প্রস্তাবিত জাতীয় শিক্ষাক্রম প্রসঙ্গে|315580|Desh Rupantor
logo
আপডেট : ১৫ সেপ্টেম্বর, ২০২১ ০০:০০
প্রস্তাবিত জাতীয় শিক্ষাক্রম প্রসঙ্গে

প্রস্তাবিত জাতীয় শিক্ষাক্রম প্রসঙ্গে

দেশে প্রাথমিক থেকে উচ্চ মাধ্যমিক স্তরের জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যসূচি নিয়ে যত আলোচনা-সমালোচনা সাম্প্রতিক বছরগুলোতে হয়েছে ততটা এর আগে দীর্ঘদিন দেখা যায়নি। অবশ্য বলাবাহুল্য, এই আলোচনা-সমালোচনার সূত্রপাতের বড় কারণ ছিল দফায় দফায় প্রাথমিক, মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক স্তরের শিক্ষাক্রমে নানাবিধ পরীক্ষা-নিরীক্ষা এবং সেসবের প্রয়োগ ও কৌশল নিয়ে। একসময় ‘বহু নির্বাচনী প্রশ্ন’ পদ্ধতি আর ‘সৃজনশীল শিক্ষা’ পদ্ধতি নিয়েও কম বিতর্ক হয়নি। একথা বললে অত্যুক্তি হবে না যে, জাতীয় শিক্ষাক্রম প্রবর্তনের এসব প্রচেষ্টা যেমন যথাযথ মূল্যায়নের ভিত্তিতে গৃহীত হয়নি, তেমনি সেসব প্রয়োগ বা অনুসরণের জন্য আনুষঙ্গিক প্রস্তুতিও যথাযথ ছিল না। এমন পরিপ্রেক্ষিতে, এসএসসি ও সমমান পরীক্ষার আগে প্রাথমিক ও মাধ্যমিক স্তরে আর কোনো পাবলিক পরীক্ষা না নেওয়ার বিধানসহ বেশকিছু মৌলিক পরিবর্তন এনে একটি সমন্বিত জাতীয় শিক্ষাক্রম রূপরেখা প্রণয়ন নিঃসন্দেহে গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি।

সোমবার প্রস্তাবিত জাতীয় শিক্ষাক্রম রূপরেখা অনুমোদন দেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। পরে সংবাদ সম্মেলনে এ বিষয়ে বিস্তারিত তুলে ধরেন শিক্ষামন্ত্রী দীপু মনি। শিক্ষামন্ত্রী জানান, দেশের শিক্ষাব্যবস্থায় এসএসসি ও সমমান পরীক্ষার আগে আর কোনো পাবলিক পরীক্ষা থাকছে না। অর্থাৎ পঞ্চম শ্রেণির সমাপনী (পিইসি), জুনিয়র স্কুল সার্টিফিকেট (জেএসসি) ও জুনিয়র দাখিল সার্টিফিকেট (জেডিসি) পরীক্ষা আর কেন্দ্রীয়ভাবে অনুষ্ঠিত হবে না। সেই সঙ্গে মাধ্যমিক স্তরে বিজ্ঞান, মানবিক ও বাণিজ্য বিভাগ ব্যবস্থাও উঠে যাচ্ছে। ষষ্ঠ থেকে দশম শ্রেণি পর্যন্ত সব শিক্ষার্থীকে অভিন্ন ১০টি বিষয় পড়তে হবে। শিক্ষার্থীরা মানবিক, বিজ্ঞান নাকি বাণিজ্য শাখায় পড়বে, সেটা ঠিক হবে একাদশ শ্রেণিতে। একই সঙ্গে বড় ধরনের পরিবর্তন আসছে শিক্ষার্থীদের মূল্যায়ন পদ্ধতিতেও। এক্ষেত্রে তৃতীয় শ্রেণি পর্যন্ত কোনো পরীক্ষা না রাখা এবং দ্বাদশ শ্রেণি পর্যন্ত যতটা সম্ভব পরীক্ষা কমিয়ে দেওয়ার পাশাপাশি সারা বছরের শিখনকালের মূল্যায়ন ও বছরশেষের সামষ্টিক মূল্যায়নের পদ্ধতি প্রবর্তন অবশ্যই সাধুবাদযোগ্য। এতে সারা বছর শ্রেণিকক্ষে শিক্ষার্থী ও শিক্ষকদের মনোযোগ বাড়বে বলে আশা করা যায়। অন্যদিকে, শিক্ষাবিদরা বলছেন, পরীক্ষাহীন শিক্ষার এই স্তর পঞ্চম শ্রেণি পর্যন্ত উন্নীত করাটা বাঞ্ছনীয়। তারা মনে করছেন, পরীক্ষায় পাস-ফেলের ভীতিহীন নতুন ব্যবস্থায় শিক্ষার্থীদের সত্যিকারের জ্ঞানার্জনের পথ সুগম করবে।

কিন্তু দীর্ঘ প্রথাগত পদ্ধতিতে নবম শ্রেণি থেকে শিক্ষার্থীদের মানবিক, বিজ্ঞান ও বাণিজ্য শাখায় বিভাজনের পদ্ধতি বাতিল করে এখন ষষ্ঠ থেকে দশম শ্রেণি পর্যন্ত অভিন্ন ১০টি বিষয় পড়ার যে প্রস্তাব করা হয়েছে তার পক্ষে যেমন যুক্তি রয়েছে তেমনি রয়েছে কিছু সমালোচনাও। এ বিষয়ে সমালোচনার দুটি দিক রয়েছে। প্রথমত, যে ১০টি বিষয় শিক্ষার্থীদের পাঠ্য হবে সেই বিষয়গুলো নির্ধারণ করা নিয়ে। প্রশ্ন থেকে যায়, এই তালিকায় ভাষা, গণিত ও বিজ্ঞান থাকলেও ইতিহাস, ভূগোল ও পরিবেশবিজ্ঞান এবং যুক্তিবিদ্যা-দর্শনের মতো মৌলিক বিষয় অনুপস্থিত থাকবে কোন যুক্তিতে? একই সঙ্গে প্রশ্ন রয়েছে, ‘জীবন ও জীবিকা’, ‘ধর্ম’, ‘স্বাস্থ্য শিক্ষা’, ‘শিল্প ও সংস্কৃতি’ এবং ‘তথ্য ও যোগাযোগপ্রযুক্তি’ নামে পাঁচটি বিষয় এই স্তরের পাঠ্যক্রমে মূল বিষয় হিসেবে অন্তর্ভুক্তির যৌক্তিকতা নিয়ে। এর বিপরীতে চিন্তা করা যেতে পারে, ভাষা শিক্ষায় বাংলা ও ইংরেজির বাইরে তৃতীয় একটি আন্তর্জাতিক ভাষা শেখার সুযোগ রাখার এবং মোট ১০টি বিষয়ের পরিবর্তে ১৩ বা ১৪টি বিষয়কে অন্তর্ভুক্ত করে শিক্ষার্থীদের জন্য নিজ নিজ আগ্রহ অনুসারে কয়েকটি পাঠ্য বিষয় পছন্দ করার সুযোগ সৃষ্টির। সেক্ষেত্রে মোট ৭টি বিষয়কে বাধ্যতামূলক করে বাকি তিনটি বিষয় শিক্ষার্থীদের জন্য নৈর্বাচনিক করা যেতে পারে। তাতে যেমন একাদশ শ্রেণি থেকে মানবিক, বিজ্ঞান ও বাণিজ্য শাখায় অধ্যয়নের ক্ষেত্রে শিক্ষার্থীদের বিষয়ভিত্তিক প্রস্তুতি জোরদার হবে তেমনি দশম শ্রেণি পর্যন্তও পাঠ্যক্রমের বিষয়-বৈচিত্র্য বাড়বে।

প্রথম থেকে দ্বাদশ শ্রেণি পর্যন্ত জাতীয় শিক্ষাক্রম রূপরেখা চূড়ান্ত করার বিষয়টি তাই শিক্ষাবিদ, শিক্ষক, অভিভাবকসহ শিক্ষাসংশ্লিষ্ট অংশীজনদের মতামত নিয়েই চূড়ান্ত করা উচিত হবে। একই সঙ্গে অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করতে হবে নতুন শিক্ষাক্রমের পাঠ্যপুস্তক প্রণয়ন এবং সেসব বিষয়ে পাঠদানের ক্ষেত্রে শিক্ষকদের যথাযথ প্রস্তুতি নিশ্চিত করার ক্ষেত্রেও। মনে রাখা দরকার, স্কুল-কলেজ পর্যায়ে শিক্ষকদের বেতন কাঠামো ও নিয়োগ পদ্ধতি যুগোপযোগী না হলে মেধাবীরা শিক্ষকতায় আসতে উৎসাহী হবে না। এছাড়া সাধারণ শিক্ষার এই পাঠ্যক্রমের সঙ্গে দেশে বিদ্যমান মাদ্রাসা, কারিগরি ও ইংরেজি মাধ্যম শিক্ষার পাঠ্যক্রমের সামঞ্জস্য বিধানের গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নটির দিকেও মনোযোগ দেওয়া জরুরি। নইলে শিক্ষাক্রমের মধ্য দিয়ে দেশের ভবিষ্যৎ নাগরিকদের যে বিভাজন তৈরি হচ্ছে সেটা কমিয়ে আনা কোনোদিনই সম্ভব হবে না।