পরিশুদ্ধির জন্য নামাজ|315552|Desh Rupantor
logo
আপডেট : ১৫ সেপ্টেম্বর, ২০২১ ০০:০০
পরিশুদ্ধির জন্য নামাজ
শায়খ ড. আহমাদ বিন তালেব হামেদ

পরিশুদ্ধির জন্য নামাজ

ফরজ ইবাদত নামাজ মহান আল্লাহর একত্ববাদে বিশ্বাসী বান্দাদের চোখের প্রশান্তি, অন্তরের তৃপ্তি। এটা সত্য ও সরল পথে অবস্থানকারীদের মানদণ্ড এবং মহান আল্লাহর বিশেষ রহমত যা তিনি বান্দাদের দান করেছেন। আল্লাহতায়ালা অত্যন্ত অনুগ্রহ করে বান্দাদের নামাজের নির্দেশনা প্রদান করে নামাজ শিক্ষা দিয়েছেন। যেন বান্দারা তার অনুগ্রহ ও সান্নিধ্য লাভের মাধ্যমে সৌভাগ্যশালী হতে পারে। নামাজের মাধ্যমে অন্তর ও শরীরের অঙ্গগুলো একত্রে আল্লাহর ইবাদত করে। তার মধ্য থেকে অন্তরকে পরিপূর্ণ ও প্রধান অংশ করা হয়েছে। যা তার প্রভুর প্রতি অগ্রসর হওয়া, তার নেয়ামত দ্বারা আনন্দিত হওয়া, তার নৈকট্য দ্বারা তৃপ্ত হওয়া, তার প্রতি ভালোবাসার অনুভূতি অনুভব করা এবং নামাজে তার সামনে প্রফুল্লচিত্তে দাঁড়ানোর মাধ্যমে হয়ে থাকে। পবিত্র কোরআনে ইরশাদ হয়েছে, ‘তোমরা ধৈর্য ও নামাজের মাধ্যমে সাহায্য প্রার্থনা করো। নিশ্চয় তা বিনয়ী ছাড়া অন্যদের জন্য কঠিন। যারা বিশ্বাস করে, নিশ্চয় তাদের প্রভুর সঙ্গে তাদের সাক্ষাৎ ঘটবে এবং নিশ্চয় তারা তারই দিকে ফিরে যাবে।’ সুরা বাকারা : ৪৫-৪৬

হাদিসে ইরশাদ হয়েছে, নবী কারিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, ‘আমার চোখের প্রশান্তি করা হয়েছে নামাজে।’ নাসাই

নবী কারিম (সা.) যখন কোনো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ের সম্মুখীন হতেন, তখন নামাজে দাঁড়িয়ে যেতেন। হাদিসে ইরশাদ হয়েছে, ‘যে ব্যক্তি নামাজের হেফাজত (পরিপূর্ণভাবে সময়মতো আদায় করবে) করবে, তা কিয়ামতের দিন তার জন্য আলো, দলিল ও মুক্তির উপায় হবে।’

আল্লাহতায়ালা পবিত্র কোরআনে বলেন, ‘অতএব, তুমি এবং তোমার সঙ্গে যারা তওবা করেছে সবাই সোজা পথে চলে যাও যেমন তোমায় হুকুম দেওয়া হয়েছে এবং সীমালঙ্ঘন করবে না, তোমরা যা কিছু করছো, নিশ্চয় তিনি তার প্রতি দৃষ্টি রাখেন। আর পাপিষ্ঠদের প্রতি ঝুঁকবে না। নতুবা তোমাদেরও আগুনে ধরবে। আর আল্লাহ ছাড়া তোমাদের কোনো বন্ধু নাই। অতএব কোথাও সাহায্য পাবে না। আর দিনের দুই প্রান্তেই নামাজ ঠিক রাখবে, এবং রাতের প্রান্তভাগে পূর্ণ কাজ অবশ্যই পাপ দূর করে দেয়, যারা স্মরণ রাখে তাদের জন্য এটি এক মহা স্মারক। আর ধৈর্যধারণ করো, নিশ্চয়ই আল্লাহ পূণ্যবানদের প্রতিদান বিনষ্ট করেন না।’ সুরা হুদ : ১১২-১১৫

অন্য হাদিসে এসেছে, হজরত রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘তোমাদের কারও বাড়ির সামনে যদি কোনো নদী থাকে আর দৈনিক পাঁচবার তাতে গোসল করা হয় তাহলে তার শরীরে কী কোনো ময়লা থাকবে? সাহাবায়ে কেরাম বললেন, তার কোনো ময়লাই অবশিষ্ট থাকবে না। তখন হজরত রাসুলুল্লাহ (সা.) বললেন, এটাই হলো পাঁচ ওয়াক্ত নামাজের উদাহরণ। আল্লাহ এর মাধ্যমে গোনাহগুলো ক্ষমা করে দেন।’ সহিহ্ বোখারি : ৫২৮

মনে রাখতে হবে, সৎকাজ দ্বারা শুধুমাত্র সগিরা গোনাহ মাফ হয়। কবিরা গোনাহের জন্য তওবা জরুরি। হাদিসে বলা হয়েছে, ‘যদি সে ব্যক্তি কবিরা গোনাহ  থেকে বিরত থাকে।’ সহিহ্ মুসলিম : ২৩৩

হাদিসে আরও বলা হয়েছে, হজরত রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ, এক জুমা থেকে পরবর্তী জুমা পর্যন্ত এবং এক রমজান দ্বারা পরবর্তী রমজান পর্যন্ত মধ্যবর্তী যাবতীয় সগিরা গোনাহগুলো মিটিয়ে দেওয়া হয়, যদি সে ব্যক্তি কবিরা গোনাহ থেকে বিরত থাকে। সহিহ্ মুসলিম : ২৩৩

হজরত সালমান (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, ‘একদা আমি আল্লাহর রাসুল (সা.)-এর সঙ্গে একটি গাছের নিচে ছিলাম। তিনি আমার সামনে গাছের একটি শুষ্ক ডাল ধরে নাড়ালেন। এতে তার সব পাতা খসে পড়ল। অতঃপর বললেন, হে সালমান! তুমি আমাকে জিজ্ঞাসা করবে না, কেন আমি এরূপ করলাম? আমি বললাম, কেন করলেন? তিনি উত্তরে বললেন, মুসলিম যখন সুন্দরভাবে অজু করে পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ পড়ে, তখন তার পাপরাশি ঠিক ওইভাবেই ঝরে যায়, যেভাবে এই পাতাগুলো ঝরে গেল। এরপর তিনি এই আয়াত পাঠ করলেন’ (নাসাই)। এক ব্যক্তি এক নারীকে চুম্বন করে ফেলে। পরে সে নবী কারিম (সা.)-এর কাছে এসে বিষয়টি জানায়। তখন আল্লাহতায়ালা এই আয়াত অবতীর্ণ করেন, ‘দিনের দুই প্রান্ত সকাল ও সন্ধ্যায় এবং রাতের প্রথমভাগে নামাজ কায়েম করো। নিশ্চয়ই পুণ্যরাশি পাপরাশিকে মিটিয়ে দেয়।’ সুরা হুদ : ১১৪

লোকটি জিজ্ঞেস করল, ‘হে আল্লাহর রাসুল! একি শুধু আমার জন্য? তিনি (নবী কারিম সা.) বললেন, না, এ সুযোগ আমার সব উম্মতের জন্য।’ সহিহ্ বোখারি ও মুসলিম

বান্দা যতটুকু মনোযোগ দিয়ে নামাজ আদায় করে, ততটুকু সওয়াব তার আমলনামায় লিপিবদ্ধ হয়। নামাজের মূল বিষয় হলো পরিপূর্ণভাবে আল্লাহর প্রতি বান্দার অগ্রসর হওয়া। নামাজে বান্দার চেহারা যেমনভাবে কেবলার দিকে থাকা আবশ্যক, তেমনি বান্দার অন্তরও আল্লাহর অভিমুখী হওয়া আবশ্যক। বান্দার চেহারার কেবলা হলো কাবা। আর বান্দার অন্তরের কেবলা হলো কাবার মালিক অর্থাৎ আল্লাহ। বান্দা আল্লাহর দিকে অগ্রসর হলে আল্লাহও বান্দার দিকে অগ্রসর হোন। আর বান্দা মুখ ফিরিয়ে নিলে আল্লাহও মুখ ফিরিয়ে নেন। অতএব নিবিষ্টচিত্তে নামাজ আদায় করা অত্যন্ত জরুরি। হাদিসে নবী কারিম (সা.) বলেছেন, ‘আমাদের (মুসলমান) এবং মুশরিকদের মধ্যে পার্থক্যকারী বিষয় হলো নামাজ।’ নাসাই

কিয়ামতের দিন সর্বপ্রথম বান্দার নামাজের হিসাব নেওয়া হবে। আর অন্যান্য আমল নির্ভর করে নামাজের ওপর। নামাজই হলো বান্দার মুক্তির উপায়। প্রাপ্তবয়স্ক সব মুসলিম নর-নারীর ওপর পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ আদায় করা ফরজ। সুরা ত্বহার ১৩২ নম্বর আয়াতে আল্লাহতায়ালা তার রাসুল নবী মুহাম্মদ (সা.) কে নামাজ আদায়ের নির্দেশ দিয়েছেন এবং তার পরিবার পরিজনকেও নামাজ আদায়ের নির্দেশ করতে বলেছেন। সুতরাং আসুন, আমরা পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ আদায় করি এবং অধীনস্থদের নামাজ আদায়ের জোর তাগিদ দেই।

১০ সেপ্টেম্বর মসজিদে নববিতে প্রদত্ত জুমার খুতবা। অনুবাদ করেছেন মুহাম্মদ আতিকুর রহমান