‘মোটা অঙ্ক’ ছাড়া কাজ করেন না এসআই আকসাদুদ|314644|Desh Rupantor
logo
আপডেট : ১০ সেপ্টেম্বর, ২০২১ ০০:০০
‘মোটা অঙ্ক’ ছাড়া কাজ করেন না এসআই আকসাদুদ
সরোয়ার আলম

‘মোটা অঙ্ক’ ছাড়া কাজ করেন না এসআই আকসাদুদ

‘আমি সাব-ইন্সপেক্টর আকসাদুদ। মোটা অঙ্কের অর্থ ছাড়া কাজ করি না। বড় বড় মালের কাজ ধরবেন। তাহলেই আমারে জানাবেন। বুঝেছেন কী বলছি। বাংলা টাকা না ধরে রিয়াল বা ডলার হলে সবচেয়ে ভালো। সাবধানে কাজ করতে হবে।’ এক সোর্সের সঙ্গে মোবাইল ফোনে এসব কথা বলেন এক প্রবাসীর অর্থ ছিনিয়ে নেওয়ার অভিযোগে গ্রেপ্তার সিআইডির সাব-ইন্সপেক্টর আকসাদুদ জামান। আকসাদুদের সোর্সের সঙ্গে কথা বলার তিনটি অডিও গতকাল বৃহস্পতিবার ফাঁস হয়েছে। কীভাবে হুন্ডি ব্যবসায়ী ও প্রবাসীদের টাকা লুট করতে হবে সেই পরিকল্পনা তথ্য ফাঁস হয় ভয়েস রেকর্ডের মাধ্যমে। এ সংক্রান্ত তিনটি অডিও রেকর্ড দেশ রূপান্তরের কাছে এসেছে। ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ ডিবির হাতে গ্রেপ্তার হওয়ার পর তার কাছ থেকে চাঞ্চল্যকর তথ্যও উদঘাটন করা হয়েছে। চাকরিজীবনে তিনি একাধিক টাকা লুটের ঘটনা ঘটিয়েছেন বলে তথ্য পেয়েছে পুলিশ। গতকাল আকসাদুদ জামানকে গ্রেপ্তার দেখিয়ে আদালতে পাঠিয়েছে পুলিশ। জিজ্ঞাসাবাদের জন্য পাঁচ দিনের রিমান্ডে নেওয়া হয়েছে।

এদিকে ডিবির এক কর্মকর্তার সঙ্গে টেলিফোনে ১ কোটি ৪২ লাখ টাকার লেনদেন করার ভয়েস রেকর্ড নিয়ে আলাদাভাবে তদন্ত করছে ডিএমপি। অডিওটি আসল না নকল তা যাচাই-বাছাই করা হয়েছে বলে পুলিশের এক কর্মকর্তা দেশ রূপান্তরকে জানিয়েছেন। তিনি বলেছেন, ‘দুই সাব-ইন্সপেক্টরের নেতৃত্বে ডাকাত চক্র রাজধানীতে সক্রিয় তা বিশ^াসও করতে পারছি না। এসব পুলিশ সদস্যের জন্য আমাদের বদনাম হচ্ছে।’

গোয়েন্দা পুলিশ সূত্র জানায়, সিআইডি থেকে বরখাস্ত হওয়া গ্রেপ্তার হওয়া এসআই আকসাদুদ জামানকে রাতভর জিজ্ঞাসাবাদ করে ডিবির ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা। জিজ্ঞাসাবাদে তিনি তার অপকর্মের বিষয়ে নানা তথ্য দিয়েছেন। চাকরিজীবনে তিনি কতগুলো অপরাধ কর্মকা- চালিয়েছেন সেই তথ্যও দিয়েছেন। ডিবির আরেক সাব-ইন্সপেক্টর রাশেদ তার সঙ্গে বেশ কয়েকটি অপরাধে সম্পৃক্ত ছিলেন। বছর দেড়েক আগে এক হুন্ডি ব্যবসায়ীর কাছ থেকে কোটি টাকা লুটের ঘটনায় পুলিশ এসআই রাশেদকে গ্রেপ্তার করে।

অভিযুক্ত সিআইডি কর্মকর্তার স্ত্রী অভিযোগ করেছেন, আসামিদের ছাড়িয়ে নিতে তারা ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের একজন অতিরিক্ত উপপুলিশ কমিশনারকে প্রায় দেড় কোটি টাকা ঘুষ দিয়েছিলেন। কিন্তু টাকা নিয়েও ডিবি পুলিশ কাউকে ছাড়েনি। উল্টো বিভাগীয় মামলার মাধ্যমে সিআইডির ওই কর্মকর্তাকে চাকরিচ্যুত করা হয়েছে। এ নিয়ে খোদ পুলিশ কর্মকর্তাদের মধ্যেই চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে।

আকসাদুদ ও সোর্সের ৩টি ভয়েস রেকর্ড ফাঁস : এসআই আকসাদুদ জামানের ঘনিষ্ঠ সোর্স আমির হোসেন সম্প্রতি ফোন করেন আকসাদুদকে। আমির তার মোবাইল থেকে ফোন করলে তিনি ফোন রিসিভ করেন। আমির হোসেন বলেন, আসসালামু আলাইকুম স্যার। হ্যাঁ বলেন। স্যার আপনার নাম্বার অনেকক্ষণ ধরে বিজি পাচ্ছি। এখন কী করব স্যার। এই সময় আকসাদুদ বলেন, কী হয়েছে আপনার, বলুন তো দেখি। তখন আমির বলেন, ওই কাজটি ১২ টাকার। পার্টি কালকের রাত্রে যাবে। ১২ টাকার কাজ। এখন কী করতে পারি স্যার? তখন আকসাদুদ বলেন, টাকা নিয়ে কোথায় থেকে যাবে? এই সময় আমির বলেন, যাইবো ইয়া থেকে। ওই যে ওইডারে কী কয়, গোপীবাগ থেকে। এতে আকসাদুদ বলেন, আগের জায়গা থেকে নাকি? এই প্রশ্ন করলে আমির হোসেন বলেন, না স্যার, অন্য জায়গা থেকে। আচ্ছা বুঝছি, এই কথা বলে আকসাদুদ বলেন, পার্টি কি অন্য? তখন আমির বলেন, হ্যাঁ স্যার অন্য। এই কথা শুনে আকসাদুদ বলেন, ১২ টাকা বলতে কি রিয়াল? না স্যার, রিয়াল না। এগুলো বাংলাদেশি টাকা। ১২ লাখ টাকা। সংক্ষেপে আপনাকে ১২ টাকা বলেছি। তখন আকসাদুদ আমিরকে বলেন, কিসে যাবে? আবারও আমির বলেন, স্যার এটি কিন্তু রিয়াল না। সবগুলো বাংলা টাকা। তখন আকসাদুদ বলেন, তাহলে বাংলা টাকা ১২ লাখ। দুর মিয়া এত কম টাকা। আমি আকসাদুদ কি এত কম অর্থের কাজ করি? তখন আমির বলেন, স্যার আপনি যদি কাজটি করেন! তখন আকসাদুদ কিছুটা উত্তেজিত হয়ে আবারও বলেন, আমি কি এত ছোট কাজ করি? দুর এসব ছোটখাটো কাজ আমাকে জানাইবেনই না। তখন আমির বলেন, তাহলে না করে দেই স্যার। ‘বাংলা ১২ লাখ ২০ লাখ’ এসব টাকা হইলো। মিয়া... কথা কন। আবারও বলছি এসব ছোটখাটো কাজের বিষয় নিয়ে আমার সাথে আর কথা বইলেন না। আমির তখন বলেন, ঠিক আছে স্যার আমি না কইরা দেই। তখন আকসাদুদ বলেন, ১২ লাখ রিয়াল হইলে হইতো। কাজ কইরা পুষাইতো। এই সময় আমির আবারও বলেন, স্যার ১২ লাখ তো অনেক টাকা। এই কথা শুনে আকসাদুদ আবারও রেগে গিয়ে বলেন দুর মিয়া। ...কথা আর কইয়েন না। মোটা অঙ্কের দানে ধরেন। আপনি যদি এই রকম বড় কাজ পান তাহলে কথা কইয়েন। আমার তো অনেক জায়গায় দিতে হয়। সেটা কি আপনি বুঝেন না? তখন আমির বলেন, জি স্যার জি স্যার। হেইয়া স্যার আপনি তো বুঝেন না। আমি তো ওই কাজে একজনকে ৩০ হাজার টাকা দিয়েছি। হে আরও চাইছিল। পরে স্যার ৫০ হাজার টাকা মিলাইয়া দিছি না স্যার? এই কথা বলার পর আকসাদুদ বলেন, ...গালি দিয়ে বলেন, এসব ঝামেলার কাজে যামু না ভাই। ঝামেলা ভালো লাগে না। দুর...। এসব ছোটখাটো বিষয় নিয়ে আর কথা বইলেন না আমার সাথে। মিয়া কথা-কাজে কোনো মিল নাই। তখন আমির হোসেন বলেন, ঠিক আছে স্যার বড় কাজ হইলে জানামো স্যার। আকসাদুদ তাকে বলেন, ঝুট-ঝামেলা হলে কোনো কাজে যামু না। বড় হোক আর ছোট হোক। ভালো বা নির্ভেজাল কাজ হলে আমারে বইলেন। বুঝেছেন ভাই। আবারও বলছি, ঝুট-ঝামেলার কোনো কাজে আমি যামু না ভাই। আমির বলেন, এইডা ঠিক আছে স্যার। আপনি যেটা বলবেন সেটা করমো স্যার। তখন আকসাদুদ বলেন, ঠিক আছে সাক্ষাতে কথা বলব।

এই দুজনের দ্বিতীয় ভয়েস রেকর্ডে সোর্স আমির হোসেন ফোন করেন আকসাদুদকে। বলেন, স্যার। তখন আকসাদুদ বলেন, আমি তো সকালে ফোন দিয়েছিলাম আপনাকে। ফোন তো ধরলেন না। তখন আমির বলেন, স্যার সকালে মনে হয় আমি ঘুমিয়ে ছিলাম। স্যার আমি তো বরিশালে। আগামীকাল চইল্লা আসুম স্যার। আকসাদুদ বলেন, তাই। তখন আমির বলেন, স্যার আপনি অনুমতি দিলে আমি রাতেই চইল্লা আসুম স্যার। ঠিক আছে আমি অন্য একটি নাম্বারে আপনাকে ফোন দিচ্ছি। ওই নাম্বারটি ধইরেন।

তৃতীয় ভয়েস রেকর্ডে আকসাদুদ আমির হোসেনকে ফোন করেন। আমির ফোন রিসিভ করে বলেন, আসসালামু আলাইকুম, স্যার বলেন, আকসাদুদ বলেন, জি বলেন। আমির বলেন, স্যার ১২ টাকার আরেকটা কাজ পেয়েছি। করবেননি স্যার। তখন আকসাদুদ বলেন, কী কাজ? উত্তরে আমির বলেন, স্যার করবেন কাজটি। এটি রিয়াল স্যার। তখন আকসাদুদ বলেন, আপনি কই? আমির বলেন, স্যার আমি তো দেশেই আছি। বরিশালে। আকসাদুদ বলেন, মোবাইলে তো আলাপ করা যাবে না কিছুই। হু, এইডা কবে যাবে? তখন আমির বলেন, স্যার বুধবার রাতে। আপনি যদি করেন তাহলে দ্রুত সময়ে চইল্লা আসমো স্যার। তখন আকসাদুদ বলেন, আপনার এই নাম্বারটি তো খোলা আছে তাই না? আমির বলেন, জি স্যার। আকসাদুদ বলেন, ঠিক আছে এই বিষয়ে আমি পরে কথা বলব।

পুলিশ কর্মকর্তার বক্তব্য : ডিবির প্রধান অতিরিক্ত কমিশনার এ কে এম হাফিজ আক্তার জানান, এক বছর আগে এক প্রবাসীর কাছ থেকে নগদ টাকা ও মালামাল লুটে ঘটনার মূল হোতা বরখাস্ত হওয়ার এসআই আকসাদুদ জামানকে গত বুধবার রাতে রংপুর মিঠাপুকুর থেকে গ্রেপ্তার করা হয়। প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে ঘটনার দায় স্বীকার করেছেন তিনি। তার নেতৃত্বেই ডাকাতি হয়েছিল। জিজ্ঞাসাবাদের জন্য তাকে পাঁচ দিনের রিমান্ডে নেওয়া হয়েছে। গত বছর ১৯ অক্টোবর রাজধানীর কাওলা থেকে রোমান নামে এক প্রবাসীর টাকা ও কাপড়ভর্তি ব্যাগ নিয়ে পালিয়ে যান আকসাদুদ। ওই প্রবাসীর কাছ থেকে ৫ হাজার ইউএস ডলার, ২ হাজার দিরহাম, ২ হাজার টাকা, দুটি ব্যবহৃত মোবাইলসহ কাপড়ভর্তি ব্যাগ লুট করেন। তথ্যপ্রযুক্তির সহায়তায় ও ঘটনাস্থল সিটিসিভি ফুটেজ পর্যবেক্ষণ করে এ ঘটনায় জড়িত ছয়জনকে গ্রেপ্তার করা হয়। তাদের জিজ্ঞাসাবাদের বেরিয়ে আসে ঘটনার মূল রহস্য। জড়িত আরও একজন রয়েছেন পলাতক। তাকে ধরার চেষ্টা চলছে।

১ কোটি ৪২ লাখ টাকা ঘুষ নেওয়ার অভিযোগ : আলোচিত এ ঘটনাটি প্রায় এক বছর ধরে গোপন থাকলেও সম্প্রতি একটি অডিও ক্লিপের সূত্র ধরে তা আলোচনায় আসে। ওই অডিও ক্লিপে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের একজন কর্মকর্তার বিরুদ্ধে ১ কোটি ৪২ লাখ টাকা ঘুষ নেওয়ার অভিযোগ করেছেন এসআই আকসাদুদ জামানের স্ত্রী তাহমিনা আক্তার। ভয়েস রেকর্ডে তাহমিনা আক্তার ডিবি কর্মকর্তাকে বলেন, ১ কোটি ২৮ লাখ টাকার পাশাপাশি তাকে আরও ব্যক্তিগতভাবে ১৪ লাখ টাকা দেওয়ার কথা বলেন। ওই কর্মকর্তা পুরো টাকা স্যারদের কাছে দেওয়া হয়েছে জানিয়ে এখান থেকে কিছু ফেরত নেওয়ার ব্যবস্থা কথা বলেন। একই সঙ্গে তিনি বারবার সাক্ষাতে কথা ও অফিসে দেখা করতে বলেন। যোগাযোগ করা হলে ওই পুলিশ কর্মকর্তা দেশ রূপান্তরকে বলেন, ভয়েস রেকর্ডটি টেম্পারড ও ফেব্রিকেটেড করে তৈরি করা হয়েছে। ডাকাতির ঘটনায় এসআই আকসাদুদের চাকরি চলে যাওয়ায় সে ক্ষিপ্ত হয়ে এ কাজ করেছে। এর আগেও আকসাদুদ তাকে দেখে নেওয়ার হুমকি দিয়েছিল।

এ প্রসঙ্গে ডিএমপির ঊর্ধ্বতন এক কর্মকর্তা দেশ রূপান্তরকে বলেন, পুলিশের বিরুদ্ধে আসা ঘুষের অভিযোগটি সত্য না মিথ্যা তা যাচাই-বাছাই করা হচ্ছে। এজন্য পুলিশের একটি টিম বিষয়টি তদন্ত করছে। ঘুষ নেওয়ার বিষয়টি সত্য হলে অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। আর মিথ্যা হলে যারা এসব করেছে তাদের বিরুদ্ধেও আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।