অনলাইন শিক্ষাকার্যক্রমে মূল ‘শিক্ষা’ই অনুপস্থিত|298818|Desh Rupantor
logo
আপডেট : ১৭ জুন, ২০২১ ০০:০০
অনলাইন শিক্ষাকার্যক্রমে মূল ‘শিক্ষা’ই অনুপস্থিত
রাহমান নাসির উদ্দিন

অনলাইন শিক্ষাকার্যক্রমে মূল ‘শিক্ষা’ই অনুপস্থিত

করোনাভাইরাস পুরো দুনিয়াটাকে সজোরে একটা ধাক্কা দিয়েছে। পৃথিবীতে মহামারী আগেও অনেকবার এসেছে। লাখ লাখ মানুষের জীবন ছিনিয়ে নিয়েছে। কিন্তু তখন বিজ্ঞান, প্রযুক্তি এবং মানুষের সক্ষমতা আজকের মতো ছিল না। ফলে, মহামারী মোকাবিলা করার শক্তি ও ক্ষমতাও পর্যাপ্ত ছিল না। কিন্তু আজ বিজ্ঞানের অভাবনীয় উন্নতি হয়েছে, চিকিৎসাশাস্ত্র নানান যুগান্তকারী উদ্ভাবন দিয়ে পৃথিবীর মানুষকে অধিকতর সুস্থ জীবনযাপনের সম্ভাবনাকে প্রসারিত করেছে। প্রযুক্তির বিস্ময়কর সব অর্জন আজকের মানবসভ্যতাকে মানুষের স্বপ্নের প্রায় সমান করে তুলেছে। অর্থনৈতিক সক্ষমতার জায়গায়ও মানুষ অনেক দূর এগিয়েছে। মানুষের শিক্ষা-দীক্ষা ও জ্ঞান-গরিমার প্রসার ঘটেছে। তথাপি, মানুষ ও সভ্যতার সমস্ত অর্জন নিয়েই করোনাভাইরাসের কাছে মানুষ যেন অসহায় আত্মসমর্পণ করেছে। এ ভাইরাস বিশ্বব্যাপী লাখ লাখ মানুষের জীবন কেড়ে নিয়েই ক্ষান্ত হয়নি, বরং এর নেতিবাচক প্রভাব রাখছে মানুষের জীবনের প্রায় সব ক্ষেত্রে। বাংলাদেশও এ ভাইরাসের সর্বগ্রাসী থাবার বাইরে নয়। সর্বক্ষেত্রে এর তীব্র প্রভাব লক্ষ করা যাচ্ছে। যদিও অর্থনীতির গতি ঠিক রাখতে গিয়ে নানান ক্ষেত্রে শক্ত লকডাউন মানা সম্ভব হয়নি। করোনাভাইরাসের নেতিবাচক প্রতিফল আমরা সমাজের সবক্ষেত্রে দেখতে পাচ্ছি। সবচেয়ে বড় এবং দীর্ঘমেয়াদি ক্ষতি হচ্ছে শিক্ষাক্ষেত্রে। আজ প্রায় পনেরো মাস ধরে বাংলাদেশের সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ। স্কুল, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের সব ধরনের প্রথাগত এবং সনাতন শিক্ষাকার্যক্রম বন্ধ আছে। শিক্ষার অপূরণীয় ক্ষতি পুষিয়ে নিতে বিকল্প হিসেবে অনলাইন শিক্ষাকার্যক্রম চালু রাখা হয়েছে যাতে ‘নাই মামার চেয়ে কানা মামা ভালো’। কিন্তু দুধের স্বাদ কি ঘোলে মিটে? শিক্ষার আসল উদ্দেশ্য হচ্ছে একজন শিক্ষার্থীর শারীরিক ও মানসিক সত্যিকার ও পূর্ণাঙ্গ বিকাশ ঘটানো। সেটা কি অনলাইন শিক্ষাকার্যক্রমের মাধ্যমে আমরা করতে পারছি? শিক্ষার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট একজন পেশাজীবী হিসেবে বিষয়টি এখানে সংক্ষেপে পেশ করছি।

এক. শিক্ষার মূল উদ্দেশ্য কী? প্রাচীন গ্রিসে বলা হতো জ্ঞান ও দক্ষতা বৃদ্ধি এবং আচরণ ও দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন। আমরা আমাদের শিক্ষা দর্শনে এসবের কতটুকু নিতে পেরেছি কিংবা পারিনি, সেটা ভিন্ন প্রশ্ন কিন্তু ‘শিক্ষার মূল উদ্দেশ্য কী’ এ প্রশ্নের উত্তর নিয়ে ‘নানা মুনির নানা মত’ থাকলেও এ বিষয়ে দ্বিমতের কোনো সুযোগ নেই যে, শিক্ষার উদ্দেশ্য নিঃসন্দেহে একটি সার্টিফিকেট-সর্বস্ব গ্র্যাজুয়েট তৈরি করা নয় বরং একজন শিক্ষার্থীকে মানবিক, সংবেদনশীল, সৎ, পরার্থপর, ন্যায়পরায়ণ এবং দেশপ্রেমিক মানুষ হিসেবে গড়ে তোলা। কিন্তু অনলাইন শিক্ষাকার্যক্রমের মাধ্যমে সেটা আদৌ সম্ভব নয়। কেননা, সেটা তখনই সম্ভব হয় যখন একজন শিক্ষার্থী আর দশজন সহপাঠীর সঙ্গে (যারা ভিন্ন পরিবার, ভিন্ন সমাজ ও ভিন্ন সংস্কৃতি থেকে ভিন্ন জীবন-দর্শন এবং ভিন্ন চিন্তা-চেতনা নিয়ে ভিন্ন ভিন্ন ছাদের নিচে বেড়ে ওঠে) একত্রে একসঙ্গে শ্রেণিকক্ষে নানান ধরনের মিথস্ক্রিয়ায় অংশ নেয়, যা অনলাইন শিক্ষাকার্যক্রমে কোনোভাবেই সম্ভব নয়। একজন শিক্ষার্থীর মন-মানসিকতায় এবং চরিত্র ও ব্যক্তিত্বে অন্যের প্রতি সহিষ্ণুতা, সহমর্মিতা এবং পরার্থপরতা তৈরিই হয় পারস্পরিক মিথস্ক্রিয়ার ভেতর দিয়ে। একজন শিক্ষার্থীর পক্ষে সত্যিকার মানুষ হিসেবে বেড়ে ওঠার জন্য তার পারিবারিক জীবন ও দর্শনের গণ্ডিকে সম্প্রসারিত এবং বিস্তারিত করার একটা অন্যতম প্রধান পরিসর হচ্ছে বিদ্যালয় এবং শ্রেণিকক্ষের সহপাঠী, যা অনলাইন কার্যক্রমের মধ্যে পুরো মাত্রায় অনুপস্থিত।

দুই. পুরো শিক্ষাকার্যক্রমে শিক্ষক (নারী ও পুরুষ দুই অর্থেই ‘শিক্ষক’ শব্দটি ব্যবহার করছি) হচ্ছে একটা কেন্দ্রীয় মনোযোগের জায়গা। একজন শিক্ষার্থীর কাছে সব সময় একজন শিক্ষক (সঙ্গে এটা স্বীকার্য যে, অবশ্যই এটা সব শিক্ষকের বেলায় প্রযোজ্য নয়!) কেবল একজন মানুষ নন, একজন গুরু, একজন আদর্শ, একজন অনুকরণীয় ও অনুসরণীয় ব্যক্তি। সক্রেটিস, প্লেটো কিংবা এরিস্টটলের মধ্যকার গুরু-শিষ্যের পরম্পরা আজ কিংবদন্তি। বর্তমানের শিক্ষাব্যবস্থা গুরু-শিষ্যের সম্পর্কের কাঠামো একেবারে গ্রিকীয় মডেলের না-হলেও শিক্ষার্থীরা এখনো শিক্ষককেই শিক্ষাগুরু মানে এবং শিক্ষকদের চিন্তা-ভাবনা এবং জীবন-দর্শন দ্বারা প্রবলভাবে প্রভাবিত হয়। এমনকি অনেক শিক্ষার্থীর মানসপটে অনেক শিক্ষক একজন সত্যিকার ও আদর্শ মানুষের মডেল হিসেবে স্থায়ী প্রভাব তৈরি করে। শিক্ষক ও শিক্ষার্থীর মধ্যকার এ অনিন্দ্য সুন্দর সম্পর্ক, মিথস্ক্রিয়ার পরম্পরা এবং চিন্তা ও ভাববিনিময়ের পরিসরটি অনলাইন শিক্ষাকার্যক্রমে একেবারেই অনুপস্থিত। কম্পিউটারে লাগানো ওয়েভ-ক্যামেরার সামনে বসে কোনো বিষয়ের ‘সংজ্ঞায়ন, কাকে বলে, কত প্রকার ও কী কী’ জাতীয় বিদ্যা বিলানো দিয়ে শিক্ষক-শিক্ষার্থীর চিন্তা-ভাবনা ও জীবন-দর্শনের কোনো ডায়ালেক্টিকস চর্চা একেবারেই অসম্ভব।

তিন. প্রাচীন গ্রিসে লাইসিয়াম যুগ থেকে শুরু করে একটা দীর্ঘ সময় পর্যন্ত শিক্ষাকার্যক্রমে জ্ঞান অর্জনের পাশাপাশি সঠিক শারীরিক গঠন ও গড়ন একটা গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হিসেবে বিবেচিত হতো। বলতে গেলে বৃদ্ধিবৃত্তিক এবং জ্ঞানতাত্ত্বিক বিকাশের সমান গুরুত্ব দিয়ে বিবেচনা করা হতো শারীরিক শিক্ষাকে। হয়তো সে কারণেই ‘সুস্থ শরীরেই সুস্থ মন’ থাকে জাতীয় প্রবাদবাক্য আমাদের সমাজে অদ্যাবধি জারি আছে। কিন্তু অনলাইন শিক্ষাকার্যক্রমের অন্যতম প্রধান ঘাটতি হচ্ছে শিক্ষার্থীদের কোনো শারীরিক যাতায়াতের এবং ক্রীড়াশৈলীতে অংশগ্রহণ করতে না-পারা। প্রতিদিন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে যাওয়া-আসা এবং সহপাঠীদের সঙ্গে নানান ধরনের খেলাধুলায় অংশ নেওয়ার মাধ্যমে একজন শিক্ষার্থীর যে মানসিক প্রশান্তি এবং শারীরিক সক্ষমতা তৈরি হয়, সেটা ঘরে বসে মোবাইল, ট্যাব বা ল্যাপটপের সামনে বসে শিক্ষাকার্যক্রমে অংশ নেওয়ার মাধ্যমে কোনোভাবেই সম্ভব নয়। এ ছাড়া প্রতিটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের যে রুটিনমাফিক বছরব্যাপী নানান স্পোর্টস-জাতীয় সহশিক্ষা কার্যক্রম থাকে, যেখানে শিক্ষার্থীরা অত্যন্ত আনন্দের সঙ্গে স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ করে নিজেদের শারীরিকভাবে ফিট রাখার সুযোগ পেত, সেটাও অনলাইন শিক্ষাকার্যক্রমের মাধ্যমে প্রায়োগিকভাবেই অসম্ভব।

চার. শিক্ষাদর্শনে বিশ্বব্যাপী একটা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ মনোযোগের জায়গা হচ্ছে এক্সট্রা-কারিকুলার অ্যাক্টিভিটিজ। বিশ্বব্যাপী প্রায় সবস্তরের শিক্ষাকার্যক্রমে কারিকুলার অ্যাক্টিভিটিজের পাশাপাশি এক্সট্রা কারিকুলার অ্যাক্টিভিটিজকেও সমান গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা হয়। কেননা, একজন শিক্ষার্থীর জ্ঞানতাত্ত্বিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক বিকাশের পাশাপাশি তার যে সুকুমার বৃত্তিগুলো আছে, তারও সমানতালে বিকাশ জরুরি। কেননা, শিক্ষা-সংক্রান্ত অসংখ্য গবেষণায় দেখা গেছে, রেগুলার কারিকুলার অ্যাক্টিভিটিজের পাশাপাশি এক্সট্রা কারিকুলার অ্যাক্টিভিটিজের নিয়মিত অনুশীলন মানুষের নানান বিকৃত প্রবৃত্তিগুলো দমন ও দূর করে মানুষের একটি সুন্দর মনোজগৎ তৈরি করতে সাহায্য করে। আর যখনই একজন মানুষ প্রাণী হিসেবে তার যে নানান বিকৃত প্রবৃত্তি, সেটা দমন করে, নিয়ন্ত্রণ করে এবং দূর করে একজন মননশীল, সংস্কৃতিমনা এবং নান্দনিক মানসিকতার অধিকারী হয়ে উঠতে পারে, তখনই তার ‘শিক্ষিত’ হওয়ার দাবি সত্যিকার ন্যায্যতা পায়। কিন্তু অনলাইন শিক্ষাকার্যক্রমে এক্সট্রা কারিকুলার অ্যাক্টিভিটিজের সুযোগ খুবই সীমিত এবং অপর্যাপ্ত। ফলে, শিক্ষার্থীরা সুকুমার বৃত্তির চর্চার এবং অনুশীলনের সব ধরনের সুযোগ এবং সম্ভাবনা থেকে পুরোপুরিই বঞ্চিত হচ্ছে।

পাঁচ. বিশ্ববিদ্যালয়ের কথা না-বললেই নয়। বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর ক্যাম্পাস হচ্ছে একজন শিক্ষার্থীর জন্য সবচেয়ে প্রাণ-প্রাচুর্যপূর্ণ, চাঞ্চল্যে-ভরা এবং বন্ধু-মুখরতায় পূর্ণ জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ একটি পরিসর। অথচ, বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাসগুলো যেন শিক্ষার্থী-শূন্যতায় হাহাকার করছে। করোনাভাইরাসের মৃত্যুর সংখ্যা এবং সংক্রমণের হার সহনীয় পর্যায়ে না-আসা পর্যন্ত ক্যাম্পাস না-খোলার সরকারি সিদ্ধান্তকে আমি সমর্থন করি। পাশাপাশি, দ্রুততম সময়ে এবং অগ্রাধিকার ভিত্তিতে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের টিকা দানের ব্যবস্থা করে ক্যাম্পাস খুলে দেওয়ার প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নেওয়াও আমি জরুরি বলে মনে করি। বিশ্ববিদ্যালয় একজন শিক্ষার্থীকে একজন যোগ্য ও দক্ষ পেশাজীবী হিসেবে গড়ে তোলে বলেই বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে মানবসম্পদ উন্নয়নের অন্যতম প্রধান কেন্দ্র বলা হয়। কিন্তু অনলাইনে পাঠ দিয়ে কি সত্যিকার অর্থে যোগ্য ও দক্ষ মানবসম্পদ গড়ে তোলা সম্ভব? আমি নিজে নৃবিজ্ঞানের মতো একটি বিষয় অনলাইনে পাঠদান করি। যে শাস্ত্রের মূল বিষয় হচ্ছে মানুষ, সেখানে শ্রেণিকক্ষে মানুষই নেই; আছে কিছু কিছু অডিও-ভিডিও অফ করা ‘স্টিল চেহারা’। একটা ল্যাপটপ সামনে নিয়ে কিছু স্টিল ফটোর সামনে বসে কি নৃবিজ্ঞানের পাঠ দেওয়া কোনো কার্যকর পদ্ধতি? মাঠ নেই, মানুষ নেই, মাঠকর্ম নেই! আমি নিশ্চিত এ রকম সমস্যা আরও অনেক শাস্ত্রের এবং অনেক শিক্ষকেরই হচ্ছে। তথাপি, বাস্তবতা মেনে চরম নিরানন্দ নিয়ে পাঠদান করছে। তাই, অনলাইন শিক্ষাকার্যক্রম ইন-পারসন শিক্ষাকার্যক্রমের কোনোভাবেই বিকল্প হতে পারে না।

পরিশেষে বলব, নানান সীমাবদ্ধতা, অতৃপ্তি এবং অপ্রাপ্তি থাকলেও করোনাভাইরাসের বাস্তবতা মেনে নেওয়া ছাড়া আমাদের উপায় নেই। সরকারেরও হাত-পা বাঁধা কেননা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খুলে দিলে সেখানে স্বাস্থ্যবিধি মানা এবং সামাজিক দূরত্ব মেনে চলা রীতিমতো অসম্ভব হয়ে উঠবে। তাই, লাখ লাখ শিক্ষার্থীকে জীবনের ঝুঁকির মধ্যে ফেলা সম্ভব নয়। সঙ্গে এ বাস্তবতাও মনে রাখা জরুরি, আপৎকালীন ব্যবস্থা হিসেবে বিদ্যমান থাকলেও অনলাইন শিক্ষাকার্যক্রমে ‘শিক্ষা’র মূল শিক্ষাটাই অনুপস্থিত।

লেখক নৃবিজ্ঞানী ও অধ্যাপক, নৃবিজ্ঞান বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়