পরওয়ারসহ ৯ জামায়াত নেতা ‘গোপন বৈঠক’ থেকে গ্রেপ্তার|314015|Desh Rupantor
logo
আপডেট : ৭ সেপ্টেম্বর, ২০২১ ০০:০০
পরওয়ারসহ ৯ জামায়াত নেতা ‘গোপন বৈঠক’ থেকে গ্রেপ্তার
নিজস্ব প্রতিবেদক

পরওয়ারসহ ৯ জামায়াত নেতা ‘গোপন বৈঠক’ থেকে গ্রেপ্তার

একাত্তরে যুদ্ধাপরাধের দায়ে অভিযুক্ত দল জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় কমিটির সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার ও সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল হামিদুর রহমান আযাদসহ ৯ নেতাকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। গতকাল সোমবার সন্ধ্যায় রাজধানীর ভাটারা থানা এলাকার একটি অফিস থেকে তাদের গ্রেপ্তার করা হয়। পুলিশ দাবি করেছে, রাষ্ট্র ও সরকারবিরোধী গোপন ষড়যন্ত্রমূলক বৈঠক করার সময় পুলিশ সেখানে অভিযান চালায়। গ্রেপ্তার ব্যক্তিরা আগামী সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে দলকে কীভাবে সংগঠিত করা যায় তা নিয়েও শলাপরামর্শ করছিলেন বলে একজন পুলিশ কর্মকর্তা জানান।

গ্রেপ্তার হওয়া অপর নেতারা হলেন দলটির সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল রফিকুল ইসলাম খান, কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদ সদস্য আবদুর রব, অধ্যক্ষ ইজ্জত উল্লাহ ও মোবারক হোসাইন, ছাত্রশিবিরের সাবেক কেন্দ্রীয় কমিটির সভাপতি ইয়াসিন আরাফাত এবং জামায়াতকর্মী মনিরুল ইসলাম ও আবুল কালাম।

এ বিষয়ে ডিএমপির গুলশান বিভাগের উপপুলিশ কমিশনার (ডিসি) মো. আসাদুজ্জামান দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘গ্রেপ্তার হওয়া জামায়াত নেতারা রাষ্ট্রবিরোধী গোপন বৈঠক করছিলেন। দেশকে অস্থিতিশীল করতে তারা সেখানে মিলিত হয়েছিলেন এমন খবর পেয়ে আমরা সেখানে অভিযান চালাই। বৈঠক থেকে আলামত হিসেবে কিছু বই আমরা জব্দ করি।’

এদিকে জামায়াতের নিয়মিত কাজের অংশ হিসেবে ওই বৈঠক ছিল বলে দাবি করেছেন দলটির আমির ডা. শফিকুর রহমান। তিনি গতকাল রাতেই ক্ষোভ প্রকাশ করে গণমাধ্যমে বিবৃতি দিয়েছেন। ওই বিবৃতিতে জামায়াতের ১০ নেতাকর্মীকে গ্রেপ্তার করার দাবি করা হয়েছে।

গ্রেপ্তার ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে কী আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে জানতে চাইলে গতকাল রাতে ডিসি আসাদুজ্জামান বলেন, ‘তাদের বিরুদ্ধে আইনি প্রক্রিয়া চলমান। রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র ও নাশতার পরিকল্পনা উদ্দেশ্যে মিলিত হওয়ার দায়ে তাদের বিরুদ্ধে একটি মামলা দায়েরের প্রক্রিয়া চলছে।’

যে বাসা থেকে তাদের গ্রেপ্তার করা হয়েছে ওই বাসার মালিকের সঙ্গে জামায়েতের কোনো সংশ্লিষ্টতা রয়েছে কি না বা বৈঠকের বিষয়ে তিনি জানতেন কি না এমন প্রশ্ন করা হলে ডিসি আরও বলেন, ‘আমাদের কাছে গোয়েন্দা তথ্য ছিল তারা প্রায়ই এ ধরনের বৈঠকে মিলিত হয়ে নাশকতামূলক কর্মকাণ্ড চালাতেন। এর আগে যে নাশকতাগুলো হয়েছিল, এভাবেই তারা সেগুলোর পরিকল্পনা করেন।’

নিয়মিত বৈঠক ছিল নাকি বিশেষ কোনো পরিকল্পনার জন্য বৈঠক ছিল জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘এটি নিয়মিত বৈঠক ছিল না। আমরা তাদের জিজ্ঞাসাবাদ করছি। তাদের কী পরিকল্পনা ছিল এবং নাশকতার পরিকল্পনা তারা কীভাবে বাস্তবায়ন করতেন, তা আমরা জানার চেষ্টা করছি।’

এর আগে পুলিশের এক কর্মকর্তা দেশ রূপান্তরকে বলেন, ভাটারা এলাকায় একটি বাড়িতে জামায়াত সমর্থিত শ্রমিক সংগঠনের একটি অফিস রয়েছে। আগামী সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে আটক হওয়া জামায়াত নেতারা জমায়েত হন। গতকাল সকাল থেকেই তারা ওই অফিসে অবস্থান করেন। দলটির সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ারের নেতৃত্বে কেন্দ্রীয় কমিটির নেতারা দলকে আরও কীভাবে সংগঠিত করা যায় তা নিয়ে আলোচনা করেন। গোপন বৈঠকের তথ্য পেয়ে পুলিশ ওই বাড়িটি ঘিরে ফেলে। পুলিশের উপস্থিতি টের পেয়ে কয়েকজন পালিয়ে গেলে অন্যরা ধরা পড়েন। তারা দেশের পরিস্থিতি অস্থিতিশীল করতে গোপনে একত্র হন। তাদের বিরুদ্ধে রাষ্ট্র ও সরকারবিরোধী ষড়যন্ত্রমূলক গোপন বৈঠকের অভিযোগে মামলা করা হবে।

ওই কর্মকর্তা আরও বলেন, গ্রেপ্তার হওয়া সবার বিরুদ্ধেই বিভিন্ন সময়ে জ¦ালাও-পোড়াও, ভাঙচুর ও নাশকতার মামলা রয়েছে। এসব মামলায় তারা জামিনে রয়েছেন কি না, তা যাচাই করা হচ্ছে। জামিনে না থাকলে পুরনো মামলাগুলোতেও গ্রেপ্তার দেখানো হবে। সাবেক সাংসদ গোলাম পরওয়ার ও হামিদুর রহমান আযাদ বিভিন্ন সময়ে একাধিকবার গ্রেপ্তার হয়েছিলেন।

এদিকে গ্রেপ্তারের নিন্দা ও প্রতিবাদ জানিয়ে জামায়াতের আমির ডা. শফিকুর রহমান গতকাল রাতে গণমাধ্যমে বিবৃতি দিয়েছেন। বিবৃতিতে অবিলম্বে জামায়াতের নেতাকর্মীদের মুক্তির আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেছেন, বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল ও সাবেক এমপি অধ্যাপক মিয়া গোলাম পরওয়ার, সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল মাওলানা রফিকুল ইসলাম খান ও হামিদুর রহমান আযাদসহ ১০ জনকে অন্যায়ভাবে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। জামায়াতে ইসলামী একটি নিয়মতান্ত্রিক ও গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক দল। দেশে বিদ্যমান ভয়াবহ করোনা পরিস্থিতিতে জামায়াত জনগণের পাশে থেকে সেবা করার চেষ্টা করে যাচ্ছে। জামায়াতের নিয়মিত কাজের অংশ হিসেবে ৬ সেপ্টেম্বর (গতকাল সোমবার) বিকেলে সেক্রেটারি জেনারেল অধ্যাপক মিয়া গোলাম পরওয়ারের সভাপতিত্বে এক বৈঠকের আয়োজন করা হয়। এ বৈঠক থেকে সরকার অন্যায়ভাবে জামায়াতের ৭ কেন্দ্রীয় নেতাসহ ১০ জনকে গ্রেপ্তার করে।

বিবৃতিতে তিনি আরও বলেন, দেশে এক বিশৃঙ্খল পরিস্থিতি চলছে। সরকার দীর্ঘ এক যুগ ধরে জনগণের রাজনৈতিক অধিকার কেড়ে নিয়েছে। কোনো দলকেই তাদের রাজনৈতিক কার্যক্রম পরিচালনা করতে দিচ্ছে না। সরকারের সবচেয়ে জুলুম-নির্যাতনের শিকার হয়েছে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী। জামায়াতের হাজার হাজার নেতাকর্মীকে গ্রেপ্তার করে নির্যাতন চালানো হয়েছে। অনেককে গুম করা হয়েছে ও পঙ্গু করে দেওয়া হয়েছে। শত জুলুম বুকে ধারণ করে জামায়াত নিয়মতান্ত্রিকভাবে তার স্বাভাবিক রাজনৈতিক কার্যক্রম পরিচালনা করে আসছে; বিশেষ করে করোনাভাইরাসের ১৮ মাসে জামায়াত জনগণের পাশে দাঁড়িয়ে সেবা দেওয়ার চেষ্টা করেছে।

তিনি বলেন, ‘আমরা স্পষ্ট ভাষায় বলতে চাই, প্রতিটি রাজনৈতিক দলেরই তাদের রাজনৈতিক কার্যক্রম পরিচালনা করার অধিকার আছে। এটা দেশের জনগণের নাগরিক ও সাংবিধানিক অধিকার। এ অধিকার থেকে বঞ্চিত করার এখতিয়ার কারও নেই। গায়ের জোরে বেশি দিন ক্ষমতায় টিকে থাকা যায় না। অতীতে রাজনৈতিক নেতাদের গ্রেপ্তার করে জনগণের ন্যায়সংগত অধিকার আদায়ের কোনো আন্দোলনকে দমন করা যায়নি। এখনো যাবে না ইনশাআল্লাহ। আমি সব ষড়যন্ত্র ও জুলুম-নিপীড়ন বন্ধ করে সেক্রেটারি জেনারেল অধ্যাপক মিয়া গোলাম পরওয়ার, সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল মাওলানা রফিকুল ইসলাম খান ও হামিদুর রহমান আযাদসহ গ্রেপ্তারকৃত ১০ জনকে অবিলম্বে মুক্তি দেওয়ার জন্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের প্রতি আহ্বান জানাচ্ছি।’

জামায়াতের এক নেতা জানান, ১৯৯৬-২০১১ সাল পর্যন্ত খুলনা মহানগরী জামায়াতের আমির হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন গোলাম পরওয়ার। ২০১২ সালের এপ্রিল থেকে ২০১৬ সালের নভেম্বর পর্যন্ত জামায়াতের কেন্দ্রীয় সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল হিসেবে দায়িত্বে ছিলেন। ২০১৬ সালের নভেম্বর থেকে তিনি জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় নায়েবে আমির ও ২০১৭ সালের জানুয়ারি থেকে বাংলাদেশ শ্রমিক কল্যাণ ফেডারেশনের কেন্দ্রীয় সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। তিনি ১৯৯১ সালে জাতীয় সংসদ নির্বাচনে খুলনা-৫ (ডুমুরিয়া-ফুলতলা) আসন থেকে জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী হিসেবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন। ১৯৯৪ সালে খুলনা সিটি করপোরেশন নির্বাচনে তিনি মেয়র পদে জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী ছিলেন।