বঙ্গবন্ধুর আদর্শ ও নতুন প্রজন্ম|309774|Desh Rupantor
logo
আপডেট : ১৫ আগস্ট, ২০২১ ০০:০০
বঙ্গবন্ধুর আদর্শ ও নতুন প্রজন্ম
ড. রাহমান নাসির উদ্দিন

বঙ্গবন্ধুর আদর্শ ও নতুন প্রজন্ম

পাকিস্তানের হানাদার বাহিনী ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ কালরাতে নিরস্ত্র বাঙালির ওপর হিংস্র থাবা নিয়ে ঝঁাঁপিয়ে পড়ার সময়ই বঙ্গবন্ধুকে গ্রেপ্তার করে নিয়ে যায়। কিন্তু স্বাধীনতা সংগ্রামের ধারাবাহিকতায়, পাকিস্তানের হানাদার বাহিনীর সমস্ত অত্যাচার, নির্যাতন, খুন, ধর্ষণ এবং অগ্নিসংযোগকে মোকাবিলা করে এদেশের কৃষক, শ্রমিক, মজদুর, ছাত্র, জনতা এবং নানান পেশাজীবী শ্রেণি মুক্তির সংগ্রামে জীবন বাজি রেখে যুদ্ধ করে। বঙ্গবন্ধুর শারীরিক অনুপস্থিতি সত্ত্বেও বঙ্গবন্ধু ছিলেন প্রতিটি বাঙালির চেতনায়, নেতৃত্বের দৃঢ়তায়, মুক্তিযুদ্ধের প্রেরণায়, দেশপ্রেমের তীব্রতায় এবং স্বাধীনতা অর্জনের অদমনীয় স্পৃহায়।

এ কারণেই, জাতীয় অধ্যাপক আব্দুর রাজ্জাক তার বিখ্যাত Bangladesh: State of the Nation বক্তৃতায়, যা পরে গ্রন্থ আকারে প্রকাশিত হয়েছিল, বলেছিলেন, ‘‘যখন দু’টি অসম শক্তির (সশস্ত্র পাকিস্তানি মিলিটারি বনাম নিরস্ত্র বাঙালি) মধ্যে যুদ্ধ হচ্ছে, তখন বঙ্গবন্ধু পুরোপুরি শারীরিকভাবে অনুপস্থিত ছিলেন, কিন্তু পুরো মুক্তিযুদ্ধের কেন্দ্রীয় প্রেরণা এবং স্বাধীনতা সংগ্রামের কেন্দ্রীয় বিন্দু ছিলেন বঙ্গবন্ধু। এ বিষয়ে কোনো ভুল বোঝাবুঝির অবকাশ নাই কিংবা কোনো অস্পষ্টতার সুযোগ নাই যে, সেই কঠিন সময়ে, সেই জীবন-মরণ পরীক্ষার দিনে বঙ্গবন্ধু একাই ছিলেন মুক্তিযুদ্ধের প্রতীক, স্বাধীনতার প্রতীক, দেশপ্রেমের প্রতীক, এবং একটি স্বাধীন-সার্বভৌম মানচিত্র ও পতাকা অর্জনের জীবন-বাজি যুদ্ধের মূল প্রেরণা।’’ [ Bangladesh: State of the Nation, Abdur Razzaq, Dhaka: Shahitya Prakash, 2010, page: 17]

যে বঙ্গবন্ধুকে পাকিস্তানের পরাক্রমশীল শক্তিধর শাসকরা একটি পরাধীন দেশের গ্রেপ্তারকৃত নেতা হওয়া সত্ত্বেও স্পর্শ করার সাহস করে নাই, সেই বঙ্গবন্ধুকেই একটি স্বাধীন-সার্বভৌম দেশের প্রধান হিসাবে নিজ বাসভবনে নিজ দেশের মানুষের হাতে নির্মমভাবে সপরিবারে জীবন দিতে হয়েছে। মুক্তিযুদ্ধের এবং বাংলাদেশের রাজনীতির পপুলার বয়ানে এটাকে ‘কতিপয় বিপথগামী সেনা কর্মকর্তার কাজ’ হিসাবে উপস্থাপন করা হয় কিন্তু এটা ছিল অত্যন্ত সুপরিকল্পিত, নিষ্ঠুর ও নির্মম হত্যাকান্ড যার মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের সমূহ সম্ভাবনাকে চিরতরে ধ্বংস করে দেওয়ার একটা চক্রান্ত হয়েছিল। মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে ধ্বংস করে বঙ্গবন্ধুর আদর্শকে চিরতরে মুছে ফেলে ইতিহাসকে নতুন করে লেখার একটা ‘মাস্টার প্ল্যানের’ অংশ হিসেবে বঙ্গবন্ধুকে সপরিবারে হত্যা করা হয়েছিল। সে নৃশংস হত্যাকা-কে স্মরণ করার জন্য প্রতি বছর ১৫ আগস্ট জাতীয় শোক দিবস পালন করা হয়।

কিন্তু নতুন প্রজন্মের কাছে ১৫ আগস্টের ঘটনা কীভাবে উপস্থাপিত হচ্ছে এবং সে উপস্থাপনা কীভাবে গৃহীত হচ্ছে সেটা অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনায় নিতে হবে। কেননা, ইতিহাসের সত্য যথাযথভাবে উপস্থাপনের মাধ্যমে নতুন প্রজন্মের কাছে যদি ১৫ আগস্টের ঘটনা বস্তুনিষ্ঠ এবং নিরপেক্ষভাবে উপস্থাপিত না-হয়, তাহলে আগামীর বাংলাদেশ ইতিহাসের সত্য থেকে বঞ্চিত হবে। কেননা বঙ্গবন্ধুর আদর্শ ও রাজনৈতিক দর্শনকে যথাযথভাবে এবং অন্তরাত্মা দিয়ে উপলব্ধি করাটা জরুরি। 

এদেশের মানুষের প্রতি ভালোবাসা নিয়ে বঙ্গবন্ধুর একটা বিখ্যাত উক্তি বহুলভাবে ব্যবহৃত। বঙ্গবন্ধু বলেছিলেন, “মানুষকে ভালোবাসলে মানুষও ভালোবাসে। যদি সামান্য ত্যাগ স্বীকার করেন, তবে জনসাধারণ আপনার জন্য জীবন দিতে পারে।” বঙ্গবন্ধু নিজের জীবনে, রাজনৈতিক কর্মকান্ডে, নানা সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়া এবং রাষ্ট্র পরিচালনায় মানুষের প্রতি তার গভীর ভালোবাসার প্রমাণ বারবার দিয়েছিলেন। বঙ্গবন্ধুর জীবন-ইতিহাস মানুষের জন্য তীব্র ভালোবাসা এবং নিরন্তর ত্যাগের মহিমায় ভরপুর। জেল-জুলুম বঙ্গবন্ধুর রাজনৈতিক জীবনের অনুষঙ্গ এবং অবিচ্ছেদ্য অংশ ছিল। বঙ্গবন্ধুর ৫৫ বছরের সংক্ষিপ্ত জীবনে প্রায় ৪,৬৮২ দিন বা প্রায় ১৩ বছর জেলে কাটিয়েছেন। দেশের জন্য, দেশের মানুষের জন্য, দেশের মানুষের সামাজিক, অর্থনৈতিক, সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক মুক্তির জন্য একজন জননেতার এই যে নিরলস পরিশ্রম এবং আত্মত্যাগ, এটাই এদেশের মানুষকে বঙ্গবন্ধুর জন্য এবং বঙ্গবন্ধুর ‘‘স্বাধীনতার সংগ্রাম এবং মুক্তির সংগ্রমের জন্য’’ জীবন উৎসর্গ করতে প্রাণিত করেছিল। তিরিশ লাখ শহীদ জীবন দিয়ে এবং রক্ত দিয়ে এদেশের স্বাধীনতার সূর্যকে পাকিস্তানের নাগপাশ থেকে ছিনিয়ে এনেছিল।

এটাকে বৃহত্তর চিন্তার ফ্রেইমওয়ার্কে দেখলে দেখা যাবে, এদেশের মানুষের প্রতি বঙ্গবন্ধুর যে অকৃত্রিম ভালোবাসা এবং এদেশের মানুষের মুক্তির জন্য বঙ্গবন্ধুর যে আত্মত্যাগ, তার জন্য এদেশের মানুষের পক্ষ থেকে ১৯৭১ সালে নিজের জীবন দিয়ে একটি স্বাধীন মানচিত্র, একটি স্বাধীন দেশ এবং একটি স্বাধীন রাষ্ট্রের পতাকা অর্জন করা বঙ্গবন্ধুর সেই আত্মত্যাগেরই প্রতিদান। তাই তো বঙ্গবন্ধু বলেছিলেন, “সাত কোটি বাঙালির ভালোবাসার কাঙাল আমি। আমি সব হারাতে পারি কিন্তু বাংলাদেশের মানুষের ভালোবাসা হারাতে পারবো না।” এই যে মানুষের ভালোবাসার জন্য কাঙালপনা এটাই বঙ্গবন্ধুর অসীম শক্তির উৎস, এটাই বঙ্গবন্ধুর দেশপ্রেমের স্মারক, এটাই বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বের ঔজ্জ্বল্য, এবং এটাই বঙ্গবন্ধুর ‘বঙ্গবন্ধু’ হয়ে উঠবার অনুষঙ্গ। কিন্তু মানুষের প্রতি নির্ভেজাল বিশ্বাস এবং নিঃশর্ত ভালোবাসাই বঙ্গবন্ধুর জন্য কাল হয়েছিল ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্টে এসে।

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বলেছিলেন, “মানুষের উপর বিশ্বাস হারাতে নেই। মানুষের উপর বিশ্বাস হারানো পাপ”। বঙ্গবন্ধু তার বক্তৃতায় মাঝে মাঝেই রবীন্দ্রনাথকে উদ্ধৃত করতেন। বঙ্গবন্ধুও মানুষকে ভালোবাসার পাশাপাশি বিশ্বাস করতেন। মানুষের প্রতি এ তীব্র ভালোবাসাই বঙ্গবন্ধুর জীবনের এক প্রচন্ড ঝড়ের মতো সবকিছু উলট-পালট করে দিয়েছে ১৯৭৫ সালের আগস্টে এসে। বঙ্গবন্ধু নিজেই বলেছেন, “আমার সবচেয়ে বড় শক্তি আমি আমার দেশের মানুষকে ভালোবাসি, সবচেয়ে বড় দুর্বলতা আমি তাদের খুব বেশি ভালোবাসি।’

বাংলার মানুষের প্রতি বঙ্গবন্ধুর এ দুর্বার ভালোবাসার কথা আজকের প্রজন্মকে জানতে হবে। আজকের প্রজন্মকে জানতে হবে আমাদের একজন বঙ্গবন্ধু আছেন। বঙ্গবন্ধু শারীরিকভাবে না-থাকলেও বঙ্গবন্ধু আমাদের মধ্যে প্রবলভাবে আছেন তার রাজনৈতিক আদর্শ এবং দর্শনে। নতুন প্রজন্মকে আরও জানাতে হবে যে, তার রাজনৈতিক দর্শন, তার রাজনৈতিক আদর্শ, তার জীবন দর্শন, তার জীবনাচার, তার রাজনীতির মূল প্রেরণা এবং শক্তি ছিল দেশের মানুষের ভালোবাসা এবং মানুষের প্রতি বঙ্গবন্ধুর তীব্র ভালোবাসা। দেশের মানুষের প্রতি গভীর এবং প্রবল ভালোবাসা যে একজন মানুষকে সাত কোটি মানুষের জননেতাতে পরিণত করতে পারে বঙ্গবন্ধু তার উজ্জ্বল উদাহারণ।

একটি স্বাধীন দেশের নেতা হয়েও বঙ্গবন্ধু ছিলেন বিশ্বনেতা। মানুষের মুক্তির সংগ্রামের ইতিহাসে পৃথিবীর মানচিত্রে অন্যান্য অনেক নেতার কাতারে উজ্জ্বল তারকার আসনে আসীন আমাদের বঙ্গবন্ধু। আমাদের ভালোবাসার, আমাদের গর্বের, আমাদের প্রাণের এবং আমাদের প্রেরণার বঙ্গবন্ধু। নতুন প্রজন্মকে এভাবেই বঙ্গবন্ধুকে জানতে হবে। জানতে হবে এদেশের মানুষের মুক্তি সংগ্রামের ইতিহাস এবং সে ইতিহাস নির্মাণের প্রধান চরিত্রকে।

পাশাপাশি চিনতে হবে একাত্তরের যুদ্ধাপরাধী ও মানবতাবিরোধী অপরাধী এবং তাদের উত্তরাধিকারীদের কর্মকান্ড সম্পর্কেও। যাতে নতুন প্রজন্ম মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে সমুন্নত রাখতে পারে এবং লাল-সবুজের পতাকার সত্যিকার সুরক্ষা দিতে পারে। জানতে হবে জাতীয় শোক দিবসের মর্মার্থকে যাতে ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট বঙ্গবন্ধুকে সপরিবারে হত্যার মধ্যদিয়ে কীভাবে এদেশের রাজনীতি ও ইতিহাসের গতিধারা পরিবর্তনের অশুভ পরিকল্পনা করা হয়েছিল। কেননা মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় এবং বঙ্গবন্ধুর আদর্শ ও রাজনৈতিক দর্শনের কাঠামোয় রাষ্ট্র পরিচালনা করতে হলে জাতির শত্রু ও মিত্র পরিষ্কারভাবে চেনাটা জরুরি। এবং নতুন প্রজন্মের জন্য এটা জরুরি কারণ আজকের প্রজন্মই আগামী দিনের রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব নেবে। তখনো যেন, বঙ্গবন্ধুর আদর্শ এবং বঙ্গবন্ধুর রাজনৈতিক দর্শন রাষ্ট্র পরিচালনার মূলনীতি হিসেবে সক্রিয়ভাবে কাজ করে। বঙ্গবন্ধুর আদর্শ, রাজনৈতিক দর্শন এবং মুক্তিযুদ্ধের চেতনা হবে বাংলাদেশের রাষ্ট্র পরিচালনার মূলনীতি। জাতীয় শোক দিবসের মূল লক্ষ্য হোক নতুন প্রজন্মের মনে, মননে এবং চেতনায় এ দর্শন সঞ্চারিত করা।

লেখক : নৃবিজ্ঞানী ও অধ্যাপক, নৃবিজ্ঞান বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়