বই পড়া নিয়ে সরদার ফজলুল করিম|312992|Desh Rupantor
logo
আপডেট : ১ সেপ্টেম্বর, ২০২১ ২১:৫১
বই পড়া নিয়ে সরদার ফজলুল করিম
সৌভিক রেজা

বই পড়া নিয়ে সরদার ফজলুল করিম

বই না-পড়া নিয়ে সবচেয়ে বেশি বকা খেয়েছি বোধহয় সরদার ফজলুল করিম স্যারের কাছে। রাজশাহী থেকে ঢাকায় গেলে স্যারের বাসায় যেতাম। স্যার এ-কথা ও-কথার পরেই কোনো একটা বইয়ের নাম বলে জেরা শুরু করতেন, সেটা পড়েছি কিনা! যদি বলতাম পড়েছি, তাতেও রেহাই মিলতো না। পড়ে কী বুঝলাম সেইটা তিনি শুনতে চাইতেন। 

স্যারের কাছে খুব নাকাল হতাম মাঝে-মধ্যে। একবার 'উত্তাল চল্লিশ: অসমাপ্ত বিপ্লব' বইটার কথা জিজ্ঞেস করলেন। 

বললাম: নাম শুনিনি।

স্যার রেগে গেলে বুঝতে দিতেন না, কিন্তু 'তুমি' থেকে 'আপনি'-তে চলে যেতেন। কয়েক মাস পরে আবার যখন দেখা করতে গেলাম, তিনি সেই 'অসমাপ্ত বিপ্লব'র কথা দেখি তখনও ভোলেননি। 

: তা ভার্সিটিতে বৈসা-বৈসা আপনে কী করেন? ছাত্র গো কী পড়ান? নিজেই তো কিছু পড়েন না। ভেরেন্ডা ভাজা ধরছেন মনে হয়!

: বইটা অনেক খুঁজেছি, কোত্থাও পেলাম না স্যার!

: বই পাওয়া যায় না কথাটার মানে কী? একটা বই রাতারাতি মাটির নিচে ঢুইকা গেলো?

: তা না স্যার, শাহবাগ, নীলক্ষেত, নিউমার্কেট... কোনোখানে নেই।

: ও আইচ্ছা। তাইলে আর কী। ভেরেন্ডাই ভাজেন।

বইটা হাতে পেয়ে যখন তাকে জানালাম, তখন আবার 'তুমি'-তে নামলেন।

আরেকবার স্যারের কথামতো টি. জেড. লেভিনের 'ফ্রম সক্রেটিস টু সার্ত্রে' বইটা কোথাও খুঁজে পাচ্ছি না, আর এদিকে স্যার সমানে আমাকে খুঁচিয়ে যাচ্ছেন। শেষে বানিয়ে বলেই ফেললাম, 'ওসব বাজে বই পড়ে সময় নষ্ট করতে চাই না।'
এই ধরনের কথাবার্তার জন্যে আমাকে অনেক সময়ই  অনেক কড়া কথা তো শুনতে হতোই, কখনও তিনি তার হাতের লাঠি দিয়ে মারতে বাকি রাখতেন। রাজিয়া খালাম্মা এসে তখন আমাকে রেহাই দিতেন। তারপর যখন বাসায় গিয়ে জানাতাম, তার বলা বইটা পেয়েছি, আর ভালোও লেগেছে, স্যারের মুখে কী মধুর হাসি! বয়স্ক লোকের হাসির মধ্যে একটা অপার্থিব সৌন্দর্য থাকে। সরদার স্যারের হাসিতে সেটা ছিল।

২০০২ সালের ডিসেম্বরের একদিন স্যারের ইন্দিরা রোডের বাসা থেকে দুজনে রিকশায় শাহবাগ এলাম। মোতাহার ভাইয়ের 'প্যাপিরাসে' বসে স্যার আলাপ তুললেন—

: আমি যে গ্রিক ভাষা জানি না, এইটা তোমার জানা আছে?

: জি, স্যার।

: তাইলে প্লেটো অনুবাদ করলাম কেমনে?

: ইংরেজি অনুবাদ থেকে। আপনি তো বেনজামিন জোয়েটের প্রশংসা করেছেন। 

: তুমি জানলা কোত্থিকা?

: আপনার অনুবাদের 'ভূমিকা'য় তো বলেছেন।

: তা, মাস্টার সাব, কুনুদিন আপনাদের ইচ্ছা হয় নাই যে বেনজামিন জোয়েট একটু পড়ি?

: পড়েছি তো স্যার!

: কী মনে হইছে একটু বলেন তো?

: উনি সারা জীবনে সক্রেটিস-প্লেটো ছাড়া আর কিছু ভাবতেন বইলা তো মনে হয় না।

: কথাবার্তা কী বুইঝা বলেন, নাকি না-বুইঝা বলেন?

: যে লোক বলেন, 'Plato is faithful friend to me—too faitful, for indeed I can't get rid of him.' তাকে তো বুঝতে অসুবিধা হয় না।

: তুমি এই রত্ন পাইলা কই?

: পল্টনের ফুটপাতে। 

: চলো, আইজকা তোমারে কিছু খাওয়াই। কও, কী খাইবা!

সম্প্রতি হাতে পেলাম Moissaye J. Olgin-এর লেখা 'Maxim Gorky : Writer and Revolutionist' বইটি। বেশি নয়, মাত্র ৬৪ পৃষ্ঠার। 

ওলগিনের যে গুণটি প্রথমেই চোখে পড়ল, সেটা হচ্ছে অল্প কথায় রাশিয়ার আর্থ-সামাজিক-সাংস্কৃতিক প্রেক্ষাপট তুলে ধরা। আমাদের সমালোচনা সাহিত্যে এরকম আজকাল তেমন একটা দেখা যায় না। এখন আমরা কথা বেশি ফেনাতে থাকি আর তাতে সারকথা কম থাকে। এ বইটা থেকে সমালোচনা-সাহিত্যের একটা ভালো নমুনা শেখা হলো। এমন বই শুধু আরও বই পড়তেই উৎসাহ দেয় না, সেইসঙ্গে কিছু লিখতেও যেন উৎসাহ দেয়।

আমাদের বন্ধু ওমর তারেক চৌধুরীর সৌজন্যে বইটা হাতে পেয়েছি। বেশিরভাগ পরিচিত অধ্যাপক যখন বসে-বসে কর্তাভজা দলে যোগ দিয়ে কীর্তন গাইছেন, তখন নানারকম বইয়ের রত্নগুলো একে-ওকে-তাকে দিয়ে যাচ্ছেন তিনি। 
সরদার স্যার বেঁচে থাকলে নিশ্চিত বলতেন, 'চলেন তারেক, আপনাকে আইজকা কিছু খাওয়াই। কী খাইবেন, বলেন!'

সৌভিক রেজা: অধ্যাপক, বাংলা বিভাগ, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়।