অনলাইনে প্রশিক্ষণ নিচ্ছে ৬০ জঙ্গি!|309536|Desh Rupantor
logo
আপডেট : ১৩ আগস্ট, ২০২১ ০০:০০
অনলাইনে প্রশিক্ষণ নিচ্ছে ৬০ জঙ্গি!
সরোয়ার আলম

অনলাইনে প্রশিক্ষণ নিচ্ছে ৬০ জঙ্গি!

ভিন্ন কৌশলে এগোচ্ছে নিষিদ্ধঘোষিত জঙ্গি সংগঠন নব্য জেএমবি। আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলোর চোখ ফাঁকি দিতে সংগঠনের সদস্যরা অনলাইনে প্রশিক্ষণ নিচ্ছে। এখনো ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে অন্তত ৬০ জঙ্গি অনলাইনে প্রশিক্ষণ নিচ্ছে। বিভিন্ন দেশের দূতাবাস, বিদেশি নাগরিক, রাষ্ট্রীয় গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা ও আইন প্রয়োগকারী সংস্থার ওপর হামলার পরিকল্পনা ছিল সংগঠনটির। সম্প্রতি গ্রেপ্তার হওয়া নব্য জেএমবির সামরিক শাখার প্রধান জাহিদ হাসান রাজু ওরফে ইসমাঈল হাসান ওরফে ফোরকানের কাছ থেকে পাওয়া তথ্যে হতবাক হয়ে গেছেন গোয়েন্দারা। তাকে রিমান্ডে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করছে ডিবি। পুলিশ তথ্য পেয়েছে, কয়েক বছরের ব্যবধানে অন্তত ১০টি পুলিশ বক্সে বোমা হামলা চালিয়েছে জঙ্গিরা। আরও নাশকতা চালাতে ৫টি সিøপার সেলও (ইদাদ) গঠন করা হয়েছে। প্রতিটি সেলের ২০ জন করে সদস্য ফোরকানের কাছে প্রশিক্ষণ নিয়েছে। তার গ্রেপ্তারের পর অন্যরা কোনো জঙ্গি নেতার কাছে প্রশিক্ষণ নিচ্ছে, সেই তথ্যও পেয়েছে পুলিশ। তবে তদন্তের স্বার্থে তার পরিচয় প্রকাশ করেনি পুলিশ। 

তদন্তসংশ্লিষ্টরা দেশ রূপান্তরকে জানান, বিদেশি ও রাষ্ট্রীয় গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা ও আইন প্রয়োগকারী সংস্থার ওপর হামলা করার জন্যই এই সেল খোলে জঙ্গিরা। ফোরকান ধরা পড়ার পর প্রশিক্ষিত জঙ্গিরা গা ঢাকা দিলেও তারা অনলাইনে প্রশিক্ষণ নিচ্ছে এবং তৎপরতা চালাচ্ছে। তাদের গ্রেপ্তার করতে সিটিটিসির একাধিক টিম মাঠে নেমেছে। গত মঙ্গলবার রাজধানীর কাফরুল এলাকায় অভিযান চালিয়ে ফোরকানসহ তিনজনকে করে গ্রেপ্তার করে সিটিটিসি। পরে বুধবার কাফরুল থানায় সিটিটিসি বাদী হয়ে সন্ত্রাস দমন আইনের মামলা করে। সিটিটিসি চার দিনের রিমান্ডে নিয়ে তাদের জিজ্ঞাসাবাদ করছে। জিজ্ঞাসাবাদে বেরিয়ে আসছে নানা চাঞ্চল্যকর তথ্য।

পুলিশ কর্মকর্তারা জানান, জঙ্গি নেতা ফোরকান চাকরির জন্য কয়েকটি কোম্পানিতে সিভি দিয়েছিলেন। তার উদ্দেশ্য ছিল চাকরির আড়ালে বিপুল পরিমাণ এক্সপ্লোসিভ প্রিকারসর সংগ্রহ করে শক্তিশালী বোমা বানানো। বোমাগুলো দিয়ে তারা আইন প্রয়োগকারী সংস্থা, রাষ্ট্রীয় গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনাসহ বিদেশিদের যাতায়াত আছে এমন স্থানে হামলা করার টার্গেট করেছিল। সেই লক্ষ্যে প্রশিক্ষণ দিয়ে ৫টি সিøপার সেলও তৈরিও করেছিলেন ফোরকান। জিজ্ঞাসাবাদে ফোরকান সিটিটিসিকে জানান, বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সময় ২০১৪ সালে জঙ্গিবাদে জড়িয়ে পড়েন তিনি। এরপরই শুরু হয় তার বোমা বানানোর কৌশল। একপর্যায়ে তিনি নব্য জেএমবির ‘বোমা গুরু’ হয়ে যান।

এ বিষয়ে ডিএমপির অ্যাডিশনাল কমিশনার ও সিটিটিসির প্রধান আসাদুজ্জামান দেশ রূপান্তরকে বলেন, রসায়নে পারদর্শী হওয়ার কারণে তার মেধা এবং সাহসের জন্য তাকে সংগঠনটির সামরিক শাখার সদস্য হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়। তিনি অল্পদিনে গ্রেনেড ও বোমা তৈরিতে অত্যন্ত দক্ষ হয়ে ওঠেন। নিত্যনতুন কৌশলে আইইডি, বোমা ও গ্রেনেড তৈরিতে পারদর্শী জাহিদ বিশ্বস্ত সহযোগীদের হাতে-কলমে প্রশিক্ষণ দিতেন। জঙ্গিবাদে সম্পৃক্ত হওয়ায় এবং হিজরত করায় মাস্টার্স সম্পন্ন করতে পারেননি ফোরকান। ২০১৬ সালে অনলাইনে ‘হোয়াইট হাউজের মুফতি’ নামে আইডির মাধ্যমে উগ্রবাদে উদ্বুদ্ধ হয়ে নব্য জেএমবির তৎকালীন আমির মুসার হাত ধরে তিনি সংগঠনে যোগদান করেন। আমির মুসার সঙ্গে কাজ করার সুবাদে সংগঠনের ওই সময়ের শীর্ষস্থানীয় জঙ্গিদের নজরে আসেন এবং তাদের সার্বক্ষণিক সঙ্গী হিসেবে কাজ করেন। তার কাছ থেকে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পাওয়া যাচ্ছে। তথ্যগুলো আমরা যাচাই করছি। এখনো যারা আত্মগোপনে আছে, তাদের গ্রেপ্তারের চেষ্টা চলছে।

ডিএমপির বোমা নিষ্ক্রিয়করণ দলের প্রধান এডিসি রহমতউল্লাহ চৌধুরী বলেন, জাহিদ দীর্ঘদিন ধরে আমাদের নজরদারিতে ছিলেন। তিনি বোমা বানানোর উপাদান সংগ্রহ করার লক্ষ্যে কেমিক্যাল সাপ্লাই কোম্পানিতে চাকরি খুঁজছিলেন। কিন্তু চাকরি পাওয়ার আগে তাকে গ্রেপ্তার করা হয়। এতে তার সব পরিকল্পনা ভেস্তে যায়।

তিনি আরও বলেন, ফোরকানের বড় ইচ্ছা ছিল, বোমা বানানোর উপাদান সংগ্রহ করে বড় ধরনের হামলা করা, যা সিটিটিসির তৎপরতার কারণে নস্যাৎ হয়ে গেছে। তবে জিজ্ঞাসাবাদে ফোরকান আরও অনেক গুরুতপূর্ণ তথ্য দিয়েছেন। বোমা তৈরির জন্য যেখান থেকে এক্সপ্লোসিভ কেমিক্যাল সংগ্রহ করেছিলেন ফোরকান, সেসব স্থানে অভিযান চালানো হবে। তাদের আইনের আওতায় আনা হবে।  

সিটিটিসির সূত্র আরও জানায়, নব্য জেএমবির সামরিক শাখার প্রধান জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের রসায়ন বিভাগের শিক্ষার্থী ফোরকান গাজীপুরের টঙ্গী রেলগেট এলাকায় রুম ভাড়া নেন। চার-পাঁচজনকে সঙ্গে নিয়ে ফ্ল্যাট বাসায় বোমা বানানোর প্রশিক্ষণ দিতে গেলে গ্রেপ্তার হওয়ার আশঙ্কায় অনলাইন প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করে বোমা বানানোর প্রশিক্ষণ দিতে শুরু করেন। ফোরকান ভিডিও কল দিয়ে বিভিন্ন দিক-নির্দেশনা দিয়ে আসছিলেন। জঙ্গিদের বোমা বানানোর প্রশিক্ষণ দিতে অনলাইন সেল খোলেন ফোরকান। এ সেলগুলোকে বলা হয় ইদাদ। প্রতিটি ইদাদে ২০ জন করে সদস্য এখনো কার্যক্রম চালাচ্ছে বলে ফোরকান পুলিশকে তথ্য দিয়েছেন।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক পুলিশের এক কর্মকর্তা দেশ রূপান্তরকে বলেন, পুলিশের চোখ ফাঁকি দিতে নব্য জেএমবি অনলাইনের দিকে বেশি ঝুঁকছে। তারা হামলা চালাতে সিøপার সেল তৈরি করছে। দেশের বাইরে থেকেও জঙ্গিরা নব্য জেএমবিতে কলকাঠি নাড়ছে বলে আমরা তথ্য পাচ্ছি। গত ১৭ মে নারায়ণগঞ্জের সিদ্ধিরগঞ্জের সাইনবোর্ড এলাকায় ট্রাফিক পুলিশ বক্সের সামনে প্লাস্টিকের ব্যাগের ভেতর থেকে শক্তিশালী একটি বোমা উদ্ধার হয়। এ ঘটনার সঙ্গে জড়িত দুই নব্য জেএমবির সদস্য আব্দুল্লাহ আল মামুন ওরফে ডেভিড কিলার ও কাউসার হোসেন ওরফে মেজর ওসামাকে গ্রেপ্তারের পর অনলাইনের বিষয়টি সামনে আসে। এমনকি জঙ্গিরা ড্রোন দিয়ে পর্যন্ত হামলা চালানোর পরিকল্পনা নিয়েছিল। তাদের সব পরিকল্পনা ভেস্তে গেছে। তবে জঙ্গিরা এখনো তৎপরতা চালাচ্ছে। তারা নিয়মিত প্রশিক্ষণ দিচ্ছে।