মনের বন্দিত্বে নেই বৈশাখী উৎসব|287569|Desh Rupantor
logo
আপডেট : ১৪ এপ্রিল, ২০২১ ০০:০০
মনের বন্দিত্বে নেই বৈশাখী উৎসব
ড. এ কে এম শাহনাওয়াজ

মনের বন্দিত্বে নেই বৈশাখী উৎসব

পরপর দুবছর বাঙালির সবচেয়ে বড় উৎসব বাংলা নববর্ষ উদযাপন করোনা বন্দিত্বে আটকে গেছে। বৈশি্বক এই মহাসংকটকে তো আর এড়ানোর উপায় নেই। গত বছর তবু কোথাও কোথাও বাঙালি উৎসব নিয়ে কিছুটা প্রকাশ্য হয়েছিল। কিন্তু এবার দ্বিতীয় ঢেউয়ের যে চণ্ডরূপ তাতে ঘরবন্দি থাকা ছাড়া কোনো উপায় নেই। তার পরও বাঙালি তার অন্তরে ধারণ করা নববর্ষকে অন্তরের আবেগ আর আনন্দ দিয়েই বরণ করবে। বাঙালির নববর্ষ শুধু বর্ষবরণের আনন্দই নিয়ে আসে না, নিয়ে আসে এক সংগ্রামী ঐতিহ্যের ইতিহাস। তা ছাড়া বাঙালির পহেলা বৈশাখ উদযাপন একটি নির্দিষ্ট ধারাবাহিকতায় বয়ে চলেনি। সময়ের পরিক্রমে এই দিবস তর্পণে বৈচিত্র্যও রয়েছে।

স্বাধীনতার পর থেকে অনেককাল আমরা সম্প্রদায় নির্বিশেষে আনন্দময় সরল জীবনই নির্বাহ করেছি। একসময় এ দেশের ধর্মীয় সমাজ জীবনে সাম্প্রদায়িক ভেদরেখা তৈরি করে অন্ধকার জীবগোষ্ঠী সমাজে পরিপুষ্ট হতে থাকে। তারা ছড়াতে থাকে বিভেদ। পাকিস্তানের এককালের প্রেসিডেন্ট আইউব খানের প্রেতাত্মা যেন এরা। ইতিহাস ও সংস্কৃতি মূর্খ এসব মানুষের কাজ হচ্ছে কোনোকিছুর সরল ব্যাখ্যায় না গিয়ে ধর্মের সত্যকে বিকৃত করে বিভ্রান্তি ছড়ানো। বাঙালিকে তারা হাজার বছরের ঐতিহ্য বিচ্ছিন্ন করার জন্য সমাজে ছড়ানোর চেষ্টা করেছিল যে, বাংলা ভাষা ও বাঙালি সংস্কৃতির ষোলোাআনাই এসেছে হিন্দু সংস্কৃতি থেকে। তাই ‘পুণ্যবান মুসলমান’ গ্রহণ করবে আইউব খানদের পাকিস্তানি সংস্কৃতি। কিন্তু বাঙালি তা গ্রহণ করেনি। আইউব খানের ভাবশিষ্যরা এখনো বলার চেষ্টা করে, বছর দুই আগে বৈশাখী উদযাপন ইসলামি সংস্কৃতিবিরোধী। যুগ যুগ ধরে বাঙালি পহেলা বৈশাখ উদযাপন করে এলেও অধুনা একই ষড়যন্ত্রের অংশীদার ধর্মান্ধগোষ্ঠী কয়েক বছর ধরে নববর্ষ পালনের বিরোধিতা করে সাম্প্রদায়িক ভেদবুদ্ধি ছড়িয়ে অন্ধকার আহ্বান করছে।

এভাবে প্রাচীন বাংলার কালপরিসর থেকে অদ্যাবধি বাঙালি সংস্কৃতি ও বাংলা ভাষা নানা ঘাত-প্রতিঘাতের মধ্য দিয়ে এগিয়েছে। প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ নানা কৌশলেই আঘাত এসেছে। এটি অব্যাহত ষড়যন্ত্রের অংশ। উদ্দেশ্য প্রায় অভিন্ন। উজ্জ্বল সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের ধারক বাংলা। প্রজন্মের পর প্রজন্ম এই ঐতিহ্য ধারণ ও লালন করে আত্মচৈতন্যে ফিরে আসে। স্বাজাত্যবোধে উদ্দীপ্ত হয়। অমন সতেজ জাতিকে বিভ্রান্ত করে কোনো পক্ষের লোভী উদ্দেশ্য বাস্তবায়ন সম্ভব নয়। তাই যুগ যুগ ধরে আগ্রাসী শক্তি বাঙালি প্রজন্মকে ঐতিহ্য ভোলাতে চেয়েছে। ঐতিহ্যের কাছে ফিরে যাওয়ার প্রধান বাহন ভাষা। এ কারণে বাংলা ভাষার ওপর আঘাত এসেছে বারবার। এখনো তা অব্যাহত আছে। আজ বাঙালির নববর্ষের প্রাক্কালে খুব প্রাসঙ্গিক হয়ে দেখা দিয়েছে এই ভাবনাগুলো পর্যালোচনা করা।

প্রাচীন বাংলায় পাল শাসনামলে বৌদ্ধ সিদ্ধাচার্যদের থেকে বাংলা সাহিত্যের ভ্রুণশিশু চর্যাপদের জন্ম ও বিকাশ ঘটেছিল। আমাদের ইতিহাসচর্চার সীমাবদ্ধতা অনেক ক্ষেত্রে ইতিহাস ও ঐতিহ্যচর্চার ধারাবাহিকতা অনুধাবন করতে বিঘ্ন সৃষ্টি করে। যতদূর মনে পড়ে, গত বৈশাখের আগে কোনো এক টিভি চ্যানেলের অনুষ্ঠানে উপস্থাপক পাল রাজাদের অবাঙালি বলেছিলেন। মিডিয়ায় কোনো সিদ্ধান্তমূলক জরুরি কথা বলতে হয় দায়িত্বশীলতার সঙ্গে। কারণ একই সঙ্গে মিডিয়ায় প্রচারিত বক্তব্য অসংখ্য দর্শককে তথ্যসমৃদ্ধ করতে পারে আবার ভ্রান্তির মধ্যেও ফেলে দিতে পারে। এ ক্ষেত্রেও তাই। আমরা মনে করি, বাঙালি সংস্কৃতির ক্রমবিকাশ বুঝতে হলে পাল শাসকদের পরিচয় স্পষ্ট হওয়া প্রয়োজন। একসময় তথ্যসূত্রের সংকটের কারণে পালদের অবাঙালি বহিরাগত মনে করা হতো। পরে পাল রাজা রামপালের জীবনী লিখতে গিয়ে সংস্কৃত কবি সন্ধ্যাকর নন্দী তার ‘রাম চরিতম’ গ্রন্থে প্রতিষ্ঠাতার পরিচয় প্রসঙ্গে লিখেছেন ‘গোপাল জনকভূ বরেন্দ্র’। অর্থাৎ গোপালের পিতৃভূমি বরেন্দ্র। বরেন্দ্রে বাড়ি হলে তারা তো বাঙালিই বটেন।

অসাম্প্রদায়িক দৃষ্টিভঙ্গি ছিল পাল রাজাদের। তাই বাঙালি সংস্কৃতি বিকাশে কোনো বাধা ছিল না এই পর্বে। এ সময় গড়া ভাস্কর্য-বিশেষ করে পোড়ামাটির অলংকরণ শিল্পে এর যথেষ্ট প্রমাণ পাওয়া যায়। চর্যাপদচর্চার মধ্য দিয়ে বাংলা ভাষা ও সাহিত্য অনেক দূর এগোতে পারত যদি এগারো শতকের মাঝামাঝি পালদের পতন ঘটিয়ে দক্ষিণ ভারতের ব্রাহ্মণ সেন বংশীয় রাজারা বাংলার ক্ষমতা দখল না করত। বাঙালির স্বাজাত্যবোধ ও লড়াকু ঐতিহ্য সম্পর্কে জানা ছিল সেনদের। নিজেদের অবৈধ ক্ষমতা দখলের বাস্তবতা সেন রাজাদেরই ভীত করে তুলেছিল। ভেবেছিল ঐতিহ্যের প্রণোদনায় সপ্রতিভ বাঙালি হয়তো তাদের মেনে নেবে না, প্রতিরোধ গড়ে তুলবে। এই কারণে বাঙালিকে স্তব্ধ করার পরিকল্পনা নেয় সেন রাজারা। সমাজকে চতুর্বর্ণে বিভাজন করে ঐতিহ্যে সচেতন বড়সংখ্যক বাঙালিকে শূদ্র অভিধায় কোণঠাসা করে ফেলতে চায়। বাঙালি প্রজন্ম যাতে ঐতিহ্যের কাছে ফিরে শক্তি সঞ্চয় করতে না পারে, তাই নানা অনুশাসন দিয়ে বাংলা ভাষাচর্চা নিষিদ্ধ করে দেয়। শিক্ষার অধিকারবঞ্চিত করে শূদ্র বাঙালিকে।

তেরো শতকের শুরুতে তুর্কি মুসলমানদের শাসন প্রতিষ্ঠিত না হলে বাংলা ভাষা ও সাহিত্য বিকাশের পথে বড় ধরনের অন্তরায় তৈরি হতো তা বলাই বাহুল্য। বাঙালির সৌভাগ্য বহিরাগত অবাঙালি মুসলিম শাসকরা মধ্যযুগের প্রায় ছয়শ বছর পৃষ্ঠপোষকতা দিয়ে বাঙালির ঐতিহ্য চেতনাকে দৃঢ় করেছিল। বাঙালির সৌভাগ্য ঔপনিবেশিক শাসকরা তাদের শাসন-দর্শনের কারণে বাঙালি সংস্কৃতি বিকাশে তেমন কোনো প্রতিবন্ধকতা তৈরি করেনি। বাংলা ভাষা ও বাঙালি সংস্কৃতির ওপর দ্বিতীয়বার বড় আঘাত আসে পাকিস্তানি শাসনামলের শুরুতে। সেন শাসকদের মতো অভিন্ন মানসিকতা ছিল পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠীর। বাঙালির ওপর শোষণ প্রক্রিয়া চালানোর পরিকল্পনার পথে হাঁটতে গিয়ে প্রথমেই অনুভব করেছিল বাঙালির উজ্জ্বল ঐতিহ্যের শক্তি। ঐতিহ্যের ব্যাখ্যা ও স্বরূপ ছড়িয়ে আছে সাহিত্য ও ইতিহাসে। সাহিত্যের বাহন ভাষা। তাই বাঙালি প্রজন্মকে ঐতিহ্য বিচ্ছিন্ন করার জন্য পাকিস্তানি শাসকচক্র হামলে পড়ে বাংলা ভাষার ওপর। এই ষড়যন্ত্রকে বাঙালি তরুণ রুখে দিয়েছিল রক্তমূল্যে। অন্যতম রাষ্ট্রভাষা হিসেবে বাংলা ভাষা স্বীকৃতি আদায় করে নেয়। তার পরও কি বাঙালি-সংস্কৃতি বিনাশী চিন্তা করেনি পাকিস্তানি শাসকচক্র।

বাঙালি সংস্কৃতিচর্চা মর্যাদা পায়নি পাকিস্তানি শাসকদের কাছে। বাঙালির ভাষা, সংস্কৃতি ও সাহিত্যের পুরোধা ব্যক্তি হিসেবে বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরকে টার্গেট করেন আইউব খান। জাতীয় প্রচারমাধ্যমে রবীন্দ্রসংগীত প্রায় নিষিদ্ধ হয়ে যায়। এই ষড়যন্ত্র দৃষ্টি এড়ায়নি সাংস্কৃতিক ব্যক্তিদের। প্রতিবাদে তারা ঢাকায় প্রতিষ্ঠা করেন সাংস্কৃতিক সংগঠন ‘ছায়ানট’। ছায়ানট সিদ্ধান্ত নেয় প্রতি নববর্ষ পালনের সূচনা হবে রবীন্দ্রসংগীত দিয়ে। নির্ধারিত হয় ‘এসো হে বৈশাখ...’। প্রথমে বলধা গার্ডেনে, পরে রমনার বটমূলে চলতে থাকে বাংলা নববর্ষের প্রভাতি উদ্বোধন। এটিই হচ্ছে বাঙালির মেধাবী প্রতিবাদ।

সাম্প্রতিক পর্বে শক্তি প্রয়োগে রমনার বটমূলে নববর্ষকে স্বাগত জানানোর দীর্ঘদিনের আয়োজনকে স্তব্ধ করে দিতে চেয়েছিল মৌলবাদী জঙ্গিরা। বোমা হামলায় রক্তাক্ত করেছিল রমনার বটমূলের প্রাঙ্গণ। কিন্তু এতে কি রুদ্ধ করা গেছে বাঙালির বৈশাখী আয়োজন। প্রতিবাদী বাঙালি এর পরের বছর আরও লোকারণ্য করে ফেলে ঢাকা শহর। এ জোয়ার আরও প্রাণবন্ত করে তোলে পুরো দেশকে।

শুরুতে আভাস রাখা হয়েছে, বৈশাখ এলে কোনো কোনো মহল ধর্মান্ধ চিন্তা থেকে বিষবাষ্প ছড়াতে চায়। বাঙালির দীর্ঘদিনের লোকজ উৎসবের সৌন্দর্যকে ধর্মের নামে ভুল ব্যাখ্যা দিয়ে বিভ্রান্ত করতে চায় সরলমতি বাঙালি মুসলমানকে। কিন্তু খুব সুবিধা যে তারা করতে পারবে না তা বাঙালির দীর্ঘদিনের ঐতিহ্য বলে দেয়। ঐতিহাসিকভাবেই বাঙালি-সংস্কৃতি বিনাশী কোনো প্রচেষ্টা কোনো ষড়যন্ত্র সফল হয়নি। এদের হীন প্রচেষ্টা বারবার ব্যর্থ করে দিচ্ছে বাঙালি সংস্কৃতির ঐশ্বর্য। এমন ঐতিহ্য যে জাতি বহন করে আধিপত্যবাদীরা তাদের দেখে ভীত হবেই। কিন্তু ভয় হয় তখনই কোনো অসর্তকতায় আমরা আমাদের সাংস্কৃতিক গরিমাকে যেন না হারিয়ে ফেলি।

তবে বাঙালি সমস্ত ঘাত-প্রতিঘাতকে মোকাবিলা করে হৃদয় দিয়ে আগলে রাখে তার সংস্কৃতির মহিমাকে। পহেলা বৈশাখ সাংস্কৃতিক শক্তির নবায়নের দিন। সাম্প্রদায়িক শক্তির পাশাপাশি করোনার চোখ রাঙানি। তবু আমরা স্বাগত জানাব নববর্ষকে। মনের বন্দিতে আবদ্ধ থাকবে না নববর্ষ উদযাপন। কাগজে দেখলাম বিকল্পব্যবস্থা তৈরি করা হয়েছে। ভার্চুয়াল মাধ্যমে মঙ্গল শোভাযাত্রা যুক্ত হবে এবার। অর্থাৎ অন্ধকারে থাকা কূপমন্ডূকদের যেমন করে বাঙালি উপেক্ষা করেছে করোনার চোখ রাঙানিকেও সে পরোয়া করবে না। এরই প্রকাশ হিসেবে আজ সর্বোচ্চ সতর্কতায় থেকে নববর্ষকে সবাই স্বাগত জানাচ্ছে।

লেখক অধ্যাপক, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়

[email protected]