নাম মুখে না নিয়ে পরস্পরকে সাফাই|314371|Desh Rupantor
logo
আপডেট : ৯ সেপ্টেম্বর, ২০২১ ০০:০০
নাম মুখে না নিয়ে পরস্পরকে সাফাই
রেজাউল করিম লাবলু

নাম মুখে না নিয়ে পরস্পরকে সাফাই

বিএনপির নেতৃত্বাধীন ২০-দলীয় জোটের অন্যতম শরিক বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল অধ্যাপক মিয়া গোলাম পরওয়ারসহ দলটির ১০ জন শীর্ষ নেতাকে গ্রেপ্তারের ঘটনায় ঢাকাসহ কয়েকটি জেলায় বিক্ষোভ মিছিল করেছেন দলটির নেতারা। মিছিলের ঘটনায় গতকাল বুধবার নোয়াখালীতে জেলা জামায়াতের আমিরসহ তিনজনকে আটক করেছে পুলিশ।

হঠাৎ করে জামায়াতের শীর্ষ নেতাদের গ্রেপ্তারের ঘটনায় ক্ষোভ প্রকাশ করে গণমাধ্যমে বিবৃতি দিয়েছে বিএনপিসহ জোটের শরিক দলগুলো। তবে জামায়াত নেতাদের গ্রেপ্তারের বিষয়ে পুলিশের গুলশান বিভাগের উপকমিশনার মো. আসাদুজ্জামান সাংবাদিকদের বলেছিলেন, ‘রাষ্ট্রদ্রোহের ষড়যন্ত্র এবং দেশকে অস্থিতিশীল করতে তারা বসুন্ধরা  আবাসিক এলাকার একটি বাসায় গোপন বৈঠকে মিলিত হয়েছিলেন এমন খবর পেয়ে আমরা সেখানে অভিযান চালাই।’

জামায়াত নেতাদের গ্রেপ্তারের ঘটনায় গতকাল বুধবার ঠাকুরগাঁওয়ে এক অনুষ্ঠানে বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেছেন, ‘জামায়াতে  ইসলামী একটা রাজনৈতিক দল, তাদের রাজনীতি করার অধিকার আছে। আমাদের দেশের সংবিধান সেটা তাদের দিয়েছে।’

এদিকে প্রয়াত রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানকে নিয়ে আওয়ামী লীগের নেতাদের কটূক্তির প্রতিবাদে সম্প্রতি জামায়াত গণমাধ্যমে যে বিবৃতি দিয়েছে তাতে খুশি হতে পারেনি বিএনপি। এতে করে দল দুটির নেতাদের মধ্যে মানসিক দূরত্ব তৈরি হয়েছে বলে রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকরা মনে করছেন। তাই জামায়াত নেতাদের গ্রেপ্তারের পর বিএনপির দেওয়া দায়সারা গোছের বিবৃতিতে সে মানসিক দূরত্ব স্পষ্ট হয়েছে।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক বিএনপির একাধিক নেতা গতকাল দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আমাদের দলের প্রতিষ্ঠাতা ও প্রয়াত  রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানকে নিয়ে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাসহ আওয়ামী লীগ নেতারা যখন কটূক্তি করছেন, তখন জিয়ার নাম উল্লেখ না করে এর প্রতিবাদ জানিয়ে বিবৃতি দিয়েছে। তারা আমাদের নেতার নাম উল্লেখ না করে বিবৃতি দিয়েছে। এ জন্য আমরাও তাদের নেতাদের নাম উল্লেখ না করে বিরোধীদলীয় নেতাকর্মীদের গ্রেপ্তারের প্রতিবাদ জানিয়ে বিবৃতি দিয়েছি।’   

এ বিষয়ে জানতে চাইলে জামায়াতের নির্বাহী পরিষদের সদস্য মতিউর রহমান আকন্দ গতকাল দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘জামায়াতের ভাষা স্বাভাবিকভাবে আলাদা হবে। আমরা আমাদের বিবৃতিতে দেশের মহান ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে কটূক্তি না করতে বলেছি। সবাইকে উদ্দেশ করে বলেছি। কারণ ওনারা সবার ঊর্ধ্বে। তা ছাড়া রাজনীতি যারা করেন তাদের দলীয় কর্মসূচি আলাদা থাকে। আমরা আমাদের মতো করে বলেছি। তারা তাদের মতো করে বলেছে। এটা নিয়ে আমাদের কোনো বক্তব্য নেই।’

এদিকে হঠাৎ করে জামায়াত নেতাদের গ্রেপ্তারের বিষয়ে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, ‘নাশকতার অভিযোগে বৈঠকের খবর পেয়ে পুলিশ তাদের গ্রেপ্তার করেছে।’ এ বিষয়ে জামায়াত নেতা মতিউর রহমান আকন্দ বলেন, ‘এটি হঠাৎ করে নয়; বরং পরিকল্পিতভাবে করেছে। সরকার ক্ষমতায় আসার পর থেকে জামায়াতকে নিশ্চিহ্ন করতে কাজ করছে। এটি এরই ধারাবাহিকতা বলে আমরা মনে করি।’ 

গত সোমবার রাজধানীর ভাটারা থেকে জামায়াত নেতাদের গ্রেপ্তার করে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। পরের দিন মঙ্গলবার রাজধানী ঢাকায় নেতাদের গ্রেপ্তারের প্রতিবাদে মিছিল করে। এ ছাড়া নোয়াখালীর বেগমগঞ্জে জামায়াতের নেতাকর্মীরা নেতাদের গ্রেপ্তারের প্রতিবাদে ঝটিকা মিছিল বের করে।

জামায়াত নেতাদের গ্রেপ্তারের প্রতিবাদে গত মঙ্গলবার রাতে একটি বিবৃতি দেয় বিএনপি। বিবৃতিতে জামায়াত নেতাদের নাম উল্লেখ না করে দেশব্যাপী বিরোধী দলের নেতাকর্মীদের গ্রেপ্তারের ঘটনায় গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়।

বিবৃতিতে বিএনপি মহাসচিব বলেন, ‘সম্প্রতি সরকার বিএনপিসহ বিরোধী দলের নেতাকর্মীদের গ্রেপ্তারে উন্মত্ত হয়ে উঠেছে। গতকালকেও (সোমবার) বিরোধী দলের কয়েকজন শীর্ষস্থানীয় নেতাকে গ্রেপ্তার করা হয়। এর আগে ছাত্রদলের কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক সম্পাদকসহ বেশ কয়েকজন নেতাকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। নেতাকর্মীদের বাড়িতে বাড়িতে তল্লাশির নামে হয়রানি করা হচ্ছে। আওয়ামী ফ্যাসিবাদী দুঃশাসনের বিরুদ্ধে প্রতিবাদী নেতৃত্বকে জনগণ থেকে বিচ্ছিন্ন করতে এবং নেতাকর্মীদের মনোবল ধ্বংস করতেই বর্তমান ফ্যাসিস্ট সরকার বিএনপি এবং বিরোধী দলের নেতাদেরকে গ্রেপ্তার করছে।’

বিবৃতিতে তিনি বলেন, ‘জুলুমবাজ সরকারের দমন-নিপীড়নে জাতীয়তাবাদী শক্তিসহ বিরোধী নেতাকর্মীরা গ্রেপ্তারের ভয়ে ভীত নয়; বরং আরও বলীয়ান হয়ে বর্তমান ভোটাবিহীন শাসকগোষ্ঠীর দুঃশাসনের বিরুদ্ধে প্রতিবাদী হয়ে উঠবে। সরকারের কোনো গণভিত্তি নেই।’

মির্জা ফখরুল বলেন, ‘নিজেদের ব্যর্থতা, অযোগ্যতা, অদক্ষতা এবং দেশের প্রকৃত চিত্র ও সমস্যা আড়াল করতে অহেতুক নতুন নতুন বিতর্ক সৃষ্টি করছে। জোর করে ক্ষমতা ধরে রাখতে গিয়ে সরকার এখন পুরোপুরি দেউলিয়া হয়ে গেছে। এমন দুর্বিষহ পরিস্থিতিতে সরকারের উন্মত্ত আচরণ প্রতিহত করতে সকল গণতান্ত্রিক শক্তিকে ঐক্যবদ্ধভাবে এগিয়ে আসতে হবে।’

বিবৃতিতে মির্জা ফখরুল রাজধানী ঢাকাসহ দেশব্যাপী বিএনপিসহ বিরোধীদলীয় নেতাকর্মীদের সম্পূর্ণ অন্যায়ভাবে গ্রেপ্তারের ঘটনার তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানান এবং অবিলম্বে তাদের বিরুদ্ধে দায়েরকৃত বানোয়াট ও রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত মামলা প্রত্যাহারসহ নিঃশর্ত মুক্তির জোর দাবি করেন।

নোয়াখালীতে জেলা জামায়াতের আমিরসহ আটক ৩ : নোয়াখালী প্রতিনিধি জানিয়েছেন, মঙ্গলবার ভোররাতে উপজেলার বিভিন্ন স্থানে অভিযান চালিয়ে নোয়াখালীর বেগমগঞ্জে ঝটিকা মিছিল করে নাশকতা ও বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির অভিযোগে জামায়াতে ইসলামীর তিন নেতাকে আটক করেছে পুলিশ। তারা হলেন জেলা জামায়াতের আমির মাওলানা আলাউদ্দিন (৬০), জেলা জামায়াতের সাহিত্য সংস্কৃতিবিষয়ক সম্পাদক নাসিমুল গনি চৌধুরী ওরফে মহল (৪৫), জামায়াত নেতা ফখরুল ইসলাম দাউদ (৪০)।

স্থানীয় অধিবাসীরা জানান, গত মঙ্গলবার সকাল ৭টার দিকে নোয়াখালীর বেগমগঞ্জে জামায়াত ইসলামীর কেন্দ্রীয় সেক্রেটারি জেনারেল সাবেক সাংসদ অধ্যাপক গোলাম পরওয়ার, সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল মাওলানা রফিকুল ইসলাম খানসহ ১০ জনকে গ্রেপ্তারের প্রতিবাদে পুলিশের চোখ ফাঁকি দিয়ে নোয়াখালীর চৌমুহনী বাজারে বিক্ষোভ মিছিল করে জামায়াত ইসলামীর নেতাকর্মীরা।

নোয়াখালী জেলা পুলিশ সুপার মো. শহীদুল ইসলাম বলেন,  ‘গতকাল চৌমুহনী বাজার এলাকায় বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী ঝটিকা মিছিল করে নাশকতা ও বিশৃঙ্খলা  সৃষ্টি করায় বিশেষ ক্ষমতা আইনে ১১ জনের নাম উল্লেখ করে অজ্ঞাত ৩০-৪০ জনকে আসামি করে মামলা হয়েছে। ওই মামলায় তিন আসামিকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। গতকাল দুপুরে গ্রেপ্তার আসামিদের নোয়াখালী চিফ জুড়িশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে সোপর্দ করা হয়। অন্য আসামিদের গ্রেপ্তারের চেষ্টা চালাচ্ছে পুলিশ।’

এদিকে গতকাল ২০-দলীয় জোটের শরিক লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টি, জাতীয় পার্টি (কাজী জাফর) ও লেবার পার্টি পৃথক বিবৃতিতে জামায়াত নেতাদের গ্রেপ্তারের নিন্দা ও প্রতিবাদে জানিয়ে অবিলম্বে তাদের মুক্তি দাবি করেছে।