আব্দুল হামিদ রায়হানের ক্যামেরায় একাত্তর|284228|Desh Rupantor
logo
আপডেট : ২৬ মার্চ, ২০২১ ০০:০০
আব্দুল হামিদ রায়হানের ক্যামেরায় একাত্তর
সালেক খোকন

আব্দুল হামিদ রায়হানের ক্যামেরায় একাত্তর

ফটো তোলার প্রতি আমার ঝোঁক ছিল ছোটবেলা থেকেই। প্রথম ক্যামেরা লুবিডর। পরে টাকা জমিয়ে একবার ৫০০ টাকায় ইয়াসিকা সিক্স-থার্টিফাইভ ক্যামেরা করাচি থেকে আনিয়ে নিই পোস্টালে। ওই ক্যামেরাটাই ইউজ করেছি একাত্তরে।

ফটোগ্রাফি শিখেছি নিজে নিজে। স্টুডিওতে গিয়ে দেখতাম কীভাবে ওরা এনলার্জ করে। তখন কৌতূহলও বেড়ে যায়। খুব বেশি টাকা তখন ছিল না। তাই লেদ মেশিনে নিজের মতো যন্ত্রাংশ তৈরি করি। করাচি থেকে দেড়শ টাকায় আনাই একটা লেন্সও। রেলগেইটের লাইটে যে কাঁচ লাগানো থাকে ওরকম দুটো কাঁচও জোগাড় করি। এগুলো দিয়েই বানাই এনলার্জার। ওটা বানানোর কথা তখন চিন্তাও করা যেত না। পরে অফিসের ভেতর একটা রুমকে স্টুডিও বানিয়ে ফেললাম।

বাল্যবন্ধু ছিলেন ব্যারিস্টার আমীর-উল-ইসলাম। ১৯৭০ সালের মার্চে কুষ্টিয়ায় আসেন বঙ্গবন্ধু। তখন আমি শহর আওয়ামী লীগের ভাইস প্রেসিডেন্ট। বঙ্গবন্ধুকে খাওয়ানোর দায়িত্ব ছিল আমার ওপর। ওই সময় বঙ্গবন্ধুর কয়েকটি পোর্ট্রেট ও জনসভার ছবি ক্যামেরাবন্দি করেছিলাম। ওই ছবিগুলোই আজ কথা বলছে। একাত্তরের আন্দোলন, প্রতিবাদ, আত্মত্যাগ ও বীরত্বের ইতিহাসটাও ছবির মাধ্যমেই জীবন্ত হয়ে আছে।

ছবি তোলার আগ্রহের কথা এভাবেই তুলে ধরেন যুদ্ধ-আলোকচিত্রী ও বীর মুক্তিযোদ্ধা আবদুল হামিদ রায়হান।

চয়েন উদ্দিন ও জোবেদা খাতুনের বড় সন্তান হামিদ রায়হান। বাড়ি কুষ্টিয়া শহরে, ৫২ মসজিদ বাড়ি লেনে (বর্তমানে সেটি ১১ নম্বর খলিলুর রহমান সড়ক)।

২৫ মার্চ ১৯৭১ কুষ্টিয়া হাইস্কুল মাঠে ছাত্রনেতারা স্বাধীন বাংলার পতাকা উত্তোলন করেন। ওইদিন সাধারণ মানুষ ও ছাত্ররা লাঠিসোঁটা, তীর-ধনুক, দা ও ডামি রাইফেল নিয়ে সমাবেশও করে। ওই আন্দোলনে হামিদ রায়হান নিজে শুধু যুক্তই থাকেননি সঙ্গে ক্যামেরায় ছবিও তুলেছেন। 

সেই রাতেই সারা দেশে শুরু হয় গণহত্যা। আব্দুল হামিদ রায়হানের ভাষায়‘আমার খেয়াল হলো ছবিগুলোর প্রত্যেকটা নেগেটিভ রাখব। ওগুলো অফিসেই ছিল। কারফিউ শেষ হলে নেগেটিভগুলো নিয়ে পরিবারসহ চলে যাই ভারতের করিমপুরে। কুমারখালির এমপিএ গোলাম কিবরিয়া সাহেবসহ নেতৃবৃন্দ একটি রিক্রুটিং ক্যাম্প খোলার উদ্যোগ নিচ্ছিলেন সেখানে। কিবরিয়া সাহেব পূর্বপরিচিত। ফলে তার সঙ্গে যুক্ত হয়ে কাজ শুরু করি। করিমপুর রিক্রুটিং ক্যাম্পটি চালু হলে ধীরে ধীরে যুবকরা আসতে থাকে। সেখান থেকেই তাদের বাছাই করে হায়ার ট্রেনিংয়ে পাঠানো হতো। ওই সময়টায় ছবি তোলায় ভাটা পড়ে। ২৪ ঘণ্টাই ক্যাম্পে থাকতাম। যুবকদের সংগঠিত করা, তাদের খাওয়ানোর ব্যবস্থা করাসহ মাস্টাররোল তৈরি করতে হতো প্রতিদিনই। প্রায় দুই হাজারের মতো যুবক ছিল ক্যাম্পে। ফলে এত লোকের খাবার আয়োজন করা খুব সহজ কাজ ছিল না।’

যুদ্ধ-আলোকচিত্রী হিসেবে যুক্ত হওয়ার কথা তিনি তুলে ধরেন ঠিক এভাবে ‘তখন বাংলাদেশ ভলান্টিয়ার সার্ভিস কোর কাজ করছিল বিভিন্ন শরণার্থী ক্যাম্পে। ওরা ভলান্টিয়ার নিয়োগ দিত। শরণার্থী ক্যাম্পের যুবক-যুবতীদের সংগঠিত করে লেফট-রাইট করানোসহ নানা কাজে যুক্ত রাখত ভলান্টিয়াররা। যাতে তারা বিপথগামী হয়ে না যায়। ভলান্টিয়ার সার্ভিস কোরের উদ্যোক্তা ছিলেন ব্যারিস্টার আমীর-উল-ইসলাম। লন্ডনের ‘ওয়ার অন ওয়ান্ট’ তাদের ফান্ড দিত। ব্রিটিশ পার্লামেন্ট সদস্য ডোনাল্ড চেসওয়ার্থ ছিলেন ‘ওয়ার অন ওয়ান্ট’-এর চেয়ারম্যান। 

একদিন ব্যারিস্টারকে (আমীর-উল-ইসলাম) বললাম ‘তুমি আমাকে এখান থেকে নিয়ে চলো। আমি ফটোগ্রাফিটা করি।’ তাদেরও প্রয়োজন ছিল ডকুমেন্টেশনের জন্য একজন লোক। ফলে তার মাধ্যমেই ১৫ সেপ্টেম্বর বাংলাদেশ ভলান্টিয়ার সার্ভিস কোরের ফটোগ্রাফার হিসেবে নিয়োগ পাই। এর পরই ক্যামেরাবন্দি করা শুরু করি যুদ্ধদিনের নানা অধ্যায় ও ঘটনাপ্রবাহ।’

বাংলাদেশ ভলান্টিয়ার সার্ভিস কোর-এর দল যখন যে জায়গায় যেত তাদের সঙ্গেই যেতে হতো হামিদ রায়হানকে। বিভিন্ন শরণার্থী ক্যাম্পে গিয়েও ছবি তুলতেন তিনি। পহেলা অক্টোবর তারিখে পরিদর্শনে আসা ডোনাল্ড চেসওয়ার্থসহ পাটগ্রামের কোর্ট-কাচারি, হাসপাতাল ও বিভিন্ন জায়গায় ছবি তোলেন হামিদ রায়হান। এছাড়া তিনি ঘুরে বেড়িয়েছেন বিভিন্ন ট্রেনিং ক্যাম্প, শরণার্থী ক্যাম্প ও মুক্তাঞ্চলগুলোতে। পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী কর্তৃক ধ্বংস হওয়া ব্রিজ, কালভার্ট ও ভবনের ছবিও উঠে এসেছে তার ক্যামেরায়। যা স্বাধীনতার পক্ষে জনমত গড়ে তুলতে সহায়ক হয়েছিল।

ভারতের পশ্চিমবঙ্গের নদীয়া জেলার শিকারপুর ট্রেনিং ক্যাম্পে মুক্তিযোদ্ধাদের ট্রেনিংয়ের ছবি, ১১ ডিসেম্বর যশোরের পিকনিক কর্নার এলাকায় পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর ফেলে যাওয়া তাজা রকেট বোমার পাশে দুই শিশুর ছবি, ঝিকরগাছায় ধ্বংসপ্রাপ্ত ব্রিজ, ২২ নভেম্বর চুয়াডাঙ্গার মুন্সিগঞ্জ বাজারে মুক্তিযোদ্ধাদের হাতে ধরা পড়া রাজাকারের ছবিও ক্যামেরাবন্দি করেন এ আলোকচিত্রী।

পাকিস্তানি সেনাদের বেয়নেটের টর্চারে আহত এক মুক্তিযোদ্ধাকে বিভিএসবি হাসাপাতালে চিকিৎসা দেওয়ার ছবি, ২ ডিসেম্বর মুক্ত কালিগঞ্জে (সাতক্ষীরা) পরিদর্শনে আসা এএইচএম কামারুজ্জামান, মেজর জলিল, ব্যারিস্টার আমীর-উল-ইসলাম, মেজর হায়দার প্রমুখের ছবি তোলেন হামিদ রায়হান। কুষ্টিয়াতে রাজাকারদের ধরে আনার ছবি, ৬ ডিসেম্বর ভারতের স্বীকৃতির দিন কোলকাতায় একটি মিছিলে প্ল্যাকার্ড হাতে ট্রাকের ওপর দাঁড়িয়ে থাকা কবি নির্মলেন্দু গুণের ছবিও উঠে আসে তার ক্যামেরায়। এই ছবিগুলোই ইতিহাসের মূল্যবান দলিল। একাত্তরে হামিদ রায়হানের তোলা ছবি ভারতসহ বিশ্ব গণমাধ্যম ও সংস্থাগুলোতে পাঠানো হতো। ফলে বাংলাদেশের স্বাধীনতার পক্ষে বিশ্বজনমত গড়তে তা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিল।

আলেকচিত্রী আবদুল হামিদ রায়হান বলেন “একাত্তরে খুব কাছ থেকে দেখেছি কীভাবে মানুষ মারা যাচ্ছে। অভুক্ত অবস্থায় মানুষ আসছে দেশ থেকে। তিন-চারদিন পর খাবার পেল। আবার কলেরা শুরু হয়ে গেল। শরণার্থী ক্যাম্পগুলোতে চোখের একটা অসুখ দেখা দেয় তখন। চোখের ওই রোগ মারাত্মকভাবে ছড়িয়ে পড়ছিল, সব ক্যাম্পে। ফলে পশ্চিম বাংলার লোকেরা ওই রোগের নাম দেয়‘জয় বাংলা’ রোগ।’’ এক শরণার্থী ক্যাম্পে দেখেছিমা মরে গেছে। বাচ্চা গিয়ে তার দুধ খাচ্ছে। এই ছবিটা তুলতে না পারায় খুব আফসোস হয়েছিল। হাজার হাজার লোক মরেছে ক্যাম্পে আসার আগেই, খাবারের অভাবে। খুলনার গল্লামারি বধ্যভূমিতে মানুষের হাড়গোড় ও মাথার খুলির স্তূপ ছিল। অধিকাংশকেই সেখানে বিহারি ও রাজাকাররা হত্যা করেছিল।

শরণার্থী ক্যাম্প ছাড়াও হামিদ রায়হান ছবি তুলেছেন বর্ডার এলাকার অ্যাকশন ক্যাম্পগুলোতে। একাত্তরে তিনি ছবি তোলেন ৫৪০টির মতো। মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরকে ২৯২টি, দৃককে ১০০টি ও সামরিক জাদুঘর ‘বিজয় কেতন’-এ দিয়েছেন বেশ কিছু ছবি।

১৯৭৩ সালের ১৩ মার্চ। কুষ্টিয়া শহরে ‘রূপান্তর’ নামে একটি স্টুডিও প্রতিষ্ঠা করেন আলোকচিত্রী আবদুল হামিদ রায়হান। সেখান থেকে একাত্তরের ছবিগুলো সামান্য মূল্যে প্রিন্ট করানো যায়। এছাড়া প্রজন্মের কাছে আলোকচিত্রের মাধ্যমে মুক্তিযুদ্ধের প্রকৃত ইতিহাস তুলে ধরতে টাঙানো রয়েছে বেশ কিছু ছবি। পরিসর ছোট হলেও ‘রূপান্তর’ মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস জানার এক জীবন্ত মিউজিয়াম।

যুদ্ধ-আলোকচিত্রী আবদুল হামিদ রায়হানের বয়স এখন আটাশি। একাত্তরে রিক্রুটিং ক্যাম্পে দায়িত্ব পালনের জন্য মুক্তিযোদ্ধার সম্মান লাভ করলেও অদ্যাবধি তাকে মুক্তিযুদ্ধ-আলোকচিত্রী হিসেবে সরকার কোনো স্বীকৃতি বা জাতীয় পুরস্কার প্রদান করেনি। যা প্রত্যাশিত ছিল। এ নিয়ে কোনো আফসোস নেই তার। শেষে শুধু বললেন‘কর্তব্য ছিল, করেছি। নিজের কোনো চাওয়া-পাওয়া নেই। দেশটা তো স্বাধীন হয়েছে। একাত্তরের ছবিগুলোকে বাঁচিয়ে রাখতে রূপান্তর স্টুডিও দিয়েছি। মুক্তিযুদ্ধের ওই ছবিগুলো প্রজন্ম দেখুক, ভাবুক তারা, কত কষ্টে আমরা স্বাধীনতা পেয়েছি!’

লেখক : লেখক ও মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক গবেষক