উৎস থেকে টিকা আনা এবং দেশে টিকা উৎপাদন জরুরি |292067|Desh Rupantor
logo
আপডেট : ৯ মে, ২০২১ ১৪:৪৮
উৎস থেকে টিকা আনা এবং দেশে টিকা উৎপাদন জরুরি

উৎস থেকে টিকা আনা এবং দেশে টিকা উৎপাদন জরুরি

মো. তৌহিদ হোসেন

মো. তৌহিদ হোসেন সাবেক পররাষ্ট্র সচিব। পেশাগত জীবনে তিনি বাংলাদেশ হাইকমিশন দিল্লি ও কলকাতায় দায়িত্ব পালন করেছেন। পরবর্তী সময়ে তিনি দক্ষিণ আফ্রিকায় বাংলাদেশের হাইকমিশনার হিসেবে নিয়োগপ্রাপ্ত হন। বাংলাদেশে ভারতীয় করোনার টিকা রপ্তানি বন্ধ ঘোষণা, পশ্চিমবঙ্গের নির্বাচন ও বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কের ভবিষ্যৎসহ প্রাসঙ্গিক বিষয়গুলো নিয়ে কথা বলেছেন সাবেক এই কূটনীতিক। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন দেশ রূপান্তর সম্পাদকীয় বিভাগের এহ্সান মাহমুদ

দেশ রূপান্তর : ভারতের সেরাম ইনস্টিটিউট অক্সফোর্ড-অ্যাস্ট্রাজেনেকার উদ্ভাবিত টিকা উৎপাদন ও বাজারজাত করে আসছিল। গত বছর নভেম্বরে বাংলাদেশের বেক্সিমকো ফার্মা আমাদের স্বাস্থ্য বিভাগকে সরবরাহ করার জন্য সেরাম ইনস্টিটিউট থেকে তিন কোটি ডোজ টিকা কেনার চুক্তি সম্পাদন করে। তার মধ্যে দেড় কোটি ডোজের মূল্যও বাংলাদেশ সরকার পরিশোধ করেছে। এখন ভারতে করোনার প্রকোপ বৃদ্ধি পাওয়ায় ভারত টিকা দিতে অপারগতার কথা জানিয়েছে। করোনার টিকা রপ্তানি বন্ধ করায় ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্কে টানাপড়েন দেখা দেবে কি না?

মো. তৌহিদ হোসেন : ভারত আমাদের দেশে টিকা রপ্তানি বন্ধ করেছে, অন্যান্য দেশেও বন্ধ করেছে। বিষয়টা এমন নয় যে, ভারত শত্রুতা করে আমাদের টিকা দিচ্ছে না। তাদের দেশে বিপর্যয় দেখা দেওয়ায় নিজেদের প্রয়োজনে টিকা রপ্তানি বন্ধ করেছে। এতে করে আমরা ক্ষুব্ধ হয়েছি। তারা প্রতিশ্রুতিবদ্ধ ছিল যে, আমাদের টিকা দেবে। মনে করা হয়েছিল, প্রয়োজনীয় সব টিকা ভারত থেকেই পাওয়া যাবে। এখন টিকা না পাওয়ায় আশাভঙ্গ হয়েছে। কিন্তু আমাদের শুরুতেই ভুল হয়েছিল, টিকার জন্য কেবল একটি দেশের ওপর নির্ভরশীল থাকা উচিত হয়নি।। তবে এতে করে ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্কে অবনতি হবে বলে আমি মনে করি না। টিকা না পাওয়ায় হয়তো অসন্তোষ থাকবে, কিন্তু সার্বিক সম্পর্ক খারাপ হয়ে যাবে এমনটা নয়। এখান থেকে আমাদের একটি উপলব্ধি থাকতে হবে, কোনো কিছুর জন্যই কেবল একটি উৎসের প্রতি নির্ভর করা ঠিক হবে না। ভারত আমাদের বন্ধুরাষ্ট্র এটা ঠিক আছে, তবে তারা তো তাদের স্বার্থই দেখবে, এটাও আমাদের মেনে নিতে হবে।

দেশ রূপান্তর : শুরু থেকেই করোনার টিকার জন্য কেবল একটি দেশের প্রতি অধিক নির্ভরশীলতা কেন  তৈরি হয়েছিল বলে মনে করেন? বন্ধুরাষ্ট্র হিসেবে পরিচিত ভারত ছাড়া অন্য কোনো দেশের সঙ্গে কেন টিকা কূটনীতির বিষয়টি আগায়নি, ভারতের কোনো চাপ ছিল কি না?

মো. তৌহিদ হোসেন : ভারতের পক্ষ থেকে কোনো চাপ ছিল কি না তা আমি বলতে পারব  না। সরকারের লোক যারা এই মুহূর্তে রয়েছেন, এ বিষয়ে তারা বলতে পারবেন। তবে প্রায় ১৮ কোটি জনসংখ্যার একটি দেশের জন্য ভারতের সঙ্গে মাত্র ৩ কোটি টিকার একটি চুক্তি করে বসে থাকা যৌক্তিক হয়নি। 

দেশ রূপান্তর : এপ্রিল মাস থেকেই ভারতে করোনা পরিস্থিতির ক্রমেই অবনতি হচ্ছে। করোনার ভারতীয় ভ্যারিয়েন্ট নিয়ে ঝুঁকির মুখে ভারতের সঙ্গে দুই সপ্তাহের জন্য সীমান্ত বন্ধ রাখার সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। বিষয়টিকে কীভাবে দেখছেন?

মো. তৌহিদ হোসেন : এটি একটি ভালো সিদ্ধান্ত। এটা দরকারও ছিল। পৃথিবীর বিভিন্ন দেশই প্রয়োজনের নিরিখে চলাফেরা নিয়ন্ত্রণ করছে। এখন ভারতে করোনার একটি খুবই ভয়াবহ পর্যায় চলছে। বিশেষ করে করোনার ভারতীয় স্ট্রেইন নিয়ে উদ্বেগ সর্বব্যাপী। প্রয়োজনে তাই এই নিয়ন্ত্রণের মেয়াদ বাড়াতে হতে পারে। কিন্তু এটি কীভাবে পালন করা হচ্ছে, সেদিকে নজর দিতে হবে। একটি খবরে দেখলাম ভারত থেকে যারা ট্রাকে পণ্য নিয়ে প্রবেশ করছেন, সেসব ড্রাইভার রা কেউ মাস্ক পরিধান করছেন না। এমনকি দেশের অভ্যন্তরে আসার পরে স্বাস্থ্যবিধি মেনে আইসোলেটেডও থাকছেন না। আমি মনে করি, ব্যবসা-বাণিজ্য সচল রাখতে হবে, তবে সেটি অবশ্যই করোনার স্বাস্থবিধি মেনে। দেখা যাচ্ছে ট্রাক ড্রাইভাররা মালামাল নিয়ে আসার পরে তা খালাস করতে গিয়ে রাত্রিযাপন করছেন। এতে করেও ঝুঁকির মাত্রা বাড়ছে। যে পরিমাণ ট্রাক একদিনে দেশে প্রবেশ করলে পণ্য খালাস করার সমর্থ আছে, সেই পরিমাণই প্রবেশের অনুমতি দেওয়া উচিত। যাতে চালকদের রাত্রিযাপন করতে না হয়। নিরাপত্তার স্বার্থে এটা নিশ্চিত করা প্রয়োজন। এমনটা করতে পারলে আরও নিশ্চিত ও নিরাপদ হওয়া যেত। কারণ, সামান্য মেলামেশা থেকেই কিছুসংখ্যক বাংলাদেশিও যদি আক্রান্ত হয়, তাদের মাধ্যমেই এই বিপজ্জনক স্ট্রেইন ছড়িয়ে পড়তে পারে। এ ব্যাপারে সাবধানতার কোনো বিকল্প নেই। 

দেশ রূপান্তর : ভারতের সেরাম ইনস্টিটিউট যদি চুক্তিতে প্রতিশ্রুত ভ্যাকসিন সরবরাহ করতে না পারে, তাহলে অগ্রিম দেওয়া অর্থ ফেরত পাওয়া যাবে বলে জানিয়েছেন অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল। এই অর্থ কী উপায়ে ফেরত পেতে পারে বাংলাদেশ? সেটা আসলেই সম্ভব কি না?

মো. তৌহিদ হোসেন : এটা একটি বাণিজ্যিক চুক্তি। ভারতের সেরাম ইনস্টিটিউট এবং বাংলাদেশের বেক্সিমকো ফার্মাসিউটিক্যালস এই চুক্তি করেছে। বাংলাদেশ সরকারের কাছ থেকে টাকা নিয়ে বেক্সিমকো ফার্মা সেরাম ইনস্টিটিউটকে দিয়েছে। যদি টিকা সরবরাহ করতে না পারে তবে টাকা ফেরত দেওয়ার দায়িত্ব বেক্সিমকোর। বেক্সিমকো ফার্মা কীভাবে সেরাম ইনস্টিটিউট থেকে টাকা আদায় করবে সেটা তাদের ব্যাপার। এই বিষয়ে সরকারের একজন মন্ত্রীর কেন কথা বলতে হবে! 

দেশ রূপান্তর : এবার পশ্চিমবঙ্গের নির্বাচন প্রসঙ্গ। টানা তৃতীয়বারের মতো মমতা ব্যানার্জির নেতৃত্বে তৃণমূল কংগ্রেস ক্ষমতায় এলো। এর আগে বিভিন্ন সময়ে বাংলাদেশের জনমুখে আলোচনা হয়েছে তিস্তা চুক্তি না হওয়ার পেছনে মমতার বিরোধিতা একটি বড় কারণ। তবে তিস্তা বা অন্য বিষয়ে বাংলাদেশের সঙ্গে চুক্তি পশ্চিমবঙ্গের হবে না, এটা সত্যি। হবে ভারতের কেন্দ্রীয় সরকারের সঙ্গে। কিন্তু এইবার মমতার নির্বাচনী প্রচারণায় বাংলাদেশবিরোধী মনোভাব অনুপস্থিত ছিল। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের সেøাগান ‘জয় বাংলা’ ছিল মমতা এবং তার নেতাকর্মীদের মুখে মুখে। বিষয়টিকে কীভাবে মূল্যায়ন করবেন? 

মো. তৌহিদ হোসেন : শুরুতেই বলি, তিনি ‘জয় বাংলা’ বলেছেন বাংলাদেশ অর্থে নয়। তার নির্বাচনী এলাকা পশ্চিমবঙ্গ যার অধিকাংশ মানুষ বাঙালি, তিনি সেটা বোঝাতে ‘জয় বাংলা’ ব্যবহার করেছেন। তিনি পশ্চিমবঙ্গের নামও ‘বাংলা’ করার কথা বলেছিলেন। তার নির্বাচনী প্রচারণায় তিনি ‘জয় বাংলা’ ব্যবহার করেছিলেন, কারণ ভারতের শাসক দল বিজেপির কেন্দ্রীয় নেতারা নির্বাচনের সময় বাড়াবাড়ি রকমে পশ্চিমবঙ্গে অবস্থান করেছেন এবং নানা উসকানিমূলক বক্তব্য দিয়েছেন। দেখার বিষয় হচ্ছে, বিজেপি কেন্দ্রীয় নেতাদের কেউই বাংলাভাষী নন, হিন্দি বা অন্য কোনো ভাষাভাষী। তাই মমতা ব্যানার্জি তার প্রচার কৌশল হিসেবে ‘জয় বাংলা’ ব্যবহার করেছেন। এর মানে এই নয় যে, তিনি পশ্চিমবঙ্গের স্বার্থের বাইরে কিছু করবেন। মমতা ব্যানার্জি আবারও ক্ষমতায় আসায় তিস্তা চুক্তি হওয়া বা না হওয়া নিয়ে আগের মতো অবস্থাই রয়েছে। আবার বিপরীত দিক থেকে চিন্তা করলে ভারতের কেন্দ্রীয় সরকার তো বিজেপির দখলেই। এইবার পশ্চিমবঙ্গেও বিজেপি নিজেদের শক্ত অবস্থান দেখিয়েছে। তারা হয়তো বিজয়ী হতে পারেনি। কিন্তু বিজেপি গতবারের ৩ আসনের তুলনায় এবারের ৭৭ আসন দখল করে অনেক বেশি শক্তি প্রদর্শন করছে। পশ্চিমবঙ্গে তারা অন্য সব দলগুলোকে প্রায় নিশ্চিহ্ন করে দিয়েছে। এইবার তারা বিরোধী দল হয়েছে, চেষ্টা করবে আগামীতে ক্ষমতায় যেতে। কাজেই বিজেপি তিস্তার পানি বাংলাদেশকে দিয়ে দিয়েছে এমনটা বলার সুযোগ বিজেপি মমতাকে দিতে চাইবে বলে মনে হয় না। আমার মনে হয় পশ্চিমবঙ্গে যদি বিজেপি জয়ী হতো, তবুও বিষয়টি চট করেই সমাধান হতো না।

দেশ রূপান্তর : এখন চীন এবং রাশিয়া থেকে করোনার টিকা আনতে সরকারের আগ্রহ দেখা যাচ্ছে। এরইমধ্যে খবর এসেছে চীনের টিকা ১২ মে’র আগেই দেশে আসবে। দেশে টিকা সংকটের সময়ে এই বিষয়টিকে কীভাবে দেখছেন?

মো. তৌহিদ হোসেন : করোনার টিকা নিয়ে আমরা এখন যেই কাজগুলো করছি, সেটি আরও আগেই শুরু করা উচিত ছিল। কমপক্ষে আরও দুইমাস আগে শুরু করলে হয়তো ইতিমধ্যে সুফল পাওয়া যেত। করোনার টিকা নিয়ে যে শুধু বাংলাদেশেই সমস্যা হচ্ছে তা নয়। পশ্চিমের দেশগুলোতেও সমস্যা হয়েছে। চীন থেকে যে পাঁচ লাখ টিকা আসছে, সেটি আমাদের দেশের চাহিদার তুলনায় তেমন কিছু না। ইতিমধ্যে দেশে নতুন করে করোনার টিকার নিবন্ধন বন্ধ রয়েছে। এখন যদি পাঁচ লাখ টিকা আসে, সেটি দিয়ে আড়াই লাখ লোককে টিকা দেওয়া যাবে। কারণ প্রথম ডোজ দেওয়ার পর দ্বিতীয় ডোজ দেওয়ার টিকা আর পাওয়া যাচ্ছে না, এমন পরিস্থিতি যাতে তৈরি না হয় সে বিষয়ে সজাগ থাকতে হবে। ভারতের প্রতি একক নির্ভরতা কাটাতে আমরা টিকা নিয়ে তৎপরতা একটু দেরিতে শুরু করেছি। এখন সেই ভোগান্তিটুকু হবেই। এখন রাশিয়ার স্পুৎনিক, চীনা টিকা কিংবা কারও সঙ্গে চুক্তির মাধ্যমে উৎপাদনে যাওয়ার দিকে এগোতে হবে। আর এই কাজগুলো করতে হবে দ্রুততার সঙ্গে।

দেশ রূপান্তর : দেশে টিকা কূটনীতি নিয়ে আপনার সুনির্দিষ্ট পরামর্শ কী?

মো. তৌহিদ হোসেন : এখানে করোনা কিংবা টিকা কূটনীতি নিয়ে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে পরামর্শ দেওয়ার কিছু নেই। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় কোনো ভুল করেনি। দায় থাকলে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের রয়েছে। দেশে করোনার অবস্থা কেমন, কতগুলো টিকা দরকার এসব ঠিক করবে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়, পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় নয়। দুটো ভুল এখানে হয়েছে। তারা ৩ কোটি টিকার চুক্তি করে চুপচাপ বসে ছিল। যদি চুক্তি অনুসারে ভারত সব টিকা দিতও, সেটিও যথেষ্ট হতো না বাংলাদেশের জন্য। ভারত ছাড়াও টিকার জন্য বিকল্প চিন্তা থাকা দরকার ছিল। এখন পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় রাশিয়া, চীন ও যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে যোগাযোগ করছে। টিকা পাওয়ার জন্য বা উৎপাদনে যাওয়ার জন্য চুক্তির ক্ষেত্র প্রস্তুত করছে। এই কাজগুলো যত দ্রুত সময়ে করা সম্ভব হবে, ততই মঙ্গল।

দেশ রূপান্তর : আপনাকে অনেক ধন্যবাদ।

মো. তৌহিদ হোসেন : আপনাকেও ধন্যবাদ।