বঙ্গবন্ধুর রেণু, আমাদের বঙ্গমাতা|308588|Desh Rupantor
logo
আপডেট : ৮ আগস্ট, ২০২১ ০০:০০
বঙ্গবন্ধুর রেণু, আমাদের বঙ্গমাতা
ড. সৈয়দ আনোয়ার হোসেন

বঙ্গবন্ধুর রেণু, আমাদের বঙ্গমাতা

বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় আনন্দমঠ-এর প্রথম সংস্করণের ভূমিকায় লিখেছিলেন, “বাঙ্গালীর স্ত্রী অনেক অবস্থাতেই বাঙ্গালীর প্রধান সহায়। অনেক সময় নয়।” সন্দেহ নেই, বঙ্কিমচন্দ্র বাঙালি জীবন অনুপুঙ্খভাবে পর্যবেক্ষণ করে উপলব্ধ সত্য উচ্চারণ করেছেন, যার সঙ্গে দ্বিমত করা বাল-চাপল্য হবে। একজন বঙ্গবন্ধু বাঙালি পুরুষ হিসেবে স্ত্রীর সাহচর্য পেয়েছিলেন। তার স্ত্রী, তার রেণু, আমাদের বঙ্গমাতা, তার জীবনে সহায় হয়েছিলেন কি না তা বঙ্গবন্ধুর স্বীকারোক্তিতেই আছে। ১৯৭২-এর ২৬ মার্চ আজিমপুর গার্লস স্কুলে দেওয়া ভাষণে তিনি বলেছিলেন :

“আমি আমার জীবনে দেখেছি আমি বুলেটের সামনে এগিয়ে গেলেও আমার স্ত্রী কোনোদিন বাধা দেননি। আমি দেখেছি ১০-১১ বছর জেলখানায় থাকলেও তিনি কোনোদিন মুখ খুলে প্রতিবাদ করেননি। যদি তিনি তা করতেন তাহলে আমি জীবনে অনেক বাধার মুখোমুখি হতাম। এমন অনেক সময় ছিল যখন আমি জেলে যাবার সময় আমার সন্তানদের জন্য একটি পয়সাও রেখে যেতে পারিনি। আমার নিরন্তর সংগ্রামী জীবনে তার প্রচুর অবদান আছে।”

বঙ্গবন্ধু তার জীবনে স্ত্রীকে শুধু সহধর্মিণী নয়, একজন সহযোদ্ধা-সহকর্মী হিসেবে পেয়েছিলেন। এটা বলা অত্যুক্তি হবে না যে, একজন শেখ মুজিব বঙ্গবন্ধু-বিশ্ববন্ধু হতে পেরেছিলেন তার স্ত্রীর প্রণোদনায়; অবশ্য স্বীকার্য যে, এতে তার নিজস্ব মেধা-মনন ও উদ্যম-উদ্যোগও ক্রিয়াশীল ছিল। তবে দুজনের মধ্যে ব্যাপারটি ছিল যেন সোনায় সোহাগা একে অপরের সম্পূরক/পরিপূরক। ড. নীলিমা ইব্রাহিমের মূল্যায়নে, “নিরহংকার দীপ্তিময়ী মুজিবপত্নী... আমাদেরই মতো একেবারে সাধারণ। এই তো যোগ্য অগ্নিপুরুষের সহধর্মিণী।”

ব্যাপারটি শিষ্য তরুণ শেখ মুজিবের রাজনৈতিক গুরু হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীর নজরে পড়েছিল। ১৯৪৬-এ বিহারে দাঙ্গা উপদ্রুত অঞ্চলে তিনি শেখ মুজিবকে স্বেচ্ছাসেবক হিসেবে পাঠাতে চেয়েছিলেন; কিন্তু তার আগে টুঙ্গিপাড়ার বাড়িতে অসুস্থ স্ত্রীর অনুমতি নিতে বলেছিলেন। স্ত্রী রেণু চিঠি লিখেছিলেন, যাতে তার নির্দ্বিধ সম্মতি ছিল। চিঠির ভাষা প্রণিধানযোগ্য : “আপনি শুধু আমার স্বামী হওয়ার জন্য জন্ম নেননি, দেশের কাজ করার জন্যও জন্ম নিয়েছেন। দেশের কাজই আপনার সবচাইতে বড় কাজ। আপনি নিশ্চিত মনে সেই কাজে যান। আমার জন্য চিন্তা করবেন না। আল্লার ওপর আমার ভার ছেড়ে দেন।” এ চিঠির মর্মার্থ অবহিত হওয়ার পর সোহরাওয়ার্দী মন্তব্য করতে বাধ্য হয়েছিলেন, “মুজিব, সে তোমার জন্য স্রষ্টার দেওয়া অতি অমূল্য দান। অনুগ্রহ করে তাকে অবহেলা করো না।” মুজিব কোনোদিন রেণুকে অবহেলা/উপেক্ষা করেননি; এমন মানসিকতা তার ছিল না বা তার সুযোগও তিনি পাননি।

এমন একটি প্রেক্ষাপটে কিছুটা যেন বাস্তবধর্মী আবেগ নিয়ে আবদুল গাফ্ফার চৌধুরী দুজনের আন্তঃসম্পর্ক মূল্যায়ন করেছেন বস্তুনিষ্ঠভাবে : অনেকেই জানেন শেখ মুজিব ছিলেন আপসহীন নেতা। বজ্রকঠিন ছিল তার ব্যক্তিত্ব। কিন্তু অনেকেই জানেন না, এই বজ্রের চৌদ্দআনা বারুদই ছিলেন বেগম মুজিব। তার সমর্থন, সাহায্য ও ষোলআনা একাত্মতা ছাড়া শেখ মুজিব আপসহীন নেতা হতে পারতেন না। বঙ্গবন্ধু হতে পারতেন না। বঙ্গবন্ধু স্বাধীনতা যুদ্ধের নেতৃত্ব দিয়েছেন। কিন্তু এই নেতৃত্বকে সাহস, শক্তি এবং সকল দুঃখ ও নির্যাতন বরণের ধৈর্য ও প্রেরণা জুগিয়েছেন এই নারী। এই নারী যদি আত্মসর্বস্ব হতেন, সংসারসর্বস্ব হতেন, ছেলেমেয়ে, স্বামী নিয়ে সুখে ঘর সংসার করতে চাইতেন, তাহলে শেখ মুজিবের সাধ্য হতো না বছরের পর বছর কারাগারে থাকা, স্বাধীনতার সংগ্রামের দুঃসাহসী পথে যাত্রা করা, তাতে নেতৃত্ব দেওয়া। বাংলার ইতিহাসে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব নামে কোনো নেতার অভ্যুদয় হতো না; বাংলার আকাশ এত শীঘ্রই স্বাধীনতার সূর্যোদয়ের আভায় রঙিন হয়ে উঠত না।

উপর্যুক্ত উদ্ধৃতি যে লেখকের, তার আরও চমৎকার একটি উদ্ধৃতিযোগ্য মন্তব্য, বঙ্গবন্ধু যা হয়েছিলেন তার কারণ ছিল “তার [বঙ্গবন্ধু] দুর্গের মতো বাড়ি এবং এই দুর্গের কর্ত্রী বেগম ফজিলাতুন নেছা। তার মনটি ছিল সাধারণ বাঙালি মায়ের চাইতেও কোমল। চরিত্র, স্বামীর চাইতেও কঠিন ও অনমনীয়। জীবনে অসহ দুঃখ ও ক্লেশ সহ্য করেছেন। কিন্তু স্বামীকে প্রলোভনের কাছে মাথা বিক্রি করতে দেননি।”

বঙ্গমাতার সাংসারিক জীবনের কিছু খন্ডচিত্র প্রণিধানযোগ্য। বঙ্গবন্ধুর জীবন ও কর্ম ছিল বন্ধুর পথে বিচরণের; তার বাড়ি ছিল তার জন্য স্বল্প দিনের অতিথির জন্য মুসাফিরখানা; আসল বাড়ি ছিল কারাগার, যেখানে কেটেছে স্বল্পায়ু জীবনের প্রায় এক-চতুর্থাংশ। কিন্তু তার বাড়ি, সংসার ও সন্তান-সন্ততি সবই ছিল। তা চলত কীভাবে? প্রশ্নটির উত্তর পাওয়া যায় ড. নীলিমা ইব্রাহিমের সাক্ষ্য থেকে : “.... বৃদ্ধ পিতা-মাতা, পুত্র-কন্যা নিয়ে ফজিলাতুন্নেছার দিন কীভাবে কেটেছে বা কাটছে এ নিয়ে নেতার খুব বেশি দুশ্চিন্তা ছিল বলে মনে হয় না। ...নিজ পরিবার সম্পর্কে নেতা নিশ্চিত ছিলেন, তার বড় কারণ একদিকে পিতা-মাতা অন্যদিকে গৃহিণীর কর্মনৈপুণ্য, তীক্ষ্ন বুদ্ধি ও সংসার পরিচালনার দক্ষতা সম্পর্কেও তিনি ছিলেন একান্তভাবে শ্রদ্ধাশীল এবং আস্থাবান।”

ড. নীলিমা ইব্রাহিমের সঙ্গে বঙ্গবন্ধুর মা সায়েরা খাতুনের প্রথম পরিচয় হয় বরিশাল-ঢাকা লঞ্চে। তখন সায়রা খাতুন বলেছিলেন, “তাঁর দায়িত্বজ্ঞানহীন একটি পাগল ছেলে আছে। সে শুধু রাজনীতি জানে, ঘর-সংসার কিছুই বোঝে না, সবই বৌমার ঘাড়ে। এখন বৌমা আসন্ন প্রসবা। পাগল তো গিয়ে পশ্চিম পাকিস্তানে বসে আছে।” ড. নীলিমা ইব্রাহিম লক্ষ করলেন, ভদ্রমহিলা সবসময় ছেলে সম্পর্কে ‘পাগল’ বলছেন। তো তিনি জিজ্ঞেস করলেন, পাগল ছেলেটির নাম কী? উত্তর পেলেন, “মুজিব, শেখ মুজিবুর রহমান।” প্রশ্নকর্ত্রীর বিমুগ্ধ বিস্ময়ের পালা। শেখ মুজিব তার চেনা-জানা নাম, কিন্তু তার মায়ের সঙ্গে এভাবে প্রথম পরিচয় হলো। মা যখন ছেলের সংসার-বিচ্ছিন্নতা আর বৌমার সংসারলগ্নতার কথা বলেন তখন তা গ্রহণ করতে আমাদের আর বাড়তি তথ্য-প্রমাণের দরকার হয় না। জানা কথা, বঙ্গমাতা সংসার সামলিয়ে মন-মস্তিষ্ক দিয়ে স্বামীর কাজে সহযোগিতা করতেন।

আমাদের অনেকের জানা নেই, ৩২ নম্বরের বাড়ি তৈরি হওয়ার সময়ে এই নারী নিজে ইট বহন করেছেন, কারণ পর্যাপ্তসংখ্যক শ্রমিক নিয়োগের আর্থিক সামর্থ্য ছিল না। বাড়ির জায়গা পাওয়া গিয়েছিল হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীর সৌজন্যে; নির্মাণসামগ্রী সরবরাহ করেছিলেন অনেক শুভার্থী, বাড়ি তৈরির সবকিছু দেখভাল করেছেন বঙ্গবন্ধুর রেণু, বঙ্গবন্ধুকে কিছু করতে হয়নি। কারণ দেশ-মানুষলগ্ন বঙ্গবন্ধু বাড়িলগ্ন হতে পারেননি।

বঙ্গবন্ধু সন্তানদের পিতা হয়েও পিতৃত্বের দায়িত্ব পালন করার সময় খুব কম পেতেন; যতটুকু পেতেন তার “চৌদ্দআনা হাসু [শেখ হাসিনা], এক আনা রাসেল, আর কামাল-জামাল-রেহানা মিলিতভাবে একআনা” পেয়েছে। কাজেই মায়ের সান্নিধ্য ও শাসনে ছেলেমেয়েকে বেড়ে উঠতে হয়েছে। শেখ হাসিনার সুবাদে জানা যায়, “আমার মা আমাদের সব দুঃখ ভুলিয়ে দিতেন তার স্নেহ-ভালোবাসা দিয়ে।” কিন্তু মায়ের স্নেহ-ভালোবাসার আতিশয্য সত্ত্বেও কড়া শাসনের ব্যত্যয় কখনো হয়নি; মাতৃস্নেহ সন্তানদের তাদের খেয়াল-খুশিমতো বড় হতে দেয়নি, তাদের বড় হতে হয়েছে মায়ের কড়া শাসনে। স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে শেখ হাসিনা লিখেছেন, “... মাকে সবাই ভয় পেত। মার অপছন্দের কাজ করলে, পড়াশোনায় ফাঁকি দিলে মায়ের কাছে নির্ঘাত শাস্তি পেতে হবে। ...তার ওপর মাকে তো আমরা আরও ভয় পেতাম, মার হাতে দু-চার ঘা যে খেতে হবে তাতে কোনো সন্দেহ নেই।” বঙ্গমাতার জবানিতেই শোনা যাক তিনি কীভাবে ছেলেমেয়েদের মানুষ করেছেন, “আমি চুবনি খাইয়া খাইয়া সাঁতার শিখছি, বাচ্চাদের এতটুকু বিলাসিতা শিখাই নাই।” তাকে কখনো কেউ সুসজ্জিতা দেখেনি; ছেলেমেয়েদেরও কখনো বিলাসপ্রবণ মনে হয়নি। তবে বঙ্গমাতাকে একবারই ভালো একটি শাড়ি পরতে দেখা গেছে এবং তা শ্রীমতি ইন্দিরা গান্ধীর সান্নিধ্যে। বঙ্গমাতা সেদিন পরেছিলেন কাতান শাড়ি, যা সামলাতে তার বড় কষ্ট হচ্ছিল।

এমন দৃঢ় ব্যক্তিত্বের অধিকারী এই নারী রসবোধ বা কৌতুকহীন ছিলেন না। বঙ্গমাতা একদিন ড. নীলিমা ইব্রাহিমকে বললেন, “নিজের ভাইকে বানিয়েছেন বঙ্গবন্ধু আর আমাকে বঙ্গমাতা, বেশ, আমি বুঝি ‘বঙ্গবান্ধবী’ হতে পারি না। এতই কি বুড়ো হয়েছি।” তবে রেণু কৌতুক করে যা-ই বলুন না কেন, তিনি আমাদের বঙ্গমাতা থেকে গিয়েছেন এবং থাকবেনও। তবে বঙ্গমাতাকে নিয়ে এক স্তাবক রসিকতা করেছিল। একদিন সে বঙ্গবন্ধুকে প্রস্তাব দিয়েছিল, বাংলাদেশ জাতীয় এয়ারলাইনসের নাম ফজিলাতুন্নেছা রাখতে; কারণ ইউরোপের একটি এয়ারলাইনসের নাম ‘লুৎফুন্নেসা’। বঙ্গবন্ধু তাকে ধমক দিয়ে বললেন, “ওটা লুৎফুন্নেসা নয়, লুফতহানসা, জার্মান এয়ারলাইনসের নাম। পৃথিবীর কোথাও কোনো ব্যক্তির নামে কোনো এয়ারলাইনস নেই, এয়ারপোর্ট আছে। যাও এখানে থেকে, চামচাগিরি করো না।”

বঙ্গমাতার সাংসারিক জীবন নিয়ে চূড়ান্ত মন্তব্য পাওয়া যায় প্রয়াত সাংবাদিক এবং বঙ্গবন্ধুর স্নেহধন্য এবিএম মূসার লেখনীতে, “বহু বছর আগে স্বামীর সঙ্গে গ্রাম্যবধূর যে লেবাসটি পরে এসেছিলেন, গণভবন বঙ্গভবনে এসে তা ছাড়তে চাননি। ...শেখ মুজিবের পত্নীকে আমি দেখেছি। কিন্তু প্রধানমন্ত্রী ও রাষ্ট্রপতির পত্নী ফার্স্ট লেডিকে দেখিনি। দেখেছি আটপৌরে শাড়ি পরনে পালঙ্কে বসে বাটা হাতে পান সাজাতে। রাষ্ট্রপতি বা প্রধানমন্ত্রী শেখ মুজিবুর রহমানের পাশে রাষ্ট্রীয় বাহনে তাকে দেখা যায়নি, দেখা যায়নি তার সাথী হয়ে বিমানে করে রাষ্ট্রীয় সফরে যেতে।” বঙ্গমাতার নিত্যসঙ্গী ছিল পানের বাটা, যা তিনি ইন্দিরা মঞ্চেও নিয়ে গিয়েছিলেন। মঞ্চের সামনে অদূরে উপস্থিত এবিএম মূসা বঙ্গবন্ধুকে অনুযোগ করতে শুনলেন, “ওটা আবার নিয়ে আসলা ক্যান?” “এ হচ্ছে সেই সহজ-সরল চিরায়ত গ্রাম্যবধূ প্রধানমন্ত্রী জায়ার চিত্ররূপ।”

মুজিব-রেণু আত্মিক সম্পর্ক

স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্ক যত ঘনিষ্ঠ তেমন আর কোনো মানবিক সম্পর্ক নয়। কিন্তু তথ্য-প্রমাণ বলে মুজিব-রেণু সম্পর্ক ছিল স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্কের চেয়েও গভীরতর; তাদের দুজনের সম্পর্ক ছিল আত্মিক। কারণ বোধহয়, দুজন দুজনকে চেনা-জানার সময় পেয়েছিলেন অনেক। বঙ্গবন্ধুর বিয়ে হয় কিশোর বয়সে আর রেণুর শিশু বয়সে। উপরন্তু রেণুর বেড়ে ওঠা বঙ্গবন্ধুর মায়ের ছত্রছায়ায়। অবশ্য এ ক্ষেত্রে দুজনের মানসিক নৈকট্য ও মিল যে ছিল তা-ও বিবেচনায় নিতে হবে।

১৯৭৪-এ বঙ্গবন্ধু মস্কোতে চিকিৎসাধীন ছিলেন। একদিন রুশ দোভাষী অধ্যাপক দানিয়েল চুক (বাংলা জানতেন) একজন ডাক্তারকে সঙ্গে নিয়ে এসে বললেন, “মাননীয় প্রধানমন্ত্রী, ইনি আপনার হৃদয়ের ডাক্তার।” হতভম্ব বঙ্গবন্ধুকে বঙ্গমাতা তার উপস্থিত বুদ্ধি দিয়ে বুঝিয়ে দিলেন, তোমার হার্টের ডাক্তার। বঙ্গবন্ধু বুঝেছিলেন ঠিকই, তবে চমকপ্রদ কিন্তু বস্তুনিষ্ঠ উত্তর দিলেন, “আমার হৃদয়ে তো তুমি।” উল্লেখ্য, এ দম্পতির যাপিত জীবন বলে দুজন দুজনের হৃদয়ে ছিলেন।

বঙ্গবন্ধুর স্মৃতিশক্তি ছিল কিংবদন্তিতুল্য। অথচ সে বঙ্গবন্ধু কি না স্ত্রীকে বলেছেন, “এই আমার জীবন্ত ডায়েরি। তাকে জিজ্ঞেস করো। আমার চাইতেও নির্ভুল বিবরণ পাবে। আমার চাইতেও তার স্মৃতিশক্তি ভালো। তোমাকে [আবদুল গাফ্ফার চৌধুরী] ডিকটেশন দেওয়ার আগে এই জীবন্ত ডায়েরির সঙ্গে অনেক কথা মিলিয়ে নিয়ে তবে এখানে আসি। কর্মব্যস্ত স্বামীর সব কাজ/ঘটনার কথা যে স্ত্রী অনুপুঙ্খভাবে ধারণ করে তার শুধু স্মৃতিশক্তির তারিফ করলে হয় না, স্বামীর প্রতি তার যে ভালোবাসা ছিল তারও স্বীকৃতি দিতে হয়, যা বঙ্গবন্ধু অকুণ্ঠভাবে দিয়েছিলেন।

কঠিন, জটিল ও অনিশ্চিত পরিস্থিতিতেও বঙ্গমাতা যে বিচক্ষণ সিদ্ধান্ত নিতে পারতেন তার দৃষ্টান্ত আছে। ’৭১-এ মুক্তিযুদ্ধের সময়ে বঙ্গবন্ধুহীন পরিবারটিকে ধানমন্ডির ১৮ নম্বর সড়কের একটি বাড়িতে বন্দি করে রাখা হয়েছিল সেনা পাহারায়। পাকিস্তানি জেনারেল উমর বাড়িটির ভাড়া দেওয়ার প্রস্তাব করলে বঙ্গমাতা তা তাৎক্ষণিক প্রত্যাখ্যান করেন; তার বিকল্প প্রস্তাব ছিল, ব্যাংকের জমা টাকা থেকে তিনিই বাড়িভাড়া দেবেন এবং অন্যান্য খরচ চালাবেন। প্রস্তাবটি জেনারেল উমর গ্রহণ করতে বাধ্য হন। অবশ্য চেক সই করতে হবে শেখ মুজিবকে। পরে সইসহ চেক পাওয়ার পর বঙ্গমাতা বুঝলেন বঙ্গবন্ধু বেঁচে আছেন। ঘটনাটির মধ্য দিয়ে বঙ্গমাতার আত্মমর্যাদাবোধ ও বিচক্ষণতা প্রমাণিত হয়।

একজন সংবেদনশীল নারী এবং স্নেহময়ী মা হিসেবে বঙ্গমাতার মানসিক মানচিত্র নিয়ে ভূরি ভূরি দৃষ্টান্ত আছে; একটির কথা বলা যেতে পারে। বঙ্গমাতা ও পরিবারের সবাইকে বন্দিত্ব থেকে উদ্ধার করেন ভারতীয় সেনাবাহিনীর মেজর তারা। পাহারাদার ১০-১২ জন পাকিস্তানি সৈনিককে আত্মসমর্পণে বাধ্য করানোর পর মেজর তারা বাড়িতে প্রবেশ করলে বঙ্গমাতা তাকে জড়িয়ে ধরে বলেছিলেন, “তুমি আমার পোলা, বাবা।” পরিস্থিতির আকস্মিক মধুর পরিবর্তনে বঙ্গমাতার মনে বাৎসল্য-রসের স্ফুরণ হয়েছিল।

পরিস্থিতির পরিপ্রেক্ষিতে যা করা সমীচীন সে সম্পর্কে বঙ্গমাতার প্রত্যুৎপন্নমতিত্ব সংক্রান্ত বেশকিছু দৃষ্টান্ত আমাদের আলোচনায় ইতিমধ্যে এসেছে। এমন একটি দৃষ্টান্ত তৈরি হয় যখন দেখা যায়, বঙ্গমাতার পরামর্শে বঙ্গবন্ধুর দেশে ফেরার কর্মসূচিতে রদবদল হয়েছিল। আগের কর্মসূচি অনুযায়ী দিল্লি এবং কলকাতা হয়ে আর দিল্লিতে ব্রিটিশ বিমান পরিবর্তন করে ভারতীয় বিমানে বঙ্গবন্ধুর ঢাকা ফেরার কথা ছিল। বঙ্গমাতা তাজউদ্দীনকে দুটো পরামর্শ দিয়েছিলেন। এক, বিমান পরিবর্তন করা ঠিক হবে না; কারণ তাতে ব্রিটেন মনঃক্ষুণœ হতে পারে। দুই, কলকাতায় গেলে ঢাকায় ফিরতে সন্ধ্যা হয়ে যাবে; যা নিরাপত্তায় সমস্যা করবে এবং রেসকোর্সেও ভাষণ দেওয়া সম্ভব হবে না। কাজেই তাজউদ্দীন দিল্লিতে শ্রীমতি ইন্দিরা গান্ধীর উপদেষ্টা ডি. পি. ধরের সঙ্গে আলোচনা করে যে ব্যবস্থা করেন তাতে বঙ্গবন্ধু কলকাতা না গিয়ে ব্রিটিশ বিমানেই দিল্লি থেকে সরাসরি ঢাকা আসেন এবং শীতের সন্ধ্যা নামার আগেই রেসকোর্সের ভাষণ শেষ করেন। বলাবাহুল্য, আগের কর্মসূচি বহাল থাকলে অন্তত রেসকোর্সের ভাষণ হতো না; ইতিহাসের একটি অধ্যায় বাদ পড়ত। কারণ ভাষণটিতে কিছু দিকনির্দেশনা ছিল।

নারীর মর্যাদাবোধ সম্পর্কে বঙ্গমাতার সজাগ দৃষ্টি ছিল। স্বাধীনতা-পরবর্তী সময়ে ’৭১-এ নির্যাতিত নারীদের সামাজিক অবস্থান কী হবে তা নিয়ে একটি সামাজিক সংকট ঘনীভূত হচ্ছিল। এমন নারীদের সামাজিক মর্যাদা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে বঙ্গবন্ধু তাদের বীরাঙ্গনা বলে অভিহিত করেন। বঙ্গমাতা স্বামীর সঙ্গে যুক্ত হয়ে ঘোষণা করেন, “আমি তোমাদের মা। ...এই বীরাঙ্গনা রমণীদের জন্য জাতি গর্বিত। তাদের লজ্জা বা গ্লানিবোধের কোনো কারণ নেই। কেননা তারাই প্রথম প্রমাণ করেছেন যে, কেবল বাংলাদেশের ছেলেরাই নয়, মেয়েরাও আত্মমর্যাদাবোধে কী অসম্ভব বলীয়ান।”

বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে রেণুর দ্বিমত

মতান্তর দাম্পত্য জীবনের অংশ, কিন্তু মনান্তর নয়; কারণ মনান্তর দাম্পত্য জীবনের ইতি ঘটায়। মুজিব-রেণুর দাম্পত্য জীবনে মতান্তর অবশ্যই ছিল। কিন্তু মনান্তর কখনই নয়। কারণ দুজনের মধ্যে ছিল আত্মিক সম্পর্ক। আত্মায়-আত্মায় মিল হলে বাহ্যিক অমিলের আশঙ্কা থাকে না।

বাঙালি ও বাংলাদেশ ঘিরে যে রাজনৈতিক ঘটনাপ্রবাহ চলমান ছিল, তা নিয়ে রেণুর ভিন্নমত বা উৎকণ্ঠা ছিল, এমন তিনটি ঘটনা ড. ওয়াজেদ মিয়া তার আত্মজৈবনিক বইতে উল্লেখ করেছেন। মুজিব-ইয়াহিয়া আলোচনা নিয়ে বঙ্গবন্ধু বাড়িতে কিছু বলতেন না, স্ত্রীকেও না। কারণ আলোচনার ফলাফল নিয়ে তিনি নিজেই উদ্বিগ্ন ছিলেন। কাজেই রেণুর গোস্বা; আর তার রাগত প্রশ্ন, “এতদিন ধরে যে আলাপ-আলোচনা করলে, তার ফলাফল কী হলো কিছু তো বলছ না। তবে বলে রাখি, তুমি যদি ইয়াহিয়া খানের সঙ্গে সমঝোতা করো, তবে একদিকে ইয়াহিয়া খানের সামরিক বাহিনী তাদের সুবিধামতো যেকোনো সময়ে তোমাকে হত্যা করবে, অন্যদিকে এ দেশের জনগণও তোমার ওপর ভীষণ ক্ষুব্ধ হবে।” প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে বঙ্গবন্ধুর বেশ সংযত উত্তর ছিল, “আলোচনা এখনো চলছে, এই মুহূর্তে সবকিছু খুলে বলা সম্ভব নয়।” স্বামীর কাছে থেকে প্রত্যাশিত উত্তর না পেয়ে রেণুর স্ত্রীসুলভ কপট রাগ অনিবার্য হয়। কথোপকথন হচ্ছিল খেতে খেতে; কাজেই রেণু না খেয়ে সারাদিনই রাগ করে থাকলেন। কারও সঙ্গে কথাও বললেন না। এখানে একটি সূক্ষ্ম ব্যাপার বিবেচ্য; এবং তা-ও আবার মনস্তাত্ত্বিক। আলোচনা সফল হচ্ছিল না বা শেষ পর্যন্ত হয়ওনি; এ কথা যে বঙ্গবন্ধু বুঝতে পারেননি, তা নয়। কিন্তু কৌশলগতভাবে তাকে আশার ছলনা ধরে রাখতে হয়েছিল। অন্যদিকে বঙ্গবন্ধুর মৌনতা রেণুকে ঠিক অশনিসংকেত দিয়েছিল যে, আলোচনা ঠিক পথে এগোচ্ছে না আর তাতেই তার গোস্বা ও বঙ্গবন্ধুর জন্য যথার্থ সতর্কবাণী। মানুষের অতিন্দ্রীয় অনুভূতি আছে, কারও বেশি, কারও কম; সবার মধ্যেই তা আছে। এমন অনুভূতির নাম মনোবিদরা দিয়েছেন ‘একস্ট্রা সেনসরি পারসেপশন’ যা ওই মুহূর্তে রেণুর মধ্যে কাজ যে করছিল, তা তার আচরণ-বচন থেকে প্রমাণিত। তার সন্দেহ ও সতর্কবাণী দুটোই যে ঠিক ছিল তা তখনকার পরিস্থিতি বলে দিয়েছিল।

সমাপনী মন্তব্য

রেণু সম্পর্কে বঙ্গবন্ধুর অকপট স্বীকারোক্তি : “আমার জীবনে দুটি বৃহৎ অবলম্বন। প্রথমটা হলো আত্মবিশ্বাস, দ্বিতীয়টি হলো আমার স্ত্রী আকৈশোর গৃহিণী।” আমাদের নাতিদীর্ঘ এ আলোচনায় আমরা দেখেছি বঙ্গমাতা বঙ্গবন্ধুর জন্য ছিলেন “শক্তিদায়িনী, প্রেরণাদায়িনী।” সুতরাং আবদুল গাফ্ফার চৌধুরীর এ বিশ্বাস সঠিক যে, “বাংলাদেশে এবং বাংলাদেশের ইতিহাসে একদিন যেমন শেখ মুজিবের প্রকৃত মূল্যায়ন হবে, তেমনি হবে মুজিবপত্নী বেগম ফজিলাতুন নেছারও। তাকে ছাড়া বাংলাদেশের ইতিহাস রবে অসম্পূর্ণ।” কালের বিবর্তনে বঙ্গবন্ধু উজ্জ্বল থেকে উজ্জ্বলতর হয়ে উঠছেন; মূল্যায়িত হচ্ছেন বঙ্গমাতাও। বঙ্গবন্ধু ছিলেন বাঙালির বটবৃক্ষ আর বঙ্গমাতা বঙ্গবন্ধুর ছায়াবৃক্ষ।

লেখক : বঙ্গবন্ধু চেয়ার অধ্যাপক, বাংলাদেশ ইউনিভার্সিটি অব প্রফেশনালস (বিইউপি), সাবেক চেয়ারম্যান,

ইতিহাস বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়