জিললুর রহমানের কবিতা ‘ওপারে বারিছা’|295753|Desh Rupantor
logo
আপডেট : ৩১ মে, ২০২১ ১৫:৫৫
জিললুর রহমানের কবিতা ‘ওপারে বারিছা’

জিললুর রহমানের কবিতা ‘ওপারে বারিছা’

জিললুর রহমান

কবি, গদ্যকার ও অনুবাদক ​​​জিললুর রহমানের জন্ম ​​১৬ নভেম্বর ১৯৬৬ সালে, ​চট্টগ্রামে। তাঁর প্রকাশিত কাব্যগ্রন্থ ​অন্যমন্ত্র (লিরিক, ১৯৯৫), শাদা অন্ধকার (লিরিক, ২০১০) ও ডায়োজিনিসের হারিকেন (ভিন্নচোখ, ২০১৮)। এক ফর্মার দীর্ঘকবিতা আত্মজার প্রতি (বাঙময়, ২০১৭) ও শতখণ্ড (বাঙময়, ২০১৭)। প্রবন্ধ গ্রন্থ ​উত্তর আধুনিকতাঃ এ সবুজ করুণ ডাঙ্গায় (লিরিক, ২০০১; পরিবর্ধিত ২য় সংস্করণ: খড়িমাটি, ২০১৯) ও অমৃত কথা (লিরিক, ২০১০)। অনুবাদ গ্রন্থ:  ​আধুনিকোত্তরবাদের নন্দনতত্ত্বঃ কয়েকটি অনুবাদ (২০১০), নাজিম হিকমতের রুবাইয়াৎ (বাতিঘর, ২০১৮) ও ​​এমিলি ডিকিনসনের কবিতা (চৈতন্য, ২০১৮)। এ ছাড়া সম্পাদনা করেছেন লিটল ম্যাগাজিন ​যদিও উত্তরমেঘ (২০১৮)।

 

ওপারে বারিছা

 

ভেসে যাই জলে—জলের পুকুরে জ্বলে অগ্নি—

তার পাশে ওই ঘন গভীর জঙ্গল—

গাঢ় আঁধারের তীব্র সবুজ বারিছা—

ভেসে যাই—চিতল মাছের রূপে

রোদ্দুরের খেলাচ্ছলে চকচকে দুপুরে—

বারিছা পেরিয়ে গেলে বিস্তীর্ণ মাঠের ধানে

অবিন্যস্ত রোদ্দুরের মায়া হাসি—

কখনো মাছের মতো, কখনো লাশের—

আবার কখনো জলপদ্ম—ভাসি, ভেসে যাই

 

২.

যারা ভাসে তারা সব পানা কিংবা পদ্মপাতা নয়

ভাসে প্রেম সংসারের টানা ও পোড়েন যত অনটন

ভাসে পলিথিন ভাসে সভ্যতার নানান বেতার

কালস্রোতে নিত্য ভাসে সহস্র সময় স্বপ্ন আর মায়া

পুকুরের পরেই বারিছা—

কতো বেতগাছ আর কতো আছারগুলার থোকা

কতো আম জাম ফলের পাশেই বেগুনী জারুল

কিছু তার ঠিক ঠিক চিনি কিছু করি মারাত্মক ভুল

ওদিকে চাঁদের আলো—ভাসিয়ে নিয়েছে যতো

আঁধারের ভয়ধরা কালো—যতো বিষণ্নতা

 

৩.

ভেসে গেছে মহেঞ্জোদারোর কাল—সিন্ধুর জলের ধারা

গিলগামেশের দিন চলে গেছে—বিগত হয়েছে একিলিস।

এখনও ভাসছে প্রাণ—জেরুসালেমের পথে—

বারুদের আস্ফালনে ভাসে—নারী শিশু—

সিমেন্ট কাঁকড় ইট—সভ্যতার লেলিহান শিখা!

 

৪.

ভেসে যায়—রক্ত—ফিলিস্তিনি শিশুর বুকের—

প্রমত্ত জ্যোস্নায় ঘোলা পুকুরের জলে রক্ত ভেসে থাকে—

বিবর্ণ প্রাচীন আল আকসা—নীরব নিথর

এখানে জেরুসালেমে—ঈশ্বরের নয়া নাম বীভৎসতা—

এইখানে মায়েরা বুকের রক্তে—ভাসিয়ে রেখেছে প্রেম

বিশ্বময় আমরা সকলে ভাসি স্রোতে—নেতানিয়াহু’র

—জো বাইডেনের

গাজায় চাঁদের রং গাঢ় লাল—আসমানে

মেঘ ভাসে—লালে লাল—বীভৎসতা ভাসে—

 

৫.

মহাকাল ভেসে চলে—বিগ ব্যাং থেকে ব্ল্যাকহোল—

আকাশ মেঘের জটাজাল নিয়ে

চলেছে সে কোন উল্টোডাঙ্গা—

ফিলিস্তিনি শিশুর রক্তের ছিটা ভাসতে ভাসতে

ছড়িয়ে পড়েছে লাল কৃষ্ণচূড়ার পাতায়—

সকল রাস্তার ধারে রক্ত ভাসে—আকাশে আকাশে

সন্ধ্যার মেঘের বুকে ভাসতে ভাসতে চলে মহাকালে—

সে লাল আকাশ আজ—ছেয়ে গেছে—

গাছে গাছে—মহাবিশ্বের সকল আলোক কণায়

 

৬.

আমাদের পথচলা বহু আগে পৃথক হয়েছে—

যেমন গাছের ডাল—দুই দিকে প্রসারিত হয়—

যেমন নদীর স্রোত—শাখানদীদের বুকে বহে—

খ্যাতি অখ্যাতির এ বিচিত্র দোলাচলে

তুমি বয়ে চলো—ভেসে যাও খ্যাতির যমুনা পথে—

অখ্যাতির ঝিরি খরস্রোতা—আমি ঘুরছি পাহাড়ে

 

তবু বুকে—কখনও উঠেছে ব্যথা—নিবিড় নিলীম

কলবে ঝড়ের বায়ু—ভেসে যায় পুকুরের অনন্য ওপারে

সামনে বারিছা জুড়ে জ্যোস্না ভেসে যায়—প্রাণের গভীরে—

 

৭.

ভেসেছি বারুদে পোড়ানো ধোঁয়ার কুণ্ডলী পাকা মেঘে

রসায়ন আর ঘাম রক্তের কর্দম পাঁকে হাঁটে

ফিলিস্তিনের শিশু

মরে পড়ে আছে মা

বাবার শরীর ছিন্ন ভিন্ন ভগিনীর দশা ভগ্ন

তবু রুগ্ন এ সমাজের চোখে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে

খোকা হেঁটে চলে দৃপ্ত পায়ের চলা

ভাসে সম্ভ্রম ভাসে মানবতা ভাসে

সোলায়মানি পাথরের দোলা

আল আকসার গম্বুজ ভাসে

কেবল ভাসে না খোকা—হাঁটে—দৃপ্ত পদভারে

 

৮.

ওপারে বারিছা

ঘন জংলায়

আঁধার এসেছে নেমে

মাথার ওপরে

থোকা থোকা লাল

কৃষ্ণচূড়ার আগুন

রোদ্দুর যেন

এইখানটায়

এক ঠাঁয়ে আছে থেমে

গুমোট গরমে

কেবল পুকুর

হৃদয় জুড়ায় দ্বিগুণ

 

৯.

পুকুরের ওপারে শাণিত চিন্তারা

ঘাসের চাদরের উপরে বসে থাকে

ওপারে বারিছায় বিশাল বৃক্ষের

ছায়ারা এপারের সিঁড়িতে নেমে আসে

 

ওপারে পুকুরের ধার তো খাড়া খুব

লাফিয়ে নামা ছাড়া উপায় নেই কিছু

তাই তো বেদনার নানান রাঙা মুখ

চকিতে ঝাঁপ দেয় ছায়ার পিছু পিছু

 

ওখানে মায়া নেই রয়েছে মলিনতা

এ ভরা সংসারে কতো যে বাজে গান

নিঃস্ব হৃদয়ের অজানা কতো কথা

পুকুর পাড়ে বসে নিত্য পায় প্রাণ

 

পুকুরে ছায়া তার ডুবিছে আর ভাসে

সে কতো যুগ হলো বসেছি তার পাশে

 

১০.

ওখানে শৈলচূড়া—সবুজ বৃক্ষে ঢাকা

পায়ে চলা পথের অসীম বিচরণ—

ওখানে মায়ামৃগ—দুগ্ধবতী গবাদি

চড়েছে সারাদিন

 

ওখানে নীলাকাশ ভীষণ একা একা

কাশের ফুলভারে শাদার আবরণে

আনত পূব দিকে—মেঘলা বাতায়ন

ঝড়ের গাহে গান

 

ওখানে লোহুলাল ছায়ারা উড়ে গেছে

বারিছা ফাঁকা আজ—পাখিরা পলাতক

ভীষণ গুমোটের এমন দুপুরেই বিমান হামলাতে

মানুষ দিশাহীন