লেখক বঙ্গবন্ধুর অনুপ্রেরণা যে নারী|308580|Desh Rupantor
logo
আপডেট : ৮ আগস্ট, ২০২১ ০০:০০
লেখক বঙ্গবন্ধুর অনুপ্রেরণা যে নারী
কামাল চৌধুরী

লেখক বঙ্গবন্ধুর অনুপ্রেরণা যে নারী

মানব ইতিহাসের বিভিন্ন পর্যায়ে সমাজবদল বা পরিবর্তনের কুশীলব হিসেবে নারীরা তাৎপর্যপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন। রাজনীতি, যুদ্ধ-বিগ্রহ, শিল্প-সাহিত্য, সমাজসেবা সব ক্ষেত্রেই অবদান রেখেছেন নারীরা। কিন্তু এই ইতিহাসের সত্য যেসব ক্ষেত্রে নারীর এই ভূমিকা স্পষ্ট হয়নি বা প্রত্যক্ষ করা যায়নি। অনেকের ভূমিকা অন্তরালে থেকে গেছে। বঙ্গমাতা শেখ ফজিলাতুন নেছার ভূমিকাও তার মৃত্যুর আগে অনেকাংশে অন্তরালে ছিল। আমাদের জাতীয় ইতিহাসে, জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবের আন্দোলন-সংগ্রামের একজন অবিচল সহযোদ্ধা হিসেবে, সর্বংসহা নারী হিসেবে তিনি যে ভূমিকা পালন করেছেন তা আজ ক্রমাগত স্পষ্ট হচ্ছে উজ্জ্বল থেকে উজ্জ্বলতর হচ্ছে।

তার অনেক তাৎপর্যপূর্ণ ভূমিকার মধ্যে একটি বিশেষ ভূমিকার কথা আমি শুরুতে উল্লেখ করতে চাই। সেটি হলো লেখক বঙ্গবন্ধুকে আমরা যে পেয়েছি এর পেছনে তার অবদান। বঙ্গবন্ধুকে তিনি লেখার জন্য উৎসাহ দিয়েছেন, অসমাপ্ত আত্মজীবনীর শুরুতেই তার বিবরণ আছে। লেখার জন্য খাতা কিনে বঙ্গবন্ধুকে সরবরাহ করেছেন, বঙ্গবন্ধু জেল থেকে বের হলে সংগ্রহ করে রেখেছেন খাতাগুলো। মূলত তার প্রবল উৎসাহের কারণে আমরা লেখক বঙ্গবন্ধুকে পেয়েছি।

বঙ্গবন্ধু অসমাপ্ত আত্মজীবনীতে লিখেছেন :

আমার সহধর্মিণী একদিন জেলগেটে বসে বলল, “বসেই তো আছো, লেখো তোমার জীবনের কাহিনী।” বললাম, “লিখতে যে পারি না; আর এমন কী করেছি যা লেখা যায়! আমার জীবনের ঘটনাগুলি জেনে জনসাধারণের কি কোনো কাজে লাগবে? কিছুই তো করতে পারলাম না। শুধু এইটুকু বলতে পারি, নীতি ও আদর্শের জন্য সামান্য একটু ত্যাগ স্বীকার করতে চেষ্টা করেছি।”

একদিন সন্ধ্যায় বাইরে থেকে তালা বন্ধ করে দিয়ে জমাদার সাহেব চলে গেলেন। ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারের ছোট্ট কোঠায় বসে বসে জানালা দিয়ে আকাশের দিকে চেয়ে চেয়ে ভাবছি, সোহরাওয়ার্দী সাহেবের কথা। কেমন করে তার সঙ্গে আমার পরিচয় হলো। কেমন করে তার সান্নিধ্য আমি পেয়েছিলাম।

হঠাৎ মনে হলো লিখতে ভালো না পারলেও ঘটনা যতদূর মনে আছে লিখে রাখতে আপত্তি কি? সময় তো কিছু কাটবে। বই ও কাগজ পড়তে পড়তে মাঝেমধ্যে চোখ দুইটাও ব্যথা হয়ে যায়। তাই খাতাটা নিয়ে লেখা শুরু করলাম। আমার অনেক কিছুই মনে আছে। স্মরণশক্তিও কিছুটা আছে। দিন-তারিখ সামান্য এদিক-ওদিক হতে পারে, তবে ঘটনাগুলো ঠিক হবে বলে আশা করি। আমার স্ত্রী যার ডাক নাম রেণু আমাকে কয়েকটা খাতাও কিনে জেলগেটে জমা দিয়ে গিয়েছিল। জেল কর্তৃপক্ষ যথারীতি পরীক্ষা করে খাতা কয়টা আমাকে দিয়েছেন। রেণু আরও একদিন জেলগেটে বসে আমাকে অনুরোধ করেছিল। তাই আজ লিখতে শুরু করলাম।

শেখ হাসিনা লিখেছেন :

আমার মায়ের প্রেরণা ও অনুরোধে আব্বা লিখতে শুরু করেন। যতবার জেলে গেছেন, আমার মা খাতা কিনে জেলে পৌঁছে দিতেন, আবার যখন মুক্তি পেতেন তখন খাতাগুলো সংগ্রহ করে সযতেœ রেখে দিতেন। তার এমন দূরদর্শী চিন্তা যদি না থাকত তাহলে এ মূল্যবান লেখা আমরা জাতির কাছে তুলে দিতে পারতাম না।

এর মাধ্যমে শেখ ফজিলাতুন নেছা আমাদের ইতিহাস চর্চার ক্ষেত্রেও তাৎপর্যময় ভূমিকা রেখেছেন। আজ যখন বঙ্গবন্ধুর লেখা আমরা পাঠ করি ইতিহাসের অনেক তথ্য ও বিবরণ অনুপুঙ্খভাবে পাই। এতে আমাদের ইতিহাসের অনেক অস্পষ্টতা কেটে গেছে। অনেকের এতদিনের মনগড়া আলোচনা গুরুত্বহীন হয়ে পড়েছে এখন।

তবে এজন্য তার কন্যা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে বিশেষ ধন্যবাদ জানাতে হয়। মহীয়সী মাতা যেমন গভীর মমতায় বঙ্গবন্ধুকে কারাগারের নিঃসঙ্গ জীবনে লেখায় উৎসাহ দিয়েছেন, বঙ্গবন্ধুর লেখা সংরক্ষণ করার চেষ্টা করেছেন, তেমনি শেখ হাসিনাও এইগুলো প্রকাশ করে, সেই সঙ্গে বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে পুলিশি গোপনীয় প্রতিবেদন প্রকাশ করে আমাদের কৃতজ্ঞ করেছেন। বঙ্গমাতা শেখ ফজিলাতুন নেছা মুজিবের জন্মদিন উদ্যাপন অনুষ্ঠানে শেখ হাসিনার স্মৃতিচারণ থেকেও এ সম্পর্কে আমরা অনেক তথ্য পাই :

’৫৮ সালে যখন আব্বা গ্রেপ্তার হয়ে গেলেন, তারপরে ’৬০ সালে তিনি মুক্তি পান। সেই সময় যেহেতু আইয়ুব খানের মার্শাল ল, আব্বার প্রায় ছয়খানা খাতা তারা নিয়ে রাখল, দিল না। আমার মা নিজে জেলগেটে গেলেন খাতাগুলির খোঁজ করতে।

আব্বাকে মুক্তি দিলে নিয়ে আসার সময় খাতাগুলি দিল না। ওরা নিয়ে গেল। তখন ছিল ইন্টেলিজেন্স ব্রাঞ্চ আইবি অফিস, এখন যেটা এসবি অফিস। আমার মা কিন্তু হাল ছাড়েননি, আমার চাচা, আব্বার ফুপাতো ভাই খোকা কাকা আমাদের সঙ্গে ছিলেন। ওই খোকা কাকাকে বারবার পাঠাতেন। ভাই একটু যা দেখ তো, আমাদের খাতাগুলি দেবে না কেন? তারপর একটা পর্যায় যাওয়ার পরে তারা চারখানা খাতা দিল আর দুখানা খাতা বাজেয়াপ্ত করল। সেই খাতাগুলি দিল না। ওই চারখানা খাতা দিল এবং আমার মা কিন্তু প্রতিবারই ওই খাতাগুলি নিজে সংগ্রহ করে রাখতেন।

আমার মাকে দেখেছি সবসময় আব্বাকে বই দিতেন। কতগুলি বই আবার খুব প্রিয় ছিল। কিছু বই উনি নিয়মিত দিতেন। একটা ছিল নজরুলের, রবীন্দ্রনাথের রচনাবলি, তারপরে বার্নার্ড শ’র হোল ওয়ার্ল্ডস অব বার্নার্ড শ’। এছাড়া রবীন্দ্রনাথের, নজরুলের লেখা, এরকম বেশ কিছু বই, ওই বইগুলি যতবার আব্বা জেলে যেতেন, কয়েকখানা বই ছিল মা নিয়মিত দিতেন। তা আমরা তখন বুঝতে পারিনি যে কেন নিয়মিত এই বইগুলি আবার পাঠান। পরে যখন বড় হলাম তিনিই দেখালেন যে দেখ তোমার আব্বা যতবার জেলে যাচ্ছেন এই বই পাঠালে তারা সেন্সর করছে, সেন্সরের একটা সিল আর তারিখটা ওখানে লেখা থাকত এবং ওই জন্য তিনি কয়েকখানা বই ছিল, ওটা বারবারই পাঠাতেন।

যথার্থ অর্থেই বেগম মুজিবকে সর্বংসহা মনে হয়। বঙ্গবন্ধুর লেখা গ্রন্থসমূহ পাঠ এবং সেই সঙ্গে গোয়েন্দা পুলিশের গোপনীয় প্রতিবেদন পাঠে অবাক হতে হয়। শেখ মুজিব রাজনীতি করতে গিয়ে যে ত্যাগ স্বীকার করেছেন, জেল-জুলুম-নির্যাতন স্বীকার করেছেন সেটি তার পরিবারের ওপর ব্যাপক প্রভাব ফেলেছে। বেগম মুজিব অসীম ধৈর্য ও সহনশীল মন নিয়ে সংসার সামলেছেন, কন্যা-পুত্রদের যতœ নিয়েছেন, সেই সঙ্গে রাজনীতির সার্বিক পরিস্থিতির প্রতি রেখেছেন গভীর দৃষ্টি। বঙ্গবন্ধু কারাগারে থাকা অবস্থায় সপরিবারে বারবার কারাগারে দেখা করতে গেছেন। স্বামীকে সাহস দিয়েছেন, বিভিন্ন খবরাখবর দিয়েছেন। তখনকার পরিস্থিতিতে এ ধরনের যাতায়াত সহজ ছিল না, অধিকন্তু গোয়েন্দা নজরদারি ছিল সার্বক্ষণিক।

বঙ্গবন্ধু ১৯৬৬ সালে বাঙালির মুক্তির সনদ ঐতিহাসিক ৬-দফা দাবি উত্থাপনের পর সারা বাংলাদেশে এর পক্ষে ব্যাপক গণসংযোগ করেন। ভীত পাকিস্তানি সরকার বঙ্গবন্ধুকে গ্রেপ্তার করে। এ প্রেক্ষাপটে আসে ৭ জুন। বঙ্গবন্ধুসহ নিরাপত্তা বন্দিদের মুক্তির দাবিতে সর্বাত্মক হরতাল পালিত হয়। পুলিশের গুলিতে মনু মিয়াসহ ১১ জন শহীদ হন তাতে। এ হরতাল পালনের নেপথ্যে ব্যাপক ভূমিকা রাখেন বেগম মুজিব। তিনি শুধু গৃহিণীর দায়িত্ব পালন করেননি, প্রবলভাবে ছিলেন রাজনীতি সচেতন। বঙ্গবন্ধুর অবর্তমানে তিনি নেতাকর্মীদের সঙ্গে যোগাযোগ রাখতেন। বাড়িতে রান্না করে খাওয়াতেন। আমরা সবাই জানি বঙ্গবন্ধুর স্মৃতিশক্তি ছিল অসাধারণ। শেখ হাসিনা আমাদের জানিয়েছেন যে তার মায়ের স্মৃতিশক্তিও ছিল টেপ রেকর্ডারের সঙ্গে তুলনীয়। জেলখানায় গিয়ে পরিস্থিতি সম্পর্কে জানানো, প্রয়োজনীয় নির্দেশ নিয়ে আসা, আওয়ামী লীগ ছাত্রলীগকে সেভাবে কাজে লাগানো সবই তিনি করতেন।

বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে বেগম মুজিবের উদ্বেগ ও উৎকণ্ঠা সম্পর্কে আমরা জানতে পারি শেখ রেহানার লেখা থেকে। ১৯৬৮ সালের ৩ জানুয়ারি পাকিস্তান সরকার বঙ্গবন্ধুকে এক নম্বর আসামি করে মোট ৩৫ জন বাঙালি সেনা ও সিএসপি অফিসারের বিরুদ্ধে আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা দায়ের করে। ১৭ জানুয়ারি তাকে জেল থেকে মুক্তি দিয়ে পুনরায় জেলগেট থেকে গ্রেপ্তার করে ঢাকা সেনানিবাসে আটক রাখা হয়। পরিবারের সদস্যরা এ খবর জানেন না। বেগম মুজিব সন্তানদের নিয়ে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে গেলেন দেখা করতে। গিয়ে জানলেন তাকে কোথায় নিয়ে যাওয়া হয়েছে জেলের লোকজনও বলতে পারছে না।

শেখ রেহানা লিখেছেন : তারপর একদিন আমরা গেছি জেলগেটে। যথারীতি দেখার জন্য অনুমতি নেওয়া আছে। আমরা পাঁচ ভাইবোন, মা। জেলের লোকেরা বলে, “উনি তো জেলে নাই।” জেলে নাই কোথায় আছেন? তারা বলে, “আমরা জানি না, উনি কোথায় আছেন।” মার মাথায় আকাশ ভেঙে পড়ল। সীমাহীন শঙ্কায় উদ্বেগে আমরা কাতর হয়ে পড়লাম। মা ৩২ নম্বরের বাড়ির গেটের ভেতরে ঢুকেই মাটিতে বসে মুখে আঁচল চাপা দিয়ে কাঁদতে লাগলেন। সে যে কী কান্না মা’র! এত কাঁদতে আমি মাকে আর কখনো দেখিনি। তারপর তো খবর এলো, আব্বাকে ক্যান্টনমেন্টে রাখা হয়েছে।

বঙ্গবন্ধুকে আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা থেকে প্যারোলে মুক্তি দেওয়ার চেষ্টা করা হয়েছিল, আওয়ামী লীগের অনেক নেতাকর্মী চেয়েছিলেন প্যারোলে মুক্তি নিয়ে বঙ্গবন্ধু পাকিস্তানে গোলটেবিল বৈঠকে যাবেন। কিন্তু বেগম মুজিব রাজি ছিলেন না। আমরা শেখ হাসিনার স্মৃতিচারণ থেকে জানি তার মাধ্যমে বেগম মুজিব বঙ্গবন্ধুকে লিখে পাঠিয়েছিলেন প্যারোলে মুক্তি না নিতে।

বেগম মুজিবের এ অনমনীয় ভূমিকা নিয়ে অনেক লেখা হয়েছে। ফয়েজ আহমেদ, এবিএম মূসাসহ বিভিন্নজনের লেখায় এ ঘটনা সম্পর্কে বর্ণনা আছে। জি ডব্লিউ চৌধুরীর গ্রন্থেও আমরা এর উল্লেখ পাই। ঘটনাটি এখন কিংবদন্তির রূপ নিয়েছে বিধায় বিভিন্নজন বিভিন্নভাবে ঘটনার বিবরণ দিয়েছেন। তবে এ সম্পর্কে সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য তথ্য আমরা পাই শেখ হাসিনার বিভিন্ন বক্তব্য ও লেখায়। কারণ ঢাকা ক্যান্টনমেন্টে বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে দেখা করে মায়ের মেসেজ শেখ হাসিনা পৌঁছে দিয়েছিলেন।

স্বামীর সহযাত্রী হিসেবে আন্দোলন সংগ্রামে ভূমিকা রাখা নারীদের মধ্যে মহাত্মা গান্ধীর স্ত্রী কস্তুরবাঈ, জওহরলাল নেহরুর স্ত্রী কমলা নেহরু, চিত্তরঞ্জন দাশের স্ত্রী বাসন্তী দেবী কিংবা নেলসন ম্যান্ডেলার প্রাক্তন স্ত্রী উইনি ম্যান্ডেলার কথা আমরা জানি। তারা সবাই ছিলেন রাজনীতিতে সক্রিয়, যাকে বলে অ্যাকটিভিস্ট আন্দোলন-সংগ্রামে প্রকাশ্যে অংশ নিয়েছেন। জেল খেটেছেন। কিন্তু বেগম মুজিবের ভূমিকা ছিল অন্তরালে রাজনীতি স¤পর্কে ছিলেন প্রবলভাবে সচেতন, সেই সঙ্গে রাজনৈতিক বলয়ে প্রেরণাদাত্রীর ভূমিকা পালন করেছেন। বঙ্গবন্ধু তার মতামতকে বিশেষ গুরুত্ব দিতেন বঙ্গবন্ধুর বন্দিদশায় রাজনীতির গতি-প্রকৃতি সম্পর্কে খোঁজ রাখতেন। বঙ্গবন্ধুকে বাইরের অবস্থা সম্পর্কে অবহিত রাখতেন। তার এই ভূমিকা ছিল অপ্রকাশ্য কিন্তু দ্ব্যর্থবোধক। তার সুচিন্তিত সিদ্ধান্ত বঙ্গবন্ধুর অবর্তমানে বিশেষ ভূমিকা রেখেছে। বাংলাদেশের অন্য কোনো খ্যাতিমান রাজনীতিবিদের সহধর্মিণীর ক্ষেত্রে এ ধরনের উদাহরণ দেখা যায় না।

বিভিন্ন ঘটনার বিশ্লেষণ থেকে বাংলাদেশের রাজনীতিতে তার অপ্রকাশ্য কিন্তু এই দৃঢ় ভূমিকা সম্পর্কে উপলব্ধি করা যায়। চিরকাল স্বামীর পাশে ছিলেন কিন্তু রাজনীতি ও ক্ষমতা তার শাশ^ত নারীর রূপটি বদলাতে পারেনি। তিনি প্রধানমন্ত্রীর সহধর্মিণী হয়ে অথবা রাষ্ট্রপতির পতœী পরিচয়ে ফার্স্ট লেডি হতে চাননি। আটপৌরে জীবনযাপন করেছেন ক্ষমতার জৌলুসের কাছে বিলীন হতে দেননি তার চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য।

বঙ্গবন্ধু ২৬ মার্চ ১৯৭২ সালে প্রদত্ত ভাষণে বলেছিলেন, “যে নারী তার স্বামীকে এগিয়ে দেয় নাই, সে স্বামী জীবনে বড় হতে পারে নাই।” বঙ্গবন্ধুর এ কথাটি খুবই তাৎপর্যপূর্ণ। সম্ভবত বেগম মুজিবের ভূমিকার কথা মনে করে তিনি এ গুরুত্বপূর্ণ মন্তব্য করেছিলেন। বেগম মুজিব একদিকে ছিলেন বঙ্গবন্ধুর ছায়াসঙ্গী, অন্যদিকে সহযোদ্ধা। শাশ্বত নারীর প্রতিমূর্তিতে তিনি সহিষ্ণুতার যে অনন্য অভিজ্ঞান সৃষ্টি করেছেন তার ফলেই বঙ্গবন্ধুর পক্ষে সম্ভব হয়েছে ঝঞ্ঝা-বিক্ষুব্ধ জীবনতরী পাড়ি দেওয়া।

অল্প বয়সে বিয়ে হয়েছিল তাদের। বঙ্গবন্ধু পরিবারকে সময় দিতে পারেননি। জীবনের বহু বছর কাটিয়েছেন কারাগারে। বেগম মুজিব যদি ছায়াসঙ্গী হিসেবে আন্দোলন-সংগ্রাম ও কারাগারের সুকঠিন সময়ে বঙ্গবন্ধুকে সাহস ও শক্তি না জোগাতেন তাহলে বঙ্গবন্ধুর পক্ষে রাজনীতিতে এরূপ ত্যাগ ও নিবেদন কঠিন হতো। বেগম মুজিব অন্তরালে থেকে এ মহান দায়িত্ব পালন করেছেন। পাশাপাশি বঙ্গবন্ধুকে উৎসাহ দিয়েছেন, বইপত্র সরবরাহ করেছেন, লিখতে উৎসাহ দিয়েছেন। যে ইতিহাস বঙ্গবন্ধু নির্মাণ করেছেন বাঙালির জাতিরাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে তার নেপথ্যের সহযাত্রী হিসেবে বেগম মুজিবের ভূমিকাও আমাদের ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। সারাজীবন তিনি ছায়াসঙ্গী ছিলেন বঙ্গবন্ধুর। মৃত্যুতে শারীরিক বিচ্ছিন্নতা হয়েছে। বঙ্গবন্ধুর শেষ শয্যা হয়েছে টুঙ্গিপাড়ায় বেগম মুজিব পরিবারের অন্য সদস্যদের নিয়ে বনানী কবরস্থানে সমাহিত আছেন। শরীরকে হত্যা করা যায় কিন্তু আত্মাকে ধ্বংস করা যায় না। ১৯৭২ সালে ডেভিড ফ্রস্টের সঙ্গে সাক্ষাৎকারে বঙ্গবন্ধু বলেছিলেন, আপনি একজন মানুষকে হত্যা করতে পারেন। সে তো তার দেহ। কিন্তু তার আত্মাকে কি আপনি হত্যা করতে পারেন? না, তা কেউ পারে না।

মৃত্যু তাদের ধ্বংস করতে পারেনি। বাঙালির হৃদয়ে তারা মিশে আছেন শাশ্বত সম্পর্ক ও সংগ্রামের সহযোদ্ধা হিসেবে।

লেখক : কবি ও প্রধান সমন্বয়ক, জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জন্মশতবার্ষিকী উদ্যাপন জাতীয় বাস্তবায়ন কমিটি। প্রধানমন্ত্রীর সাবেক মুখ্য সচিব।