অন্তর্বর্তী তালেবান সরকারের শীর্ষনেতারা|314558|Desh Rupantor
logo
আপডেট : ১০ সেপ্টেম্বর, ২০২১ ০০:০০
অন্তর্বর্তী তালেবান সরকারের শীর্ষনেতারা
মুফতি এনায়েতুল্লাহ

অন্তর্বর্তী তালেবান সরকারের শীর্ষনেতারা

কাবুল দখলের তিন সপ্তাহ পর ৭ সেপ্টেম্বর অন্তর্বর্তীকালীন সরকার ঘোষণা করেছে তালেবান। সরকারের শীর্ষপদগুলোতে কাদের দায়িত্ব দেওয়া হলো এবং তাদের নীতি কেমন হবে তা নিয়ে বিশ্বব্যাপী আগ্রহের শেষ নেই। আফগানিস্তানের অন্তর্বর্তী সরকার ও তাদের ভবিষ্যৎ চ্যালেঞ্জ নিয়ে লিখেছেন মুফতি এনায়েতুল্লাহ

প্রত্যাবর্তন

১৯৯৪ সালের সেপ্টেম্বরে মোল্লা মোহাম্মদ ওমর আফগানিস্তানের কান্দাহারে ৫০ জন মাদ্রাসার ছাত্র নিয়ে ‘তালেবান’ প্রতিষ্ঠা করেন। প্রতিষ্ঠার দুই মাসের মধ্যে কান্দাহার দখলে নিয়ে গৃহযুদ্ধে জর্জরিত দেশটিতে নতুন শক্তি হিসেবে আভির্ভূত হয় তালেবান। ১৯৯৬ সালে সিংহভাগ আফগানিস্তানে নিজেদের শাসন প্রতিষ্ঠা করে তালেবান। ২০০১ সালের সেপ্টেম্বরে মার্কিনিরা ক্ষমতাচ্যুত করে তালেবানদের। এরপর দেশটিতে কয়েক দফা নির্বাচন ও সরকার গঠিত হলেও তালেবানরা যুদ্ধ অব্যাহত রাখে। অবশেষে তালেবানের সঙ্গে ‘বিশেষ সমঝোতার মাধ্যমে’ বিশ বছরের যুদ্ধ শেষ করে সৈন্য প্রত্যাহার শুরু করে মার্কিনিরা। এমন পরিস্থিতিতে আগস্টের শুরু থেকে তালেবানরা ক্ষমতা পুনরুদ্ধার অভিযান শুরু করে। ১৫ আগস্ট কাবুল দখলের তিন সপ্তাহ পর মোল্লা মোহাম্মদ হাসান আখুন্দকে সরকারপ্রধান এবং মোল্লা আবদুল গনি বারাদারকে প্রধান সহকারী ও মৌলভি আবদুস সালাম হানাফিকে দ্বিতীয় সহকারী করে অন্তর্বর্তী সরকার ঘোষণা করেছে তালেবান। অপরাজেয় পাঞ্জশির উপত্যকা দখলের পর আফগানিস্তানে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের ৩৩ সদস্যের নাম ঘোষণার পাশাপাশি আফগানিস্তানের নতুন নাম দেওয়া হয়েছে ‘ইসলামিক আমিরাত অফ আফগানিস্তান’।

নবগঠিত সরকারকে নানাবিধ চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে হবে। এর মধ্যে রয়েছে অভ্যন্তরীণ বিভিন্ন গোষ্ঠীকে সন্তুষ্ট রাখা, সম্ভাব্য বিদ্রোহ দমন, বিদেশিদের কাছে গ্রহণযোগ্যতা অর্জন এবং সর্বোপরি আর্থিক সংকট নিরসন করে দেশের ভগ্নপ্রায় অর্থনীতিকে সঠিক পথে নিয়ে যাওয়া। এই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় তালেবানরা প্রবীণদের পাশাপাশি নবীনদের ওপরও ভরসা করছে। বিশেষ করে ১৯৯৬-২০০১ পর্যন্ত প্রথম তালেবান সরকারে থাকা অভিজ্ঞ ১৪ জনের পাশাপাশি সরাসরি যুদ্ধের ময়দানে থাকা দ্বিতীয় প্রজন্মের ১২ তরুণকে সরকারে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।

সরকারে আফগানিস্তানের সাবেক প্রেসিডেন্ট হামিদ কারজাই, সাবেক প্রধানমন্ত্রী গুলবুদ্দিন হেকমতিয়ার এবং আবদুল্লাহ আবদুল্লাহসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের প্রধান ও নৃগোষ্ঠী নেতারা স্থান পাননি। ধারণা করা হচ্ছে, তাদের নিয়ে আলাদা একটি উপদেষ্টা পরিষদ গঠন করা হবে। নতুন সংবিধান প্রণয়নের আগ পর্যন্ত এই সরকার দেশ পরিচালনা করবে। সরকারের নির্দিষ্ট মেয়াদ, রূপরেখা ও কার্যপরিচালনা পদ্ধতি সম্পর্কেও কিছু বলা হয়নি।

তালেবানের প্রধান মুখপাত্র জাবিউল্লাহ মুজাহিদ বলেছেন, এটা একটি অন্তর্বর্তীকালীন সরকার। তারা দেশের অন্যান্য অঞ্চল ও জাতিগোষ্ঠীর লোকজনকে সরকারে নেওয়ার চেষ্টা করবেন।

মোল্লা মোহাম্মদ হাসান আখুন্দ

২০১০ সালে তালেবান কাতারের রাজধানী দোহায় তাদের রাজনৈতিক কার্যালয় স্থাপন করে। সেখানে তারা আফগান সরকারের সঙ্গে নানা সমঝোতা বৈঠক করে আসছিল বছরের পর বছর ধরে। বহির্বিশ্বের নেতাদের সঙ্গে তালেবান নেতারা দোহা কার্যালয়ে বৈঠক করতেন। ২০১৩ সালের পর থেকে যেসব সিনিয়র তালেবান নেতা দেশে ফিরতে পারেননি তারা এতদিন দোহায় অবস্থান করছিলেন।

কাবুল দখলের পর তালেবানের সরকারে মোল্লা হাইবাতুল্লাহকে শীর্ষে রেখে মোল্লা আবদুল গনি বারাদারকে প্রধানমন্ত্রী কিংবা রাষ্ট্রপতি করে সরকার গঠনের সম্ভাবনার কথা উচ্চারিত হতে থাকে। বিশেষ করে দোহা কার্যালয়কেন্দ্রিক নেতা হিসেবে বিভিন্ন দেশের সঙ্গে শান্তি আলোচনায় নেতৃত্ব দেওয়া এবং আমেরিকার সঙ্গে শান্তিচুক্তি স্বাক্ষরের কারণে এ ধারণা করা হয়। কিন্তু না, তাকে প্রধান সহকারী করে মোল্লা মোহাম্মদ হাসান আখুন্দকে প্রধানমন্ত্রী করে সরকার ঘোষণা করা হয়।

মোল্লা হাসান আখুন্দ কান্দাহারের বাসিন্দা। জাতিগতভাবে পশতুনদের কাকার গোত্রের সদস্য। আফগানিস্তান ও পাকিস্তানে প্রতিষ্ঠিত দেওবন্দি ধারার বিভিন্ন মাদ্রাসায় তিনি পড়াশোনা করেছেন। ১৯৯৪ সালে যে চারজন মিলে তালেবান প্রতিষ্ঠা করেন মোল্লা মোহাম্মদ হাসান আখুন্দ তাদের একজন। মোল্লা ওমরের প্রিয়ভাজন হওয়ায় জাতিসংঘ তার ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছিল। তালেবানের ভেতর তিনি অত্যন্ত শ্রদ্ধাভাজন। বর্তমান সর্বোচ্চ নেতা হাইবাতুল্লাহ আখুন্দজাদাও তাকে খুব পছন্দ করেন। তিনি তালেবানের রাহবারি শুরা তথা লিডারশিপ কাউন্সিলের প্রধান হিসেবে দীর্ঘদিন কাজ করছেন। সামরিক কার্যক্রমেও তিনি দিকনির্দেশনা দেন।

২০০১ সালে মার্কিন সামরিক অভিযানের মুখে তালেবান ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর গঠিত কোয়েটা শুরায় (রাহবারি শুরা, কাউন্সিল অব লিডার্স নামেও অভিহিত) তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। তিনি ইসলামের ওপর বেশ কয়েকটি গ্রন্থ রচনা করেছেন। প্রশাসনিক অভিজ্ঞতাও রয়েছে তার। তিনি ১৯৯৬ থেকে ২০০১ সালের আফগানিস্তান সরকারে প্রথমে তিনি উপ-পররাষ্ট্রমন্ত্রী, পরে উপ-প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেছেন।

ভারপ্রাপ্ত প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার পর ‘সাধারণ ক্ষমা ঘোষণা’ এবং ‘পালিয়ে যাওয়া আফগান কর্মকর্তাদের’ দেশে ফিরে আসার আহ্বান জানিয়েছেন তিনি। আল জাজিরাকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, ‘সরকার কূটনীতিক দূতাবাস ও মানবিক সহায়তাকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর নিরাপত্তার নিশ্চয়তা দিচ্ছে। এই সরকার ধর্মের ঊর্ধ্বে উঠে সব দেশের সঙ্গে ইতিবাচক ও শক্তিশালী সম্পর্ক প্রতিষ্ঠা করতে আগ্রহী। আফগানিস্তানের ইতিহাসের এই ঐতিহাসিক মুহূর্তের জন্য আমরা বিপুল অর্থ ও জীবনহানির ক্ষতির শিকার হয়েছি। আফগানিস্তানের জনগণের রক্তপাত, হত্যাকাণ্ড ও বিদ্বেষের পর্বের অবসান ঘটেছে।’ যুক্তরাষ্ট্র ও তার সমর্থিত প্রশাসনের পক্ষে যারা যারা কাজ করেছেন, তাদের সবার প্রতি ‘সাধারণ ক্ষমার ঘোষণা’ পুনরাবৃত্তি করে বলেন, ‘কেউ প্রমাণ করতে পারবে না, তিনি প্রতিহিংসার শিকার হয়েছেন। এ ধরনের উত্তপ্ত পরিস্থিতিতে যে কেউ ইচ্ছামতো কাজ করতে পারে। কিন্তু আমরা সেটা হতে দিইনি। আমরা আগের কার্যক্রমের জন্য কারও ক্ষতি করতে চাই না। আমি আফগান জনগণকে বলতে চাই, আমরা সবার কল্যাণ, সফলতা কামনা করছি। আমরা ইসলামি ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করতে চাই। আমরা চাই, সবাই এই রহমতময় প্রকল্পে আমাদের সঙ্গে অংশগ্রহণ করুক।’

আড়ালে সর্বোচ্চ নেতা

আফগানিস্তানের নবগঠিত সরকার তালেবানের সর্বোচ্চ নেতা মোল্লা হাইবাতুল্লাহ আখুন্দজাদার অনুমোদন সাপেক্ষে যাবতীয় কাজ করবে ও সিদ্ধান্ত নেবে। তিনি ইসলামিক আমিরাত অফ আফগানিস্তানের আমিরুল মুমিনিন হিসেবে দায়িত্ব পালন করবেন। তিনি সরাসরি রাষ্ট্রের দৈনন্দিন কার্যক্রমের সঙ্গে সংযুক্ত না থেকে গাইড হিসেবে রাষ্ট্র পরিচালনায় দিকনির্দেশনা দেবেন। এক কথায়, মোল্লা হাইবাতুল্লাহ তালেবানের প্রধান হিসেবে অন্তরালে থেকে সরকার পরিচালনার পাশাপাশি সংগঠন পরিচালনা, গোষ্ঠীদ্বন্দ্ব নিরসন এবং সম্পর্কোন্নয়নে ভূমিকা রাখবেন।

সরকার গঠনের পর আড়ালে থাকা তালেবানের সর্বোচ্চ নেতা হাইবাতুল্লাহ আখুন্দজাদা বলেছেন, আফগানিস্তানের নবগঠিত সরকার শরিয়া আইন অনুসরণ করবে। ইংরেজি ভাষায় দেওয়া বিবৃতিতে হাইবাতুল্লাহ আখুন্দজাদা জানান, ‘আমি দেশবাসীকে নিশ্চিত করছি যে, নতুন সরকারের দায়িত্বপ্রাপ্ত নেতারা দেশে ইসলামি শাসন এবং শরিয়া আইন অনুসরণের ব্যাপারে কঠোরভাবে কাজ করবেন।’ আখুন্দজাদা আফগানদের উদ্দেশ্যে বলেন, ‘নতুন নেতৃত্ব দীর্ঘস্থায়ী শান্তি, সমৃদ্ধি ও উন্নয়ন নিশ্চিতে নিবিড়ভাবে কাজ করবে। সুতরাং কারও দেশত্যাগ করার চেষ্টা করা উচিত হবে না। কোনো ব্যক্তির কিংবা গোষ্ঠীর সঙ্গে ইসলামিক আমিরাতের কোনো সমস্যা নেই। আপনারা-আমরা সবাই মিলে সুন্দর শাসনব্যবস্থা ও আফগানিস্তানকে শক্তিশালী করতে কাজ করব। আমরা আমাদের যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশকে পুনর্গঠিত করব।’

এই নেতা খুব একটা জনসম্মুখে আসেন না। সাধারণ জীবন-যাপনে অভ্যস্ত এই নেতাকে কঠিন নিরাপত্তায় ঢেকে রাখে তালেবান সদস্যরা। ক্ষমতা গ্রহণের পর তাদের মুখপাত্র জাবিউল্লাহ মুজাহিদ বলেন, ‘তিনি কান্দাহারে রয়েছেন, শিগগিরই তার জনসম্মুখে আসার কথা রয়েছে।’ হাইবাতুল্লাহ আখুন্দজাদা ২০১৬ সাল থেকে তালেবানের রাজনৈতিক, ধর্মীয় এবং সামরিক বিষয়ে চূড়ান্ত কর্র্তৃত্বের অধিকারী। অনুমান করা হয় তার বয়স ৬০। আফগানিস্তানের দ্বিতীয় বৃহত্তম শহর কান্দাহারে জন্ম নেওয়া আখুন্দজাদার একটি মাত্র ছবি পাওয়া যায়, যে ছবিতে তিনি সরাসরি ক্যামেরার দিকে তাকিয়ে আছেন। মাথায় সাদা পাগড়ি, ধূসর লম্বা দাড়ি। অভিব্যক্তিহীন বিবর্ণ এক মুখ। লোকচক্ষুর অন্তরালে থাকা আখুন্দজাদা তালেবানের দায়িত্ব পাওয়ার পর সংগঠনে বেশ কিছু পরিবর্তন আনেন। এর ফলে গোষ্ঠীদ্বন্দ্ব কমে তালেবান শক্তিশালী হয়।

কারাগার থেকে মন্ত্রিত্বে

আফগানিস্তানের সদ্যগঠিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সদস্য হিসেবে যাদের নাম ঘোষণা করা হয়েছে, তার মধ্যে বেশ কয়েকজন সদস্য আমেরিকার গুয়ানতানামো বে কারাগারসহ দেশ-বিদেশের কারাগারে দীর্ঘদিন বন্দি ছিলেন। তাদের কেউ মুক্তি পেয়েছেন আনীত অভিযোগের সত্যতা না মেলায়, কেউ মুক্ত হয়েছেন বন্দি বিনিময় কর্মসূচির আওতায়। তালেবানের সীমান্ত ও আদিবাসীবিষয়ক মন্ত্রী মোল্লা নূরুল্লাহ নূরী, তথ্য ও সংস্কৃতিমন্ত্রী মোল্লা খায়রুল্লাহ খায়েরখা, উপ-প্রতিরক্ষামন্ত্রী মোল্লা মোহাম্মদ ফাজিল ও গোয়েন্দা বিভাগের পরিচালক আবদুল হক ওয়াসিক দীর্ঘদিন যুক্তরাষ্ট্রের হাতে বন্দি হয়ে গুয়ানতানামো বে কারাগারে ছিলেন। ২০১৪ সালে তালেবানের হাতে বন্দি থাকা যুক্তরাষ্ট্রের সেনাবাহিনীর সার্জেন্ট বোয়ে বার্গধালের সঙ্গে বন্দি বিনিময়ের অংশ হিসেবে ওই চার তালেবান নেতাকে মুক্তি দেওয়া হয়। এর বাইরে উপ-প্রধানমন্ত্রী মোল্লা আবদুল গনি বারাদার পাকিস্তানে এবং গণপূর্তমন্ত্রী মোল্লা আবদুল মান্নান ওমারিও দীর্ঘদিন যুক্তরাষ্ট্রের হাতে বন্দি ছিলেন।

মোল্লা আবদুল গনি বারাদার ২০১০ সালে যুক্তরাষ্ট্র-পাকিস্তানের যৌথ অভিযানে করাচি থেকে গ্রেপ্তার হন। পরবর্তী আট বছর তিনি কারাগারে বন্দি ছিলেন। দোহায় যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে শান্তি আলোচনা শুরু হওয়ার পর তাকে মুক্তি দেওয়া হয়। ২০১৯ সালের জানুয়ারি থেকে কাতারের দোহায় তালেবানের রাজনৈতিক দপ্তরের প্রধান হিসেবে তিনি দায়িত্ব পালন করে আসছিলেন। তালেবান নেতা হিসেবে ২০২০ সালে তিনিই প্রথম যুক্তরাষ্ট্রের কোনো প্রেসিডেন্টের সঙ্গে (ডোনাল্ড ট্রাম্প) টেলিফোনে কথা বলেন। তার ঠিক আগে আফগানিস্তান থেকে যুক্তরাষ্ট্রের সেনা প্রত্যাহারের দোহা চুক্তিতে তালেবানের পক্ষে স্বাক্ষর করেন বারাদার। সম্পর্কে তিনি মোল্লা ওমরের ভগ্নিপতি।

অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব ও গৃহযুদ্ধের আশঙ্কা

বিগত দুই বছর তালেবানের মুখ হয়ে ওঠা দোহা অফিসের কর্মকর্তারা নতুন সরকারে দ্বিতীয় সারিতে রয়েছেন। প্রথমে ধারণা করা হয়েছিল আবদুল গনি বারাদার সরকারের দায়িত্ব পেতে চলেছেন। কিন্তু হাসান আখুন্দ দায়িত্ব দেওয়ার মাধ্যমে সরকারে দোহা কার্যালয় ও মাঠের নেতাদের মধ্যে সমন্বয় করা হলো বলে ধারণা করা হচ্ছে। মন্ত্রিসভায় জ্যেষ্ঠ ও কট্টরপন্থি আদি তালেবান নেতারা স্থান পেয়েছেন। তাদের অধিকাংশই আশির দশকে সোভিয়েত দখলদারিত্বের বিরুদ্ধে লড়াই করেছেন। এছাড়া গত দুই দশক ধরে দেশটিতে মার্কিন বাহিনীর বিরুদ্ধে লড়াইয়েও তারা সামনের সারিতে ছিলেন।

আফগানিস্তানের পরিস্থিতি যে বেশ জটিল তা উপলব্ধি করা যায়। ভূ-রাজনৈতিক অবস্থান আফগানিস্তানের বড় সম্পদ, আবার এটিই আফগানিস্তানের জন্য হয়ে উঠেছে বড় বিপদের কারণ। বিভিন্ন সময় বৃহৎশক্তির হামলার শিকার হতে হয়েছে দেশটিকে।

শুধু সরকার গঠন নয়, তালেবানের সামনে রয়েছে আদর্শিক ও সাংস্কৃতিক চ্যালেঞ্জ। এই পরিস্থিতিতে তালেবানরা যে ৩৩ জনের অন্তর্বর্তীকালীন নতুন সরকার গঠন করেছে, সেটির চেহারা পুরনো তালেবানের মতোই। সব চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হচ্ছে, সরকারে অন্য রাজনৈতিক দল ও গোষ্ঠীগুলোকে বাদ দেওয়া হয়েছে। যদিও তালেবানরা বলেছিল, তারা একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক সরকার চায়। কিন্তু সরকার গঠনের পর আগের কথার সঙ্গে বাস্তবতার মিল না থাকায়, তাজিক ও হাজারাদের মতো সংখ্যালঘুরা কী ভাবছে তা এখনো প্রকাশ্যে আসেনি।  অন্যদিকে কাবুল দখলের ৩ সপ্তাহের মধ্যেই তালেবানরা বিক্ষোভের মুখোমুখি হয়েছে। ৪ সেপ্টেম্বর তারা কাবুলে আফগান নারীদের একটি বিক্ষোভকে শক্তি দিয়ে দমন করেছে। পশ্চিমে হেরাত, ফারাহ এবং উত্তরে বালখ এবং মাজার-ই-শরিফে একই ধরনের বিক্ষোভের সম্মুখীন হয়েছে।

দীর্ঘমেয়াদে চলে আসা জাতি, ধর্মীয় ও গোষ্ঠীগত উত্তেজনাও মোকাবিলা করতে হবে তালেবানদের। এখানে ব্যর্থ হলে উত্তেজনা বাড়বে। যা দেশকে আরেকটি গৃহযুদ্ধের দিকে ধাবিত করতে পারে। সবচেয়ে কঠিন বিষয়, নতুন সরকারকে আন্তর্জাতিক মহলে গ্রহণযোগ্যতা বাড়ানোর পাশাপাশি আফগানিস্তানের তলিয়ে যাওয়া অর্থনীতি, বিপর্যস্ত অবকাঠামো, ভঙ্গুর স্বাস্থ্যদশা পুনরুদ্ধার ও শিক্ষাব্যবস্থা গতিশীল করার জন্য কাজ করতে হবে। নারীর কর্মসংস্থান, সাংস্কৃতিক কর্মকা- ও খেলাধুলার বিষয়ে তালেবানদের দৃষ্টিভঙ্গির বিষয়ে বিশ্ববাসীর নজর থাকবে।