শেখ ফজিলাতুন নেছা|308592|Desh Rupantor
logo
আপডেট : ৮ আগস্ট, ২০২১ ০০:০০
জীবনী
শেখ ফজিলাতুন নেছা

শেখ ফজিলাতুন নেছা

জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সহধর্মিণী, বঙ্গমাতা শেখ ফজিলাতুন নেছা ১৯৩০ সালের ৮ আগস্ট গোপালগঞ্জ জেলার টুঙ্গিপাড়ায় এক সম্ভ্রান্ত মুসলিম পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। তার ডাকনাম রেণু। তিন বছর বয়সে তিনি পিতা জহুরুল হক ও পাঁচ বছর বয়সে মাতা হোসনে আরা বেগমকে হারান। দাদা শেখ আবুল কাশেম তার চাচাতো ভাই শেখ মুজিবুর রহমানের সঙ্গে রেণুর বিয়ে দেন। শেখ মুজিবুর রহমানের মা সায়েরা খাতুনের স্নেহ, মায়া-মমতায় তিনি বড় হতে থাকেন। তিনি গৃহশিক্ষকের কাছে পারিবারিক রীতি অনুযায়ী পড়াশোনা করতেন। স্কুলের লেখাপড়া না এগোলেও ছোটবেলা থেকেই লেখাপড়ার প্রতি ছিল তার অদম্য আগ্রহ। তিনি এ সময় থেকেই বঙ্কিমচন্দ্র, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ও শরৎচন্দ্রের বই আগ্রহ নিয়ে পড়তেন। পরবর্তী জীবনে তিনি প্রচুর পড়াশোনা করেছেন। প্রবল স্মৃতিশক্তির অধিকারী ছিলেন তিনি। যে কারণে বঙ্গবন্ধু তাকে সারা জীবনের জীবন্ত ডায়েরির সঙ্গে তুলনা করেছেন।

বঙ্গবন্ধুর জীবন ও সংগ্রামের অপরিহার্য অংশ হয়ে উঠেছিলেন শেখ ফজিলাতুন নেছা। কৈশোর থেকে বঙ্গবন্ধুর রাজনৈতিক জীবনের গুরুত্ব অনুধাবন করে শিশু-সন্তান আর ঘর-সংসারের দায়িত্ব নিজের কাঁধে তুলে নিয়েছিলেন তিনি। ’৪৬-এর দাঙ্গা মোকাবিলা, ভাষা আন্দোলন থেকে শুরু করে স্বাধিকার আর স্বাধীনতা সংগ্রামের প্রতিটি পদক্ষেপে তিনি সক্রিয় সহযোগিতা করেছেন, প্রেরণা দিয়েছেন। বঙ্গবন্ধু তার জীবনের এক বিরাট সময়ই কারাগারের অন্তরালে কাটিয়েছেন। তার অবর্তমানে মামলা পরিচালনার ব্যবস্থা করা, দলকে সংগঠিত করা, আন্দোলন পরিচালনা করাসহ প্রতিটি কাজে ফজিলাতুন নেছা অত্যন্ত দক্ষতা ও সাহসিকতার পরিচয় দিয়েছেন।

শেখ ফজিলাতুন নেছা কখনো বাঙালির অবিসংবাদিত নেতার স্ত্রী, কখনো প্রধানমন্ত্রীর স্ত্রী, কখনো রাষ্ট্রপতির স্ত্রী জীবনের সকল পর্যায়েই তিনি নিঃস্বার্থভাবে বঙ্গবন্ধুর সংগ্রাম ও সংকটের সঙ্গী হয়ে, ভরসা হয়ে, চালিকাশক্তি হয়ে কাটিয়ে দিয়েছেন। সাধারণ গৃহবধূর জীবনযাপন করলেও, রাজনীতির সঙ্গে সরাসরি যুক্ত না হলেও স্বামী বঙ্গবন্ধুর প্রতিটি কর্মকাণ্ড ও চিন্তাধারার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন তিনি। খোঁজখবর রাখতেন প্রতিটি বিষয়ে, কাজ করতেন নেপথ্যে থেকে। প্রচারবিমুখ এই মহীয়সী নারী কাজ করে গেছেন নীরবে-নিভৃতে। তাকে অনেক কষ্ট, দুর্ভোগ ও ঝুঁকির সম্মুখীন হতে হয়েছে। চিরায়ত বাঙালি নারীর, বাঙালি মায়ের কোমল মনের অধিকারী ছিলেন তিনি। কিন্তু বঙ্গবন্ধু যেমন কোনো অন্যায় বা প্রলোভনের কাছে মাথানত করেননি, তেমনি তিনিও ছিলেন আপসহীন। আত্মকেন্দ্রিকতা বা আত্মসর্বস্বতা কখনো স্পর্শ করতে পারেনি এই নির্লোভ মহীয়সী নারীকে। মানবকল্যাণে বঙ্গমাতা ফজিলাতুন নেছার ছিল অপরিসীম অবদান। তিনি সংগঠনের নেতাকর্মী ও গরিব আত্মীয়স্বজনের রোগশোকে চিকিৎসার ব্যবস্থাসহ অর্থনৈতিক সংকটে মুক্তহস্তে দান করতেন। এছাড়া কন্যাদায়গ্রস্ত পিতাকে আর্থিক সাহায্য, অনাথ, এতিম ও গরিব ছেলেমেয়েদের শিক্ষার জন্য সাহায্য-সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দিয়েছেন সবসময়ই।

১৯৪৭ সালের ২৮ সেপ্টেম্বর টুঙ্গিপাড়ায় তাদের বড় মেয়ে শেখ হাসিনার জন্ম হয়। এ সময়ও বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান কলকাতায় দাঙ্গাবিরোধী কর্মকাণ্ড ফেলে স্ত্রীর কাছে আসতে পারেননি। কিন্তু তিনি কোনো অনুযোগ করেননি। ১৯৪৯ সালে শেখ কামাল ও ১৯৫৩ সালে শেখ জামালের জন্ম হয় টুঙ্গিপাড়ায়। ১৯৫৭ সালের ১৩ সেপ্টেম্বর ঢাকায় শেখ রেহানার জন্ম হয়। ১৯৬১ সালে শেখ মুজিবুর রহমান কারাগার থেকে ছাড়া পেয়ে আলফা ইন্স্যুরেন্স কোম্পানিতে চাকরি নেন। এ বছরই ৩২ নম্বর রোডের বাড়িটির কাজ নিজ হাতে শুরু করেন ফজিলাতুন নেছা এবং ১ অক্টোবর নিশ্চিত আশ্রয়স্থল আপন ঘরে প্রবেশ করেন। এ বাড়িতেই ১৯৬৪ সালের ১৮ অক্টোবর জন্ম হয় শেখ রাসেলের। তিনি স্পষ্টই অনুধাবন করেছিলেন স্বামীর দেশসেবার কাজ সংসারে সময় দেওয়ার চেয়ে অনেক বড়। একদিকে এই বিবেচনা আরেক দিকে দফায় দফায় বঙ্গবন্ধুর দীর্ঘ কারাবাসের কারণে শেখ ফজিলাতুন নেছাকে একহাতেই ঘর-সংসার সামলে রেখে তাদের পাঁচ সন্তানকে লালন-পালন করতে হয়েছে।

বঙ্গমাতা ফজিলাতুন নেছার চিন্তাচেতনায় দেশপ্রেম এবং আদর্শ ও মূল্যবোধের স্থান ছিল সবার ওপরে। বঙ্গবন্ধুর জীবন এবং স্বাধীনতা আন্দোলনের নানা সংকটের সময়ে বারবার তার রাজনৈতিক প্রজ্ঞার পরিচয় পাওয়া যায়। নিজ বিবেক-বুদ্ধি দ্বারা পরিচালিত হয়ে বঙ্গবন্ধুর রাজনৈতিক জীবনে অনেক জটিল পরিস্থিতিতে সৎ পরামর্শ দিতেন এবং সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে সহযোগিতা করতেন। অত্যন্ত বুদ্ধিমতী এই নারী অসীম ধৈর্য ও সাহসের সঙ্গে জীবনের যেকোনো পরিস্থিতি মোকাবিলা করতেন।

শেখ মুজিবুর রহমান গ্রেপ্তার হলে শেখ ফজিলাতুন নেছাকেই মামলা পরিচালনা করার জন্য ছোটাছুটি করতে হতো। অনেক সময় ছাত্রলীগ ও আওয়ামী লীগের সংগঠন পরিচালনাতেও তিনি সক্রিয় ও গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখেন। শেখ মুজিবুর রহমানের কাছ থেকে পার্টির নির্দেশ আদান-প্রদান করে কর্মীদের মাঝে সেতুবন্ধ হিসেবে কাজ করেন। ছয় দফা যে এক দফায় পরিণত হতে পারে, তা পাকিস্তানের আওয়ামী লীগ নেতারা বুঝতে পেরেছিলেন। ধানম-ির ৩২ নম্বর বাড়িতে ছয় দফাকে আট দফায় রূপান্তর করার জন্য বললে সেখানে এক বিশৃঙ্খল পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। সেদিন সেই সভায় শুধু ফজিলাতুন নেছার সাহসী হস্তক্ষেপের ফলে ছয় দফা আট দফা থেকে রক্ষা পায়। একইভাবে আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলায় প্যারোলে মুক্তির বিরোধিতা করে তিনি বঙ্গবন্ধুকে বার্তা পাঠিয়েছিলেন যে তিনি যেন প্যারোলে মুক্তিতে রাজি না হন। এভাবে অনড় থাকার কারণেই শেখ মুজিবুর রহমানসহ আগরতলা মামলার সব আসামিরই একযোগে নিঃশর্ত মুক্তিলাভ ঘটে। ১৯৬৯ সালের ২৩ ফেব্র“য়ারি রেসকোর্স ময়দানে আয়োজিত সভায় ছাত্র-জনতা শেখ মুজিবুর রহমানকে ‘বঙ্গবন্ধু’ উপাধিতে ভূষিত করে।

১৯৭১ সালের ৭ মার্চ বঙ্গবন্ধুর ঐতিহাসিক ভাষণেও ফজিলাতুন নেছার ছিল নেপথ্য উৎসাহ ও প্রেরণা। ২৬ মার্চ প্রথম প্রহরে স্বাধীনতা ঘোষণার পর বঙ্গবন্ধুকে গ্রেপ্তার করে পশ্চিম পাকিস্তানে নিয়ে যাওয়া হলে সন্তানদেরসহ শেখ ফজিলাতুন নেছাকেও ধানমন্ডির একটি বাড়িতে গৃহবন্দি করে রাখা হয়। মুক্তিযুদ্ধের ৯ মাসে অনেক চাপ থাকা সত্ত্বেও তিনি কখনই পাকিস্তানি হানাদারদের কাছে মাথানত করেননি। ১৬ ডিসেম্বর, ১৯৭১ সালে বিকেল ৪টায় লেফটেন্যান্ট জেনারেল এ এ কে নিয়াজি আত্মসমর্পণের দলিল স্বাক্ষর করেন। বন্দি ফজিলাতুন নেছা ও তার সন্তানরা আনন্দে আত্মহারা, তৎক্ষণাৎ তিনি পাকিস্তানি হাবিলদারকে ডেকে বললেন তোমাদের নিয়াজি সারেন্ডার করেছে, তোমরাও সারেন্ডার করো। তারপর তিনি পাকিস্তানি পতাকা নামিয়ে পদদলিত করেন এবং নিজেই জয় বাংলা স্লোগান দিতে শুরু করেন। এমনই ছিল তার দেশপ্রেম।

১৯৭৪ সালের ৮ মার্চ আন্তর্জাতিক নারী দিবসে বাংলাদেশ মহিলা সমিতির পক্ষ থেকে বঙ্গমাতা ফজিলাতুন নেছাকে স্বাধীন বাংলাদেশের অভ্যুদয়ে তার অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ সম্মাননা প্রদান করা হয়। ইতিহাসের এক নিষ্ঠুরতম ঘটনার শিকার হয়ে ঘাতকদের বুলেটের আঘাতে স্বামী ও তিন ছেলের সঙ্গে সঙ্গে তাকেও জীবন দিতে হয়েছিল। মরণেও সাথী হয়ে থাকলেন বাংলার বন্ধুর এই আজীবনের সুখ-দুঃখের সঙ্গী, নজিরবিহীন ত্যাগী এই অসাধারণ মহীয়সী নারী।