সংসার চালানোই দায়|277759|Desh Rupantor
logo
আপডেট : ১৯ ফেব্রুয়ারি, ২০২১ ০০:০০
সংসার চালানোই দায়
আরিফুর রহমান তুহিন

সংসার চালানোই দায়

রাজধানীর পূর্ব রামপুরার বাসিন্দা সোহরাব হোসেন একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে চাকরি করেন। তার ছয় সদস্যের পরিবারে মাসে গড়ে চালের প্রয়োজন হয় ৬০ কেজি, মসুর ডাল ৩ কেজি ও সয়াবিন তেল ৬ লিটার। গত চার মাসের ব্যবধানে এ তিন পণ্যেই তার ব্যয় বেড়েছে ৬৬০ টাকা। আর অন্য নিত্যপণ্যের দাম একটি কমে তো আরেকটি বাড়ছে। যাতায়াত ভাড়াসহ অন্যান্য খরচও বেড়েছে। এছাড়া করোনা পরিস্থিতি কিছুটা স্বাভাবিক হওয়ায় গত ফেব্রুয়ারি থেকে বাড়িভাড়াও বেড়েছে। অথচ ব্যবসা খারাপের অজুহাতে এবার বেতন বাড়বে না বলে বছরের শুরুতেই কর্মস্থল থেকে জানিয়ে দেওয়া হয়েছে সোহরাব হোসেনকে।

তিনি উদ্ভূত পরিস্থিতিতে ক্ষোভ প্রকাশ করে দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘করোনার কারণে অনেক দিন বেতন কম পেয়েছি। ধারদেনা করে তখন চলেছি, যা এখনো শোধ করতে পারিনি। এখন আবার নিত্যপণ্যে নাভিশ্বাস অবস্থা। ফেব্রুয়ারিতেও ৮০ টাকা কেজি দরে কাঁচামরিচ খেতে হবে ভাবা যায়? সবজির দাম কিছুটা কম আছে। তবে এমন কতদিন থাকে বলা যায় না। হিসাব করলে দেখা যাবে মাসে বাসাকেন্দ্রিক খরচই বেড়েছে অন্তত ২ হাজার ৫০০ টাকা। অন্যান্য খরচ তো আছেই। আমরা যারা স্বল্প আয়ের মানুষ তাদের জন্য এখন রাজধানীতে টিকে থাকাই কঠিন হয়ে পড়েছে।’ দ্রব্যমূল্যের এমন র্উদ্বগতিতে সোহরাব হোসেনের মতো নিম্ন আয়ের মানুষের জীবনযাপন এখন চরম সংকটে। করোনা পরিস্থিতিতে একদিকে আয় কমছে অন্যদিকে খরচ বাড়ছে। বাধ্য হয়ে অনেকে রাজধানী ছেড়ে পাড়ি জমিয়েছেন গ্রামে অথবা ছোট কোনো শহরে। বেসরকারি সংগঠন পিপিআরসি ও বিআইজিডির গত আগস্টের গবেষণায় বলা হয়েছিল, করোনাকালে রাজধানী ঢাকা ছেড়ে চলে গেছে অন্তত ১৬ শতাংশ দরিদ্র মানুষ। বাড়িভাড়া, চিকিৎসা খরচ, যোগাযোগের ব্যয় এবং অন্য নানামুখী ব্যয় মেটাতে না পেরেই তারা এমন সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। বাজার পরিস্থিতি এখন আরও খারাপ। সংস্থাটির আশঙ্কা, নতুন জরিপে এই হার আরও বাড়বে।

নিত্যপণ্যের র্উদ্বগতির প্রমাণ মেলে সরকারের পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) মূল্যস্ফীতির তথ্যেও। বিবিএস বলছে, ২০২০ সালে জিনিসপত্রের দাম বৃদ্ধির হার আগের বছরের তুলনায় বেড়েছে। গত জানুয়ারি থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত গড় মূল্যস্ফীতি হয়েছে ৫ দশমিক ৬৯ শতাংশ, যা ২০১৯ সালে ছিল ৫ দশমিক ৫৯ শতাংশ। আর ২০১৮ সালে গড় মূল্যস্ফীতি ছিল ৫ দশমিক ৫৫ শতাংশ।

খাদ্য এবং খাদ্যবহির্ভূত বিভিন্ন পণ্য ও সেবার মূল্য নিয়ে বিবিএস মূল্যস্ফীতির হিসাব করে থাকে। ২০০৫-০৬ অর্থবছরকে ভিত্তি বছর (১০০ পয়েন্ট) ধরে পরিসংখ্যান তৈরি করা হয়। পয়েন্ট টু পয়েন্ট মূল্যস্ফীতি হচ্ছে আগের বছরের নির্দিষ্ট কোনো মাসের ভোক্তা মূল্যসূচকের তুলনায় পরের বছরের একই মাসে ওই সূচক যতটুকু বাড়ে তার শতকরা হিসাব। যদিও অর্থনীতিবিদরা বলছেন, বাস্তবে মূল্যস্ফীতির হার বিবিএসের হারের চেয়ে বেশি।

তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক উপদেষ্টা ও অর্থনীতিবিদ ড. হোসেন জিল্লুর রহমান দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘নিত্যপণ্যের দাম বলতে আমরা চাল, ডাল, তেল, পেঁয়াজ, আটা এগুলোকে বুঝি। এর সঙ্গে ওষুধ ও যাতায়াত খরচও যোগ করতে হবে। এ দুটি সেবা মানুষ নিত্য ব্যবহার করে। কথা হলো এসব তো সহনীয় পর্যায়ে নেই। আগের তুলনায় মানুষের আয় কিছুটা বেড়েছে ঠিকই। কিন্তু জীবনের মান বাড়ানো যায়নি। এর কারণ হলো এসব পণ্যের দাম নিয়ন্ত্রণে থাকা। সরকারের পক্ষ থেকে পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে বলা হলেও বিষয়টি দৃশ্যমান নয়। এসব পণ্য বা সেবার দাম তো কমেনি। আমরা এ নিয়ে আরেকটি গবেষণা করছি। তখন বাস্তব পরিস্থিতিটা আরও বিশদভাবে তুলে ধরা যাবে।’

দেশ রূপান্তরের বাজার পর্যবেক্ষণে দেখা যায়, গত সেপ্টেম্বরে বাজারে কেজিপ্রতি নিম্নমানের মোটা চালের দাম ছিল ৪০-৪২ এবং চিকন চালের কেজি ছিল ৫৭-৫৮ টাকা। অক্টোবরের মাঝামাঝি পর্যন্ত এ দাম থাকে। এ সময়ের মধ্যে সরকারের মজুদও তলানিতে নামে। বাজারে হু হু করে বাড়তে থাকে সব ধরনের চালের দাম। নভেম্বরে বাজারে কেজিপ্রতি নিম্নমানের মোটা চাল বিকোয় ৪৫-৪৮ টাকা দরে আর ভালোমানের মোটা চালের কেজি বিক্রি হয় ৫২-৫৪ টাকা। ওই সময়ে চিকন চালের কেজি ৫৮-৬০ টাকা দরে বিক্রি হয়। ডিসেম্বরে যখন আমনের ভরা মৌসুম চলছিল তখন দেশের চালের বাজার আরও অস্থিতিশীল হয়ে পড়ে। বাজারে নিম্নমানের মোটা চালের কেজিও বিক্রি হয় ৫০-৫২ টাকা দরে। ওই সময়ে কেজিপ্রতি ভালো মানের মোটা চাল ৫৬-৫৮ এবং চিকন চাল ৬৫ টাকা দরে বিক্রি করেছেন বিক্রেতারা। আর গতকাল বৃহস্পতিবার রাজধানীর বিভিন্ন বাজারে কেজিপ্রতি ভালোমানের মোটা চাল ৫৪-৫৬ এবং চিকন চাল ৬৩-৬৫ টাকা দরে বিক্রি হয়েছে।

খাদ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, গত ১৫ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত সরকারের কাছে চাল মজুদ ছিল ৫ লাখ ৩৭ হাজার টন। মজুদ বাড়াতে সরকারি পর্যায়ে সাড়ে ৪ লাখ টন এবং বেসরকারি পর্যায়ে ১০ লাখ ১৭ হাজার টন চাল আমদানির অনুমোদন দেয় সরকার। আমদানি শুল্ক সাড়ে ৬৭ শতাংশ থেকে কমিয়ে ১৫ শতাংশ করা হয়। গত ১৭ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত দেশে ২ লাখ ১৮ হাজার টন চাল আমদানি হয়েছে। এর মধ্যে সরকারি পর্যায়ে ৭১ হাজার ৭৭০ এবং বেসরকারি পর্যায়ে ১ লাখ ৪৬ হাজার ৭৫০ টন। ভারতের কলকাতা বন্দরে নাব্য সংকট ও স্থলপথে যানজটের কারণে চাল আসতে সময় লাগছে বলে জানিয়েছে খাদ্য মন্ত্রণালয়। আমদানিকারকরা জানিয়েছেন, ভারতের বাজারে চালের উচ্চমূল্যও আমদানিতে ধীরগতির কারণ।

খাদ্য মন্ত্রণালয়ের সচিব ড. মোছাম্মৎ নাজমানারা খানুম গতকাল দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আমদানি শুরুর পর দামে কিছুটা প্রভাব পড়েছিল। কিন্তু এরপর আবার সেটা বেড়ে যায়। এখন আবার কমলেও রাজধানীতে তেমন প্রভাব পড়েনি। সুতরাং আমাদের জন্য ঢাকার বাজারটা মূল চ্যালেঞ্জ। যদি অনুমোদিত ১০ লাখ টনের পুরোটা ঢুকত তাহলে প্রভাব পড়ত। বাংলাদেশে তো চাল ঢুকছেই কম।’

তিনি আরও বলেন, ‘বিষয়টি নিয়ে গত বুধবার ব্যবসায়ীদের সঙ্গে খাদ্য মন্ত্রণালয় বৈঠক করেছে। ২৩ ফেব্রুয়ারি আবারও বসব। এছাড়া রাজধানীতে খোলা বাজারে ৩০ টাকা দরে চাল বিক্রি হচ্ছে। ১২৬ টন বরাদ্দ থাকলেও বাড়তি আরও ১২ টন বেশি চাল দেওয়া হচ্ছে। এছাড়া আমদানি যাতে বেগবান করা যায় সেজন্য আমরা ভারতীয় হাইকমিশনারসহ বন্দর ও আমদানিসংশ্লিষ্ট সবার সঙ্গে কথা বলছি। আমরা চালের ট্রাককে অগ্রাধিকার দেওয়ার জন্য বলেছি।’

এদিকে গত বুধবার ভোজ্য তেলের নতুন দাম নির্ধারণ করেছে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়। পরবর্তী নির্দেশনা না আসা পর্যন্ত প্রতি লিটার সয়াবিন (খোলা) মিলগেটে ১০৭, পরিবেশক মূল্য ১১০ এবং খুচরা মূল্য ১১৫ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে। আর প্রতি লিটার বোতলজাত সয়াবিন মিলগেট মূল্য ১২৩, পরিবেশক মূল্য ১২৭ এবং খুচরা বিক্রয় মূল্য ১৩৫ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে। পাঁচ লিটার বোতলজাত সয়াবিন মিলগেট মূল্য ৫৯০, পরিবেশক মূল্য ৬১০ এবং খুচরা বিক্রয় মূল্য ৬৩০ টাকা। প্রতি লিটার পাম সুপার (খোলা) মিলগেট মূল্য ৯৫, পরিবেশক মূল্য ৯৮ এবং খুচরা বিক্রয় মূল্য ১০৪ টাকা নির্ধারণ হয়েছে।

সয়াবিন তেলের বাজার পর্যবেক্ষণে দেখা যায়, সেপ্টেম্বরে লিটারপ্রতি বোতলজাত সয়াবিন তেল বিক্রি হয়েছিল ১০০-১০৫ টাকা দরে। নভেম্বরে তা বেড়ে ১০৫-১১০ টাকা হয়। ডিসেম্বরে আরেক দফা বেড়ে ১২০ টাকা দরে পৌঁছায়। আর চলতি ফেব্রুয়ারির শুরু থেকেই বাজারে লিটারপ্রতি বোতলজাত সয়াবিন তেল বিক্রি হচ্ছে ১৩৫ টাকা দরে।

দেশে মোট চাহিদার ৮০ শতাংশ ব্যবহার হয় খোলা তেল। গত চার মাসে খোলা সয়াবিন ও পাম অয়েলের দামও বাড়ছে অস্বাভাবিক হারে। সেপ্টেম্বরের শুরুতে লিটারপ্রতি খোলা সয়াবিন তেলের সর্বোচ্চ মূল্য ছিল ৮৮, অক্টোবরে তা বেড়ে ৯২-৯৩ টাকা হয়। নভেম্বরে আরেক দফা দাম বেড়ে ৯৫ টাকায় পৌঁছায়। এরপর থেকে বোতলজাত সয়াবিন তেলের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে পণ্যটির দাম বাড়ে। ডিসেম্বরে ১০০ টাকা লিটার ছাড়িয়ে যায়। বর্তমানে বাজারে লিটারপ্রতি খোলা সয়াবিন তেল ১২০-১২৫ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে। একই অবস্থা পাম অয়েলের ক্ষেত্রেও। অক্টোবরে যেখানে সুপার পাম অয়েলের লিটার ৯০ টাকা ছিল, বর্তমানে তা বেড়ে ১০৫-১১০ টাকা হয়েছে।

সেপ্টেম্বরেও বাজারে ১০০-১১০ টাকা কেজি দরে মসুর ডাল মিলত। কিন্তু অন্য পণ্যের সঙ্গে এ নিত্যপণ্যটির দামও বেড়েছে। গতকাল বাজারে কেজিপ্রতি ছোট দানার মসুর ডাল বিক্রি হয়েছে ১৩০ টাকা দরে। চার মাস আগে ৮০-১০০ টাকা বিক্রি হওয়া রসুনের কেজি এখন ১২০-১৩০ টাকা পর্যন্ত। কেজিতে ২-৩ টাকা পর্যন্ত বেড়েছে আটা ও ময়দার দামও। মৌসুম শুরু হওয়ার পর পেঁয়াজের দাম কিছুটা কমলেও এখনো কেজি বিকোচ্ছে ৩৫ টাকা দরে।

বাজার পরিস্থিতির বিষয়ে জানতে চাইলে বাণিজ্যমন্ত্রী টিপু মুনশি দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আন্তর্জাতিক বাজারে দাম বাড়ার কারণে তেলের দামটা বাড়িয়েছি। এটা নিয়ে যাতে অরাজকতা সৃষ্টি না হয় সেজন্য দামও নির্ধারণ করে দিয়েছি। এছাড়া নিম্ন আয়ের মানুষের কথা বিবেচনা করে টিসিবির (সরকারের বিপণন সংস্থা) মাধ্যমে বিক্রি বাড়ানোর পরিকল্পনা নিয়েছি। আন্তর্জাতিক বাজারে দাম বাড়ার কারণেই আমদানিনির্ভর পণ্যের দাম বেড়েছে।’

এলসি না খুললেই চাল আমদানির অনুমোদন বাতিল : সরকার চাল আমদানির ঋণপত্র (এলসি) খোলার জন্য সময় নির্ধারণ করে দিয়েছে। এলসি খোলার সাত দিনের মধ্যে অন্তত ৫০ শতাংশ চাল আমদানির শর্তও রয়েছে। যাদের আমদানির অনুমোদন সর্বোচ্চ পাঁচ হাজার টন, তাদের এলসি খোলার ২০ দিনের মধ্যে এবং এর বেশি যাদের তাদের ৩০ দিনের মধ্যে সমুদয় চাল আমদানি করতে হবে। এটি করতে না পারলে আমদানির অনুমোদন বাতিল হবে।

খাদ্য সচিব বলেন, ‘শুধু সময়মতো ঋণপত্র না খোলায় গত বুধবার ২৫০ হাজার টনের এলসি বাতিল করা হয়েছে। যারা সময়মতো চাল আনবে না তাদেরও এ পরিণতি হবে। কেউ যাতে মজুদ করতে না পারে সেজন্য জেলা প্রশাসক ও উপজেলা নির্বাহী অফিসারদের নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।’