কুমিল্লা ‘পরিবেশে’ টাকা আর টাকা|307749|Desh Rupantor
logo
আপডেট : ৩ আগস্ট, ২০২১ ০০:০০
কুমিল্লা ‘পরিবেশে’ টাকা আর টাকা
নিজস্ব প্রতিবেদক, কুমিল্লা

কুমিল্লা ‘পরিবেশে’ টাকা আর টাকা

পরিবেশ সুরক্ষার বিষয়টি দেখভালের দায়িত্ব পরিবেশ অধিদপ্তরের। কিন্তু পরিবেশ রক্ষার নামে কুমিল্লায় সরকারি এ প্রতিষ্ঠানটি দিন দিন বারোটা বাজিয়ে চলেছে পরিবেশের। প্রতিষ্ঠানটির কুমিল্লা কার্যালয়ের প্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালন করা উপপরিচালক (ডিডি) শওকত আরা কলিসহ কর্মকর্তারা ঘুষের কারবারের একটি শক্তিশালী সিন্ডিকেট গড়ে তুলেছেন বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। যার নিয়ন্ত্রক উপপরিচালক নিজেই। টাকা দিলেই পরিবেশ অধিদপ্তরের কুমিল্লা কার্যালয় থেকে মিলছে যেকোনো ধরনের ছাড়পত্র। তা সে দূষণ বিস্তারকারী কারখানা বা প্রতিষ্ঠান হলেও সমস্যা নেই।

ভুক্তভোগীরা বলছেন, ‘খরচাপাতি’ ছাড়া কুমিল্লা পরিবেশ অধিদপ্তর থেকে কোনো ছাড়পত্র মেলে না। দিনের পর দিন ধরনা দিলেও সাড়া মেলে না কর্মকর্তাদের। সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলেও ছাড়পত্র তো দূরে থাক, ফাইলের সন্ধান দিতেই সময় নেয় কয়েক দফা। শেষ পর্যন্ত স্তূপের ভেতর থেকে ফাইল উদ্ধার হলেও ছাড়পত্র দেওয়ার কাজ আর এগোয় না। সব মিলিয়ে পরিবেশ রক্ষার এ কার্যালয় যেন ঘুষের হাটে পরিণত হয়েছে।

উপপরিচালক শওকত আরা কলির বিরুদ্ধে রয়েছে অসংখ্য অভিযোগ। ভুক্তভোগীরা জানান, উপপরিচালক কলি অবৈধ লেনদেন তার নিজের ব্যাংক হিসাবে করেন না। ঘুষের লেনদেন হয় তার স্বামীর ব্যাংক হিসাবে। কলির স্বামী লোকমান হোসেন সরকার ইস্পাহানি স্কুল অ্যান্ড কলেজের শিক্ষক হিসেবে কর্মরত। জেলা জুড়ে বছরের পর বছর ধরে অনুমোদনহীন ইটভাটা ও অবৈধ কলকারখানাগুলো চলছে পরিবেশ অধিদপ্তরকে ম্যানেজ করে। আর এজন্য লেনদেন হয়েছে কোটি কোটি টাকা। জেলার দেবিদ্বারের এক ইটভাটামালিক দেশ রূপান্তরকে বলেছেন, ‘টাকা দিলেই কুমিল্লা পরিবেশ অধিদপ্তর কেনা যায়।’

তবে এসব অভিযোগ অস্বীকার করে নিজেদের নির্দোষ দাবি করেছেন উপপরিচালক শওকত আরা কলি।

দেশ রূপান্তরের অনুসন্ধানে জানা যায়, কুমিল্লা পরিবেশ অধিদপ্তরের উপপরিচালক শওকত আরা কলির স্বামী লোকমান হোসেন সরকার ২০১৯-২০ সালে ট্রাস্ট ব্যাংকের ০০৪৭০৩১০০১৫০৭৪ নম্বর হিসাব এবং আইএফআইসি ব্যাংকের ০১৭০২১৭৪৯৮৮১১ নম্বর হিসাবের মাধ্যমে ১ কোটি ১৯ লাখ টাকা লেনদেন করেছেন। এর মধ্যে আরটিজিএসের (রিয়েল টাইম গ্রস সেটেলমেন্ট) মাধ্যমে যমুনা ব্যাংকে ২০২০ সালের ১৮ নভেম্বর আবাসন ব্যবসায়ী হোসেন বাদলকে ৫২ লাখ টাকা পরিশোধ করেন। একই দিনে কুমিল্লা নগরীতে ১৪২১ বর্গফুটের একটি ফ্ল্যাট কেনেন কলি-লোকমান দম্পতি। নগরীর ছোটরা মৌজার জজ কোর্ট রোডের ওই ফ্ল্যাটটি ২৭ লাখ টাকা মূল্য উল্লেখ করে শওকত আরা কলির নামেই নিবন্ধন (রেজিস্ট্রি) করা হয়েছে। এসব লেনদেনের কাগজপত্র ও তথ্য দেশ রূপান্তরের হাতে এসেছে। এছাড়া কলির শ্বশুরবাড়ি জেলার দেবিদ্বারের ধামতি গ্রামেও নির্মাণ করা হয়েছে আলিশান ভবন। কুমিল্লা সদর ও দেবিদ্বারে নামে-বেনামে বেশকিছু জমিও কিনেছেন এ দম্পতি। অভিযোগ রয়েছে, এসব সম্পদের সবই গড়া হয়েছে পরিবেশ অধিদপ্তরের কুমিল্লা কার্যালয়ের প্রধান হয়ে কলির অবৈধ লেনদেনে অর্জিত টাকায়।

কলির স্বামীর ব্যাংক হিসাবে বাধ্য হয়ে ঘুষের টাকা জমা দেওয়া অন্তত দুজন ভুক্তভোগীর সঙ্গে কথা হয়েছে এই প্রতিবেদকের। এদের একজন কুমিল্লা সদরের, আরেকজন জেলার দেবিদ্বারের ইটভাটামালিক। নাম প্রকাশ না করার শর্তে তারা এ প্রতিবেদককে জানান, তাদের ইটভাটাগুলো আবাসিক এলাকার মধ্যে পড়েছে, পরিবেশ আইন অনুযায়ী যা নিষিদ্ধ। তাদের ভাটাগুলো অবৈধ ঘোষণা করে সরিয়ে ফেলার নির্দেশ দেন কুমিল্লা পরিবেশ অধিদপ্তরের উপপরিচালক। এরপর তার কার্যালয়ের এক কর্মচারীর মাধ্যমে ৫ লাখ টাকা ঘুষ দিয়ে ভাটাগুলো চালানোর প্রস্তাব দেওয়া হয়। এ প্রস্তাবে দুই ইটভাটা মালিক রাজি হলে তাদের উপপরিচালক কলির স্বামী লোকমানের সঙ্গে যোগাযোগ করতে বলা হয়। পরে তিন ধাপে ওই ৫ লাখ টাকা লোকমানের ব্যাংক হিসাবে জমা দেন দুই ভাটামালিক।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, একদিকে পাহাড় কাটা, জলাশয় ও পুকুর ভরাট এবং অবৈধ ইটভাটার দাপটে পুরো জেলার পরিবেশ ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে, অন্যদিকে কুমিল্লা পরিবেশ অধিদপ্তরের উপপরিচালক শওকত আরা কলিসহ তার কার্যালয়ের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের লাগামহীন ঘুষ কারবার চলছে অনেকটাই প্রকাশ্যে। অবস্থা দেখলে মনে হবে, পরিবেশ রক্ষার এ কার্যালয় যেন ঘুষের হাটে পরিণত হয়েছে। পরিবেশ অধিদপ্তরের নীরবতার কারণে দখল-দূষণে কুমিল্লার প্রাকৃতিক পরিবেশ এখন অনেকটাই বিপন্ন। গোমতী নদী ঘিরে গত এক বছরের বেশি সময় ধরে চলছে ধ্বংসযজ্ঞ। নদীর শতাধিক স্থানে ড্রেজার দিয়ে বালু উত্তোলন হচ্ছে, আবার কোথাও নদীর বাঁধের ভেতরের ফসলি জমি থেকে মাটি কেটে বিক্রি করা হচ্ছে। অবৈধভাবে মাটি কেটে ও বালু উত্তোলন করে বিকৃত করে ফেলা হচ্ছে নদীর দুইপাড় এবং চরের কৃষিজমি। ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বেড়িবাঁধ। এসব যেন দেখার কেউ নেই!

এছাড়া ময়নামতি-লালমাই পাহাড় কেটে সাবাড় করা হচ্ছে। পাহাড় কেটে কেউ বানাচ্ছেন পার্ক, আবার কেউ বানাচ্ছেন পিকনিক স্পট, রিসোর্ট ও বাংলো বাড়ি। জনশ্রুতি রয়েছে, কুমিল্লায় পরিবেশ অধিদপ্তরের অসাধু কর্মকর্তাদের যোগসাজশেই দিন-রাতে এভাবে পাহাড় নিধন চলছে। মোটা অঙ্কের টাকার বিনিময়ে তারা এসব রোধে কোনো ব্যবস্থা না নিয়ে নীরব দর্শকের ভূমিকা পালন করছেন। এতে হুমকির মুখে পড়েছে কুমিল্লার প্রাকৃতিক পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্য।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, কুমিল্লা মহানগরীর ভেতরে পাঁচটি, দেবিদ্বার পৌরসভার ভেতরে দুটি, চৌদ্দগ্রাম পৌরসভায় তিনটি, চান্দিনা পৌরসভায় দুটি এবং নাঙ্গলকোট পৌরসভায় দুটি অবৈধ ইটভাটাসহ জেলার বিভিন্ন স্থানে অসংখ্য অবৈধ ইটভাটা গড়ে উঠেছে কোনো প্রকার অনুমোদন ছাড়াই। পরিবেশ অধিদপ্তরে টাকা দিলেই অবৈধ ইটভাটা হয়ে যায় ‘বৈধ’। আর টাকা না দিলে বৈধ ইটভাটার ওপরও নেমে আসে কথিত অভিযানের খড়গ। করা হয় মোটা অঙ্কের জরিমানা। নতুন ইটভাটা স্থাপনে পরিবেশ ছাড়পত্র নিতে দিতে হয় ৫ লাখ টাকা ঘুষ। আর ইটভাটার বার্ষিক নবায়নে গুনতে হয় লাখ টাকা ঘুষ। শুধু ইটভাটাই নয়, রাইস মিল, স’মিল, পোলট্রি ফার্ম কিংবা ক্ষুদ্র কারখানা করতে গেলেও টাকা ছাড়া মিলে না ছাড়পত্র। এমনকি বহুতল ভবন নির্মাণে ছাড়পত্রের জন্যও দিতে হয় ৩০ থেকে ৫০ হাজার টাকা উৎকোচ। রাইস মিলের ছাড়পত্রের জন্য ৫ লাখ আর স’মিলের জন্য ৫০ হাজার টাকা করে ঘুষ নেওয়া হয়। এর বাইরে অবৈধ ইটভাটাসহ ক্ষুদ্র কারখানাগুলো থেকেও ওঠানো হয় মাসোহারা।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে কয়েকটি অনুমোদিত ইটভাটা ও কারখানার মালিক জানান, কোনো প্রকার নীতিমালা অনুসরণ না করেই পরিবেশ অধিদপ্তরের কুমিল্লা কার্যালয় থেকে ছাড়পত্র নিয়ে পরিবেশের বিপর্যয় ঘটাচ্ছে অবৈধ ইটভাটাসহ নানান ধরনের কলকারখানা। পরিবেশ আইন লঙ্ঘন করে জেলা জুড়ে তিনশোর বেশি ইটভাটা গড়ে তোলা হয়েছে। এগুলোর অধিকাংশেরই বৈধ কাগজপত্র নেই। ছাড়পত্র ও অনুমোদন না থাকলেও অবৈধ লেনদেনের মাধ্যমেই মালিকরা তাদের ইটভাটা পরিচালনা করছেন।

তারা আরও জানান, কুমিল্লায় মোট ৩১৪টি ইটভাটা নিয়মিত ইট প্রস্তুত করছে। এসব ভাটার বেশিরভাগই পরিবেশের ক্ষতি করে ইট তৈরির কাজ চালিয়ে যাচ্ছে। মহানগর, পৌরসভা, লোকালয়, কৃষিজমি, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের অদূরে এমনকি আবাসিক এলাকাসহ গ্রামের মাঝখানেই অধিকাংশ ইটভাটা স্থাপন করা হয়েছে। এতে পরিবেশ বিপর্যয়ের পাশাপাশি লোকালয়গুলোতে বসবাসকারী লাখো মানুষের স্বাস্থ্যঝুঁকি দেখা দিয়েছে। যদিও আইন অনুযায়ী আবাসিক, সংরক্ষিত বা বাণিজ্যিক এলাকা, সিটি করপোরেশন-পৌরসভা, উপজেলা সদর, সরকারি বা ব্যক্তিমালিকানাধীন বন, অভয়ারণ্য, বাগান-জলাভূমি, কৃষিজমি, সংকটাপন্ন এলাকা এবং সড়কের পাশে কোনো ইটভাটা স্থাপনে নিষেধাজ্ঞা রয়েছে। কিন্তু এ আইনের সম্পূর্ণ উল্টোপথে চলছে কুমিল্লার বেশিরভাগ ইটভাটা।

এ প্রসঙ্গে বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলনের (বাপা) সদস্য পরিবেশবিদ শাহ মোহাম্মদ আলমগীর খান দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘কুমিল্লার পরিবেশ রক্ষায় পরিবেশ অধিদপ্তর ব্যর্থ হয়েছে। একদিকে অবৈধভাবে স্থাপিত হচ্ছে কলকারখানা ও ইটভাটা আবার অন্যদিকে নদী-জলাশয় এবং খাল-বিল-পুকুর ভরাট হচ্ছে। কিন্তু পরিবেশ অধিদপ্তর এসব ক্ষেত্রে যেন নীরব দর্শক। পরিবেশ অধিদপ্তর সঠিক ও সৎভাবে কাজ করলে এসব অনিয়ম চলতে পারত না।’

তবে নিজের বিরুদ্ধে ওঠা সব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন পরিবেশ অধিদপ্তরের কুমিল্লা কার্যালয়ের উপপরিচালক শওকত আরা কলি। তিনি দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘এ ধরনের কোনো কাজে (ঘুষ লেনদেন) আমি জড়িত নই।’ নিজের নামে ফ্ল্যাট কেনার বিষয়টি স্বীকার করে তিনি বলেন, ‘এ বছর আয়কর রিটার্ন দাখিলের সময় এসব বিষয়ে তথ্য দেব।’ আর স্বামী লোকমান হোসেনের ব্যাংক হিসাবে লেনদেনের বিষয়টি জানা নেই বলে দাবি করেন তিনি।

ইটভাটার বিষয়ে উপপরিচালক কলি বলেন, ‘কুমিল্লায় ৩১৪টি ইটভাটা রয়েছে, অধিকাংশ ইটভাটাই পরিবেশের বিপর্যয় ঘটাচ্ছে। আমরা এদের বিরুদ্ধে অভিযান অব্যাহত রেখেছি। এছাড়া পরিবেশ আইন লঙ্ঘন করে যারা পুকুর, জলাশয় ভরাট এবং অন্যান্য পরিবেশবিরোধী কাজ করছে তাদের বিরুদ্ধেও আইনগত পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে।’

স্ত্রীর হয়ে ঘুষের টাকা লেনদেনের অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে স্বামী লোকমান হোসেন সরকার দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আমার বিরুদ্ধে আসা এসব অভিযোগ সম্পূর্ণ মিথ্যা ও বানোয়াট। আমি এমন কোনো কাজের সঙ্গে জড়িত নই।’ আর ব্যাংকে ২০১৯-২০ সালে ১ কোটি ১৯ লাখ টাকা লেনদেনের বিষয়টি পুরোপুরি সঠিক নয় দাবি করলেও ৫২ লাখ টাকায় ফ্ল্যাট কেনার বিষয়টি স্বীকার করেন লোকমান হোসেন।

কুমিল্লা কার্যালয়ে ঘুষ লেনদেনের অভিযোগ প্রসঙ্গে জানতে পরিবেশ অধিদপ্তরের চট্টগ্রাম অঞ্চলের পরিচালক মোহাম্মদ মোয়াজ্জেম হোসাইনের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি এ বিষয়ে কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি।