রপ্তানি মূল্য না এনেও নগদ সহায়তা!|307757|Desh Rupantor
logo
আপডেট : ৩ আগস্ট, ২০২১ ০০:০০
রপ্তানি মূল্য না এনেও নগদ সহায়তা!
শেখ শাফায়াত হোসেন

রপ্তানি মূল্য না এনেও নগদ সহায়তা!

প্রায় পাঁচ বছর আগে বাংলাদেশ থেকে চিংড়ি রপ্তানি করেছিল মার্কেন্টাইল ব্যাংকের গ্রাহক মেসার্স কুলিয়ারচর সি ফুডস (কক্সবাজার) লিমিটেড। সেই টাকা এখনো দেশে আসেনি। এরপরও ওই প্রতিষ্ঠানের অনুকূলে সরকার ঘোষিত রপ্তানি সহায়তা পরিশোধ করেছে মার্কেন্টাইল ব্যাংক।

বিষয়টি বাংলাদেশ ব্যাংকের সাম্প্রতিক এক পরিদর্শনে উঠে এসেছে। পরিদর্শন প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, মার্কেন্টাইল ব্যাংকের গ্রাহক মেসার্স কুলিয়ারচর সি ফুডস প্রথম দফায় ৫ লাখ ৫৮ হাজার ৭২০ ডলার ও পরে ৪৪ হাজার ৬ ডলার রপ্তানিমূল্য দেশে আনতে ব্যর্থ হয়। বাংলাদেশি মুদ্রায় যার পরিমাণ ৫ কোটি ১২ লাখ ৪৮ হাজার ৭৮৮ টাকা। বর্তমান মুদ্রা বিনিময় হার ১ ডলার সমান ৮৫ টাকা ধরে এ হিসাব বের করা হয়েছে।

জানা যায়, ২০১৭ সালে কেন্দ্রীয় ব্যাংক সতর্ক করলেও অবৈধ উপায়ে টাকাটা সমন্বয়ের চেষ্টা করা হয়। প্রতিষ্ঠানটিকে একাধিকবার রপ্তানি সহায়তা দেওয়া হয়েছে। করোনার মধ্যেও ওই গ্রাহককে নতুন করে ২৬ কোটি টাকার অধিক সরকারের রপ্তানি সহায়তা দিয়েছে মার্কেন্টাইল ব্যাংক।

বাংলাদেশ ব্যাংকের ওই পরিদর্শন প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, মার্কেন্টাইল ব্যাংকের প্রধান শাখার গ্রাহক মেসার্স কুলিয়ারচর সি ফুডস লিমিটেড ২০১৬ সালের ১২ জুলাই চিংড়ি রপ্তানি করে কানাডায়। ৫ লাখ ৫৮ হাজার ৭২০ ডলার মূল্যের ওই চিংড়ি কিনেছিল কানাডার কুইবেকের ইকোপ্যাক ইনকরপোরেশন। ঋণপত্রের (এলসি) বিপরীতে একই মাসের ২১ এবং ২৭ তারিখে পণ্য শিপমেন্ট সম্পন্ন হয়। কিন্তু এ রপ্তানিমূল্য আজও দেশে আসেনি।

বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিদর্শনে বলা হয়, বিদেশি ওই ক্রেতা ছিল একটি শেল কোম্পানি বা নামসর্বস্ব প্রতিষ্ঠান। এই রপ্তানির করেসপন্ডেন্ট ব্যাংক ছিল সোলিল চার্টার্ড ব্যাংক, নিউ ইউর্ক, যুক্তরাষ্ট্র। এটাও ছিল একটি শেল ব্যাংক।

এছাড়া ওই বছরের ২৯ সেপ্টেম্বর কুলিয়ারচর সি ফুডস ২ লাখ ৩৪ হাজার ডলার মূল্যে ১ হাজার ৬০০ কার্টন চিংড়ি রপ্তানি করে যুক্তরাষ্ট্রে। এর মধ্যে এক হাজার কার্টন চিংড়ি প্রত্যাখ্যান করে বিদেশি ক্রেতা প্যাসিফিক অ্যামেরিকান ফিশ কোং ইনকরপোরেশন। বাকি ৬০০ কার্টন চিংড়ির মূল্য ছিল ১ লাখ ৭ হাজার ২০০ ডলার। ওই রপ্তানির বিপরীতে বিদেশি ব্যাংক কুলিয়ারচর সি ফুডসকে আংশিক মূল্য পরিশোধ করে। ৬০০ কার্টন চিংড়ির মূল্য হিসাবে ৬২ হাজার ৯৯৩ ডলার পায় কুলিয়ারচর সি ফুডস। ফলে ৪৪ হাজার ২০৬ ডলার দেশে আসেনি বলে উল্লেখ করা হয় বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিদর্শন প্রতিবেদনে।

রপ্তানির দেড় বছর পর ২০১৮ সালের ২২ ফেব্রুয়ারি সংযুক্ত আরব আমিরাত থেকে আল স্নায়া গার্মেন্টস শপ কর্তৃক পাঠানো ৪৩ হাজার ৭৫২ ডলার পাঠিয়ে এর দ্বারা রপ্তানিমূল্য সমন্বয় করা হয়। আল স্নায়া গার্মেন্টের প্রধান কার্যালয়ের অবস্থান ৫১/৫১, পুরানা পল্টন। এভাবে রপ্তানিমূল্য সমন্বয় করে এর বিপরীতে কুলিয়ারচর সি ফুডসকে সরকারের নগদ সহায়তা দেওয়া অব্যাহত রাখে মার্কেন্টাইল ব্যাংক। যা রপ্তানির নগদ সহায়তার নীতির সঙ্গে সাংঘর্ষিক বলে মনে করেন কেন্দ্রীয় ব্যাংকের পরিদর্শক দল।

বাংলাদেশ ব্যাংক এ নিয়ে আগেও একবার একটি পরিদর্শন প্রতিবেদন তৈরি করেছিল, যাতে এসব অনিয়মের বিস্তারিত বিবরণ উঠে আসে। ওই প্রতিবেদনে গ্রাহক কুলিয়ারচর সি ফুডসের নামে বরাদ্দকৃত ১৮ কোটি ৬৯ লাখ টাকা সরকারের কোষাগারে ফেরত দেওয়ার সুস্পষ্ট নির্দেশনা দেওয়া হয়। ওই সময়ে এ নিয়ে পত্রপত্রিকায় সংবাদও পরিবেশিত হয়।

বাংলাদেশ ব্যাংকের সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে বলা হয়, আগের পরিদর্শন প্রতিবেদনের নির্দেশনা মোতাবেক গ্রাহক নগদ সহায়তার টাকা ফেরত দেয়নি। এরপরও মার্কেন্টাইল ব্যাংক কর্তৃক ওই গ্রাহককে সম্প্রতি নতুন করে ২৬ কোটি টাকার বেশি নগদ সহায়তা দেওয়া হয়েছে। এ ক্ষেত্রে নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্দেশনা উপেক্ষিত হয়েছে। নগদ সহায়তার নীতিমালা অনুযায়ী, গ্রাহকের কোনো রপ্তানি বিলের মূল্য অনাদায়ি থাকলে পরবর্তী দুই বছর তাকে নগদ সহায়তা দেওয়া হয় না।

জানতে চাইলে মার্কেন্টাইল ব্যাংকের অতিরিক্ত ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এএমডি) মতিউল হাসান দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘বিষয়টি আদালতে বিচারাধীন। বিচারপ্রক্রিয়া শেষ হলেই শুধু রপ্তানিমূল্য আসেনি বলে বিবেচিত হবে। বিচার যেহেতু শেষ হয়নি সেহেতু আমার মনে হয় তাদের নগদ সহায়তা দিতে কোনো অসুবিধা নেই।’

নাম প্রকাশ না করার শর্তে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের একটি সূত্র জানায়, গ্রাহক ও ব্যাংক কর্মকর্তাদের উভয়ের যোগসাজশে রপ্তানির টাকাগুলো পাচার হয়ে থাকতে পারে। এসব ক্ষেত্রে আদালত থেকে স্থগিতাদেশ নেওয়া যায়। তবে তার মেয়াদ তিন থেকে সর্বোচ্চ ছয় মাস। এ সময় শেষে শুনানির জন্য প্রস্তুত ছিল আদালত। কিন্তু ব্যাংকের পক্ষ থেকে কোনো যোগাযোগই করা হয়নি। ফলে মামলাটি এখন ফাইলবন্দি হয়ে আছে।