সোহেল রানার গা থেকে ঝরত ক্ষমতার বাহার|314017|Desh Rupantor
logo
আপডেট : ৭ সেপ্টেম্বর, ২০২১ ০০:০০
সোহেল রানার গা থেকে ঝরত ক্ষমতার বাহার
সরোয়ার আলম

সোহেল রানার গা থেকে ঝরত ক্ষমতার বাহার

ভারতে গ্রেপ্তার হওয়া গ্রাহকের টাকা আত্মসাতের দায়ে অভিযুক্ত ই-কমার্স প্রতিষ্ঠান ই-অরেঞ্জের নেপথ্য নায়ক বনানী থানার ইন্সপেক্টর (তদন্ত) সোহেল রানা ক্ষমতার দাপট দেখিয়ে কাঁড়ি কাঁড়ি অর্থ কামিয়েছেন। ঢাকার পাশাপাশি চারটি দেশে আছে তার একাধিক ব্যবসা। নানা উপায়ে তিনি গড়ে তুলেছেন গাড়ি-বাড়ি। বিভিন্ন দূতাবাসের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সঙ্গে ছিল তার গভীর সখ্য। তার ব্যবহৃত একটি সানগ্লাসের দামই ২ হাজার ২০০ ডলার। আর ১ হাজার ১০০ ডলারের মূল্যের একেকটি টি-শার্ট ব্যবহার করতেন নিয়মিত। এমনকি ঠিকভাবে অফিসও করতেন না তিনি। ভারতের সীমান্তরক্ষী বিএসএফের হাতে ধরা পড়ার পর বিতর্কিত পুলিশ ইন্সপেক্টর সোহেল রানার বিষয়ে চাঞ্চল্যকর তথ্য উদঘাটন করছে পুলিশের কয়েকটি সংস্থা।

এদিকে পুলিশ প্রতিবেদন আসার পর সোহেল রানাকে গতকাল সোমবার সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে। ইতিমধ্যে তার স্থানে নতুন কর্মকর্তাকেও বদলি করা হয়েছে। তবে সোহেল রানার বিপুল পরিমাণ টাকা বিদেশে পাচারের তথ্য এবং বেশ কয়েকজন সহযোগীকে খুঁজছে পুলিশসহ একাধিক সংস্থা। পুলিশ কর্মকর্তা হিসেবে দুর্নীতির ও বিদেশে টাকা পাচারের সঙ্গে সম্পৃক্ত থাকার প্রাথমিক তথ্য পাওয়ার পর ছায়াতদন্ত শুরু করেছে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ সিআইডি।

তদন্তসংশ্লিষ্টরা দেশ রূপান্তরকে জানান, বরখাস্ত হওয়া ইন্সপেক্টর সোহেল রানার অবৈধ কারবারের সূত্র ধরে আমানউল্লাহ, মাহবুব ও সুমনসহ কয়েকজনের খোঁজ মিলেছে। ছলচাতুরী করে নিজেদের অপকর্ম ঢাকতে চলতি বছরের জুন মাসে আমানউল্লাহ ও বীথি নামে এক তরুণীর কাছে ই-অরেঞ্জ বিক্রি করে দেওয়া হয়। ই-কমার্সভিত্তিক প্রতিষ্ঠান নগদ হাট ও আমান টেল এবং ডিজিটাল কমিউনিকেশন নেটওয়ার্কসহ নানা ধরনের ব্যবসা রয়েছে আমানের। নামে-বেনামে তারও অঢেল সম্পদ থাকার তথ্য পাওয়া গেছে। বিদেশে তিনি টাকা পাচার করেছেনÑ এমন তথ্য পেয়েছে একাধিক সংস্থা। তার বিরুদ্ধে প্রতারণা ও জালিয়াতির একাধিক মামলাও রয়েছে। একসময়ের প্রতারক আমান বিয়ে করেন পুলিশের এক কর্মকর্তাকে। পরে ওই কর্মকর্তা তাকে ডিভোর্স দেন। এখন পর্যন্ত তিনটি বিএমডব্লিউ, দুটি মার্সিডিজ ও এক প্রাডো গাড়ির মালিকানা আছে আমানউল্লাহর। তার গ্রামের বাড়ি ভোলার চরফ্যাশন পৌরসভার ১ নম্বর ওয়ার্ডে। আমানউল্লাহর বাবা মৃত মোছাদ্দেক চৌধুরী। তার শৈশব কেটেছে নানার বাড়ি নলছিটিতে। তার সঙ্গে সোহেল রানার সম্পর্ক প্রায় এক যুগ ধরে। সোহেল রানার গ্রামের বাড়ি গোপালগঞ্জ। তার সঙ্গে পুুলিশের বেশ কয়েকজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার ছিল গভীর সখ্য। অল্প সময়ের মধ্যে অঢেল সম্পদের মালিক বনে যান। সম্পদ গড়ার পাশাপাশি সোহেল রানা একাধারে পাঁচটি বিয়েও পর্যন্ত করেছেন।

পুলিশ সূত্র জানায়, সোহেল রানা গুলশান এলাকায় নানা কারবারে জড়িত ছিলেন। তার সঙ্গে বিভিন্ন দূতাবাসের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সঙ্গে ছিল গভীর সখ্য। চাকরিজীবনে বেশিরভাগ সময়ই থেকেছেন ডিএমপির গুলশান ডিভিশনে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক গুলশান এলাকার কয়েকজন ব্যবসায়ী জানান, চীন, থাইল্যান্ড, পর্তুগাল ও ইংল্যান্ডে আছে হরেক রকমের ব্যবসা। আর গুলশানে আছে স্পা থেকে শুরু করে কাঁচাবাজারের ব্যবসা। গুলশান ২ নম্বর ডিসিসি মার্কেটের দ্বিতীয় তলায় আছে তার একটি নামিদামি সেলুন। ল্যান্ডভিউ মার্কেটে আছে একটি মানিএক্সচেঞ্জ। ডিসিসি মার্কেটসংলগ্ন কাঁচাবাজারে আছে একটি দোকান। গুলশান এক নম্বর নাভানা টাওয়ারেও তার আছে একটি বিশাল স্পা সেন্টার। ডিসিসির মার্কেটের মিস্টার বেকারের দোকান ছিল তার নিয়মিত আড্ডাস্থল। গলা ও হাতে পরতেন অন্তত ৩০ ভরি ওজনের সোনার চেইন। গুলশান ২ নম্বরের ১২৩ নম্বর রোডে আছে একটি ফ্ল্যাট। আছে ১২টি প্রাইভেট কার। চাকরিজীবনে সোহেল রানা চীন, পর্তুগাল, আমেরিকা, থাইল্যান্ড, ইংল্যান্ড, নেপাল ও ইতালিতে যাতায়াত করেছেন বহুবার। ওই ব্যবসায়ীরা আরও জানান, সোহেল রানা নিয়মিত যে সানগ্লাসটি ব্যবহার করতেন সেটি বছর দুয়েক আগে আমেরিকা থেকে ২ হাজার ২০০ ডলার (বাংলাদেশি টাকায় প্রায় ২ লাখ টাকা) দিয়ে কিনেছেন। তার একেকটি টি-শার্টের দাম ১ হাজার ১০০ থেকে ১ হাজার ২০০ ডলার। গুলশান এলাকার মাহবুব ও সুমন নামে অন্য দুই ব্যবসায়ী তার গুলশানের ব্যবসাগুলো নিয়মিত দেখাশোনা করতেন। এ প্রসঙ্গে পুলিশের এক কর্মকর্তা বলেন, সোহেল রানা ক্ষমতার দাপট দেখিয়ে নানা অপকর্ম করেছেন। তিনি অর্থের পেছনে ছুটেছেন নিয়মিত। তার নামে- বেনামে অন্তত ৫০০ কোটি টাকার সম্পদ আছে বলে আমাদের কাছে তথ্য এসেছে। ওপরের মহলের নির্দেশেই আমরা সোহেল রানার প্রতিটি বিষয় তদন্ত করছি।

ঢাকা মহানগর পুলিশ কমিশনার মোহা. শফিকুল ইসলাম বলেন, রবিবার তার স্থলে নতুন কর্মকর্তাকে বদলি করা হয়েছে। তার বিরুদ্ধে মামলা ছিল। তিনি ভারতে পালিয়ে গেছেন, গুলশান পুলিশের পক্ষ থেকে এমন রিপোর্ট আসার পর বনানীর পরিদর্শক (তদন্ত) সোহেল রানাকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে।

সংশ্লিষ্টরা আরও জানান, ই-অরেঞ্জের অর্থ আত্মসাতের মামলায় আসামি হওয়ার পরপরই দেশ থেকে পালাতে গিয়ে গত শুক্রবার বাংলাদেশ-ভারত সীমান্তের চ্যাংড়াবান্ধা এলাকায় ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনী বিএসএফের হাতে গ্রেপ্তার হন সোহেল রানা। বিনা ভিসায় ভারতে প্রবেশের দায়ে করা মামলায় দেশটির আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কাছে বর্তমানে তিনি তিন দিনের হেফাজতে রয়েছেন। ভারতে অবৈধভাবে অনুপ্রবেশের সময় সোহেলের কাছ থেকে থাইল্যান্ড, যুক্তরাজ্যসহ বিভিন্ন দেশের পাঁচটি ডেবিট কার্ড জব্দ করা হয়। তার পাসপোর্টে ভারতের ভিসা না থাকলেও ছিল থাইল্যান্ড, সৌদি আরব, চীন ও শেনজেন ভিসা।

সিআইডির একজন দায়িত্বশীল কর্মকর্তা গতকাল দেশ রূপান্তরকে বলেন, সোহেল রানা নামে-বেনামে দেশে-বিদেশে সম্পদের পাহাড় গড়েছেন। থাইল্যান্ডের পাতায়ায় তার শতকোটি টাকা বিনিয়োগ রয়েছে। পর্তুগালের রাজধানী লিসবনে সুপারশপ, বার ও রেস্টুরেন্টও রয়েছে। চীনের রাজধানীর পেইচিং, নেপাল ও ইতালিতে ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান থাকার তথ্য পেয়েছি আমরা। পাশাপাশি দেশেও একটি প্রতিষ্ঠানে বড় অঙ্কের বিনিয়োগ রয়েছে। এই অঙ্কও প্রায় ১০০ কোটি টাকার কাছাকাছি। ওই কর্মকর্তা আরও বলেন, সম্প্রতি ই-অরেঞ্জে গ্রাহকের টাকা আত্মসাতের বিষয়টি সামনে আসার পরপরই সোহেলের অর্থ-সম্পদ নিয়ে অনুসন্ধান শুরু করে একাধিক সংস্থা। এখন পর্যন্ত ই-অরেঞ্জের দুটি ব্যাংক হিসাব থেকে প্রায় ৩৪৯ কোটি টাকা বেহাত হওয়ার তথ্য মিলেছে। এই অর্থ ই-অরেঞ্জ থেকে সরিয়ে দেশে-বিদেশে অন্যান্য ব্যবসায় সোহেল বিনিয়োগ করেছেন সেই তথ্যও মিলেছে।

নাম প্রকাশে ডিএমপির ঊর্ধ্বতন এক কর্মকর্তা দেশ রূপান্তরকে বলেন, সোহেল রানার গ্রামের বাড়ি গোপালগঞ্জ। চাকরিজীবনের বেশিরভাগ সময়ই তিনি পুলিশের গুলশান ডিভিশনে কাটিয়েছেন। ডিএমপির আগে তিনি স্পেশাল ব্রাঞ্চ এসবিতে ছিলেন। তিনি গুলশান এলাকায় অঘোষিত ‘পুলিশ কমিশনার’। তার কথায় এই এলাকায় সবকিছুই চলত। ই-অরেঞ্জের পাশাপাশি তিনি অন্যান্য ব্যবসায়িক কর্মকা-ে জড়িত ছিলেন। ওই কর্মকর্তা আরও বলেন, সোহেল রানা গুলশান থানার ওসি হতে তদবির করে আসছিলেন। কিন্তু তার আচার-আচরণের কারণে ওসি হতে পারেননি। তবে তদবির করেই বনানী থানায় ইন্সপেক্টর তদন্ত হয়ে যান। এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, বিএসএফ কর্মকর্তারা তাকে আটক করেছেন তা সত্য। তাকে দেশে ফিরিয়ে আনার চেষ্টা চলছে। তিনি দেশ ছেড়ে পালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেছিলেন। তিনি দেশের বাইরে অর্থ পাচার করেছেন বলে আমাদের কাছে তথ্য এসেছে।

পুলিশ সদর দপ্তরের এক কর্মকর্তা বলেন, ই-অরেঞ্জের ঘটনায় তাকে গ্রেপ্তার করার সিদ্ধান্ত ছিল। বিষয়টি তিনি আঁচ করতে পেরে দেশ ছেড়ে পালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেছিলেন। আটকের পর প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে সোহেল রানা অপরাধমূলক একাধিক কাজে নিজের সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ স্বীকার করেছেন বলে জানিয়েছেন বিএসএফের কর্মকর্তারা।

জানা গেছে, গত ১৭ আগস্ট অগ্রিম অর্থ পরিশোধের পরও মাসের পর মাস পণ্য না পাওয়ায় ই-অরেঞ্জের বিরুদ্ধে মামলা করেন প্রতারণার শিকার গ্রাহক মো. তাহেরুল ইসলাম। ওই সময় তার সঙ্গে প্রতারণার শিকার আরও ৩৭ জন উপস্থিত ছিলেন। গ্রাহকের ১ হাজার ১০০ কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগে ওই মামলা হয়। আসামিরা হলেন ই-অরেঞ্জের মালিক সোনিয়া মেহজাবিন, তার স্বামী মাসুকুর রহমান, আমানউল্লাহ, বীথি আক্তার, কাউসার আহমেদ এবং পুলিশের বনানী থানার পরিদর্শক সোহেল রানা। শুরু থেকেই ই-অরেঞ্জের সঙ্গে নিজের সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ অস্বীকার করে আসছিলেন তিনি। তবে ই-অরেঞ্জ বাংলাদেশ নামে প্রতিষ্ঠান খুলতে নেওয়া টিআইএন সনদে পরিচালক হিসেবে সোহেল রানার নাম দেখা যায়। প্রতিষ্ঠানটি থেকে বিভিন্ন সময়ে আড়াই কোটি টাকা তুলে নেওয়ার অভিযোগও রয়েছে তার বিরুদ্ধে। প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে সোহেল রানা অপরাধমূলক একাধিক কাজে নিজের সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ স্বীকার করেছেন বলে জানিয়েছেন বিএসএফের কর্মকর্তারা।