শ্রেণিকক্ষের হাতছানি শিক্ষার্থীদের|313858|Desh Rupantor
logo
আপডেট : ৬ সেপ্টেম্বর, ২০২১ ০০:০০
শ্রেণিকক্ষের হাতছানি শিক্ষার্থীদের
নিজস্ব প্রতিবেদক

শ্রেণিকক্ষের হাতছানি শিক্ষার্থীদের

সব জল্পনা-কল্পনার অবসান ঘটিয়ে অবশেষে আগামী ১২ সেপ্টেম্বর থেকে খুলছে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। যদিও কয়েক দিন আগেই শিক্ষামন্ত্রী দীপু মনি ওইদিন স্কুল-কলেজ খোলার কথা জানিয়েছিলেন। কিন্তু কীভাবে সেটি করা হবে সে বিষয়ে বিস্তারিত জানাননি তিনি। গতকাল রবিবার এ বিষয়ে পূর্ণাঙ্গ পরিকল্পনা প্রকাশ করেছে সরকার। ফলে ১২ সেপ্টেম্বরই খুলে যাচ্ছে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের দরজা। ফলে দেড় বছর পর আবারও শ্রেণিকক্ষ উন্মুক্ত হচ্ছে শিক্ষার্থীদের জন্য। যদিও এই দীর্ঘ সময়ে শিক্ষা খাতে বড় ধরনের ক্ষতি হয়ে গেছে বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে উঠে এসেছে। তবে সবার আন্তরিক চেষ্টায় এই ক্ষতি দ্রুত কাটিয়ে ওঠা সম্ভব বলে আশা প্রকাশ করেছেন দীপু মনি। 

শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খোলার বিষয়ে রবিবার বিকেলে সচিবালয়ে আন্তঃমন্ত্রণালয় বৈঠকে বসেন শিক্ষামন্ত্রী দীপু মনি। এতে যোগ দেন  কৃষিমন্ত্রী ড. আব্দুর রাজ্জাক, স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও  সমবায়মন্ত্রী মো. তাজুল ইসলাম, প্রাথমিক ও গণশিক্ষা প্রতিমন্ত্রী মো. জাকির হোসেন ও যুব ও ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রী জাহিদ আহসান রাসেল, মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের সচিব খন্দকার আনোয়ারুল ইসলাম, শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগের সচিব মো. মাহবুব হোসেনসহ শিক্ষাসংশ্লিষ্ট সরকারের বিভিন্ন দপ্তরের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা। সেখানেই নেওয়া হয় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খোলার বিষয়ে এক গুচ্ছ পরিকল্পনা। ৯ সেপ্টেম্বরের মধ্যে সমস্ত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান পাঠদানের উপযোগী করতে এরই মধ্যে নির্দেশনা পাঠানো হয়েছে। দেওয়া হয়েছে ১৯ দফা গাইডলাইন।

এসএসসি, এইচএসসি ও পঞ্চম শ্রেণির ক্লাস প্রতিদিন বাকিদের সপ্তাহে এক দিন : আপাতত শ্রেণিকক্ষ উন্মুক্ত হলেও পুরো কার্যক্রম শুরু হচ্ছে না। চলতি বছরের এইচএসসি ও এইচএসসি সমমান পরীক্ষা হওয়ার কথা ছিল বছরের শুরুতে। কিন্তু শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকায় সেটি সম্ভব হয়নি। করোনা সংক্রমণ বিবেচনায় নিয়ে এসএসসি-এইচএসসি ও পঞ্চম শ্রেণিতে অধ্যয়নরত শিক্ষার্থীদের জন্য প্রতিদিন ক্লাসের ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। অন্য শ্রেণির শিক্ষার্থীদের জন্য এটি সপ্তাহে এক দিন করা হয়েছে।

দীপু মনি বলেন, শুরুর দিকে ২০২১ সালে যারা এসএসসি ও এইচএসসি পরীক্ষা দেবেন তাদের প্রতিদিন স্কুল-কলেজে আসতে হবে। এছাড়াও পঞ্চম শ্রেণির শিক্ষার্থীরা প্রতিদিন ক্লাসে আসবে। তিনি বলেন, ১২ সেপ্টেম্বর শুরুর দিন চার-পাঁচ ঘণ্টা ক্লাস হবে। পর্যায়ক্রমে ক্লাসের সংখ্যা বাড়বে। প্রতিটি প্রতিষ্ঠানকে চেকলিস্ট পূরণ করে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে পাঠাতে হবে। র‌্যান্ডম স্যাম্পলিং করে সংক্রমণের ঝুঁকি থাকলে বন্ধ করার সিদ্ধান্তও নেওয়া হতে পারে। স্কুলে প্রবেশের ক্ষেত্রে শিক্ষার্থীদের সারিবদ্ধভাবে প্রবেশ করাতে হবে। স্কুলে আপাতত কোনো এসেম্বলি হবে না। তবে ফিজিক্যাল অ্যাক্টিভিটি বা খেলাধুলা চলবে, যাতে শারীরিক ও মানসিকভাবে ভালো অবস্থানে থাকতে পারে।

এসএসসি ও এইচএসসি পরীক্ষা গ্রহণ সম্পর্কে মন্ত্রী জানান, আগের ঘোষণা অনুযায়ী পরীক্ষা হবে। অর্থাৎ নভেম্বরের মাঝামাঝি এসএসসি এবং ডিসেম্বরে এইচএসসি পরীক্ষা নেওয়ার প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছে।

পরিস্থিতি বিবেচনায় ক্লাস বাড়বে : শুরুতে কম ক্লাসের ব্যবস্থা রাখা হলেও পরিস্থিতি বিবেচনা করে ক্লাসের সংখ্যা বাড়বে বলে জানিয়েছেন শিক্ষামন্ত্রী। তিনি বলেন, ১৭ মাস যেহেতু শিক্ষার্থীরা ক্লাসে ছিল না, তাই চার ঘণ্টা, পাঁচ ঘণ্টা করে ক্লাস নেওয়া হবে। তারপর ধীরে ধীরে ক্লাসের সময়সূচি স্বাভাবিক করা হবে। বাকি সব শ্রেণিতে এক দিন করে ক্লাস হবে। পরিস্থিতি বিবেচনা করে ক্লাসের সংখ্যা বাড়ানো হবে।

দীপু মনি বলেন, ‘আমরা প্রতিদিন পর্যবেক্ষণ করব। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়, শিক্ষা, প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়, জাতীয় পরামর্শক কমিটি আমরা সবাই যৌথভাবে এই পর্যবেক্ষণ কাজের মধ্যে থাকব। আমরা দেখব, কীভাবে আমরা এই পরিস্থিতিতে এগিয়ে যাচ্ছি। কারও বাড়িতে কারও মধ্যে যদি করোনাভাইরাস উপসর্গ থাকে তার ক্লাসে আসার দরকার নেই। আর পরিস্থিতি স্বাভাবিক না হওয়া পর্যন্ত এসেম্বলি হবে না।’

যাদের বয়স ১২ বছর তাদেরও ভ্যাকসিনেশনের আওতায় নিয়ে আসতে প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনা রয়েছে বলে জানিয়েছেন শিক্ষামন্ত্রী। তিনি বলেন, ‘টিকা প্রাপ্তি ও কারিগরি ব্যবস্থাপনা শেষ হলে এই প্রক্রিয়া শুরু হবে। বেশিরভাগ শিক্ষকই টিকা নিয়েছেন। এছাড়া ১২ বছর বয়সী শিক্ষার্থীদেরও টিকার আওতায় আনা হবে।’

মাস্ক ছাড়া প্রবেশ করা যাবে না শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে : করোনা সংক্রমণ মাথায় রেখে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে কঠোর স্বাস্থ্যবিধি প্রতিপালনের নির্দেশ দিয়েছে সরকার। খুলে দেওয়ার পর মাস্ক ছাড়া কাউকে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে প্রবেশ করে দেওয়া হবে না। এ বিষয়ে শিক্ষামন্ত্রী দীপু মনি বলেন, ‘আমরা কঠোর মনিটরিং করব। স্বাস্থ্যবিধির বিষয়টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকে দেখভাল করতে হবে। কেউ যাতে মাস্ক ছাড়া শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে প্রবেশ করতে না পারে। ক্লাসে অংশ নেওয়া শিক্ষার্থীদেরও এটি পরতে হবে। এক কথায় সবাইকে কঠোর বিধিনিষেধ মানতে হবে।’

সংক্রমণ বাড়লেই বন্ধ সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান : শিক্ষামন্ত্রী বলেন, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খোলা থাকার কারণে কোথাও যদি আমরা কখনো মনে করি যে, সংক্রমণ বাড়ার কোনো আশঙ্কা আছে; সেখানে আমরা সঙ্গে সঙ্গে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেব। তিনি বলেন, যদি স্থানীয় পর্যায়ে কোনো নির্দিষ্ট শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এ কারণে বন্ধ করে দেওয়ার প্রয়োজন হয়, আমরা সেই সিদ্ধান্ত নেব। কারণ কোনোভাবেই আমরা শিক্ষার্থী-শিক্ষক-অভিভাবকদের স্বাস্থ্য সুরক্ষার বিষয়টিকে অবহেলা করব না।

বিশ্ববিদ্যালয় খুলতে বৈঠকে বসবেন শিক্ষামন্ত্রী : প্রথম দফায় স্কুল-কলেজ খুললেও বন্ধ থাকছে দেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর দরজা। এর আগে অক্টোবরে বিশ্ববিদ্যালয় খোলার সময় নির্ধারণ করা হয়েছিল। তবে পরিস্থিতি অনুযায়ী এখন আগেই খোলার ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নেওয়া হতে পারে বলে জানিয়েছেন দীপু মনি। তিনি বলেন, ভিসিদের সঙ্গে কথা হয়েছিল যে, অন্ততপক্ষে সব শিক্ষার্থী এক ডোজ টিকা নেওয়ার পরে দুই সপ্তাহ সময় দিয়ে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খোলার। সে আলোকে মধ্য অক্টোবর ঠিক করা হয়েছিল। এখন যে পরিস্থিতি, তাতে আমি আবারও এই সপ্তাহে উপাচার্যদের (ভিসি) সঙ্গে হয়ত বৈঠক করব ইনশাআল্লাহ।

মন্ত্রী বলেন, সেখানে (বৈঠক) অবস্থা আবারও পর্যবেক্ষণ করে যদি তারা সিদ্ধান্ত নেন যে, তারা অক্টোবরের আগেই বিশ্ববিদ্যালয় খুলে দেওয়ার জন্য প্রস্তুত আছেন। যেহেতু বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর সিদ্ধান্ত তাদের সিন্ডিকেট ও একাডেমিকভাবে হয়ে থাকে। তাই এ সিদ্ধান্ত তারাই নেবেন। কিন্তু আমরা তাদের সঙ্গে আবারও একটি বৈঠক করব। ১৮ বছর বয়সীদের টিকা দেওয়া যখন শুরু হয়, তার মধ্যে যাদের এনআইডি আছে তাদের নিবন্ধন করতে বলা হয়েছে।

বন্ধ থাকছে প্লে, নার্সারি ও প্রাক প্রাইমারির ক্লাস : এদিকে প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক আলমগীর মুহম্মদ মনসুরুল আলম গণমাধ্যমকে বলেছেন, পরিস্থিতি বিবেচনা করে পরে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রাক্-প্রাথমিক শিক্ষা সশরীর চালু করা হবে। এই সঙ্গে বন্ধ থাকছে কিন্ডারগার্টেন স্কুলগুলোর প্লে ও নার্সারি শ্রেণির সশরীরে শিক্ষাদান।

এদিকে ৯ সেপ্টেম্বরের মধ্যে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান পাঠদানের উপযোগী করতে নির্দেশ দিয়েছেন শিক্ষামন্ত্রী। সেই সঙ্গে প্রতিষ্ঠানগুলোকে স্বাস্থ্যবিধি মানাতে ১৯ দফা গাইডলাইন ঠিক করে দিয়েছে শিক্ষা মন্ত্রণালয়। এসব গাইডলাইন ঠিকঠাক প্রতিপালন হচ্ছে কিনা তা দেখভাল করতে জেলা-উপজেলা শিক্ষা অফিস, মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা অধিদপ্তর, প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তর এবং কারিগরি ও মাদ্রাসা শিক্ষা অধিদপ্তরকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

 মহামারী করোনাভাইরাস পরিস্থিতিতে গত বছরের ১৭ মার্চ বন্ধ হয়ে যায় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। এরপর দফায় দফায় বাড়ানো হয় ছুটি। এতে শিক্ষক-শিক্ষার্থী অভিভাবকসহ সকলেই হাঁফিয়ে ওঠেন।