পাটের নবযাত্রায় রপ্তানি ও দেশের বাজার|307460|Desh Rupantor
logo
আপডেট : ২ আগস্ট, ২০২১ ০০:০০
পাটের নবযাত্রায় রপ্তানি ও দেশের বাজার
নিতাই চন্দ্র রায়

পাটের নবযাত্রায় রপ্তানি ও দেশের বাজার

করোনাভাইরাস মহামারীতে বিশ^বাসী পরিবেশদূষণ বন্ধের গুরুত্বটি নতুনভাবে উপলব্ধি করতে শুরু করেছে। ঠিক এ সময়েই সদ্যসমাপ্ত ২০২০-২১ অর্থবছরে চামড়াশিল্প খাতকে পেছনে ফেলে টানা দ্বিতীয়বারের মতো পাট ও পাটজাত পণ্য হয়ে উঠেছে দেশের দ্বিতীয় শীর্ষ রপ্তানি খাত। এটি পাটশিল্পের ধারাবাহিক উন্নতির পরিচায়ক এবং দেশের অভ্যন্তরীণ বাজার এবং রপ্তানি বাজারে নতুন সম্ভাবনার বার্তাবহ।

পাট বাংলাদেশের অন্যতম অর্থকরী ফসল। জমির উর্বরতা বৃদ্ধি, পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা, কর্মসংস্থান ও বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনে পাটের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সরকারি হিসাবে দেশে পাটচাষির সংখ্যা ৪০ লাখ হলেও দেশের মোট জনসংখ্যার প্রায় ২০ শতাংশ পাট চাষ এবং চাষ-পরবর্তী বিভিন্ন কর্মকান্ড যেমন পাট প্রক্রিয়াজাতকরণ, ঘাটবাঁধা, গুদামজাতকরণ, পরিবহন ও বিপণনের মতো নানা কাজে যুক্ত। জিডিপিতে পাটের অবদান ০.২৬ শতাংশ হলেও কৃষি খাতে এর একক অবদান ১.১৪ শতাংশ।

চলতি মৌসুমে দেশে সাড়ে সাত লাখ হেক্টর জমি থেকে ৮৬ লাখ ১০ হাজার বেল পাট উৎপাদনের লক্ষ্য স্থির করা হলেও আবাদ হয়েছে ৭ লাখ ২৫ হাজার হেক্টর জমিতে।

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের মতে, আবাদ লক্ষ্যমাত্রা শতভাগ পূরণ না হলেও বড় ধরনের কোনো প্রাকৃতিক দুর্যোগ না হলে এই পরিমাণ জমি থেকেই লক্ষ্যমাত্রা মোতাবেক পাট উৎপাদন ও দেশের চাহিদা পূরণ সম্ভব হবে। বেশি দিনের কথা নয়, নব্বইয়ের দশকেও দেশে ১২ লাখ হেক্টর জমিতে পাটের চাষ হতো। স্বাধীনতার পর পাটই ছিল বাংলাদেশের প্রধান রপ্তানি পণ্য। রপ্তানি আয়ের শতকরা ৮০ ভাগ আসত পাট থেকে। তাই পাটকে বলা হতো সোনালি আঁশ। দেশের সব জেলায় কমবেশি পাট চাষ হয়।

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, দেশে উৎপাদিত পাটের শতকরা ৫১ ভাগ স্থানীয় পাটকলে ব্যবহৃত হয়। শতকরা ৪৪ ভাগ কাঁচা পাট বিদেশে রপ্তানি হয়। ৫ শতাংশের মতো পাট ব্যবহৃত হয় গৃহস্থালি ও কুটির শিল্পের কাজে। গুণগত মানের পাটবীজের অভাব বাংলাদেশে পাট উৎপাদনে একটি মৌলিক সমস্যা। দেশে ব্যবহৃত পাটবীজের শতকরা ৮০ থেকে ৮৫ ভাগ আসে ভারত থেকে। এ সমস্যা সমাধানে মানসম্মত পাটের উৎপাদন বৃদ্ধি ও পাটবীজে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জনের লক্ষ্যে পাট অধিদপ্তরের আওতায় ‘উন্নত প্রযুক্তিনির্ভর পাট ও পাটবীজ উৎপাদন এবং সম্প্রসারণ’ শীর্ষক একটি প্রকল্প চলমান রয়েছে। প্রকল্পটি দেশের ৪৬টি জেলার ২৩০টি উপজেলায় বাস্তবায়িত হচ্ছে। প্রকল্পটির মাধ্যমে পাট চাষের উন্নত কলাকৌশল সম্পর্কে চাষিদের প্রশিক্ষিত করা এবং সার্বিকভাবে গুণগত মানসম্মত পাট ও পাটবীজ উৎপাদন বৃদ্ধির জন্য কৃষকদের মধ্যে বিনামূল্যে ৩৯০ টন পাটবীজ বিতরণ করাসহ সব ধরনের সহায়তা করছে সরকার। আশা করা যায়, এতে দেশে গুণগত মানের পাটবীজের অভাব অনেকটাই পূরণ হবে। বাড়বে ফলন ও আঁশের গুণগত মান।

ইউরোপ-আমেরিকাসহ প্রধান বাজারগুলোতে করোনাভাইরাস মহামারীর প্রকোপ কমে স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরে আসতে শুরু করেছে। তাই রপ্তানিকারকরাও এই খাতটি থেকে গত অর্থবছরের চেয়ে বেশি বিদেশি মুদ্রা দেশে অর্জনে নতুন পরিকল্পনা তৈরি করছেন। ২০১৯-২০ অর্থবছরে প্রথমবারের মতো চামড়াকে পেছনে ফেলে পাট দ্বিতীয় শীর্ষ রপ্তানি খাত হলেও ব্যবধানটা ছিল খুবই কম। কিন্তু বিগত ২০২০-২১ অর্থবছরে চামড়া খাত থেকে রপ্তানি আয় হয় ৯৪ কোটি ১৭ লাখ ডলার। আর পাট খাত থেকে রপ্তানি আয় হয় ১১৬ কোটি ১৪ লাখ ডলার। এই ধারাবাহিকতা বজায় রেখে নতুন অর্থবছরে পাট ও পাটজাত পণ্য থেকে আরও বেশি রপ্তানি আয়ের আশা করছে বাংলাদেশ।

গত অর্থবছরে পাট সুতা রপ্তানি হয়েছে ৮০ লাখ ডলারের, প্রবৃদ্ধি হয়েছে ৪১ দশমিক ৬১ শতাংশ। কাঁচা পাট রপ্তানি হয়েছে ১৩ কোটি ৮১ লাখ ৫০ হাজার ডলার, আয় বেড়েছে ৬ দশমিক ৩৬ শতাংশ। পাটের তৈরি বস্তা, চট ও থলে রপ্তানি হয়েছে প্রায় ১৪ কোটি ডলারের। আয় বেড়েছে ৩০ দশমিক ১৫ শতাংশ। পাট ও পাট সুতা দিয়ে হাতে তৈরি বিভিন্ন পণ্য রপ্তানি করে আয় হয়েছে ১২ কোটি ডলার, প্রবৃদ্ধি ১০ শতাংশ। এ ছাড়া পাটের তৈরি অন্যান্য পণ্য রপ্তানি হয়েছে ৮ কোটি ৫৬ লাখ ৩০ হাজার ডলারের।

এদিকে, গত ৬ জুলাই, বাণিজ্য মন্ত্রণালয় ২০২১-২২ অর্থবছরের পণ্য রপ্তানি থেকে ৪৩ দশমিক ৫০ বিলিয়ন ডলার আয়ের যে লক্ষ্যমাত্রা ঘোষণা করে, তাতে ২৩ দশমিক ১২ শতাংশ প্রবৃদ্ধি ধরে পাট ও পাটজাতপণ্য থেকে ১৪৩ কোটি ডলার আয়ের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে। এ লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করতে হলে পাটের সর্বোচ্চ ব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে।

বাংলাদেশের মতো উৎকৃষ্ট মানের পাট পৃথিবীর কোনো দেশেই উৎপন্ন হয় না। পাট বাংলাদেশের একটি গুরুত্বপূর্ণ খাত। এ খাতের উন্নয়নে বন্ধ ঘোষিত পাটকলগুলো দ্রুততম সময়ে বেসরকারি ব্যবস্থাপনায় ভাড়া বা ইজারায় চালু করা হবে বলে জানিয়েছে বস্ত্র ও পাট মন্ত্রণালয়। বেসরকারি ব্যবস্থাপনায় পাটকল চালু হলে বন্ধের সময় যেসব শ্রমিক ছিলেন তারা অগ্রাধিকার ভিত্তিতে কাজের সুযোগ পাবেন এবং পর্যায়ক্রমে সব শ্রমিককে পুনর্বাসিত করা হবে বলেও জানিয়েছেন তারা।

রপ্তানিকারকরা বলছেন, এখন পৃথিবীতে পাট ও পাটজাত পণ্য রপ্তানিতে সুসময় চলছে। কভিড-১৯ মহামারী পরিবেশের ক্ষেত্রে নতুন ভাবনার জন্ম দেওয়ায় এ খাতের সম্ভাবনা দেখা দিয়েছে নতুন করে। পরিবেশের ক্ষতি বিবেচনায় এমনিতেই পলিথিনের ব্যবহার কমে আসছিল বেশির ভাগ দেশে। পরিবেশের বিষয়টি ভবিষ্যতে আরও জোরালোভাবে সামনে আসবে। আর তাতে পাট ও পাটপণ্যের চাহিদা বাড়বে।

পাট খাতে উন্নয়নে শুধু বিদেশে রপ্তানির ওপর নির্ভর করলে চলবে না। দেশেও পাটের ব্যবহার বাড়াতে হবে। বস্ত্র ও পাট মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, পাটের অভ্যন্তরীণ ব্যবহার বৃদ্ধি এবং পরিবেশ সুরক্ষায় সরকার ১৯টি পণ্যে পাটের মোড়ক ব্যবহার বাধ্যতামূলক করে আইন প্রণয়ন করেছে। এই ১৯টি পণ্য হচ্ছে ধান, চাল, গম, ভুট্টা, চিনি, সার, মরিচ, হলুদ, পেঁয়াজ, আদা, রসুন, ডাল, ধনিয়া, আলু, আটা, ময়দা, তুষ-খুদ-কুঁড়া, পোলট্রি ফিড ও ফিশ ফিড। কিন্তু দুর্ভাগ্যের বিষয় শুধু ধান, চাল ও গমের বস্তাতেই পাটের ব্যবহার হচ্ছে। সেটাও সামান্য পরিমাণে শুধু রাজধানী ঢাকায়। বাইরের জেলা-উপজেলাগুলোতে কেউ মানছে না এই আইন। আইনটি বাস্তবায়ন করা গেলে  প্রতি বছর দেশে ১০০ কোটি পাটের বস্তার চাহিদা তৈরি হবে। স্থানীয় বাজারে পাট ও পাটজাত পণ্যের চাহিদা বৃদ্ধি পাবে, চাষিরা পাটের ন্যায্যমূল্য পাবেন এবং দেশে সৃষ্টি হবে সোনালি আঁশের নতুন সম্ভাবনা।

লেখক : সাবেক মহাব্যবস্থাপক (কৃষি), বাংলাদেশ চিনি ও খাদ্যশিল্প করপোরেশন

[email protected]