শোক ও শক্তির আগস্ট|309775|Desh Rupantor
logo
আপডেট : ১৫ আগস্ট, ২০২১ ০০:০০
শোক ও শক্তির আগস্ট
সেলিনা হোসেন

শোক ও শক্তির আগস্ট

বাঙালির জীবনে শোক ও শক্তির নির্যাস আগস্ট মাস। বঙ্গবন্ধুর শারীরিক মৃত্যু শোকের দহন। বঙ্গবন্ধুর দর্শন ও আদর্শের অমরত্ব শক্তির ঝরনাধারা। শোকের দহন তাকে হারানোর কষ্ট। শক্তির ঝরনাধারা তিনি। আগামীর প্রজন্মের অবিনাশী চেতনায় বাংলা ও বাঙালির সত্তায় এগিয়ে চলার শক্তি।

বিশ্বজুড়ে বাংলার যে পরিচিতি সেই অর্থে এই ভূখণ্ডকে শুধু ভৌগোলিক আকারে খর্বীকৃত বলার সুযোগ নেই। ইতিহাসের প্রেক্ষাপটে দীর্ঘ সময় ধরে বাঙালি জাতি বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বের অপেক্ষায় সময়ের পরিসর অতিক্রম করেছে। তিনিই উপমহাদেশের একমাত্র নেতা যিনি সশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে উপমহাদেশের মানচিত্রে একটি স্বাধীন রাষ্ট্রের সংযোজন ঘটিয়েছেন। সাড়ে সাত কোটি বাঙালি এই অর্জনে নিজেদের নিবেদন করেছেন বীরদর্পে! মানুষের ভালোবাসার অবিস্মরণীয় চেতনাবোধে সিক্ত হয়েছে তার নেতৃত্বের দৃঢ়তা। তার মৃত্যুদিবস মৃত্যুর ঊর্ধ্বে জীবনসত্যের বড় পরিচয়।

বিশ্বের অনেক নেতা যেভাবে ইতিহাসের পৃষ্ঠায় আছেন অজেয় প্রেরণায় তেমনি বঙ্গবন্ধু আছেন। কিউবার বিপ্লবী নেতা ফিদেল ক্যাস্ট্রো, বাংলাদেশের স্বাধীনতার পরে ১৯৭৩ সালে আলজিয়ার্সে অনুষ্ঠিত জোটনিরপেক্ষ সম্মেলনে বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে পরিচিত হন। তিনি পরিচয়ের মুগ্ধতা নিয়ে বলেন, ‘আমার হিমালয় দেখা হয়নি, কিন্তু আমি শেখ মুজিবকে দেখেছি। ব্যক্তিত্বে এই মানুষটিই হিমালয়সম। এতেই আমার হিমালয় দেখা হলো।’ এভাবে বাংলাদেশ নামের ছোট ভূখণ্ড বিশ্বের সামনে বিশাল হয়ে উঠেছিল। শুধু ভৌগোলিক আকারের খর্বতা কাটিয়ে উচ্চতার শীর্যে ওঠার যে দিকনির্দেশনা বঙ্গবন্ধু সেই অসাধ্য কাজটি পূর্ণ করেছিলেন। বিশ্বের অন্য অনেক নেতার মতো তিনি দেশের পরিচিতি বিস্তৃত করেছিলেন। নেলসন ম্যান্ডেলার নামের সঙ্গে যুক্ত হয় দক্ষিণ আফ্রিকা, হো চি মিনের নামের সঙ্গে ভিয়েতনাম, সুকর্নের নামের সঙ্গে ইন্দোনেশিয়া, মিসরের সঙ্গে কর্নেল নাসের, প্যালেস্টাইনের সঙ্গে ইয়াসির আরাফাত এমন আরও অনেকে। তেমনি বাংলাদেশের সঙ্গে শেখ মুজিবুর রহমান। তার নাম উচ্চারণ না করে বাঙালির আত্মপরিচয় কখনো পূর্ণ হবে না। তিনি বাঙালির ত্রাণকর্তা। হাজার বছর ধরে বাঙালি এই ত্রাণকর্তার অপেক্ষায় ছিল। বাঙালির সভ্যতা-সংস্কৃতির আবহমান স্রোতে তিনি নতুন অভ্যুদয় ঘটিয়েছেন। বাঙালি জাতীয়তাবাদের বিকাশ একটি স্বাধীন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে পূর্ণ রূপ লাভ করেছে। তিনি আবহমানকালের নিপীড়িত বাঙালির কণ্ঠস্বর বদলে দিয়ে কঠিন ভাষায় উচ্চারণ করেছেন : ‘আমি বাঙালি, বাংলা আমার ভাষা। বাংলার কৃষ্টি, বাংলার সভ্যতা, বাংলার ইতিহাস, বাংলার আকাশ, বাংলার আবহাওয়া, বাংলার মাটি, তাই নিয়ে বাংলার জাতীয়তাবাদ।’

নিজের জাতিসত্তার অধিকারের প্রশ্নে তিনি অনড় ছিলেন। কোথাও সামান্যতম আপস করেননি। ১৯৭০ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি শহীদ স্মরণে বঙ্গবন্ধু তার ভাষণে বলেছিলেন, ‘আজকের এই দিনে স্মরণ করি সেইসব শহীদকে যারা নিজের জন্মভূমিকে ভালোবাসার অপরাধে অত্যাচারী শাসকের মারণযজ্ঞে অকালে আত্মাহুতি দিয়েছেন।... যতদিন বাংলার আকাশ থাকবে, যতদিন বাংলার বাতাস থাকবে, যতদিন এ দেশে মাটি থাকবে, যতদিন বাঙালির সত্তা থাকবে, ততদিন শহীদদের আমরা ভুলতে পারব না। আমরা কোনোক্রমেই শহীদদের রক্ত বৃথা যেতে দেব না। এই বিজয় সাত কোটি বাঙালির বিজয়, দরিদ্র জনসাধারণের বিজয়।’

শহীদদের আত্মত্যাগকে তিনি বাংলার অস্তিত্বের সঙ্গে এক করে দেখেছেন। যতদিন বাংলাদেশ থাকবে ততদিন শহীদের জীবন-উৎসর্গ চিরজাগরূক থাকবে।

এমন প্রাজ্ঞ দার্শনিক ভাবনা বাংলার মাটি ও মানুষের সঙ্গে তার মাতৃভাষার মর্যাদায়। বাঙালির বিত্তবৈভবকে তিনি লালন করেছেন নিজের আত্মপরিচয়ের সবটুকু জায়গাজুড়ে। বাঙালির এই পথপরিক্রমাকে প্রখ্যাত সাহিত্যিক হাসান আজিজুল হক মূল্যায়ন করেছেন সৃজনশীল মাত্রায় ‘‘পরাধীন বাংলায় তিনি রাজনৈতিক আন্দোলনের কর্মী থেকে ক্রমান্বয়ে হয়ে ওঠেন সকলের প্রিয় মুজিব ভাই, জনগণের পক্ষ থেকে বঙ্গবন্ধু ঘোষিত হয়ে তিনি স্বাধীনতা আন্দোলনে নেতৃত্ব দিলেন। রক্তের বিনিময়ে বাঙালি জাতি অর্জন করল তার শ্রেষ্ঠ অর্জন স্বাধীনতা। বঙ্গবন্ধু প্রতিষ্ঠা করলেন ভাষাভিত্তিক রাষ্ট্রব্যবস্থা, যার মধ্য দিয়ে বাংলা ভাষার চিরকালীন বিকাশের অর্গল খুলে গেল, বাঙালি জাতিসত্তা একটি রাষ্ট্রভাবনায় পরিণত হলো। খুব কাছ থেকে তাকে যারা দেখেছেন তারা বলতে পারবেন, এই মানুষটির বিরাটত্ব কোথায় লুকিয়ে ছিল। সাধারণ মানুষের হৃদয় স্পর্শ করে তাদের সঙ্গে মিশে যেতে পারতেন তাদের দুঃখ-সুখের সাথী হয়ে। বিচক্ষণতার সঙ্গে লক্ষ করলে বোঝা যায় যে, বাঙালিত্ব বিষয়টি মূর্তিমান হয়ে রয়েছে তার ব্যবহারে, খাদ্যাভ্যাসে, পোশাকে। সবচেয়ে বেশি করে তার মননে, চিন্তনে, আবেগ-অনুভূতির অনুরণনে। সেজন্যই ছাত্রসমাজ তাকে গ্রহণ করল ‘বঙ্গবন্ধু’ নামে, এই নামেই শেষ পর্যন্ত পরিণত হলো সমগ্র জাতির সঙ্গে তার পরিচয়ের সেতুবন্ধ।’’

১৯৭২ সালের ১০ জানুয়ারি পাকিস্তান কারাগার থেকে দেশে ফিরে রমনা রেসকোর্স ময়দানে দেওয়া ভাষণে বলেছিলেন : ‘‘কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ বলেছিলেন, ‘সাত কোটি সন্তানেরে, হে মুগ্ধ জননী, রেখেছ বাঙালি করে মানুষ করোনি।’ কিন্তু আজ আর কবিগুরুর সে কথা খাটে না। বাংলাদেশের মানুষ বিশ্বের কাছে প্রমাণ করেছে বাঙালি বীরের জাতি। তারা নিজেদের অধিকার অর্জন করে মানুষের মতো বাঁচতে জানে।”

বঙ্গবন্ধুর জীবনদর্শন থেকে এ কথা উচ্চারিত হয়েছে, ‘এই রাষ্ট্রে হিন্দু-মুসলমান ভেদাভেদ থাকবে না। এই রাষ্ট্র মানুষের হবে। তাদের মূলমন্ত্র হবেসবার উপরে মানুষ সত্য তাহার উপরে নাই।’ তিনি আরও বলেছেন, ‘বাংলার মাটিতে সাম্প্রদায়িকতার কোনো স্থান নেই। মুসলমান, হিন্দু, বৌদ্ধ ও খ্রিস্টান বাংলাদেশে যারা বসবাস করেন, তারা সকলেই এ দেশের নাগরিক। সকল ক্ষেত্রে তারা সমঅধিকার ভোগ করবেন।’

এভাবে বাঙালির মর্যাদার স্থান প্রতিষ্ঠিত করেছেন তিনি। বাঙালির আত্মপরিচয়ের সীমানা নির্ধারণ করে দিয়ে ইতিহাসের গৌড়, বঙ্গকে বাংলাদেশ করে, বিশ্বের সামনে বাঙালির পরিচয়কে সার্বভৌমের চেতনায় প্রতিষ্ঠিত করলেন সার্বভৌম শেখ মুজিবুর রহমান।

১৯৭৪ সালের ২৩ সেপ্টেম্বর তিনি জাতিসংঘে বাংলা ভাষায় বক্তৃতা করেছিলেন। নিজের মাতৃভাষায় বক্তৃতা দিয়ে তিনি বাঙালি জাতিসত্তার দিগন্ত প্রসারিত করেছিলেন। অন্যদিকে বিশ্বের শান্তি ও ন্যায় প্রতিষ্ঠার কথা বলেছিলেন:

‘জনাব সভাপতি, আজ এই মহামহিমান্বিত সমাবেশে দাঁড়াইয়া আপনাদের সাথে আমি এইজন্য পরিপূর্ণ সন্তুষ্টির ভাগীদার যে, বাংলাদেশের সাড়ে ৭ কোটি মানুষ আজ এই পরিষদের প্রতিনিধিত্ব করিতেছেন। আত্মনিয়ন্ত্রণাধিকার প্রতিষ্ঠার সংগ্রামের পূর্ণতা চিহ্নিত করিয়া বাঙালি জাতির জন্য ইহা একটি ঐতিহাসিক মুহূর্ত। স্বাধীনভাবে বাঁচার অধিকার অর্জনের জন্য এবং একটি স্বাধীন দেশে মুক্ত নাগরিকের মর্যাদা নিয়ে বাঁচার জন্য বাঙালি জনগণ শতাব্দীর পর শতাব্দীব্যাপী সংগ্রাম করিয়াছেন, তাহারা বিশ্বের সকল জাতির সাথে শান্তি ও সৌহার্দ্য নিয়া বাস করিবার জন্য আকাক্সক্ষী ছিলেন। যে মহান আদর্শ জাতিসংঘ সনদে রক্ষিত আছে, আমাদের লক্ষ লক্ষ মানুষ সেই আদর্শের জন্য সর্বোচ্চ ত্যাগ স্বীকার করিয়াছেন। আমি জানি, শান্তি ও ন্যায় প্রতিষ্ঠার উদ্দেশ্যে সকল মানুষের আশা-আকাক্সক্ষা বাস্তবায়নের উপযোগী একটি বিশ্ব গড়িয়া তোলার জন্য বাঙালি জাতি পূর্ণ প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।’

তার মৃত্যুদিবস শারীরিক মৃত্যুর সত্য। ইতিহাসে তিনি মৃত্যুহীন অমর মানুষ। তার জন্ম না হলে বাঙালির হাজার বছরের অপেক্ষার জায়গাটি প্রশমিত হতো না। বাঙালি বিশ্বজুড়ে বাঙালি হয়ে উঠতে পারত না। বঙ্গবন্ধুর মৃত্যুহীন জন্মদিন বাঙালির হাজার বছরের ইতিহাসের সুনির্দিষ্ট বাঁকবদলের ইতিহাস। স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশের জন্য। বাংলাদেশ আজ ইতিহাসের খর্বীকৃত ভূখণ্ড নয়। বিশ্বের মানচিত্রে অবিনাশী নাম উচ্চতায় বিশ্ববাসীর সামনে মাথা তুলেছে।

বিশ্বের সব মানুষের আশা-আকাক্সক্ষা বাস্তবায়নের সঙ্গে তিনি বাঙালি জাতিকে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ করেছেন। এই প্রতিশ্রুতি থেকে মিয়ানমারের রোহিঙ্গা নির্যাতন-নিপীড়ন-গণহত্যাসহ মানবাধিকার লংঘনের প্রতিবাদে বাঙালির এগিয়ে চলার পথপ্রদর্শক হিসেবে অভিভাবকের দায়িত্ব নিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। মানবতার বার্তাটি ভিন্ন জাতিসত্তার মানুষের সামনে থেকে মুছে দেননি। এখানেই বঙ্গবন্ধুর জাতিসংঘের ভাষণের পূর্ণতর রূপ উঠে এসেছে। বিশ্ব তাকিয়ে আছে বঙ্গবন্ধুর বাংলাদেশের দিকে। তাকে বাংলাদেশের সাহিত্যে অনবরত স্মরণ করেছেন দেশের লেখকরা।

শিশুসাহিত্যিক রোকনুজ্জামান খানের একটি কবিতার নাম ‘মুজিব’:

‘‘সবুজ শ্যামল বনভূমি মাঠ নদীতীর বালুচর

সবখানে আছে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবের ঘর।

সোনার দেশের মাঠে মাঠে ফলে সোনাধান রাশি রাশি

ফসলের হাসি দেখে মনে হয় শেখ মুজিবের হাসি।

শিশুর মধুর হাসিতে যখন ভরে বাঙালির ঘর

মনে হয় যেন শিশু হয়ে হাসে চিরশিশু মুজিবুর।

আমরা বাঙালি যতদিন বেঁচে রইব এ বাংলায়

স্বাধীন বাংলা ডাকবে : মুজিব আয় ঘরে ফিরে আয়।’’

তিনি বাঙালির জীবনে হিরণ¥য় জ্যোতি। ইতিহাসের পাতায় তার অবস্থান বঙ্গ থেকে স্বাধীন বাংলাদেশের বাস্তবতা। শংকর বাঙালি তার নেতৃত্বে আজ জাতিসত্তার মর্যাদায় আসীন।

আগস্ট মাস যেমন বঙ্গবন্ধুর মহাপ্রয়াণের মাস তেমনি বঙ্গমাতার জন্ম ও মৃত্যুরও মাস। তাকেও স্মরণে রাখতে হবে গভীর জ্ঞানে ও প্রজ্ঞায়। তিনি ছিলেন বঙ্গবন্ধুর রাজনীতির সহযোদ্ধা। নিজের সচেতন বোধে ধারণ করেছিলেন বাংলার মেহনতি ও গণমানুষকে। ইতিহাসে তিনিও অমর মানুষ। বাঙালির অগ্রগতিতে নিজের কোনো পিছুটান রাখেননি। বঙ্গবন্ধুর অগ্রযাত্রাকে এগিয়েছেন পরম গৌরবে। বাঙালির ইতিহাসে তিনি এক অনন্য নারী।

লেখক : কথাসাহিত্যিক