উদ্যম ও সাফল্যের যুগলবন্দি|274223|Desh Rupantor
logo
আপডেট : ১ ফেব্রুয়ারি, ২০২১ ০০:০০
উদ্যম ও সাফল্যের যুগলবন্দি
ওয়াহিদ সুজন

উদ্যম ও সাফল্যের যুগলবন্দি

১৯৬৬ সালে বাবা মুজিবুর রহমান প্রতিষ্ঠিত ডব্লিউ রহমান জুট মিলে শিক্ষানবিশ হিসেবে যোগ দেন লতিফুর রহমান। স্বাধীনতার পর পারিবারিক সেই পাটকলটি জাতীয়করণ করা হয়। নানা জটিলতায় পরিবারের প্রথম ব্যবসা চা রপ্তানিও বন্ধ। রাজধানীর মতিঝিলে শুধু একটি অফিস লতিফুর রহমানের। দমে যাওয়ার পাত্র নন তিনি। ভাড়ায় আসবাব ও ঘরের পাখা খুলে অফিসে লাগিয়ে পথচলা শুরু। অতিপরিচিত গল্পটি এমন। সেই পথচলাকে এখন সবাই ট্রান্সকম গ্রুপ নামেই চেনে। গত বছরের ১ জুলাই লতিফুর রহমান প্রয়াত হলেও দেশের শিল্প ইতিহাসে তার নাম স্থায়ীভাবে লেখা হয়ে গেছে আরও আগে।

পারিবারিক ব্যবসার ঐতিহ্য তত দিনে কয়েক দশকের। পেয়েছেন পরিবারিক সুনামের সহায়তাও। তা সত্ত্বেও লতিফুর রহমান সম্পর্কে বলা হয়, শূন্য থেকে শুরু করে অনেক চড়াই-উতরাই পেরিয়ে নিজের মেধা, স্বকীয়তা, নৈতিকতা ও পরিশ্রমের স্বাক্ষর রেখেছেন। যেখানে হাত দিয়েছেন সোনা ফলেছে। তার ব্যবসায়িক সাম্রাজ্যে চা থেকে শুরু করে ওষুধ, খাদ্যদ্রব্য, ইলেকট্রনিক্স পণ্য, ভোক্তাপণ্য, গণমাধ্যম কী ছিল না! এ যেন উদ্যম ও সাফল্যের যুগলবন্দি কেউ কাউকে ছাড়েনি।

ট্রান্সকম গ্রুপের ভিত গড়ে উঠেছিল সেই ১৮৮৫ সালে, লতিফুর রহমানের দাদা খান বাহাদুর ওয়ালিউর রহমানের হাত ধরে। ওয়ালিউর রহমানের জন্ম কুমিল্লা চৌদ্দগ্রামের চিওড়া গ্রামে। জীবনের শেষ কয়েক বছর কাটান লতিফুর রহমান, মৃত্যুও হয় সেখানে। ওয়ালিউর রহমান পরবর্তী সময়ে চলে যান আসামের জলপাইগুড়িতে। আইন পাস করে সেখানে বারে আইনি পেশা শুরু করেন। কিছু জমি কিনে চা-বাগান শুরু করেন।

ব্রিটিশ মালিকানার বাইরে ওয়ালিউর রহমান ছিলেন প্রথম স্থানীয় চা বাগানের মালিক। লতিফুরের বাবা মুজিবুর রহমানের জন্ম জলপাইগুড়িতে। কলকাতায় লেখাপড়া করে আসামের তেজপুরে ফিরে জমি কিনে চা-বাগান তৈরি করেন। তিনিও খান বাহাদুর উপাধি পান। ১৯৫০ এর দশকের শুরুতে সিলেটে চা-বাগান করেন, পাটের ব্যবসাও শুরু করেন। ভৈরব-আশুগঞ্জ এলাকাজুড়ে পাটের ব্যবসা ছিল। এ ব্যবসাকে বাংলাদেশের স্বাধীনতা পরবর্তী অর্ধ শতকে বহুগুণে পত্রপল্লবে এগিয়ে নেন লতিফুর রহমান। সে হিসেবে জলপাইগুড়ি থেকে সিলেট পর্ব হয়ে ট্রান্সকম গ্রুপের বয়স ১৩৫ বছর।

লতিফুর রহমানের জন্ম জলপাইগুড়িতে, ১৯৪৫ সালের ২৮ আগস্ট। পড়াশোনার শুরু স্থানীয় সেন্ট ফ্রান্সিস স্কুলে। ১৯৫৬ সালে শিলংয়ের সেন্ট এডমন্ডস স্কুলে ভর্তি হন। তারপর সেন্ট জেভিয়ার্স কলেজে পড়াশোনা করেন।

১৯৬৫ সালের ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধ, হিন্দু-মুসলমান দাঙ্গাসহ নানা কারণে ঢাকায় ফিরে আসেন লতিফুর রহমান। বাবা মুজিবুর রহমান তখন চাঁদপুরে গড়ে তুলেছেন ডব্লিউ রহমান জুট মিল। একদম শুরুতেই বলেছিলাম, সেখানে শিক্ষানবিশ হিসেবে কাজ শুরু করেন লতিফুর। দেড় বছর পর নির্বাহী হিসেবে যোগ দেন।

স্বাধীনতার পর ডব্লিউ রহমান জুট মিল রাষ্ট্রায়ত্ত হলে লতিফুরকে শুরু করতে হয় নতুন করে। ব্যাংক থেকে ৫০ লাখ টাকা ঋণ নিয়ে ব্যবসা শুরু করেন। এখন সেই ট্রান্সকম গ্রুপের বার্ষিক লেনদেনের পরিমাণ কয়েক হাজার কোটি টাকা। শুরুতে এ ঋণ পাওয়া অনেকটা কঠিন ছিল। নেদারল্যান্ডসের রটারডাম-ভিত্তিক ভ্যান রিস তখন বিশ্বে চা সরবরাহকারীদের মধ্যে সেরা কোম্পানি। নানা দেশ থেকে চা কিনে তারা সরবরাহ করে। ১৯৭৪ সালে বাংলাদেশে তাদের হয়ে চা কেনার কাজটি লতিফুর রহমান পান। তিনি জানিয়েছিলেন, সেই যে বিনা শর্তে ৫০ লাখ টাকার ঋণ পেয়েছিলেন, সেটিই তার জীবনের ‘টার্নিং পয়েন্ট’। জীবনের মোড় ঘুরে গিয়েছিল সেই এক ঘটনায়। অথচ এভাবে ঋণ নেওয়ার কথা ছিল না।

বর্তমানে কয়েক হাজার কর্মী নিয়ে ট্রান্সকম গ্রুপ ৯টি খাতে ব্যবসা পরিচালনা করছে। গ্রুপটির নিয়ন্ত্রণাধীনে এখন ১৬টি কোম্পানি আছে। আন্তর্জাতিক কিছু ব্র্যান্ডের এ দেশের ব্যবসায় অংশীদার এখন ট্রান্সকম গ্রুপ। দেশের শীর্ষ দুটি বাংলা ও ইংরেজি দৈনিক এ গ্রুপের মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠান থেকে প্রকাশিত হয়। এ ছাড়া আরও কিছু প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন লতিফুর রহমান।

এই যে সফল এবং নীতির যে সংমিশ্রণ, আমার মনে হয় লতিফুর রহমান তার জীবনের মাধ্যমে  উদাহরণ হিসেবে তা তুলে ধরেছেন। আমি আশা করব, আমাদের সমাজ এবং রাষ্ট্র এবং বিশেষ করে তরুণ সমাজ এই বিষয়টা তাদের মনোযোগের মধ্যে আনবে। সফল আমরা সবাই হতে চাই, কিন্তু সেটা নীতির পথে থেকেই সফল হওয়া উচিত এবং তা সম্ভবও লতিফুর সম্পর্কে এভাবে বলেছিলেন ব্র্যাকের চেয়ারপারসন ও অর্থনীতিবিদ হোসেন জিল্লুর রহমান।