জনসাধারণকে যুক্ত করলে করোনা মোকাবিলায় সুফল মিলবে|307602|Desh Rupantor
logo
আপডেট : ২ আগস্ট, ২০২১ ১৫:৩১
জনসাধারণকে যুক্ত করলে করোনা মোকাবিলায় সুফল মিলবে

জনসাধারণকে যুক্ত করলে করোনা মোকাবিলায় সুফল মিলবে

ডা. মুশতাক হোসেন

জনস্বাস্থ্য ও মহামারী রোগ বিশেষজ্ঞ ডা. মুশতাক হোসেন বাংলাদেশ সরকারের রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউট (আইইডিসিআর)-এর পরামর্শক হিসেবে কাজ করছেন। এর আগে তিনি আইইডিসিআর-এর চিকিৎসা সামাজিকবিজ্ঞান বিভাগের প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ছিলেন। এছাড়া বিভিন্ন সময়ে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা এবং ইউএস-সিডিসির উপদেষ্টা হিসেবেও কাজ করেছেন। দেশে চলমান করোনা মহামারী, টিকাদান কর্মসূচিসহ প্রাসঙ্গিক বিষয়ে কথা বলেছেন এ জনস্বাস্থ্য ও মহামারী বিশেষজ্ঞ। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন দেশ রূপান্তর সম্পাদকীয় বিভাগের এহসান মাহমুদ

দেশ রূপান্তর : দেশে করোনা সংক্রমণের এক বছরেরও বেশি সময় পরে মহামারীর বর্তমান পরিস্থিতি কোন দিকে যাচ্ছে বলে মনে করেন? কীভাবে মূল্যায়ন করছেন?

মুশতাক হোসেন : এই মুহূর্তে করোনা পরিস্থিতির দিন দিন অবনতি হচ্ছে। প্রতিনিয়ত মৃত্যুর সংখ্যা ও নতুন আক্রান্তের সংখ্যা বাড়ছে। এখনো করোনা পরিস্থিতি ঊর্ধ্বগতির মধ্যেই আছে।

দেশ রূপান্তর : চলতি বছর আমরা লকডাউনের নানা ধরন দেখলাম। কঠোর লকডাউন, কঠোরতম লকডাউন থেকে শুরু করে শিথিল লকডাউনের দেখা মিলেছে। এমন পরিস্থিতিতে ঈদুল আজহার পর থেকেই দেশে কঠোর লকডাউন চলছে। এর মধ্যেই এখন তৈরি পোশাক কারখানাসহ রপ্তানিমুখী শিল্পকারখানা খুলে দেওয়ার ঘোষণা দেওয়া হয়েছে। পুরো বিষয়টিকে আপনি কীভাবে দেখছেন?

মুশতাক হোসেন : এখন দেশে করোনার যে সার্বিক পরিস্থিতি তাতে চলমান এই লকডাউন যেটি ৫ আগস্ট পর্যন্ত ঘোষণা করা আছে, তাতে যে কোনো ধরনের শিথিলতাই ঝুঁকি বয়ে আনবে। এখন সরকার নানা দিক বিবেচনা করে, বিচার-বিশ্লেষণ করে যেটি তাদের জন্য লাভজনক মনে করছে, সেটিই করবে। তবে জনস্বাস্থ্যের বিবেচনায় এখন এই বিধিনিষেধ বা লকডাউন শিথিল করার বা খুলে দেওয়ার কোনো সুযোগ নেই। কোরবানির সময়ে যাতায়াত ও জনসমাগমের স্থল খুলে দেওয়া বা শিল্পকারাখানা খুলে দেওয়া এই সব কিছুই জনস্বাস্থ্যের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ। রপ্তানিমুখী শিল্প মালিকদের দাবির মুখে সরকার নমনীয় হয়ে কারখানা খুলে দেওয়ার মধ্য দিয়ে একটি বিপুল সংখ্যক জনগোষ্ঠীর ঝুঁকি বেড়ে গেল। এখনই রাজধানীর সরকারি হাসপাতালগুলোতে করোনা রোগীরা শয্যা পাচ্ছে না। আক্রান্তের সংখ্যা যদি এমনটাই অব্যাহত থাকে বা কারখানা খুলে দেওয়ার কারণে যদি সামনের দিনগুলোতে আরও বেড়ে যায় তাহলে পরিস্থিতি মোকাবিলা করা আরও কঠিন হবে।

দেশ রূপান্তর : সরকার ঘোষণা দিয়েছে আগামী ৭ আগস্ট থেকে সারা দেশের ইউনিয়ন পর্যায়ে ভ্যাকসিন দেওয়া হবে। প্রতিটি ইউনিয়নে দিনে ৬০০ জনকে টিকা দেওয়া হবে বলেও জানানো হয়েছে। দেশে টিকার মজুদ এবং সার্বিক পরিস্থিতি বিবেচনায় সরকারের দেশজুড়ে এই টিকাদানের সক্ষমতা আছে কি না? 

মুশতাক হোসেন : বাংলাদেশের টিকাদানের সক্ষমতা প্রশ্নাতীত। বাংলাদেশ সরকারের টিকা ব্যবস্থাপনায় কোনো সক্ষমতার অভাব নেই। তবে করোনার টিকাটি যেহেতু এখন পর্যন্ত হাসপাতালগুলোতে দেওয়া হচ্ছে, সেখানে কোনো টিকাগ্রহীতা অসুস্থ হয়ে পড়লে তাকে চিকিৎসা দেওয়ার একটা তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা রয়েছে। এখন করোনার টিকা ইউনিয়ন পর্যায়ে দেওয়ার কথা ঘোষণা দেওয়া হয়েছে। এমনিতে বাংলাদেশের টিকার  যে ঐতিহ্য, তা হচ্ছে গ্রামে গ্রামে টিকা দেওয়া। এখন করোনার টিকা যখন গ্রামে গ্রামে যাচ্ছে, তখন টিকাপ্রদানের সক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন জাগার কোনো কারণ নেই। তবে করোনার টিকার আমদানি এবং মজুদ নিশ্চিত করতে হবে সবার আগে। এখন যে জনবল আছে, এর বাইরে যদি নতুন করে কাজে লাগানো যায়, তবে আরও দ্বিগুণ সংখ্যক টিকা দেওয়া যাবে। পরিবার পরিকল্পনা বিভাগের কর্মী, রেড ক্রিসেন্ট ছাড়াও নতুন জনবল দিয়ে চাইলে টিকা কার্যক্রম চালিয়ে নেওয়া সম্ভব। 

দেশ রূপান্তর : এখন করণীয় কী?

মুশতাক হোসেন : পরিস্থিতি থেকে উত্তরণ ঘটাতে আমাদের ৩টি কাজ করতে হবে। প্রথমত, যাদের করোনা শনাক্ত হচ্ছে তাদের টেলিমেডিসিনের মাধ্যমে চিকিৎসা দেওয়ার কার্যকর ব্যবস্থা নিতে হবে। আক্রান্তদের আইসোলেশনে রাখার ব্যবস্থা নিতে হবে। শনাক্ত রোগীদের জন্য একটি ভালো ব্যবস্থা করা গেলে নতুন উপসর্গধারীরা শনাক্তে আরও এগিয়ে আসবে। দ্বিতীয়ত, স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলতে হবে সবাইকে। এখন যেই লকডাউনের বিধিনিষেধ আছে তা মেনে চলতে হবে। তৃতীয়ত, সবাইকে টিকা দিতে হবে। পুরো জনগোষ্ঠীকে করোনার ভ্যাকসিনের আওতায় আনতে হবে।

এইসব কাজের সফলতার চাবিকাঠি হচ্ছে প্রথমত সরকারি নেতৃত্বে, সরকারের পরিকল্পনা মাফিক একটি নির্দিষ্ট কর্মপরিকল্পনা প্রণয়ন করা। এটা মোটামুটি এখন হচ্ছে। এরপর যে বিষয়ে জোর দিতে হবে, তা হচ্ছে জনসাধারণকে সব কাজে সম্পৃক্ত করা। স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের উদ্যোগে যদি জনসাধারণকে এসব কাজে যুক্ত করা যায় তবে এখন যেই ফলাফল আসছে, তারচেয়ে আরও বেশি সুফল পাওয়া যাবে। আমাদের জনসাধারণের মধ্যে স্বাস্থ্যবিধি না মানার প্রবণতা রয়েছে। তারা করোনা শনাক্তের পরীক্ষা করাতে অনীহা দেখান। টিকা গ্রহণে নেতিবাচক ধারণা প্রচার করেন। এমন পরিস্থিতিতে যদি এলাকার নেতৃস্থানীয়রা বা জনপ্রতিনিধিরা এগিয়ে আসেন এবং লোকজনকে বলেন যে, তোমার জ¦র হয়েছে, পরীক্ষা করাও। আক্রান্ত হলে যদি বলা হয়, তুমি ঘরে অবস্থান করো। তোমার বাসায় খাবারের ব্যবস্থা করা হবে। তাহলে কিন্তু লোকজন নিয়ম মানবে। ঘরে থাকবে। নতুন সংক্রমণ এতে কমে আসবে। কিংবা বলেন যে, তোমার বয়স হয়েছে এখন টিকা দিতে পারবে। স্থানীয় জনপ্রতিনিধিরা যদি বলেন, অযথা বাইরে জনসমাগম করা যাবে না, মসজিদে কম লোকের উপস্থিতি থাকতে হবে, দুর্যোগকালে ঘরে বসে নামাজ আদায় করো তাহলে সংক্রমণের ছড়িয়ে পড়াটা অনেকটা রোধ করা সম্ভব হবে। এলাকার যারা নেতৃস্থানীয় আছেন, তারা যদি বলেন তবে অনেকেই তা মানবেন। মসজিদের ইমাম সাহেব যদি বলেন তবে মুসল্লিরা বুঝবেন। এভাবে পারিবারিক দাওয়াত থেকে শুরু করে জনসমাগম হয় এমন সবকিছু যদি কমানো যায়, যদি সবার অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা যায়, তবে সুফল আসবে।

সমাজের বয়োবৃদ্ধ এবং পিছিয়ে পড়াদের টিকার রেজিস্ট্রেশনে সহায়তা করতে হবে। টিকাকেন্দ্র খুঁজে পেতে যদি একজন আরেক জনকে সাহায্য করে তবে টিকাগ্রহীতার সংখ্যাও বাড়বে। এছাড়া এখন তো ইউনিয়ন পর্যায়ে কেবল ন্যাশনাল আইডি কার্ড দেখিয়েই টিকা নেওয়ার কথা ঘোষণা করা হয়েছে। সমাজের সব শ্রেণির মানুষের কাছে এই বার্তাটি পৌঁছে দিতে হবে। করোনা শনাক্ত এবং টিকাদানের প্রতি মানুষের ভীতি কমাতে কাজ করতে হবে। মানুষ যদি মানুষের কাজে সহায়ক হয়ে এগিয়ে আসে তাহলে করোনার বিপক্ষে লড়াই করা সহজ হবে। জনসাধারণকে সংযুক্ত করা গেলে সুফল মিলবে। নইলে কেবল সরকারি কর্মচারী দিয়ে কাজ করিয়ে সুফল আশা করা যাবে না।

দেশ রূপান্তর : করেনার টিকা দেওয়া নিয়ে দেশের মানুষের মধ্যে এক ধরনের অনীহা, ভীতি দেখা যাচ্ছে। এ থেকে কীভাবে পরিত্রাণ পাওয়া যেতে পারে?

মুশতাক হোসেন : দেশে প্রতি বছর একটি বিশাল জনগোষ্ঠীকে টিকা দেওয়া হয়। নারী ও শিশুদের নিয়মিত টিকার আওতায় আনা হয়েছে। এসব নিয়ে কর্মসূচিও রয়েছে। এসব কাজ সম্পন্ন করার জন্য বিভিন্ন শ্রেণির স্থায়ী কর্মী ছাড়াও স্বেচ্ছাসেবী রয়েছেন। এখন করোনার টিকা প্রদানের জন্য শিক্ষার্থীদের যুক্ত করে সহজেই টিকাদানে জনসাধারণকে উৎসাহী করা থেকে শুরু করে নানা পর্যায়ের কাজ করা সম্ভব। এলাকাভিত্তিক এইভাবে শিক্ষার্থীদের যুক্ত করে প্রচারণা চালানো যেতে পারে। কারণ এলাকার ছেলেমেয়েদের কথা লোকজন শুনবে। টেলিভিশনে বিজ্ঞাপন প্রচারের মাধ্যমে লোকজনকে সচেতন করার চেয়ে এলাকার শিক্ষার্থী বা এলাকার প্রতিষ্ঠানের শিক্ষকরা যদি লোকজনকে বুঝিয়ে বলেন, সেটি বেশি সুফল দেবে।

দেশ রূপান্তর : আমেরিকার গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর ডিজিজ কন্ট্রোল (সিডিসি) বলছে, করোনা এখন চিকেন পক্সের মতো ছড়িয়ে পড়ছে। আমাদের দেশে করোনার ডেল্টা ভ্যারিয়েন্ট নিয়ে গণমাধ্যমে নানা ধরনের সংবাদ আসছে। করোনা ঠিক কোন মাত্রায় দেশে ছড়িয়ে পড়ছে বা এর ধরনটাই কেমন এসব নিয়ে কোনো গবেষণা আছে কিনা?

মুশতাক হোসেন : করোনা ইনফ্লুয়েঞ্জার মতো অর্থাৎ হাঁচি-কাশির মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ছে। তবে তারা যে গবেষণা ফলের কথা বলছেন, সেটি আরও প্রমাণ সাপেক্ষ। এখনই চূড়ান্ত কিছু বলা যাবে না। আমাদের দেশেও করোনা নিয়ে গবেষণা হচ্ছে। মাঝেমাঝে গবেষণার ফলাফল গণমাধ্যমের মাধ্যমে প্রকাশ করা হয়। তবে আরও বড় ধরনের গবেষণার পুরো বিষয়টা সম্পদ বা সামর্থ্যরে সঙ্গেও জড়িত। সম্পদের জোগান দিয়ে গবেষণা কার্যক্রম চালিয়ে নিতে হয়। আমাদের দেশের গবেষকরাও গবেষণা করছেন। যদি সরকারি ও বেসরকারিভাবে তাদের আরও সহযোগিতা করা হয়, তবে তাদের যেই সক্ষমতা আছে তা দিয়েই আরও বড় ধরনের গবেষণা কার্যক্রম চালিয়ে নেওয়া সম্ভব। আমাদের দেশের গবেষকদের সক্ষমতায় কোনো ঘাটতি নেই।

দেশ রূপান্তর : দেশে করোনার এই বিরাজমান পরিস্থিতি মোকাবিলায় আপনার পরামর্শ কী?

মুশতাক হোসেন : প্রথম পদক্ষেপ হতে হবে শনাক্ত রোগীদের আইসোলেশন এবং চিকিৎসাব্যবস্থা নিশ্চিত করা। আইসোলেশন করা গেলে নতুন শনাক্ত রোগীর সংখ্যা কমবে। আর সঠিক সময়ে চিকিৎসার ব্যবস্থা করা গেলে মৃত্যুর সংখ্যাও কমিয়ে আনা যাবে।

দ্বিতীয় পদক্ষেপ হতে হবে, স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলা। এই সময়ে করোনা থেকে এড়াতে যেসব নিয়ম-কানুন রয়েছে তা যথাযথ মানতে হবে।

আর তৃতীয়ত হচ্ছে আমরা সবাইকে টিকা দিয়ে দেব। টিকা এই জন্য দেব যে, এটা আমাদের ভবিষ্যতের জন্য সুরক্ষা দেবে।

দেশ রূপান্তর : অনেক ধন্যবাদ আপনাকে।

মুশতাক হোসেন : আপনাকেও ধন্যবাদ।