মুজিব অন ট্রায়াল|309768|Desh Rupantor
logo
আপডেট : ১৫ আগস্ট, ২০২১ ০০:০০
মুজিব অন ট্রায়াল

মুজিব অন ট্রায়াল

আন্দালিব রাশদী১১ আগস্ট ১৯৭১ অ্যাসোসিয়েটেড প্রেস রাওয়ালপিন্ডি থেকে সংবাদটি অবমুক্ত করল : ওয়াকিবহাল সরকারি সূত্র জানিয়েছে, আজ আওয়ামী লীগ নেতা শেখ মুজিবুর রহমানের বিচার শুরু হয়েছে পাকিস্তানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণার সাব্যস্ত শাস্তি মৃত্যুদণ্ড, তাকে এর বিরুদ্ধেই লড়তে হবে।

প্রকাশ্য আদালতে বিচার নয়; সঙ্গোপনে, সামরিক বেষ্টনীতে ক্যাঙ্গারু কোর্টে। মামলার প্রতিদিনের কার্যবিবরণী গোপন থাকবে।

বিচার যে শুরু হয়েছে দাপ্তরিকভাবে তা নিশ্চিত করতে পাকিস্তান সরকার অস্বীকৃতি জানিয়েছে। বিচারের জন্য নির্ধারিত সামরিক ট্রাইব্যুনালটি কোথায়, কারা বিচারক, আসামিপক্ষে উকিলই বা কে সরকার কোনো কিছুই জানাতে সম্মত হয়নি।

‘মুজিবুর’স ট্রায়াল বিগিনস; ইন্ডিয়া অ্যাপিলস টু নেশনস’ এই শিরোনামে ভারতের ইংরেজি দৈনিক দ্য স্টেটসম্যান যে সংবাদটি প্রকাশ করেছে ঐতিহাসিকভাবে একটি গুরুত্বপূর্ণ দলিল বিবেচনায় এটি ভাষান্তরিত করা হলো :

তিনটি বিদেশি বেতার রেডিও আক্রা, রেডিও কোলোন এবং রেডিও অস্ট্রেলিয়া আজ জানিয়েছে যে গোপন আদালতে আজ শেখ মুজিবুর রহমানের বিচার শুরু হয়েছে, তবে তারা এই সংবাদের কোনো উৎসের কথা উল্লেখ করেনি।

স্টেটসম্যান পত্রিকার বিশেষ প্রতিনিধি নয়া দিল্লি থেকে লিখেছেন যে, মিস্টার রহমানের জীবন রক্ষা করার জন্য মিসেস গান্ধী ২৪টি দেশের কাছে আবেদন জানিয়েছেন। একই বিষয়ে সোভিয়েত ইউনিয়নও অনুরূপ আবেদন জানাতে পারে বলে মনে করা হচ্ছে।

একই বিষয়ে ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী সর্দার শরণ মিং জাতিসংঘের মহাসচিবের কাছে টেলিগ্রাম পাঠিয়েছেন।

ওয়াশিংটন থেকে অ্যাসোসিয়েটেড প্রেস জানিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র আজ দ্বিতীয়বারের মতো পাকিস্তান সরকারের কাছে তাদের উদ্বেগ প্রকাশ করেছে যে, শেখ মুজিবুর রহমানের গোপন বিচারে কোনো সংক্ষিপ্ত কার্যক্রম পূর্ববাংলার সংকটে একটি রাজনৈতিক সমাধানের সম্ভাবনা নস্যাৎ করে দেবে।

যুক্তরাষ্ট্রের সেক্রেটারি অব স্টেট মিস্টার রজার্স আজ পাকিস্তানের রাষ্ট্রদূত আগা হিলালিকে ১১ জন মার্কিন সিনেটরের টেলিগ্রাম এবং ৫৮ জন কংগ্রেসম্যানের স্বাক্ষরিত পত্র হস্তান্তরিত করেন। তাতে শেখের প্রতি সহানুভূতির সঙ্গে যথার্থ আচরণ করার এবং ন্যায়বিচার করার দাবি জানানো হয়েছে।

একই সঙ্গে স্টেট ডিপার্টমেন্টের একজন মুখপাত্র সিনেটর অ্যাডওয়ার্ড কেনেডিকে পাকিস্তানের ইসলামাবাদ ও ঢাকা সফরে আসার অনুমতি প্রত্যাখ্যান করার সিদ্ধান্তে তীব্র প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেছেন। ইউএনআই পরিবেশিত এক খবরে জানা গেছে, গৃহবন্দি থাকা শেখ মুজিবুর রহমানের স্ত্রীকে কয়েক দিন আগে করাচি আনা হয়েছে, মুজিবনগরে একটি বিশ^স্ত সূত্র থেকে তারা এই খবর পেয়েছে বলে জানায়।

রেডিও অস্ট্রেলিয়া জানায়, এই বিচারের উপসংহার আগেই টানা হয়েছে, একমাত্র রায় : অভিযোগ প্রমাণিত।

২৬ মার্চ রাতে শেখ মুজিব গ্রেপ্তার হওয়ার ১৮ ঘণ্টা পর জেনারেল ইয়াহিয়া খান তাকে রাষ্ট্রদ্রোহী ও পাকিস্তানের শত্রু হিসেবে চিহ্নিত করছেন। রেডিও অস্ট্রেলিয়া বলছে, পাকিস্তানে কেউ-ই না, বিশেষ করে সামরিক আদালত ইয়াহিয়ার ইচ্ছের বিরুদ্ধে যেতে পারবে না। রেডিও আরও বলেছে, তাদের জানা আছে জেনারেল ইয়াহিয়া একান্ত আক্ষেপে বলেছেন যে, শেখকে অবশ্যই ধরতে হবে।

প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীর টেলিগ্রাম বার্তা সব বৃহৎশক্তি, পশ্চিমা দেশ, আফ্রিকা, এশিয়া ও পশ্চিম এশিয়ার নির্বাচিত কয়েকটি দেশের সরকার প্রধানের কাছে পাঠানো হয়েছে এবং প্রবাসী ভারতীয় দূতাবাস বার্তাটি হস্তান্তর করছে।

তিনি তার টেলিগ্রাম বার্তায় বলেছেন : ভারত সরকার ও জনগণ আমাদের গণমাধ্যম ও সংসদ এই খবরটি শুনে অত্যন্ত বিচলিত যে প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খান কোনো বিদেশি আইনি সহায়তার সুযোগ না দিয়ে সঙ্গোপনে শেখ মুজিবুর রহমানের বিচারের আয়োজন করতে যাচ্ছেন। আমাদের আশঙ্কা শেখ মুজিবুর রহমানকে হত্যা করার উদ্দেশ্যে এই কথিত বিচারের অজুহাত সৃষ্টি করা হয়েছে। এতে পূর্ববাংলার পরিস্থিতি আরও ভয়ানক হয়ে উঠবে এবং তাদের প্রতি আমাদের জনগণ ও রাজনৈতিক দলগুলোর বিশেষ অনুভূতির কারণে ভারতেও ভীষণ উত্তেজনা সৃষ্টি হবে। কাজেই আমরা অত্যন্ত গভীরভাবে উদ্বিগ্ন। আপনার কাছে আমাদের নিবেদন প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়ার ওপর আপনার প্রভাব খাটিয়ে তাকে ঘটনার বাস্তবতা অনুধাবন করার জন্য এবং এই অঞ্চলের শান্তি ও স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে তিনি যেন বৃহত্তর স্বার্থে বাস্তবসম্মত পদক্ষেপ গ্রহণ করেন।

অবশ্য মিসেস গান্ধীর বার্তা চীনে এবং মিসর ও ইরাক বাদে পশ্চিম এশিয়ার কোনো সরকার প্রধানের কাছে পাঠানো হয়নি। তার নির্বাচিত দেশগুলো হচ্ছে : মিসর, সিংহল, তানজানিয়া, ইন্দোনেশিয়া, আফগানিস্তান, নেপাল, মালয়েশিয়া, জাম্বিয়া, সোভিয়েত ইউনিয়ন, কানাডা, ফ্রান্স, ইতালি, সিঙ্গাপুর, সুইডেন, হল্যান্ড, জাপান, যুক্তরাজ্য, যুক্তরাষ্ট্র, পশ্চিম জার্মানি ঘানা ও যুগোস্লাভিয়া। জাতিসংঘের মহাসচিব উ থান্টের কাছে পাঠানো পররাষ্ট্রমন্ত্রী সর্দার শরণ সিং-এর টেলিগ্রাম বার্তায় উল্লেখ করা হয়েছে : রাওয়ালপিন্ডিতে প্রদত্ত ঘোষণা যে আগামীকাল থেকে শেখ মুজিবুর রহমানকে বিচারে সোপর্দ করা হচ্ছে, তা আমাদের হতবাক ও বিপন্ন করে তুলেছে। প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খানের কয়েকটি লাগাতার ঘোষণার প্রাক্কালে এই ঘোষণা দেওয়া হয়েছে। ইয়াহিয়া বলেছেন, শেখ মুজিবুর রহমান পাকিস্তানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করেছেন এবং বিভিন্ন ধরনের রাষ্ট্রদ্রোহীর কাজে অংশ নিয়েছেন।

শেখ মুজিবুর রহমান তার জনগণের কাছে অবিসংবাদিত নেতা, তিনি তাদের অত্যন্ত প্রিয় ও শ্রদ্ধেয় ব্যক্তিত্ব। ১৯৭০ সালের ডিসেম্বরের নির্বাচনে তিনি বিস্ময়কর বিজয় লাভ করেছেন সাম্প্রতিককালে সারা পৃথিবীতে কোথাও এ ধরনের বিজয় লাভের ঘটনা ঘটেনি। আমাদের জনগণ, গণমাধ্যম এবং পার্লামেন্ট ও সরকার সবাই বিশ্বাস করে পূর্ববাংলায় তাদের কীর্তির কারণে পাকিস্তান সরকার ভারতের জন্য সমস্যা সৃষ্টি করেছে, যদি শেখ মুজিবুর রহমানের জীবন ও কল্যাণ নিয়ে হঠকারী কোনো সিদ্ধান্ত নেয় তাহলে এই সমস্যা ১০ গুণ বেড়ে যাবে।

মহোদয় আপনার কাছে আমাদের আপিল পাকিস্তান সরকারকে বলার জন্য জরুরি পদক্ষেপ গ্রহণ করুন যাতে তাদের ও আমাদের পরিস্থিতির আরও অবনতি না ঘটান। যদি তারা শেখ মুজিবের ‘কিছু’ করেন তাহলে ভয়ংকর ও আতঙ্কজনক পরিণতি ঘটতে পারে।

বিষয়টি রুশ পররাষ্ট্রমন্ত্রীকে জানিয়েছেন কি না রাজ্যসভায় এই প্রশ্ন করা হলে সর্দার শরণ সিং বলেন, আদ্রে গ্রোমিকো বিশেষভাবে চান পাকিস্তান যেন এ ধরনের কোনো লজ্জাজনক ট্রায়ালের আয়োজন না করে।

তিনি হাউজকে বলেন, প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া শেখ মুজিবুর রহমান সম্পর্কে যে হুমকি দিয়েছেন তাতে ভারত সরকার খুবই উদ্বিগ্ন।

সদস্য এ ডি মানি তাকে জিজ্ঞেস করেন, পাকিস্তানের সেনাবাহিনী বাংলাদেশে যে যুদ্ধাপরাধ করেছে সেজন্য ভারত সরকার : ‘...কমিশন অব ইন্টারন্যাশনাল জুরিস্ট’-এর মাধ্যমে কোনো তদান্তানুষ্ঠানের উদ্যোগ নেবে কি?

জবাবে পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, কমিশনের ভারতীয় সদস্যরা যদি উদ্যোগ নেন তাহলে বরং ভালো হবে।

গতকাল মহাসচিব উ থান্টের বরাত দিয়ে রয়টার জানিয়েছে, শেখ মুজিবুর রহমানের নিয়তি পাকিস্তানের বাইরের ভীষণ প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি করবে। মহাসচিব বলেন, সামরিক আদালতে শেখ মুজিবুর রহমানের আসন্ন বিচার অত্যন্ত সংবেদনশীল ব্যাপার, তা কেবল কোনো সদস্য রাষ্ট্রের বিচার বিভাগই দক্ষতার সঙ্গে বিবেচনা করতে পারে।

একটি প্রেসবার্তায় উ থান্ট বলেন, তিনি তার অনুভূতি অনেক সদস্য রাষ্ট্রের প্রতিনিধির সঙ্গে ভাগাভাগি করেছেন এবং তিনি মনে করেন শেখ মুজিবুর রহমানের নিয়তি অবশ্যই পাকিস্তানের সীমান্তের বাইরেও অনিবার্য প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি করবে। তার বিচার নিয়ে বিভিন্ন ধরনের মানবিক সংস্থা উদ্বিগ্ন হবে, রাজনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকেও তা উদ্বেগজনক। তিনি আরও বলেন, পূর্ব পাকিস্তান পরিস্থিতি নিয়ে তিনি এখনো প্রতিদিন সদস্য দেশের প্রতিনিধিদের কাছ থেকে উদ্বেগজনক বার্তা পাচ্ছেন।

জেনেভায় গতকাল ইন্টারন্যাশনাল জুরিস্ট কমিশন শেখ মুজিবুর রহমানের বিচার নিয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খানের কাছে প্রতিবাদ পাঠিয়েছে। টেলিগ্রাম বার্তা কমিশনের সেক্রেটারি জেনারেল অ্যালান নিয়াল ম্যাকভারমট বলেছেন : ইন্টারন্যাশনাল কমিশন অব জুরিস্টস শেখ মুজিবুর রহমানের গোপন সামরিক আদালতে বিচারের প্রতিবাদ জানাচ্ছে। ন্যায়বিচার লুকোনোর কিছু নেই।

রয়টার পরিবেশিত লন্ডন থেকে পাওয়া খবরে জানা গেছে, শেখ মুজিবুর রহমানের বিলেতি আইনজীবীরা জানিয়েছেন, তাকে সব ধরনের আইনি সহায়তা গ্রহণ থেকে বঞ্চিত করা হচ্ছে।

আইনি প্রতিষ্ঠান বার্নাড শেরিভান অ্যান্ড কোম্পানি এ সমস্যা নিয়ে একটি অসনাতন পদক্ষেপ নিয়েছেন। তারা মামলাটি নিয়ে ‘দ্য টাইমস’-এ চিঠি দিয়েছে এবং বলেছে তার আইনজীবীরা শেখ মুজিবুর রহমানের ন্যায়বিচার প্রাপ্তি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে : ‘সাধারণ নির্বাচনে ব্যাপক সাফল্যের পর যদিও মার্চ মাসে তাকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে এত দিন কোনো আইনি সহায়তা গ্রহণের সুযোগ তাকে দেওয়া হয়নি।’ তারা আরও বলেন, তারা জুন মাসে লন্ডনের পাকিস্তান হাইকমিশনে তার সঙ্গে সাক্ষাৎ করে আইনি সহায়তা প্রদানের প্রস্তাব করলেও হাইকমিশন কোনো জবাব দেয়নি, এমনকি তাদের পত্রপ্রাপ্তি স্বীকার করেনি। এতে আরও বলা হয়, সিনিয়র কাউন্সেল সিন ম্যাকব্রাইড ব্যক্তিগতভাবে উপস্থিত হয়ে অনুরূপ আবেদন করলে তাতেও সাড়া মেলেনি।

কায়রোর সংবাদপত্র আল এহরাম সামরিক আদালতে পূর্ববাংলার নেতা শেখ মুজিবুর রহমানের বিচারের খবরে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। পত্রিকাটি বলেছে, ‘সামরিক বিচার কিংবা গোপন বিচার কখনো জাতীয় ঐক্য রক্ষা করতে পারে না।’

শেষ পর্যন্ত জাতীয় ঐক্য রক্ষিত হয়নি।

লেখক : কথাসাহিত্যিক ও অনুবাদক