সংক্রমণ ঝুঁকি, পথের ভোগান্তি চাকরি বাঁচাতে ঢাকামুখী ঢল|307362|Desh Rupantor
logo
আপডেট : ১ আগস্ট, ২০২১ ০০:০০
সংক্রমণ ঝুঁকি, পথের ভোগান্তি চাকরি বাঁচাতে ঢাকামুখী ঢল
রূপান্তর ডেস্ক

সংক্রমণ ঝুঁকি, পথের ভোগান্তি চাকরি বাঁচাতে ঢাকামুখী ঢল

করোনা নিয়ন্ত্রণে সরকার ঘোষিত কঠোর বিধিনিষেধের মধ্যে আজ রবিবার থেকে খুলছে গার্মেন্টসসহ রপ্তানিমুখী শিল্পকারখানা। এ অবস্থায় কর্মস্থলমুখে ঢল নেমেছে ঈদের ছুটিতে গ্রামে ফেরা শ্রমিকদের। যে যেভাবে পারছেন ছুটছেন ঢাকার দিকে, কখনো ট্রাকে, কখনো রিকশায়, কখনো হেঁটে। কিন্তু কোথাও মানা হচ্ছে না ন্যূনতম স্বাস্থ্যবিধি। করোনা সংক্রমণের শঙ্কা আর সীমাহীন ভোগান্তি উপেক্ষা করে অনেকটা উদভ্রান্তের মতো ছুটছেন মানুষ। শ্রমিকরা বলছেন, গার্মেন্টস খোলার দিন কাজে যোগ না দিলে তাদের চাকরি থাকবে না। তাই চাকরি বাঁচাতে সব বাধা আর বিধিনিষেধ তাদের কাছে তুচ্ছ হয়ে গেছে। তুচ্ছ হয়ে গেছে  ৪-৫ গুণ বেশি ভাড়াও। 

এদিকে ট্রাক উল্টে, ট্রাকের ধাক্কায়, গাড়িচাপায় ৭ শ্রমিক প্রাণ হারিয়েছেন। এর মধ্যে মাদারীপুরের শিবচরে ট্রাক খাদে পড়ে ৪ জন, টাঙ্গাইলের মির্জাপুরে ট্রাকের ধাক্কায় দুই নারী পোশাক শ্রমিক ও ময়মনসিংহের ভালুকায় গাড়িচাপায় ঢাকামুখী এক কর্মজীবী নিহত হয়েছেন। বিস্তারিত আমাদের প্রতিনিধিদের পাঠানো খবর :

সাভার প্রতিনিধি জানান, গতকাল ঢাকা-আরিচা মহাসড়ক ও নবীনগর-চন্দ্রা মহাসড়ক ঘুরে দেখা যায় কঠোর বিধিনিষেধের মধ্যে রবিবার থেকে রপ্তানিমুখী কারখানাগুলো খুলে দেওয়ার ঘোষণায় শিল্পকারখানায় কাজে যোগ দিতে কর্মস্থলে ফিরছেন হাজার হাজার মানুষ। অতিরিক্ত ভাড়া, যানবাহন সংকটসহ নানা ভোগান্তিকে সঙ্গী করে যে যেভাবে পারছেন শিল্প এলাকায় ফিরে আসছেন। এদের মধ্যে বেশিরভাগই পোশাকশ্রমিক ও তাদের পরিবারের সদস্য।

সাভারের বাইপাইল এলাকায় সিরাজগঞ্জ থেকে আসা রাজা মিয়া বলেন, ‘কাল অফিস খোলা তাই কাজে যোগ দিতে হবে বিধায় কষ্ট করেই চলে আসা। চাকরি বাঁচাতে পথে পথে ভোগান্তি আর অনিচ্ছা সত্ত্বেও জীবনের ঝুঁকি নিয়েই চলে আসলাম। কয়েকগুণ বেশি ভাড়ায় কখনো অটোরিকশা, পিকআপ, আবার হেঁটেও আসতে হয়েছে। মাদারীপুর প্রতিনিধি জানান, বাংলাবাজার ফেরিঘাটে হাজার হাজার যাত্রীর চাপ দেখা যায়। ফেরিঘাট সূত্রে জানা যায়, আজ রবিবার থেকে পোশাক কারখানা খুলে দেওয়ার খবরে বাংলাবাজার ঘাট এলাকায় ভিড় করছেন ঢাকামুখী হাজার হাজার শ্রমিক। কঠোর লকডাউনে লঞ্চ ও স্পিডবোট চলাচল বন্ধ, তাই ফেরিতেই পার হচ্ছেন যাত্রীরা। করোনাভাইরাস সংক্রমণ রোধে কঠোর লকডাউনের ভেতর ফেরিতে সাধারণ যাত্রী পারাপারে নিষেধাজ্ঞা থাকলেও ঠেকানো যাচ্ছে না যাত্রীদের। জরুরি পরিবহন পারাপারের জন্য ফেরিঘাটে ভেড়া মাত্রই উঠে পড়ছেন যাত্রীরা। যাত্রীদের চাপে ঘাটে পদ্মা পারের অপেক্ষায় ঢাকাগামী যানবাহনের দীর্ঘ লাইন তৈরি হয়েছে। ঘাট এলাকায় বর্তমানে এই নৌপথে ৩টি রো রো ও ৫টি কে-টাইপের ফেরি নিয়ে মোট ৮টি ফেরি চলাচল করছে।

বরিশালের মুলাদী থেকে ঢাকাগামী জুবায়ের নামে এক গার্মেন্টসশ্রমিক বলেন, পরিবারের খাবারের তাগিদে করোনার মধ্যেও ঢাকায় যাচ্ছি। না গেলে তো চাকরি থেকেও বাদ দিতে পারে কর্র্তৃপক্ষ। তাছাড়া হাতে টাকা পয়সা নেই, কাজ করতে না পারলে বিপদে পড়ে যাব পরিবার নিয়ে।

লক্ষ্মীপুর প্রতিনিধি জানান, ভোলা ও বরিশালসহ দেশের দক্ষিণাঞ্চল থেকে হাজার হাজার যাত্রী জেলার মতিরহাট ও মজুচৌধুরীর হাট ঘাটে পৌঁছান। এ সময় কথা হয় গার্মেন্টসশ্রমিকদের সঙ্গে। তারা জানান, রবিবার থেকে তাদের কারখানা খুলছে। এ জন্য ভোলার ইলিশা থেকে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে জনপ্রতি এক হাজার টাকা ট্রলার ভাড়া দিয়ে এখন তারা গাজীপুর যাচ্ছেন। তারা জানান, দূরপাল্লার বাস না থাকায় পথে পথে তাদেরকে ভাড়া বাবদ অনেক টাকা খরচ করতে হচ্ছে। টাকা বেশি গেলেও ভোগান্তির কমতি নেই তাদের।

মাগুরা প্রতিনিধি জানান, শহরের ভায়নার মোড় ও ঢাকা রোড বাসস্ট্যান্ডে গিয়ে দেখা গেছে শত শত মানুষ বিভিন্ন এলাকা থেকে এসে সেখানে ভিড় করছেন। কেউ মাইক্রোবাস, কেউ ট্রাক, পিকআপ ভ্যান ও সিএনজি অটোতে উচ্চমূল্যের ভাড়া দিয়ে নিজ নিজ প্রতিষ্ঠানের উদ্দেশ্যে রওনা হচ্ছেন। এদের অধিকাংশ গার্মেন্টসকর্মী। গণপরিবহন বন্ধ থাকায় তারা এ ঝুঁকি নিয়েই গন্তব্যের উদ্দেশ্যে রওনা হচ্ছে বলে জানান। মাগুরা থেকে রাজবাড়ীর দৌলতদিয়া ফেরিঘাট পর্যন্ত মাইক্রোবাসে জনপ্রতি ভাড়া নেওয়া হচ্ছে ৫০০ টাকা, ট্রাক ও পিকআপ ভ্যানে নেওয়া হচ্ছে ৩০০ টাকা। স্বাভাবিক সময়ে গণপরিবহনে এই দূরত্বের ভাড়া সর্বোচ্চ ১৫০ থেকে ২০০ টাকা। এসব যাত্রী জানান, মাগুরা থেকে দৌলতদিয়া ঘাট পর্যন্ত পৌঁছাতে পারলে ফেরি, লঞ্চ কিংবা ট্রলারে তারা পদ্মা নদী পার হবেন। ওপারে গিয়ে একইভাবে অন্য কোনো যানবাহনে নিজ নিজ চাকরিস্থলে পৌঁছাবেন।

ময়মনসিংহ প্রতিনিধি জানান, গতকাল ভোর থেকেই পাটগুদাম ব্রিজ মোড়ে ট্রাক, পিকআপ, সিএনজি অটো, মোটরসাইকেল এমনকি হেঁটেও যে যেভাবে পারছেন রওনা হয়েছেন। এতে যাত্রীদের বেশি ভাড়ার পাশাপাশি বেশ ভোগান্তি পোহাতে হচ্ছে। নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটরা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সহায়তায় ঢাকামুখী মানুষদের পরিচয়পত্র দেখে ছাড়ছেন এবং স্বাস্থ্যবিধি মেনে যাওয়ার জন্য পরামর্শ দিচ্ছেন।

পটুয়াখালীর প্রতিনিধি জানান, গতকাল শনিবার সকাল থেকেই লেবুখালী ফেরিঘাটে ঢাকামুখী যাত্রীদের উপচেপড়া ভিড় লক্ষ করা গেছে। পটুয়াখালী ও বরগুনা জেলার বিভিন্ন উপজেলা থেকে নানাভাবে শত শত মানুষকে ব্যাগ-লাগেজ কাঁধে চেপে হেঁটে এসে ফেরিতে পারাপার হতে দেখা যায়। দুর্যোগপূর্ণ আবহাওয়ায় থেমে থেমে বৃষ্টিতে ভিজে শত শত যাত্রী ছুটছেন ঢাকার গন্তব্যে। এসব ঢাকামুখী যাত্রীর বেশিরভাগই মানছেন না স্বাস্থ্যবিধি।

টাঙ্গাইল প্রতিনিধি জানান, ট্রাকের ছাদে, খোলা পিকআপে শত শত নারী-পুরুষ ভোগান্তি ও ঝুঁকি নিয়ে ঢাকা-টাঙ্গাইল মহাসড়ক হয়ে কর্মস্থলে ফিরছেন। এছাড়া ভাড়ায় চালিত মোটরসাইকেল, সিএনজিচালিত অটোরিকশা, লেগুনা ও ব্যাটারিচালিত রিকশায়ও অনেকে কর্মস্থলের দিকে যাত্রা করছেন।

বরিশাল প্রতিনিধি জানান, গতকাল শনিবার সকালে বরিশাল নগরের নথুল্লাবাদ বাসস্ট্যান্ডে গিয়ে দেখা গেছে লকডাউন উপেক্ষা করে মানুষ রাজধানীর উদ্দেশে ছুটছেন। একটি পণ্যবাহী গাড়ি থামার সঙ্গে সঙ্গে অসংখ্য মানুষ ভিড় করছেন। এ ছাড়া রিকশা, সিএনজি অটো, মাহিন্দ্রা ও মোটরসাইকেলে করে রওনা হয়েছেন অনেকে। সেক্ষেত্রে স্বাস্থ্যবিধির কোনো বালাই ছিল না। পোশাকশ্রমিক আব্দুল্লাহ বলেন, ‘সরকার ৫ আগস্ট পর্যন্ত লকডাউন ঘোষণা করলেও হঠাৎ করে কারখানা খুলে দিয়েছে। এমন খবরে আমরা ঢাকায় যাচ্ছি। চাকরি বাঁচাতে হলে যেভাবেই হোক যেতে হবে। তিনি বলেন, করোনায় সবাই বাড়ি চলে এসেছে, ঢাকায় ৫ ভাগ শ্রমিকও নেই। তাহলে কারখানা চলবে কীভাবে?’

রপ্তানিমুখী কারখানার শ্রমিকদের কর্মস্থলে ফিরতে কষ্ট লাঘবে সরকার গতকাল রাত থেকে আজ দুপুর ১২টা পর্যন্ত গণপরিবহন চলাচল করার অনুমতি দিয়েছে। দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের সব জেলায় গণপরিবহন চলবে। এদিকে বাংলাবাজার-শিমুলিয়া এবং পাটুরিয়া-দৌলতদিয়া রুটে লঞ্চ চলাচল করবে বলেও জানা যায়।