সময়ের মূল্যায়ন সফলতার ভিত্তি|307279|Desh Rupantor
logo
আপডেট : ১ আগস্ট, ২০২১ ০০:০০
সময়ের মূল্যায়ন সফলতার ভিত্তি
শায়খ ড. আলি বিন আবদুর রহমান আল হুজায়ফি

সময়ের মূল্যায়ন সফলতার ভিত্তি

ক্ষণিকের পার্থিব জীবন, দুনিয়ার তুচ্ছ সৌন্দর্য এবং বারবার অবস্থার পরিবর্তন নিয়ে চিন্তা করুন। তবেই দুনিয়ার গুরুত্ব অনুধাবন এবং এর রহস্য সম্পর্কে জানতে পারবেন। যে ব্যক্তি দুনিয়ার ওপর পূর্ণমাত্রায় নির্ভরশীল হয়, সেই প্রতারিত। আর যে এর প্রতি অতিমাত্রায় ঝুঁকে পড়ে, সে বঞ্চিত ও ক্ষতিগ্রস্ত। ক্ষণিকের দুনিয়ায় মানুষের আয়ু সীমিত। ব্যক্তির আয়ু শুরু হয় সময়ের বেশ কিছু মুহূর্ত দিয়ে। অতঃপর সেই মুহূর্ত ও ঘণ্টার সমন্বয়ে কিছু দিন, দিনের পর মাস, মাসের পর বছর। এভাবেই সীমিত কয়েকটি বছর কাটানোর পর তার আয়ু ফুরিয়ে আসে।

বস্তুত চিরকালের মধ্য থেকে প্রত্যেক মাখলুকের আয়ু সামান্য এক মুহূর্ত মাত্র। কারণ এই দুনিয়া হলো- ভোগের। অর্থাৎ সময়ের মধ্যে যাকে ভোগ করা হয় ও স্বাদ গ্রহণ করা হয়, অতঃপর তা ওই সময়ের মধ্যে নিঃশেষ হয়ে যায়। এ প্রসঙ্গে মহান আল্লাহ বলেন, ‘এ দুনিয়ার জীবন কেবল অস্থায়ী ভোগের বস্তু, আর নিশ্চয় আখেরাতই হচ্ছে স্থায়ী আবাস।’ -সুরা আল মুমিন : ৩৯

কোরআনে কারিমে ইরশাদ হয়েছে, ‘আপনি ভেবে দেখুন, যদি আমরা তাদের দীর্ঘকাল ভোগ-বিলাস করতে দিই, তারপর তাদের যে বিষয়ে (মৃত্যু) সতর্ক করা হয়েছিল তা তাদের কাছে এসে পড়ে, তখন যা তাদের ভোগ-বিলাসের উপকরণ হিসেবে দেওয়া হয়েছিল তা তাদের কী উপকারে আসবে? সুরা শোয়ারা : ২০৫-২০৭

কোরআনে কারিমের বহু আয়াতে দুনিয়ার সময়ের স্বল্পতা সম্পর্কে সতর্ক করা হয়েছে। বলা হয়েছে, দুনিয়ার আয়ুর সমপরিমাণ চিরস্থায়ী অনন্তকালের মধ্য থেকে এক বিন্দু পরিমাণ মাত্র। পরকালের তুলনায় দুনিয়ার জীবনের আয়ু একেবারেই সীমিত। কাজেই সুসংবাদ তার জন্য, যে নিজের সংক্ষিপ্ত জীবনকে সৎকাজ দিয়ে সাজায় এবং হারাম ও নিষিদ্ধ বিষয় পরিহার করে এবং প্রবৃত্তির অনুসরণ ও পথভ্রষ্টতা এড়িয়ে চলে। এভাবেই সে কল্যাণ লাভ করে পার্থিব জীবনে সফল হয় এবং মৃত্যুর পর জান্নাতের নেয়ামতে আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভ করে বিজয়ী হয়।

পক্ষান্তরে ধ্বংস ও দুর্ভোগ তার জন্য, যে প্রবৃত্তির অনুসরণ করে, নামাজসমূহ ও ওয়াজিব বিষয় খর্ব করে, ধ্বংসাত্মক কাজে জড়িয়ে পড়ে; পরিণতিতে সে জাহান্নামে নিক্ষিপ্ত হয়, তার খাদ্য হয় কাঁটাযুক্ত তিক্ত ফল এবং পানীয় হয় পুঁজ ও ফুটন্ত গরম পানি।

আফসোস তার জন্য, যাকে তার সুস্থতা সীমালংঘন করিয়েছে, ফলে সে অবাধ্য ও পাপী হয়েছে। তার অবসর সময় তাকে ভ্রষ্ট করেছে, ফলে সে অনর্থক কাজে জড়িয়েছে। তার ধন-সম্পদ ফেতনায় ফেলেছে, ফলে সে ধ্বংস হয়েছে। যে প্রবৃত্তির অনুসরণ করেছে, ফলে সে পতিত ও নষ্ট হয়েছে। যাকে তার যৌবনকাল ধোঁকায় ফেলেছে, ফলে সে জীর্ণ ও ক্ষয়প্রাপ্ত হওয়ার অবস্থাকে ভুলে গেছে। আল্লাহর নেয়ামত পেয়েছে, কিন্তু সে অবাধ্যতায় মেতে উঠেছে। আপনি কি জানেন না যে, আসমান ও জমিনের কোনো কিছুই আল্লাহকে অক্ষম ও দুর্বল করতে পারবে না? নিশ্চয় তিনি শাস্তি প্রদানে কঠোর? আপনি কি মৃত্যু ও মৃত্যু পরবর্তী জীবনে জবাবদিহিতে বিশ্বাস করেন না? অতএব যাকে তার সময়ের সুযোগ এবং প্রাপ্তি ও কামনা তার রবের সঙ্গে স্পর্ধা দেখাতে দুঃসাহস জুুগিয়েছে, আর অবশেষে মৃত্যুর স্বাদ গ্রহণ করেছে- সে কীভাবে আবার সুযোগ পাবে দুনিয়ায় ফেরত এসে আমল সংশোধনের? অবশ্যই না, সুতরাং রবের কাছে তওবার সুযোগ এখনই, উদাসীনতা পরিহার করে সজাগ হওয়ার মুহূর্ত এটাই। সময়কে মূল্যায়ন করে সফলতা অর্জনের মুহূর্ত এখনই। 

মৃত্যুকে বাধা দেওয়ার মতো কোনো শক্তি নেই। কোরআনে কারিম ছাড়া সঠিক পথ প্রদর্শকও আর কিছু নেই। অতএব আপনি চিরস্থায়ী আবাসের (বেহেশত) জন্য আমল করুন, যার নেয়ামতরাজি কখনো ফুরাবে না ও কমবে না। বরং তার নেয়ামত বাড়তে থাকবে, সেখানে বার্ধক্য এসে কারও যৌবনকে নষ্ট করবে না, রোগ-ব্যাধির কোনো আশঙ্কা থাকবে না। আল্লাহতায়ালা সেখানে স্বাগত স্বরে বলবেন, ‘শান্তির সঙ্গে তোমরা তাতে প্রবেশ করো, এটা অনন্ত জীবনের দিন। সেখানে তারা যা কামনা করবে তা-ই পাবে এবং আমার কাছে রয়েছে তারও অধিক।’ সুরা কাফ : ৩৪-৩৫

আপনারা সেই জাহান্নাম থেকে বাঁচুন যার অধিবাসীকে আজাব ছাড়বে না; আল্লাহর অকাট্য আদেশ পালন ও কঠোর ক্রোধ থেকে বেঁচে থাকার মাধ্যমে। পাপাচার থেকে বিরত থাকুন, যা পাপীকে জাহান্নামের অতল গহ্বরে নিক্ষেপ করে। মনে রাখবেন, মানুষ এবং জান্নাত ও জাহান্নামের মধ্যে মৃত্যু ছাড়া আর কোনো প্রতিবন্ধকতা নেই। আপনি আপনার দিনগুলোকে সাধ্যমতো সৎকাজে পরিপূর্ণ করুন এবং আপনার আমলনামাকে অসৎকাজ থেকে হেফাজত করুন। নিশ্চয় আল্লাহতায়ালা সৎকর্ম সম্পাদন ও অসৎকর্ম পরিত্যাগের বিধান দিয়ে মানুষের প্রতি তার রহমত ও দয়ার দ্বারকে উন্মুক্ত করে দিয়েছেন। কাজেই কেউ যেন গোনাহ করে আল্লাহর সঙ্গে বিদ্রোহী আচরণ করে নিজের ওপর রহমতের দ্বারকে বন্ধ না করে।

এখনো সময় আছে, সুস্থ অবস্থা ও নিরাপদ সময়কে মূল্যায়ন করুন। হজরত ইবনে আব্বাস (রা.) থেকে বর্ণিত, নবী করিম (সা.) বলেছেন, ‘দুটি নেয়ামত রয়েছে যে ব্যাপারে অনেক মানুষ ধোঁকায় নিপতিত, সুস্থতা ও অবসর সময়।’সহিহ বোখারি

হজরত ইবনে উমর (রা.) থেকে বর্ণিত, হজরত রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘তুমি দুনিয়াতে এমনভাবে থাকো যেন তুমি একজন প্রবাসী অথবা পথচারী।’ সহিহ বোখারি

৩০ জুলাই মসজিদে নববিতে প্রদত্ত জুমার খুতবা। অনুবাদ মুহাম্মদ আতিকুর রহমান