপূর্ণ।

তিনি ছিলেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার শিক্ষক। বঙ্গবন্ধুর ঘনিষ্ঠ কর্মসহচর ও কলমযোদ্ধা। ‘মুজিববর্ষ’ উদযাপন কমিটির অন্যতম পুরোধা। সংবাদপত্রের পাতায় বহু বিশেষণে ভূষিত হতেন। বিশ্ববিদ্যালয়ে বাংলা বিভাগের অধ্যাপক ছিলেন এবং পরে ইমেরিটাস অধ্যাপকও ছিলেন।

আনিসুজ্জামানের পায়জামা-পাঞ্জাবি তথা পোশাকের স্বাতন্ত্র্য ও ব্যক্তিত্ব সবার দৃষ্টি আকর্ষণ করেছিল। খুব শান্ত ও ধীরস্থিরভাবে কথা বলতেন। তিনি আপাদমস্তক অসাম্প্রদায়িক মানুষ ছিলেন। তার বাবার নাম এ টি এম মোয়াজ্জেম ও মায়ের নাম সৈয়দা খাতুন। পারিবারিক শিল্প-সাহিত্যের আবহাওয়ায় বেড়ে উঠেছেন। কলকাতার পার্ক সার্কাস হাইস্কুলে শিক্ষাজীবন শুরু করেন। দেশভাগের পর বাংলাদেশে চলে আসেন এবং খুলনা জেলা স্কুলে অষ্টম শ্রেণিতে ভর্তি হন। এক বছর পর ঢাকায় এসে প্রিয়নাথ হাইস্কুলে ভর্তি হন। ১৯৫১ সালে এ বিদ্যালয় থেকে মাধ্যমিক ও ১৯৫৩ সালে জগন্নাথ কলেজ থেকে উচ্চমাধ্যমিক পাশ করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে বাংলা বিভাগে ভর্তি হন। ১৯৫৬ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতক ও ১৯৫৭ সালে একই বিষয়ে প্রথম শ্রেণিতে প্রথম স্থান অধিকার করে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেন। ১৯৫৮ সালের ফেব্রুয়ারিতে বাংলা একাডেমির গবেষণা বৃত্তি লাভ করেন। একই বছর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ইংরেজ আমলের বাংলা সাহিত্যে বাঙালি মুসলমানের চিন্তাধারা ১৭৫৭-১৯১৮ বিষয়ে পিএইচডি শুরু করেন। ১৯৫৯ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগে অধ্যাপনায় যোগ দেন। ১৯৬৫ খ্রিস্টাব্দে আমেরিকার শিকাগো বিশ্ববিদ্যালয় থেকে উনিশ শতকের বাংলার সাংস্কৃতিক ইতিহাস : ইয়ংবেঙ্গল ও সমকাল বিষয়ে পোস্ট ডক্টরাল ডিগ্রি অর্জন করেন।

আনিসুজ্জামান ২২ বছর বয়সে বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপনার মাধ্যমে কর্মজীবন শুরু করেন। ১৯৬৯ সালে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে বাংলা বিভাগের রিডার হিসেবে যোগ দেন। স্বাধীনতাযুদ্ধ শুরু হলে তিনি ১৯৭১ সালের ৩১ মার্চ পর্যন্ত চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে অবস্থান করেন এবং পরে শরণার্থী শিক্ষকদের সংগঠন ‘বাংলাদেশ শিক্ষক সমিতি’র সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব কাঁধে তুলে নেন। একই সময় অস্থায়ী বাংলাদেশ সরকারের পরিকল্পনা কমিশনের সদস্য হিসেবে যোগ দেন। স্বাধীনতার পর ১৯৭৪-৭৫ সালে কমনওয়েলথ অ্যাকাডেমি স্টাফ ফেলো হিসেবে তিনি লন্ডন বিশ্ববিদ্যালয়ের স্কুল অব ওরিয়েন্টাল অ্যান্ড আফ্রিকান স্টাডিজে গবেষণা করেন।

১৯৮৫ সালে আনিসুজ্জামান ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে চলে আসেন। ২০০৩ সালে এখান থেকে অবসর গ্রহণ করেন। পরে সংখ্যাতিরিক্ত অধ্যাপক হিসেবে আবার যুক্ত হন। এ ছাড়া তিনি নজরুল ইনস্টিটিউট ও বাংলা একাডেমির সভাপতির দায়িত্ব পালন করেন। মৃত্যুর আগে তিনি শিল্পকলাবিষয়ক ত্রৈমাসিক পত্রিকা ‘যামিনী’ এবং বাংলা মাসিকপত্র ‘কালি ও কলম’-এর সম্পাদকমণ্ডলীর সভাপতির দায়িত্ব পালন করে গেছেন। আনিসুজ্জামান ২০টিরও বেশি গবেষণা গ্রন্থের রচয়িতা। অসংখ্য অনুবাদও করেছিলেন। তার প্রজ্ঞা ও পাণ্ডিত্য মানুষের জন্য নিবেদিত ছিল। এজন্যই আনিসুজ্জামান বাঙালি সমাজের কাছে চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবেন।