ধর্ষণ নিয়ে মন্তব্যে ভারতে প্রধান বিচারপতির পদত্যাগ দাবি |280492|Desh Rupantor
logo
আপডেট : ৫ মার্চ, ২০২১ ০৯:৫৪
ধর্ষণ নিয়ে মন্তব্যে ভারতে প্রধান বিচারপতির পদত্যাগ দাবি
অনলাইন ডেস্ক

ধর্ষণ নিয়ে মন্তব্যে ভারতে প্রধান বিচারপতির পদত্যাগ দাবি

খোলা চিঠিতে সাক্ষরকারীরা বলছেন, প্রধান বিচারপতি শারদ বোবড়ের মন্তব্যকে হালকাভাবে নেওয়ার কোন সুযোগ নেই

ধর্ষণের অভিযোগে দায়ের করা দুটি মামলায় ভারতীয় সুপ্রিম কোর্টের প্রধান বিচারপতির মন্তব্যের পর অবিলম্বে তার পদত্যাগের দাবি উঠেছে।

বিবিসি এক প্রতিবেদনে জানায়, প্রধান বিচারপতি শারদ বোবড়েকে লেখা খোলা চিঠিতে পাঁচ হাজারের ওপর নারীবাদী, নারী অধিকারকর্মী ও উদ্বিগ্ন নাগরিক ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন। তাকে বিবৃতি প্রত্যাহার করে ক্ষমা চাওয়ার আহ্বান জানানো হয়েছে।

দুটি মন্তব্য ঘিরে এই তোলপাড়। তিনজন বিচারকের একটি বেঞ্চের প্রধান হিসেবে বোবড়ে ধর্ষণের অভিযোগ ওঠা ২৩ বছর বয়সী এক ব্যক্তিকে বলেন, “আপনি যদি ওই মেয়েকে বিয়ে করতে চান, আমরা আপনাকে সাহায্য করতে পারি। না চাইলে আপনি চাকরি হারাবেন এবং জেলে যাবেন।”

এই মন্তব্য অনেককে স্তম্ভিত করেছে। বিশেষ করে অভিযোগকারী নারী, ২০১৪ থেকে ১৫ সালের মধ্যে ওই ব্যক্তির বিরুদ্ধে ধর্ষণের ঘটনার যেসব ভয়ংকর অভিযোগ এনেছেন, সেসময় তার বয়স ছিল ১৬। অভিযুক্ত ব্যক্তি তার দূর সম্পর্কের আত্মীয়।

ওই ব্যক্তির বিরুদ্ধে অভিযোগ, সে মেয়েটির পিছু নিয়ে তাকে হয়রানি করে, বেঁধে রাখে, চিৎকার যাতে করতে না পারে তার জন্য তার মুখ কাপড় গুঁজে বন্ধ করে রাখে, স্কুল শিক্ষার্থী অপ্রাপ্তবয়স্ক মেয়েটিকে বারবার ধর্ষণ করে এবং তার গায়ে পেট্রল ঢেলে গায়ে আগুন দেওয়ার ও তার ভাইকে খুন করার হুমকি দেয়। ওই স্কুল শিক্ষার্থী আত্মহত্যার চেষ্টা করলে ধর্ষণের ঘটনা প্রথম প্রকাশ পায়।

মেয়েটির পরিবার অভিযোগ করে, তারা পুলিশে খবর না দেওয়ার ব্যাপারে সম্মতি দেয় কারণ অভিযুক্তের মা বলেছিল— মেয়েটি প্রাপ্তবয়স্ক হওয়ার পর ছেলেটির সঙ্গে বিয়ে দেবে।

ভারতে ধর্ষণের ঘটনার জন্য প্রায়শই ধর্ষিতাকে দায়ী করা হয়ে থাকে এবং এ ধরনের যৌন নির্যাতনের ঘটনাকে একটা মেয়ের জন্য সারা জীবনের কলঙ্ক হিসেবে দেখা হয়। ফলে মেয়েটির পরিবার ছেলেটির মায়ের প্রস্তাবে রাজি হন। কিন্তু অভিযুক্ত পরে সেই প্রতিশ্রুতি মানতে অস্বীকার করে আরেকজনকে বিয়ে করার পর ধর্ষণের শিকার মেয়েটি পুলিশের কাছে যায়।

অভিযুক্ত ব্যক্তি মহারাষ্ট্র রাজ্যে সরকারি কর্মচারী এবং তিনি গ্রেপ্তার হলে তার চাকরি হারাবেন এই মর্মে নিম্ন আদালতে আবেদন জানালে তাকে জামিন দেওয়া হয়। কিন্তু বম্বে হাইকোর্ট এই নির্দেশকে ‘ন্যক্কারজনক’ আখ্যা দিয়ে তার জামিন বাতিল করে দেয়।

ওই ব্যক্তি এরপর সুপ্রিম কোর্টের দ্বারস্থ হন। সুপ্রিম কোর্ট সোমবার তাকে চার সপ্তাহের জন্য গ্রেপ্তার হওয়া থেকে সুরক্ষা দেওয়ার বিষয়টি অনুমোদন করে এবং সেই শুনানির সময় ওই ব্যক্তির আইনজীবী ও বিচারপতি বোবড়ের মধ্যে এই ‘আলোড়ন সৃষ্টিকারী’ কথোপকথন হয়।

খোলা চিঠিতে স্বাক্ষরদানকারী ভারতের প্রথম সারির নারীবাদী এবং বেসরকারি সংস্থাগুলো বোবড়ের মন্তব্য বর্ণনা করার ক্ষেত্রে বম্বে হাইকোর্টে উচ্চারিত ‘ন্যক্কারজনক’ শব্দটি ব্যবহার করেন।

সেখানে বলা হয়, অপ্রাপ্তবয়স্ক একটি মেয়ের ধর্ষণের মামলা নিষ্পত্তিতে আপস হিসেবে আপনি বিয়ের যে প্রস্তাব দিয়েছেন তা ন্যক্কারজনকেরও অধম এবং ধর্ষকের শিকার একজনের ন্যায় বিচারের অধিকার এতে মারাত্মকভাবে ক্ষুণ্ন হয়েছে। অভিযুক্ত ধর্ষক যাকে ধর্ষণ করেছে বলে অভিযোগ, তাকে বিয়ে করার এই প্রস্তাব দিয়ে আপনি ভারতের প্রধান বিচারপতি - আপনি মেয়েটিকে একজন নির্যাতনকারী, যে তাকে আত্মহত্যার পথে ঠেলে দিয়েছিল, তার হাতে সারা জীবন ধর্ষণের জন্য তুলে দিচ্ছেন।

গ্রাম অঞ্চলে সমঝোতা বা মীমাংসা করার জন্য মুরুব্বিদের এ ধরনের আপসরফার আলোচনা করার চল রয়েছে বহু বছর ধরে। আদালতকেও কোন কোন সময় ধর্ষণের দায়ে অভিযুক্ত ও ধর্ষিতার মধ্যে বিয়ে দিয়ে ধর্ষণের অভিযোগ মীমাংসা করতে দেখা গেছে। কিন্তু সুপ্রিম কোর্ট, হাইকোর্ট এবং নিম্ন আদালতে আবার এমন বেশ কিছু রায় এসেছে যেখানে বলা হয়েছে, বিয়ের মাধ্যমে ধর্ষণ অভিযোগের কোন অবস্থাতেই নিষ্পত্তি করা যাবে না।

নারী অধিকার কর্মীরা বলছেন, বিচারপতি বোবড়ের মন্তব্য ধর্ষকদের এমন বার্তা দেবে যে বিয়ে ধর্ষণের ব্যাপারে একটা লাইসেন্স। একজন ধর্ষক অপরাধ করে পরে বিয়ে করার লাইসেন্স ব্যবহার করলে অপরাধ থেকে আইনগতভাবে পার পেয়ে যেতে পারে।

খোলা চিঠিতে আরেকটি ধর্ষণের মামলার প্রতিও দৃষ্টি আকর্ষণ করা হয়েছে যে মামলা বিচারপতি বোবড়ে একই দিনে শুনেছেন এবং সেখানেও বিতর্কিত দ্বিতীয় মন্তব্যটি করেছেন, বিবাহিত দম্পতিদের মধ্যে যৌন মিলনকে কি ধর্ষণ হিসাবে বিবেচনা করা যায়?

মামলাটি ছিল একজন পুরুষের আবেদনের শুনানি। তার নারী বন্ধু তার বিরুদ্ধে ধর্ষণের যে অভিযোগ আনেন তা প্রত্যাখ্যান করে ওই পুরুষ আদালতে আবেদন করেছিলেন। ওই নারীর সঙ্গে দু বছর ওই পুরুষের সম্পর্ক ছিল যখন তারা একসঙ্গে বসবাস করতেন।

ওই নারী অভিযোগ করেন যে তিনি ‘বিয়ের আগে কোন রকম যৌন সম্পর্ক প্রত্যাখ্যান করার’ পর ওই পুরুষ ‘প্রতারণার মাধ্যমে’ তার সম্মতি আদায় করে।

দাবি করেন, ২০১৪ সালে তারা একটি মন্দিরে গিয়ে বিয়ে করেন এবং তখন ওই পুরুষের সঙ্গে যৌন সম্পর্কে তিনি মত দেন। কিন্তু ওই ব্যক্তি বলছেন তিনি তাকে বিয়ে করেননি এবং তিনি দাবি করেন তাদের মধ্যে যৌন সম্পর্কে ওই নারীর মত ছিল। ওই পুরুষ আরেকজন নারীকে বিয়ে করার পর ওই নারী তার বিরুদ্ধে ধর্ষণের অভিযোগ দায়ের করেন।

সোমবার এই মামলার শুনানির সময় বিচারপতি বোবড়ে বলেন, “বিয়ের ব্যাপারে মিথ্যা প্রতিশ্রুতি দেওয়া অন্যায়” কিন্তু এরপর তিনি প্রশ্ন করেন, “যখন একজন পুরুষ ও নারী স্বামী স্ত্রীর মতো একসঙ্গে বসবাস করেন, তখন তার স্বামী নিষ্ঠুর চরিত্রের হলেও, আইনগতভাবে বিবাহিত দম্পতির মধ্যে যৌন মিলনকে কি ধর্ষণ বলা চলে?”

এর জবাবে খোলা চিঠিতে বলা হয়, এ ধরনের মন্তব্য একজন স্বামীর হাতে যৌন, শারীরিক ও মানসিক যে কোনরকম নির্যাতন ও সহিংসতাকে আইনি বৈধতা দেবে। ভারতীয় নারীরা যেখানে পরিবারের ভেতর তাদের ওপর চালানো নির্যাতন ও সহিংসতা বন্ধে আইনি ব্যবস্থা পেতে বছরের পর বছর ধরে ব্যর্থ হচ্ছেন সেখানে একজন বিচারপতি এ ধরনের মন্তব্য করলে এ ধরনের আচরণ মানুষ স্বাভাবিক বলেই ধরে নেবে।

খোলা চিঠিতে সাক্ষরকারীরা বলছেন, প্রধান বিচারপতি শারদ বোবড়ের মন্তব্যকে হালকাভাবে নেওয়ার কোন সুযোগ নেই। কারণ অন্যরাও তখন এটাকে আইনে ব্যবহৃত যুক্তি হিসেবে ভবিষ্যতে খাড়া করার চেষ্টা করবে।

এরপর তারা বোবড়েকে অবিলম্বে পদত্যাগের আহ্বান জানান। তবে এ বিচারপতি বিষয়টি নিয়ে মন্তব্য করেননি।