কালক্ষেপণে সরকারের গচ্চা ২৮৩ কোটি টাকা!|309533|Desh Rupantor
logo
আপডেট : ১৩ আগস্ট, ২০২১ ০০:০০
জয়দেবপুর-চন্দ্রা-টাঙ্গাইল-এলেঙ্গা সড়ক চার লেনে উন্নীতকরণ
কালক্ষেপণে সরকারের গচ্চা ২৮৩ কোটি টাকা!
মামুন আব্দুল্লাহ

কালক্ষেপণে সরকারের গচ্চা ২৮৩ কোটি টাকা!

প্রতিবেশী দেশগুলোর সঙ্গে সড়ক যোগাযোগব্যবস্থার উন্নয়ন করে ট্রান্সপোর্ট ও ট্রান্সশিপমেন্ট ব্যবস্থা গড়ে তুলতে গাজীপুরের জয়দেবপুর থেকে টাঙ্গাইলের এলেঙ্গা পর্যন্ত মহাসড়ককে চার লেনে উন্নীত করার প্রকল্প নেওয়া হয়। ২০১৩ সালে ৫ বছর মেয়াদি ২ হাজার ৭৮৮ কোটি টাকা ব্যয়ের এ প্রকল্প মাঝে দুবার সংশোধন করা হয়েছে। এতে ব্যয় বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৬ হাজার ২১৪ কোটি টাকায়। এরপরও কাজ শেষ না হওয়ায় এখন আবার প্রকল্পের সংশোধনী প্রস্তাব করা হয়েছে। এতে প্রকল্পের কিছু অঙ্গ বাতিল করার পরও সরকারকে ২৮৩ কোটি টাকা গচ্চা দিতে হচ্ছে! কারণ প্রকল্পে বৈদেশিক সহায়তার অংশে ডলারের দাম পড়ে যাওয়ায় সরকারি অর্থ (জিওবি) থেকে সমন্বয় করতে হবে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, নির্দিষ্ট মেয়াদে কাজ শেষ হলে এ খেসারত দিতে হতো না।

এ প্রসঙ্গে পরিকল্পনামন্ত্রী এম এ মান্নান বলেন, প্রকল্প বাস্তবায়নে এটি কোনো ভালো উদাহরণ নয়। কোনো প্রকল্প দুবারের বেশি সংশোধন না করতে নির্দেশ দিয়েছিলেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। তবুও করোনার কারণে প্রকল্পটি শেষবারের মতো সংশোধনপূর্বক সমাপ্ত করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। তবে প্রকল্প বাস্তবায়নে বিলম্বের কারণসহ প্রকল্পের বাস্তব ও আর্থিক অগ্রগতির বিষয়ে ব্যাখ্যা চাওয়া হবে।

প্রকল্পের আওতায় জয়দেবপুর থেকে এলেঙ্গা পর্যন্ত মহাসড়কের বিদ্যমান ৭০ কিলোমিটার সড়ককে ২ লেন থেকে ৪ লেন এবং উভয় পাশে সেøা মুভিং ভেহিকুলার ট্রাফিক (এসএমভিটি) লেন নির্মাণ করার কথা ছিল। উন্নয়ন সহযোগী সংস্থা এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (এডিবি), ওপেক ফান্ড ফর ইন্টারন্যাশনাল ডেভেলপমেন্ট (ওএফআইডি) এবং আবুধাবি ফান্ড ফর ডেভেলপমেন্ট (এএফডি) যৌথভাবে এতে অর্থায়ন করছে। চলতি বছরের এপ্রিল পর্যন্ত প্রকল্পটিতে মোট ব্যয় হয়েছে ৪ হাজার ৮৪২ কোটি টাকা। তবে এখন পর্যন্ত কাজের ভৌত অগ্রগতি ৯০ শতাংশ।

প্রকল্পের শেষ মুহূর্তে সংশোধনী আনার বিষয়ে বাস্তবায়নকারী সংস্থা সড়ক ও জনপথ (সওজ) অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা বলছেন, ডলারের বিপরীতে টাকার মূল্যমান হ্রাস পাওয়ায় চুক্তি অনুযায়ী নির্মাণকাজের জন্য প্রতিশ্রুত পরিমাণ ঋণ না পাওয়ায় ফাইন্যান্সিং গ্যাপ পূরণের জন্য জিওবি থেকে নির্মাণ ব্যয় মোট ২৮৩ কোটি টাকা বৃদ্ধি করতে হবে। প্রকল্পের মেয়াদ বৃদ্ধির ফলে কনসালট্যান্সি সার্ভিস বা সেবা খাতে ৮০১ জনমাস এবং ব্যয় ৩৩ কোটি বাড়াতে হবে। এ ছাড়া প্রাইস অ্যাডজাস্টমেন্ট খাতে ১৫৫ কোটি টাকা, ভ্যাট, আইটি, সিডি খাতে ১৬২ কোটি টাকা, নতুন অঙ্গ হিসেবে ফ্লাইওভার ও আন্ডারপাসে বৈদ্যুতিক লাইট স্থাপন  অন্তর্ভুক্তিসহ এ খাতে সাড়ে ১৫ কোটি টাকা বাড়তি ব্যয় হবে, যা সংস্থান করতে হবে।

তারা আরও বলেন, হেডকোয়ার্টার নির্মাণ খাতে ২০ কোটি টাকা, ভূমি অধিগ্রহণ খাতে ৯১ কোটি টাকা, পুনর্বাসন খাতে ১৪২ কোটি টাকা, আরএইচডি ইকুইপমেন্ট খাতে ৭ কোটি টাকা, ইউটিলিটি শিফটিং খাতে ১০৯ কোটি টাকা, প্রাইস কনটিনজেন্সি খাতে ১০ কোটি টাকা, বৈদেশিক প্রশিক্ষণ ও বিভিন্ন রাজস্ব খাতে সাড়ে ৪ কোটি টাকাসহ মোট ৩৮৫ কোটি টাকা ব্যয় হ্রাস পাবে। এ ছাড়া প্রকল্পের বাস্তবায়ন মেয়াদকাল ডিসেম্বর ২০২২ পর্যন্ত নির্ধারণ করাও জরুরি। সব মিলিয়ে তৃতীয় সংশোধনীর ফলে প্রকল্প ব্যয় ১৮ কোটি হ্রাস পাবে।

তবে পরিকল্পনা কমিশনের কর্মকর্তারা বলছেন, মূল প্রকল্পটি পাঁচ বছর মেয়াদে বাস্তবায়নের কথা থাকলেও পরে তিন ধাপে মেয়াদ বাড়ানো হয়েছে। অর্থাৎ পাঁচ বছর মেয়াদে সমাপ্তির জন্য নির্ধারিত প্রকল্প সমাপ্ত করতে ৯ বছর ৮ মাস সময়ের প্রয়োজন হচ্ছে।

এটি বাস্তবায়নে প্রকল্প সাহায্য বা ঋণ বাবদ ৪১৮ মিলিয়ন ডলার বিবেচনায় নিয়ে দ্বিতীয় সংশোধিত সাসেক রোড কানেকটিভিটি প্রকল্পের ডিপিপি প্রণয়ন করা হয়েছিল, যা প্রতি ডলার ৮২ টাকা হারে দাঁড়ায় ৩ হাজার ৪২০ কোটি টাকার সমান। পরে ডলারের বিনিময় হার বৃদ্ধির ফলে প্রতিশ্রুত ৪১৮ মিলিয়ন ডলারের পরিবর্তে প্রকৃতপক্ষে ৩৯১ মিলিয়ন ডলার পাওয়া গেছে, যা টাকার মূল্যে ৩২০ কোটি কোটি টাকা। অর্থাৎ এ ক্ষেত্রে ২১৫ কোটি টাকা বৈদেশিক ঋণ প্রাপ্তির ঘাটতি রয়েছে। চুক্তি অনুযায়ী নির্মাণকাজের জন্য নির্ধারিত বৈদেশিক ঋণ পর্যাপ্ত না হওয়ায় ফাইন্যান্সিং গ্যাপ পূরণের জন্য জিওবি খাতে নির্মাণ ব্যয় বৃদ্ধি করতে হবে। তবে সওজ বলছে, জিওবি থেকে ২৮৩ কোটি টাকা দিতে হবে। এ বিষয়ে ইআরডির প্রতিনিধির মতামত জানতে চাওয়া হবে বাস্তবায়নকারী সংস্থার কাছে।

এ প্রসঙ্গে পরিকল্পনা কমিশনের ভৌত অবকাঠামো বিভাগের সদস্য মো. মামুন আল রশীদ দেশ রূপান্তরকে বলেন, শেষ মুহূর্তে এসে প্রকল্পের নতুন সংশোধনী প্রস্তাব করেছে সওজ। বর্তমানে নতুন অঙ্গ অন্তর্ভুক্তি, বিভিন্ন অঙ্গের পরিমাণ ও ব্যয় হ্রাস-বৃদ্ধি এবং বাস্তবায়ন মেয়াদকাল ৬ মাস বৃদ্ধি করতে বলছেন তারা। এ বিষয়ে বেশ কয়েকটি কারণের ব্যাখ্যা চাওয়া হয়েছে। জবাব পাওয়ার পর পরবর্তী পদক্ষেপ নেওয়া হবে।

২০১৩ সালে নেওয়া প্রকল্পের মোট ২ হাজর ৭৮৮ কোটি ব্যয়ের মধ্যে জিওবি ৯৪৫ কোটি এবং প্রকল্প সাহায্য ১ হাজার ৮৪৩ কোটি টাকা ব্যয় ধরা হয়। ২০১৮ সালেল মার্চ নাগাদ এর কাজ শেষ হবে বলে ধরে নেওয়া হয়। ২০১৪ সালে এসে প্রকল্পের ভূমি অধিগ্রহণে বাড়তি ব্যয়ের জন্য প্রকল্পে প্রথম সংশোধনী আনা হয়। এতে বরাদ্দ বেড়ে দাঁড়ায় ৩ হাজার ৬৭ কোটি টাকায়। এর মধ্যে জিওবি অংশে ১ হাজার ২২৩ কোটি এবং প্রকল্প সাহায্য ১ হাজার ৮৪৩ কোটি। পরে প্রকল্পটির বিশেষ সংশোধনী আনা হয় ২০১৬ সালের মার্চে। এতে ব্যয় বেড়ে দাঁড়ায় ৩ হাজার ৩৬৫ কোটি টাকায়।

এরপর প্রকল্পের বিভিন্ন অঙ্গের পরিমাণ, ব্যয় হ্রাস-বৃদ্ধি ও বাস্তবায়ন মেয়াদকাল বৃদ্ধিসহ ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে করা চুক্তি অনুসারে পূর্তকাজের ব্যয় মেটাতে বরাদ্দ বাড়িয়ে করা হয় ৫ হাজার ৫৯৩ কোটি টাকা (জিওবি ২ হাজার ১৭২ কোটি টাকা, প্রকল্প সাহায্য ৩ হাজার ৪২১ কোটি)। ওই সময় মেয়াদকাল ২০২০ সালের জুন পর্যন্ত বাড়ানো হয়। পরে আবারও বিশেষ সংশোধনীর মাধ্যমে প্রকল্প ব্যয় বাড়িয়ে ৬ হাজার ২১৪ কোটি টাকা করা হয়। এর মধ্যে জিওবি ২ হাজার ৭৯৪ কোটি এবং প্রকল্প সাহায্য ৩ হাজার ৪২১ কোটি টাকা প্রাক্কলন করা হয়। এরপর কভিড-১৯-এর কারণে প্রকল্পের মেয়াদ ২০২১ সালের জুন পর্যন্ত বৃদ্ধি করা হযয়েছিল।