কিশোর অপরাধীদের নিয়ে পুলিশের উদ্বেগ|315239|Desh Rupantor
logo
আপডেট : ১৩ সেপ্টেম্বর, ২০২১ ০০:০০
দেড় বছর পর সশরীরে দুদিনের ক্রাইম কনফারেন্স শুরু
কিশোর অপরাধীদের নিয়ে পুলিশের উদ্বেগ
সরোয়ার আলম

কিশোর অপরাধীদের নিয়ে পুলিশের উদ্বেগ

রাজধানী ঢাকাসহ দেশজুড়ে কিশোর অপরাধীদের তৎপরতা বেড়ে গেছে। রাস্তার মোড়ে মোড়ে তাদের আড্ডাবাজি দেখা যায় হরহামেশা। এসব কিশোর গ্যাং সদস্য নিজ নিজ এলাকায় দাপট দেখিয়ে বিভিন্ন অপরাধমূলক কাজও করছে। তাদের মধ্যে অনেকে বিত্তবান পরিবারের সন্তান। এসব কিশোর গ্যাং সদস্যকে কঠোরভাবে প্রতিহত না করলে সামনের দিনগুলোতে খেসারত দিতে হবে। গতকাল রবিবার পুলিশ সদর দপ্তরে শুরু হওয়া দুই দিনের ক্রাইম কনফারেন্সের প্রথম দিনে পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা এই উদ্বেগের কথা জানিয়েছেন। সভায় সভাপতিত্ব করেন পুলিশের মহাপরিদর্শক (আইজিপি) ড. বেনজীর আহমেদ। সভায় সবকটি মেট্রোপলিটন পুলিশ কমিশনার, উপ-পুলিশ কমিশনার, রেঞ্জ উপ-মহাপরিদর্শক (ডিআইজি) ও জেলার পুলিশ সুপাররা (এসপি) উপস্থিত ছিলেন।

সংশ্লিষ্টরা দেশ রূপান্তরকে জানান, করোনা পরিস্থিতিতে প্রায় দেড় বছর পর সশরীরে গতকাল বেলা ১১টায় পুলিশ সদর দপ্তরের ৪র্থ তলায় হল অব ইন্ট্রেগেটিতে ক্রাইম কনফারেন্সের প্রথম দিনের বৈঠক শুরু হয়। এর আগে ভার্চুয়ালি বৈঠক হয়েছে পুলিশ সদর দপ্তর থেকে। স্বাস্থ্যবিধি মেনেই গতকালের বৈঠকটি হয়েছে। বৈঠকের শুরুতে করোনা অতিমারিতে জীবন উৎসর্গকারী পুলিশ সদস্যদের স্মৃতির প্রতি সম্মান জানিয়ে এক মিনিট নীরবতা পালন করা হয়। আজ সোমবার বৈঠক শেষ হবে। ক্রাইম কনফারেন্সে পুলিশ কর্মকর্তারা খোলামেলা কথা বলেন। ঢাকা, চট্টগ্রাম, রাজশাহী, খুলনা, বরিশাল, রংপুর ও ময়মনসিংহের উপ-মহাপুলিশ পরিদর্শক (ডিআইজি) এবং গাজীপুর, সিরাজগঞ্জ, মুন্সীগঞ্জ, গোপালগঞ্জ ও যশোরসহ আরও কয়েকটি জেলার পুলিশ সুপাররা বৈঠকে কথা বলেছেন। সভায় দেশব্যাপী কিশোর অপরাধ বৃদ্ধি পাওয়া, প্রযুক্তির অপব্যবহার করে রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি, সরকার ও দেশের বিরুদ্ধে নানামুখী অপতৎপরতাসহ বিভিন্ন বিষয়ে আলোচনা হয়। পুলিশ সুপাররা তাদের বক্তব্যে ফেইসবুক ও ইউটিউবসহ সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমগুলোর কর্র্তৃপক্ষকে জবাবদিহিতার আওতায় আনার জন্য প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়ার কথা বলেন।

বৈঠকে উপস্থিত থাকা কয়েকজন পুলিশ কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করে গতকাল রাতে দেশ রূপান্তরকে বলেন, শুরুর পর মাঝে এক ঘণ্টা বিরতি দিয়ে বিকেল ৫টা পর্যন্ত বৈঠক চলে। বেশিরভাগ পুলিশ কর্মকর্তাই ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে কিশোর অপরাধ নিয়ে কথা বলেন। তারা বলেছেন, দিনে দিনে কিশোর গ্যাংয়ের তৎপরতা বেড়েই চলেছে। ইতিমধ্যে তাদের হাতে হত্যাকা-সহ বিভিন্ন ঘটনা ঘটেছে। রাস্তাঘাট, স্কুল-কলেজের সামনে তারা আড্ডা দিয়ে থাকে নিয়মিত। ইভটিজিংও করছে। এসব অপরাধীর কেউ কেউ ধনাঢ্য পরিবারের সন্তান। আর এই  কারণে অনেক সময় তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়াও যায় না। তারা ইভটিজিং করার পাশাপাশি মাদক সেবন ও কেনাবেচাও করে। তাদের প্রতিহত করতে না পারলে সামনের দিনগুলোতে কঠিন সমস্যায় পড়তে হবে। এই বিষয়ে আইজিপি বলেছেন, কিশোর গ্যাংকে প্রতিরোধ করতে হবে। যারা অপকর্ম করবে তাদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নিতে হবে। তাদের পরিবারকে কঠোর বার্তা দিতে হবে। তালিকা ধরে ধরে গ্রেপ্তার করতে হবে। পাশাপাশি কিশোরদের পরিবারের সঙ্গে কথা বলতে হবে। ওই পুলিশ কর্মকর্তারা আরও বলেন, আসন্ন কনস্টেবল নিয়োগ নিয়ে আলোচনা হয়েছে বৈঠকে। আইজিপি বলেছেন, নতুন চ্যালেঞ্জ নিয়ে এবারের কনস্টেবল নিয়োগ হবে। স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতার মধ্যে নিয়োগ হতে হবে। নিয়োগের বিষয়ে পুলিশ সদর দপ্তর যেসব শর্ত আরোপ করেছে তা বাস্তবায়ন করতে হবে। এক কথায় বলা যায়, নিয়োগ পরীক্ষা হবে কঠোর। কোনো ধরনের ছলছাতুরী বা তদবিরের কাছে হার মানা যাবে না।

তিনটি জেলার পুলিশ সুপার দেশ রূপান্তরকে বলেন, প্রায় দেড় বছর পর সরাসরি বৈঠকটি হয়েছে। এতে পুলিশ কর্মকর্তারা স্বস্তিবোধ করেছেন। কারণ ভার্চুয়ালি বৈঠকে ঠিকভাবে কথা বলা যায় না। সশরীরে বিস্তারিত আলোচনা হয়েছে। আইজিপিসহ ঊর্ধ্বতনের সামনে খোলামেলা কথা হয়েছে। নিজ নিজ এলাকায় কী ধরনের সমস্যার মুখোমুখি হতে হয় সেসব বিষয়েও অবহিত করা হয়েছে। কিশোর গ্যাংয়ের পাশাপাশি মাদক ও জঙ্গিবাদ নিয়েও কথা হয়েছে। আইজিপি বলেছেন, মাদক ও জঙ্গিদের বিরুদ্ধে জনমত গড়ে তুলতে হবে। মসজিদ-মাদ্রাসায় গিয়ে মাদক ও জঙ্গিবাদেরর কুফল সম্পর্কে মুসল্লিদের জানাতে হবে। বৈঠকে আইজিপি আরও বলেছেন, যেসব রেঞ্জ, পুলিশ সুপার ও মেট্রো এলাকায় পুলিশ সদস্যরা ভালো কাজ করবে, তাদের আগামী মাস থেকে পুরস্কৃত করা হবে। আর যারা খারাপ কাজ করবে তাদের কঠোরভাবে দমন করা হবে। তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নেওয়া হবে। কোনো ধরনের ছাড় দেওয়ার সুযোগ নেই।  

পুলিশ সদর দপ্তর সূত্র জানায়, সভায় সব অতিরিক্ত আইজিপি, ঢাকাস্থ পুলিশের বিভিন্ন ইউনিটের প্রধান এবং পুলিশ সদর দপ্তরের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন। সভায় স্বাগত বক্তব্য রাখেন অতিরিক্ত আইজিপি (ক্রাইম অ্যান্ড অপারেশন্স) এম খুরশীদ হোসেন। কনফারেন্সের শুরুর দিনে জানুয়ারি-মার্চ ও এপ্রিল-জুন দুই কোয়ার্টারের সার্বিক অপরাধ পরিস্থিতি যেমন : ডাকাতি, দস্যুতা, খুন, দ্রুত বিচার আইনে মামলা, নারী ও শিশু নির্যাতন মামলা, অপহরণ, সিঁধেল চুরি, দাঙ্গা, মাদক, অস্ত্র ও গাড়ি উদ্ধার ইত্যাদির তথ্য তুলে ধরা হয়। এসব তথ্য তুলে ধরেন ডিআইজি (ক্রাইম ম্যানেজমেন্ট) এ ওয়াই এম বেলালুর রহমান। ক্রাইম কনফারেন্সে উন্মুক্ত আলোচনায় মাঠ পর্যায়ের কর্মকর্তারা কিশোর অপরাধ, মূলতবি মামলা, জনকল্যাণমূলক বেস্ট প্র্যাকটিসসহ আইন-শৃঙ্খলাসংক্রান্ত বিভিন্ন বিষয়ে আলোচনা করেন।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক পুলিশ সদর দপ্তরের এক কর্মকর্তা দেশ রূপান্তরকে বলেন, সম্প্রতি দেশে ও দেশের বাইরে থেকে একটি মহল বিভিন্ন ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানকে টার্গেট করে নানামুখী অপতৎপরতা শুরু করেছে। এই বিষয়ে তথ্য-প্রযুক্তি আইনে মামলা করলেও এসব অপরাধ নিয়ন্ত্রণ করা যাচ্ছে না। কারণ এসব দুর্বৃত্ত দেশের বাইরে অবস্থান করে দেশ ও সরকার, বিচার বিভাগ, রাষ্ট্রীয় বিভিন্ন বাহিনী ও গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে বিষোদগার করছে। তাদের এসব অপতৎপরতা রোধে ফেইসবুক, টুইটার ও ইউটিউবসহ সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমগুলোকে জবাবদিহিতার আওতায় আনার পরামর্শ দেন তারা। এ প্রসঙ্গে অপর একজন পুলিশ সুপার বলেন, প্রযুক্তির অপব্যবহারে কারণে দেশে কিশোর অপরাধ মারাত্মকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। অনেক ক্ষেত্রে পূর্বে ধারণা না থাকায় এসব কিশোর অপরাধীদের নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হয় না। এ বিষয়ে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে নির্দেশনা চান পুলিশ সুপাররা। এ বিষয়ে পুলিশ সদর দপ্তর থেকে পুলিশের সব ক্রাইম ইউনিটে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।