প্রধানমন্ত্রীর সম্মতির অপেক্ষায় ৩ বিকল্প|313857|Desh Rupantor
logo
আপডেট : ৬ সেপ্টেম্বর, ২০২১ ০০:০০
প্রধানমন্ত্রীর সম্মতির অপেক্ষায় ৩ বিকল্প
আশরাফুল হক

প্রধানমন্ত্রীর সম্মতির অপেক্ষায় ৩ বিকল্প

নির্বাচন কমিশন (ইসি) পুনর্গঠনের তিনটি বিকল্প প্রস্তাব দিয়ে নির্দেশনার অপেক্ষা করছে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ (কেবিনেট ডিভিশন)। এসব প্রস্তাব নিয়ে সরকারের শীর্ষপর্যায়ে আলাপ-আলোচনা করে সিদ্ধান্ত নেওয়ার পর তা বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেওয়ার জন্য মন্ত্রিপরিষদ বিভাগে ফেরত পাঠানো হবে। সরকারের একটি নির্ভরযোগ্য সূত্রে এসব তথ্য জানা গেছে।

কমিশন পুনর্গঠনের এখতিয়ার রাষ্ট্রপতির। সংবিধানে রাষ্ট্রপতিকে সে এখতিয়ার দেওয়া হয়েছে। কিন্তু রাষ্ট্রপতি কোন ফর্মুলা অনুসরণ করে কমিশন পুনর্গঠন করবেন সংবিধানে তার কোনো দিকনির্দেশনা নেই। এ সংক্রান্ত কোনো আইন বা বিধিও নেই। তিনি তিনটি পদ্ধতি অনুসরণ করে কমিশন পুনর্গঠন করতে পারেন। রাষ্ট্রপতি প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) ও অন্যান্য নির্বাচন কমিশনার নিয়োগের জন্য উপযুক্ত ব্যক্তিদের নিয়ে সার্চ কমিটি গঠন করতে পারেন। সেই কমিটি প্রতিটি পদে একাধিক বিকল্প রেখে প্রস্তাব তৈরি করতে পারে। সার্চ কমিটির প্রস্তাবিত নাম থেকে রাষ্ট্রপতি চূড়ান্ত কমিটি গঠন করতে পারেন। রাষ্ট্রপতি বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতাদের সঙ্গে আলোচনা করে তাদের সুপারিশকৃত পদ্ধতি অনুযায়ী নির্বাচন কমিশন পুনর্গঠন করতে পারেন। কমিশন পুনর্গঠনের তৃতীয় উপায় হচ্ছে প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) এবং নির্বাচন কমিশনার (ইসি) কারা হবেন তা রাষ্ট্রপতি নিজেই মনোনীত করবেন।

গত সপ্তাহে এ তিনটি বিকল্প প্রস্তাব পাঠিয়ে সরকারের সিদ্ধান্তের অপেক্ষা করছে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ। কিন্তু গতকাল রবিবার পর্যন্ত কোনো নির্দেশনা পৌঁছায়নি। নির্বাচন কমিশন পুনর্গঠনে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ সাচিবিক দায়িত্ব পালন করে। প্রধানমন্ত্রী মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের মন্ত্রী হওয়ায় এ সংক্রান্ত প্রস্তাব প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় হয়েই রাষ্ট্রপতির কাছে যাবে। আনুষ্ঠানিকভাবে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ রাষ্ট্রপতিকে নির্বাচন কমিশন পুনর্গঠনের বিষয়টি অগ্রিম অবহিত করেছে। যেন তিনি পুনর্গঠনের একাধিক বিকল্প থেকে একটি বাছাই করতে পারেন।

নীতিনির্ধারকদের মতে, সরকারের ভাবনায় নির্বাচন কমিশন পুনর্গঠনের আইন প্রণয়নের কোনো চিন্তাভাবনা নেই। তাছাড়া এই অল্প সময়ের মধ্যে একটি গ্রহণযোগ্য আইন প্রণয়নও কঠিন কাজ। কমিশন পুনর্গঠনের জন্য আইন প্রণয়ন করা হলে তা নিয়ে দেশে রাজনৈতিক বিতর্ক সৃষ্টি হতে পারে। এ কারণে সরকার কমিশন গঠনের জন্য আইন প্রণয়নের ঝুঁকি নিতে চায় না।

রাষ্ট্রপতি নির্বাচন কমিশন কোন কোন প্রক্রিয়ায় পুনর্গঠন করতে পারেনতা নিয়ে গত মাস জুড়েই কাজ করেছে মন্ত্রিপরিষদ  বিভাগ। আগামী ১৫ ফেব্রুয়ারি মেয়াদ শেষ হওয়ার আগেই কমিশন পুনর্গঠনের কাজ শেষ করা হবে। বর্তমান কমিশনের মেয়াদ শেষে যে নতুন কমিশন গঠিত হবে তার অধীনেই আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা। সবসময়ই নির্বাচন কমিশন পুনর্গঠন নিয়ে রাজনৈতিক অঙ্গন সরগরম হয়ে ওঠে। স্বাধীনতার পর থেকে এ পর্যন্ত ১২টি নির্বাচন কমিশন গঠিত হয়েছে বাংলাদেশে। ২০১৭ সালের ফেব্রুয়ারি থেকে দায়িত্ব পালন করছে বর্তমান কমিশন।

সংবিধানের ১১৮ অনুচ্ছেদের বিধান অনুযায়ী রাষ্ট্রপতি প্রধান নির্বাচন কমিশনার ও অন্য নির্বাচন কমিশনারদের নিয়োগ দেন। সংবিধানের আলোকে রাষ্ট্রপতি যাকে উপযুক্ত বিবেচনা করেন, সেই প্রক্রিয়ায় তিনি প্রধান নির্বাচন কমিশনার ও অন্য নির্বাচন কমিশনার নিয়োগ সম্পন্ন করেন। প্রয়াত রাষ্ট্রপতি মো. জিল্লুর রহমান সাংবিধানিক পদের অধিকারীদের সমন্বয়ে গঠিত সার্চ কমিটির মাধ্যমে প্রধান নির্বাচন কমিশনারসহ কমিশনার নিয়োগ প্রথা চালু করেন।

২০১৭ সালে রাষ্ট্রপতি ৩২টি রাজনৈতিক দলের নেতাদের সঙ্গে বৈঠক করেছিলেন। রাষ্ট্রপতি অন্যতম বিরোধী দল বিএনপিকে দিয়ে বৈঠক শুরু করেন। সবশেষ বৈঠক করেন আওয়ামী লীগের সঙ্গে। আওয়ামী লীগ এবং বিএনপিসহ ২৫টি রাজনৈতিক দল নিজ নিজ দলের পক্ষে নাম জমা দিয়েছিল। রাজনৈতিক দলগুলো সর্বোচ্চ পাঁচজন করে নাম প্রস্তাব করে। নির্বাচন কমিশন পুনর্গঠনের জন্য রাজনৈতিক দলের প্রস্তাবিত ১২৫ জনের মধ্যে ২০ জনের নামের একটি প্রাথমিক তালিকা তৈরি করে সার্চ বা অনুসন্ধান কমিটি। এই ২০ জনকে বাছাই করতে সততা, যোগ্যতা এবং নিরপেক্ষতার বিষয়কে বিবেচনায় নেয় সার্চ কমিটি। পরে একজন প্রধান নির্বাচন কমিশনার এবং চারজন কমিশনারের জন্য ১০ জনের নাম প্রস্তাব করে অনুসন্ধান কমিটি।

এর আগে নির্বাচন কমিশন সদস্যদের বাছাই করতে রাষ্ট্রপতি সার্চ বা অনুসন্ধান কমিটি গঠন করেন। সার্চ বা অনুসন্ধান কমিটির সদস্যরা ছিলেন বিচারপতি সৈয়দ মাহমুদ হোসেন, মহাহিসাব নিরীক্ষক মাসুদ আহমেদ, পিএসসি চেয়ারম্যান ড. মোহাম্মদ সাদিক, অধ্যাপক সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম, অধ্যাপক শিরিন আখতার এবং বিচারপতি ওবায়দুল হাসান।

নির্বাচন কমিশন পুনর্গঠনে বিতর্ক এড়াতে আইন প্রণয়নের দাবি তুলেছিল সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন)। সংগঠনটির মতে আইন প্রণয়ন না করে আবারও কমিশন গঠন করলে বিষয়টি আদালত পর্যন্ত গড়াতে পারে। পরে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাও সংসদে দেওয়া এক বক্তৃতায় প্রয়োজনে নির্বাচন কমিশন পুনর্গঠনে আইন প্রণয়নের কথা বলেন। ২০১৭ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি সংসদে দেওয়া ভাষণে নির্বাচন কমিশন গঠনে আইন প্রণয়নের জন্য তখন থেকেই উদ্যোগ নেওয়ার পরামর্শ দিয়েছিলেন প্রধানমন্ত্রী। জাতীয় সংসদে প্রধানমন্ত্রীর জন্য নির্ধারিত প্রশ্নোত্তর পর্বে এক প্রশ্নের জবাবে তিনি সংসদে এ কথা বলেন। তিনি আরও বলেছিলেন, আমরা চাই পরবর্তী সময়ে প্রধান নির্বাচন কমিশনার ও অন্য নির্বাচন কমিশনার নিয়োগের লক্ষ্যে একটি উপযুক্ত আইন প্রণয়ন করা হোক। সংবিধানের নির্দেশনার আলোকে তখন থেকেই সেই উদ্যোগ গ্রহণ করার কথা বলেন প্রধানমন্ত্রী।

সাবেক মন্ত্রিপরিষদ সচিব আলী ইমাম মজুমদার দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘রুলস অব বিজনেস অনুযায়ী এ ধরনের প্রস্তাব কেবিনেট ডিভিশন থেকেই যাওয়ার কথা। তবে এখানে রাষ্ট্রপতির ক্ষমতা নিরঙ্কুশ না। প্রধানমন্ত্রী নিয়োগ এবং প্রধান বিচারপতি নিয়োগ এই দুটো বিষয় ছাড়া রাষ্ট্রপতিকে সব দায়িত্ব পালন করতে হবে প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে আলোচনা করে। প্রক্রিয়াটি সহজতর ও গ্রহণযোগ্য করার জন্য রাষ্ট্রপতি সার্চ কমিটি গঠন করতে পারেন, আগে যেমনটি হয়েছে। তিনি রাজনৈতিক দলের সঙ্গে আলোচনাও করতে পারেন। কেবিনেট ডিভিশন যেসব প্রস্তাব পাঠিয়েছে বলে বলা হচ্ছে তা অযৌক্তিক নয়। সব ক্ষেত্রেই যাদের নিয়োগ দেবেন তা প্রধানমন্ত্রীর সুপারিশে হতে হবে।’

অনেক রাজনৈতিক দল নির্বাচন কমিশন পুনর্গঠনের জন্য আইন চাচ্ছে। আপনি কি মনে করেন একটি আইন হলেই সবকিছু পাল্টে যাবেএ প্রশ্নের জবাবে সাবেক এই মন্ত্রিপরিষদ সচিব বলেন, ‘আমি সুশাসনের জন্য নাগরিকের (সুজন) সঙ্গে সংশ্লিষ্ট। এখানে আমার ব্যক্তিগত মত হচ্ছেঅনেক কিছুর জন্যই আইন আছে। মানবাধিকার কমিশনের জন্য আইন আছে। আরও নানা সংস্থা বা সংগঠনের জন্য আইন আছে। আইন থাকলে কী হবে, সরকার যা চাচ্ছে তাই হচ্ছে। আইন থাকাটা খারাপ না, ভলো। আইন ছাড়াও এ দেশে অনেক ভালো নির্বাচন কমিশন ছিল। ২০০৭ সালে শামসুল হুদা কমিশনের সময় কোনো আইন ছিল না। ১৯৯১ সালে কেনো আইন ছিল না। আবু হেনা কমিশনের সময় আইন ছিল না। আইন ছাড়াই গ্রহণযোগ্য নির্বাচন কমিশন গঠন হয়েছে। আবার আইন ছাড়াই অগ্রহণযোগ্য কমিশনও গঠিত হয়েছে। এমএ আজিজ বিচারপতি হিসেবে গ্রহণযোগ্য হলেও প্রধান নির্বাচন কমিশনার হিসেবে ব্যর্থ ছিলেন। কাজেই আইন দিয়ে হবে না। সরকারকে চাইতে হবে ভালো নির্বাচন হোক।’

১৫ ফেব্রুয়ারির মধ্যে নির্বাচন কমিশন পুনর্গঠন সংক্রান্ত গ্রহণযোগ্য আইন প্রণয়ন করা সম্ভব কি নাজানতে চাইলে আলী ইমাম মজুমদার বলেন, ‘সরকার চাইলে হয়তো সম্ভব। কিন্তু আইন দিয়ে কী হবে যদি সেটা কার্যকর না হয়। এখানে সরকারের সদিচ্ছা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।’