বাংলার সর্বজনীন উৎসব|287570|Desh Rupantor
logo
আপডেট : ১৪ এপ্রিল, ২০২১ ০০:০০
বাংলার সর্বজনীন উৎসব
গাজী তানজিয়া

বাংলার সর্বজনীন উৎসব

স্বাধীনতার পঞ্চাশ বছরে বাংলাদেশের সংস্কৃতিতে যে উৎসবটা সর্বজনীনতা পেয়েছে তা হলো পহেলা বৈশাখ বা বাংলা নববর্ষ। যদিও মুঘল আমল থেকে শুরু করে জমিদারি শাসনামল পর্যন্ত দেশীয় ভূ-স্বামীদের সাধারণ কৃষকের ওপরে করা শোষণ ও নিপীড়নের চিহ্ন ইতিহাস এখনো বহন করে চলেছে, তবু বর্তমান সময়ে এসে ধর্ম-বর্ণ-নির্বিশেষে পহেলা বৈশাখ সত্যিকার অর্থে উৎসবের দিন হয়ে উঠেছে সেটাই যা স্বস্তির।

জেমস জর্জ ফ্রেজার ‘দি গোল্ডেন বাউ’ গ্রন্থে ধর্মীয় ও লৌকিক ক্রিয়ানুষ্ঠানকে দুই ভাগে ভাগ করেছেন একটি অনুকরণমূলক এবং অপরটি সংক্রামক। পহেলা বৈশাখ এখন অনুকরণ ছাপিয়ে বলতে গেলে হয়ে উঠেছে সংক্রামক।

শহরের শিক্ষিত মানুষ, আরও নির্দিষ্ট করে বললে বলতে হয় মধ্যবিত্ত শিক্ষিত মানুষ পুনরায় আবিষ্কার করেছে নববর্ষকে। কারণ শহরের খেটে খাওয়া মানুষের কাছেও গ্রামের প্রান্তিক মানুষের মতো একটা দিনের সঙ্গে আরেটা দিনের পার্থক্য খুব কম। শহরের মধ্যবিত্তরা নববর্ষকে পুনরাবিষ্কার করেছে তাদের প্রয়োজনে। এই পুনরাবিষ্কার বিষয়টা মোটেই নেতিবাচক নয়। এর একটা গঠনমূলক ও ইতিবাচক অভিঘাত রয়েছে, যা প্রভাবিত করেছে আমাদের জাতীয় চিন্তাকে এবং আমাদের সংস্কৃতি ভাবনাকে। কিন্তু মধ্যবিত্ত যেহেতু পুনরাবিষ্কার করেছে দিনটিকে সুতরাং এর মালিকানাও সে দাবি করেছে। মধ্যবিত্তের মালিকানাধীন সম্পত্তি যেহেতু একসময় এলিট শ্রেণির হাতে চলে যায়, বাঙালির নববর্ষও এলিটের হাতে পড়ে রূপান্তরিত হয়েছে। নিম্নবর্গীয়দের নববর্ষ এখন খোলনলচে পাল্টে এলিটের নববর্ষে রূপ নিয়েছে।

পহেলা বৈশাখ এখন মূলত একটা বাণিজ্যিক উৎসবে পরিণত হয়েছে। পুঁজিবাজারের পালে পহেলা বৈশাখ এনে দিয়েছে নতুন হাওয়া, যা মূলত পোশাক ও খাদ্যকেন্দ্রিক হয়ে উঠেছে। পহেলা বৈশাখে মেলার একটা প্রচলন প্রাচীনকাল থেকেই ছিল, যেখানে দেশীয় কামার-কুমারের পণ্য, শিশু খেলনা এবং খাবারের সওদাই প্রাধান্য পেত। নব্য ধনিক শ্রেণির হাতে পড়ে পণ্য প্রসারের বিশাল ক্ষেত্র হয়ে উঠেছে এই দিনটা। আর যেহেতু পুঁজিবাজারের হাতে পড়েছে দিনটা, তাই সব শ্রেণি-পেশার মানুষের দোরগোড়ায় পৌঁছে যেতে বেগ পেতে হয়নি।

তবে ইতিহাস যা সাক্ষ্য দেয় তাতে, পহেলা বৈশাখ বা নববর্ষ একসময়ে শুধুমাত্র সম্পন্ন কৃষক আর সচ্ছল ব্যবসায়ীদের ঘরেই উৎসবের বাতাবরণ তৈরি করেছিল। বাংলার প্রান্তিক কৃষক, শ্রমিক বরাবরই দরিদ্র ও শোষিত। নববর্ষ প্রবর্তনের শুরুর দিকটা লক্ষ করলে আমরা দেখব, সম্রাট আকবরের নবরত্ন সভার অন্যতম রত্ন আল্লামা আমির ফতেউল্লাহ সিরাজী চান্দ্রবর্ষ আর সৌরবর্ষের সমন্বয়ে সেকালে সুবে বাংলার জন্য যে ফসলি সন তৈরি করেছিলেন তা-ই আমাদের বঙ্গাব্দ। কৃষিপ্রধান বাংলা মুল্কে বাংলা অর্থবছর শুরু হয় পহেলা বৈশাখ থেকে। শীতকালীন ফসল বোনার মৌসুম কার্তিক মাস আর ফসল তোলার মৌসুম হলো মাঘের শেষ থেকে চৈত্রের প্রথম অবধি। সরকার মহাজন আর জমিদার শ্রেণি বুঝে নিয়েছিলেন চৈত্র মাসের মধ্যেই যা কিছু পাওনা তা কৃষকের কাছ থেকে নিয়ে নিতে হবে, ছলে-বলে-কিংবা কৌশলে। কেননা চৈত্র শেষ হয়ে গেলে কৃষকের হাতে আর কোনো টাকা থাকবে না। সুতরাং চৈত্র কৃষককে নিংড়ে নেওয়ার মাস, আর জমিদার, মহাজন, দোকানদার ও পাওনাদার গোষ্ঠীর কাছে চৈত্র মাস হলো আদায় উশুলের মাস।

এজন্যই অতীতের জমিদাররা বসাতেন পুণ্যাহ। এই পুণ্যাহর দিনে প্রজাকে যেতে হতো জমিদারবাড়ি। প্রজাদের আকৃষ্ট করার জন্য এ সময় জমিদারবাড়িতে চলত লাঠিখেলা, জমত কবিগানের আসর, ঘোষণা করা হতো সালতামামিতে খাজনা শোধ করলে বকেয়া সুদ লাগবে না। এই পুণ্যাহর দিনে জমিদার বাবুরা সাধারণ প্রজা সাধারণকে দর্শন দিতেন। খাজনা দিয়ে, বাজনা শুনে প্রজাপাট মিষ্টিমুখ করে বাড়ি ফিরে যেত। এখানে প্রজার স্বার্থ বা আনন্দের উৎস কোথায় তা খুঁজে পাওয়া যায় না। তারপরও নববর্ষ বাঙালি কৃষকের জন্য একটি উৎসবের দিন হয়ে আসে।

পৃথিবীর সব দেশেই আধিপত্যকারী শ্রেণির সংস্কৃতিই জাতীয় সংস্কৃতি হিসেবে পরিগণিত হয় এবং উৎসব-পাগল আমজনতা সেই মেওয়া লুফে নেয়। জমিদার মহাজনদের ভাড়াটে লাঠিয়ালের লাঠিখেলা, কুস্তিগিরের কুস্তি-কসরত আর বায়না করা কবিয়ালের কবিগান ছিল উৎপাদক শ্রেণির কৃষক-প্রজাদের নিংড়ে নেওয়ার মনস্তাত্ত্বিক ক্ষতিপূরণ। আমরা এখনো দেখি আমাদের জাতীয় উৎপাদনে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অথচ সবচেয়ে অবহেলিত সম্প্রদায় হলো কৃষকশ্রেণি। যদিও আমরা এখন আর আক্ষরিক অর্থেই একটা কৃষিপ্রধান অর্থনৈতিক কাঠামোর ভেতরে নেই। অথচ এই পুঁজিবাদী সমাজে থেকে এমন প্রহসনের ভেতর দিয়ে কি আমরা যাচ্ছি না? আমরা সরকারকে যে ট্যাক্স দিই তা কোথায়, কোন খাতে কতটা খরচ হয় আমরা কিছু জানি না। আমাদের গ্যাস, বিদ্যুৎসহ নিত্যপণ্যের দাম ক্রমাগত বাড়ানো হয়, আমরা তার কোনো প্রতিবাদ করি না। আমাদের সামনে উন্নয়নের একটা মুলা ঝোলানো হয়। কাঠামোগত উন্নয়ন যে প্রকৃত অর্থে উন্নয়ন না, সে কথা আমরা মুখ ফুটে বলি না। কারণ আমাদের বলার স্বাধীনতা নেই। আমরাও উৎসবে বুঁদ হয়ে থাকি। উৎসব প্রবণ জাতি মূলত আত্মকেন্দ্রিক হয়। সামগ্রিকতায় তাদের উৎসাহ কম। তারা বিপ্লবে অনীহ। তাই করপোরেট জগৎ আমাদের সামনে নানা উৎসবের মুলা ঝুলিয়ে রাখে। আমাদের জাতীয় শোক, জাতীয় গৌরব সবকিছু এক করপোরেট র‌্যাপিং পেপারে মুড়িয়ে উৎসবের আমেজে আমাদের সামনে হাজির করা হয়।

এ ধরনের কর্মকাণ্ড মূলত সমাজপতিদের এক অলিখিত চক্রান্ত। প্রাক-আমলে উৎসব আয়োজনের ছদ্মাবরণে জমিদারের লাঠিয়াল, পাইক, বরকন্দাজরা মূলত হাতি, বাঘ, সিংহ, সাপ, শকুনসহ নানা হিংস্র বন্য প্রাণীর মুখোশ পরে, যত সব লোমহর্ষক বীভৎস কর্মকাণ্ডের মহড়া চালাত চৈত্র মাসজুড়ে। পিঠে বড়শি গেঁথে চড়ক ঘোরানো হতো মানুষকে। অর্থাৎ প্রজাদের জানিয়ে দেওয়া হতো খাজনাপাতি না দিলে কি অবস্থা তাদের হতে পারে। জমিদারদের উদ্যোগে ও আনুকূল্যে এই অন্তজ শ্রেণির পাইক, পেয়াদা, বরকন্দাজরা এসব মেলা, আড়ং, লাঠিখেলা, চড়ক, কবিগানের উৎসব আয়োজন চালাত চৈত্র পর্যন্ত। ইতিহাস সাক্ষী গ্রামীণ প্রজা ও কৃষককুল তথা উৎপাদক-শ্রেণিরা নববর্ষের মতো এসব উৎসব আয়োজন ও পার্বণ কখনো পালন করেনি। বরং জমিদারের পাইক-পেয়াদাদের ঢাকের বাড়ি শুনে গ্রামীণ কৃষক দুরু দুরু বুকে উপলব্ধি করত সালতামামের দিন এসে গেছে; প্রয়োজনে হাঁড়ি-কুড়ি বিক্রি করে হলেও যাবতীয় ধার-দেনা পরিশোধ করতে হবে।

পরে পাকিস্তান আমলে পশ্চিমাদের বিরোধিতায় বাঙালি যে বাংলা সনকে গ্রহণ করেছিল, তা ছিল নিছক রাজনৈতিক। শিক্ষিত বাঙালি মুসলমানের মানস জগতে একটা বৈপ্লবিক পরিবর্তন পঞ্চাশ ও ষাটের দশকে ঘটতে থাকে। রাজনীতির ক্ষেত্রে যেমন গণতন্ত্র এবং স্বাধিকারের আন্দোলন, ভাষার ক্ষেত্রে যেমন বাংলা ভাষা প্রতিষ্ঠা করার সংগ্রাম, তেমন বাংলা নববর্ষ উদ্যাপনের ব্যাপারগুলো সামনে চলে আসে। আমাদের রাজনীতির সব রণকৌশল এ ক্ষেত্রে সফল হয়েছে। কৃষিপ্রধান বাংলার শাসন কাঠামোয়ও অনেক পরিবর্তন ঘটেছে। আর সন হিসেবে পহেলা বৈশাখ আমাদের সংস্কৃতির পরিমণ্ডলে এক স্থায়ী ভীত গড়তে সক্ষম হয়েছে। স্বাধীনতা-পরবর্তীকাল থেকে বাংলা নববর্ষ আক্ষরিক অর্থেই বাঙালির একটা উৎসবের দিন।

তথ্যসূত্র :

সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম; বৈশাখ শুরুর সংস্কৃতি, ২০০২।

নববর্ষ ও বাংলার লোকসংস্কৃতি;

সম্পাদনা আবুল কালাম মনজুর মোর্শেদ।

চৈত্রের শেষ বৈশাখের শুরু; আখতারুল আলম।

লেখক : কথাসাহিত্যিক

[email protected]