যেতে হবে বহু দূর|315582|Desh Rupantor
logo
আপডেট : ১৫ সেপ্টেম্বর, ২০২১ ০০:০০
যেতে হবে বহু দূর
জাঁ-নেসার ওসমান

যেতে হবে বহু দূর

খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণতার পাশাপাশি এখন শতভাগ বিদ্যুতায়নের পথে বাংলাদেশ। ধীরে ধীরে বিশ্বের উন্নয়নশীল দেশগুলোর কাতারের দিকে ধাবিত হচ্ছে বাংলাদেশ। উনিশশ একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধের পর বাংলাদেশ আজ পাকিস্তানকে পেছনে ফেলে শাঁ শাঁ করে এগিয়ে যাচ্ছে। এটা ভাবতে গর্বে বুক ভরে ওঠে। বাংলাদেশের স্বাধীনতার কা-ারি জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের দূরদর্শিতায় আমরা পেলাম স্থায়ী এক ঠিকানা, বাংলাদেশ। বিশ্ব-মানচিত্রে স্থান করে নিল মাত্র পঞ্চান্ন হাজার বর্গমাইলের এক ছোট্ট দেশ, বাংলাদেশ।

সেই ১৯৭১ থেকে এই ২০২১ সালের মধ্যে চোখ ধাঁধানো উন্নতি পাড়া-পড়শির ঈর্ষার কারণ হয়ে দাঁড়াল। না হলে এই বাংলাদেশে অকালে ঘটে যায় ইতিহাসের নিষ্ঠুরতম হত্যাকা-! পরিবারের বেশির ভাগ সদস্যসহ বঙ্গবন্ধুর নিষ্ঠুর হত্যাকা-! যে লজ্জা প্রকাশের কোনো ভাষা নেই। শত হাজার বই, পুস্তক, হাজার উপন্যাস, কবিতা-গান রচনা করেও এ লজ্জা ঢাকা যাবে না।

তবু সূর্য ওঠে, সূর্য ডোবে দিন পেরিয়ে যায়। বাংলাদেশও হাঁটি-হাঁটি পা-পা করে উন্নয়নশীল দেশ আর উন্নত দেশের দিকে ধাবিত। কিন্তু নানা ঘটনার দৃষ্টে মনে হয় আমাদের চলার পথে কোথাও একটা নিয়ন্ত্রণহীনতার ছাপ পরিলক্ষিত হয়। না হলে মুক্তিযুদ্ধের পঞ্চাশ বছর পার করেও কেন মনে হয় বাঙালির এখনো অনেকটা পথ পাড়ি দিতে হবে?

শিল্পে সাহিত্যে এর বন্ধ্যাদশা প্রবলরূপে পীড়া দেয়। বাংলাদেশের একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রকাশনা প্রতিষ্ঠান ‘প্রথমা প্রকাশন’ যেসব বই প্রকাশ করে তা গুণে-মানে বিশ্বের যেকোনো প্রথম শ্রেণির প্রকাশনা শিল্পের সঙ্গে প্রতিযোগিতার দাবি করতে পারে। সেই প্রথমা প্রকাশনের প্রকাশিত মাসরুর আরেফিনের উপন্যাস ‘আগস্ট আবছায়া’-তে বানান ভুল আর মুদ্রণ প্রমাদ যখন চোখে পড়ে তখন মনে হয় বাঙালিকে বিশ্বমানে পৌঁছাতে হলে এখনো অনেকটা পথ পাড়ি দিতে হবে। প্রথমা’র মতো অতি-সচ্ছল প্রকাশন যদি কারিগরি দিক থেকে নির্ভুল একটা বই বের করতে না পারে তাহলে অন্যদের কী হবে? ভাবতেই গা শিউরে ওঠে। কষ্ট লাগবে যখন শুনব, ‘আরে আমাদের তো ভুল খুবই কম, অন্যান্য প্রকাশকের ভুল দেখলে তো মাথা ঘুইরা যাইব।’

এ যেন অনেকটা সেই জোকসের মতো, ‘কী ভাই আপনেরে বাইগুন দিতাছি, আপনে হাসতাছেন?’ : ‘হেঁ হেঁ, আমার পরেরজন তো, কাঁঠাল আনতাছে।’ বাঙালি সব সময় যেন এতেই খুশি। ‘আগের দল তো দশটা খুন করছে, আমরা খুন করছি চাইরটা। আমরা অগো চায়া ষাইটগুণ বালা। হেঁ হেঁ।’

এমনি সব ভালো দেখতে দেখতে মনে হয় আমাদের এখনো যেতে হবে বহুদূর। বাঙালির চিকিৎসার চিত্র দেখলে স্বয়ং যমরাজের চিত্রগুপ্ত পর্যন্ত তার গুপ্ত স্থান চুলকোতে চুলকোতে লজ্জায় জিহ্বায় কামড় দিয়ে কান মুলে তৌবা তৌবা বলে পালাবে। বিশ্বমানে পৌঁছানো? দিল্লি হনুজ দূর অস্ত। যেদিকে দুচোখ যায় কেবল হতাশা। শূন্যতা আর ধু ধু মরুভূমির মতো অনৈতিক ক্রিয়া-কলাপের ছড়াছড়ি। কারে কবো দুঃখের কথা, কোথা পাব প্রতিকার, তার কোনো লক্ষণ দেখি না। রাম-সীতা তো দূরের কথা।

বিশ্বমানে পৌঁছাতে হলে বিশ্বমানের লোক লাগবে না? আমাদের গর্ব ক্রিকেটার সাকিব আল হাসান। বিশ্বের এক নম্বর অলরাউন্ডার হয়ে কতখানি গর্বের বিষয় হয়ে দাঁড়ায়। সেই ছোট্ট বাংলাদেশের ছোট্ট মাগুরার যুবা সাকিব আল হাসান বিশ্বে বাংলাদেশের সম্মান বয়ে নিয়ে বেড়াচ্ছে... আর কোনো ক্ষেত্রে কেউ কি এগিয়ে আসবে না!!

যে দেশে আচার্য্য জগদীশ চন্দ্র বসুর জন্ম সে দেশে কি আর কোনো বৈজ্ঞানিক জন্মাবে না?

সাহিত্যে একমাত্র বিদ্রোহী কবি নজরুল ইসলামের নামেই একটা ইনস্টিটিউট আছে। সবেধন নীলমণি। আর কোনো সাহিত্যিকের নামে কি ইনস্টিটিউিট গড়ে উঠবে না?

আজ যখন বলা হয়, ‘পুলিশ জনগণের বন্ধু’ তখন সত্যিই বুকটা গর্বে ভরে ওঠে। যখন দেখি পথের ধারের ভ্যানগাড়ি ঠেলে ঠেলে নিরীহ সবজি বিক্রেতা সারা দিনের বেচা-বিক্রির টাকা থেকে জনগণের বন্ধুদের জন্য ‘লাইনের টাকা তোলা’ ভাইটির হাতে শত শত টাকা তুলে দেয়। তখন জনগণের বন্ধুদের প্রতি নিপীড়িত বন্ধুর এই দরদ দেখে শ্রদ্ধায় মাথা নত হয়ে আসে! সারা বছর ধরে তিনশ পঁয়ষট্টি দিন বন্ধুর প্রতি এভাবেই বন্ধুত্বের হাত বাড়িয়ে রেখেছে আমাদের সমাজের নিচুতলার লোকরা। তাদের এই ভালোবাসার নিদর্শন নিয়ে তার বন্ধুর ছেলেরা বিদেশে লেখা পড়া করে। দেশে ফিরে দেশ গড়ায় ঝাঁপিয়ে পড়ে। সাধু সাধু সাধু! সমাজের প্রতিটি ক্ষেত্রে এমনি বন্ধুরা যদি বন্ধুত্বের হাত বাড়িয়ে দেন তাহলে প্রশাসনের কর্মকর্তাদের পরবর্তী প্রজন্ম দেশ গড়ায় জীবন উৎসর্গ করতেন! অন্যদিকে, দেখুন না নৈতিকতার স্খলন। তিন বছরের কচি শিশুটিকে ব্লেড দিয়ে চিরে লালসা পূরণে লিপ্ত হয় এ কালের বাঙালিরা! আমরা কি এই বাংলাদেশ চেয়েছিলাম! আবার এই বাঙালি যখন অন্য কোনো বাঙালির প্রশংসা করে তখন তার তো কোনো খামতি থাকে না।

এক কথাসাহিত্যিক তো, ‘আগস্ট আবছায়া’ নিয়ে মন্তব্য করতে গিয়ে বললেন, ‘অসাধারণ উপন্যাস। বাংলা সাহিত্যে এমন লেখা আছে বলে আমার মনে হয় না।’ আমার তো মনে হয় তার বাংলা সাহিত্যের জায়গায়, বিশ্বসাহিত্য লেখা উচিত ছিল! তাহলে ষোলোকলা পূর্ণ হতো। তার মনে হতেই পারে এমন উপন্যাস বিশ্বসাহিত্যেও নেই। এটা তার ব্যক্তিগত অভিমত। তিনি যা ইচ্ছা বলতে পারেন। কিন্তু এই মন্তব্য যখন ছাপার অক্ষরে বিশ্ব-চরাচরে উদ্ধৃত, তখন একটু ভেবে বলাই সমীচীন নয় কি? 

সেদিন প্রয়াত চলচ্চিত্র পরিচালক তারেক মাসুদের স্ত্রী ক্যাথেরিন মাসুদ টেলিভিশনে বললেন, কত কষ্ট করে তারা জনাব লেয়ার লেভিনের কাছ থেকে ‘মুক্তির গানের’ ফুটেজ জোগাড় করেছেন। ১৯৭১ সালে প্রয়াত তারেক মাসুদের বয়স ছিল চৌদ্দ কী পনেরো বা তার চেয়েও কম। পরে এই ফুটেজ দিয়ে চলচ্চিত্র প্রকাশের অসাধ্যসাধন করায় প্রয়াত তারেক মাসুদকে অন্তরের অন্তস্তল থেকে অভিবাদন। কিন্তু যখন দেখি ছবির পরিচালক রূপে প্রয়াত তারেক মাসুদের নাম, তখন মনে হয় বাংলাদেশের বিশ্ব-দরবারে পৌঁছাতে এখনো অনেকটা পথ পাড়ি দিতে হবে।

এখনো অনেক কিছু বাকি রয়ে গেছে। মানুষ এখনো মানুষ হতে পারল না। খাবারে ফরমালিন, ওজনে ফাঁকি, শিক্ষায় নকল সাপ্লাইকারী বাবা, উৎকোচ গ্রহণ নিয়মে পরিবর্তিত হচ্ছে, ব্যাংকের টাকা চুরি এখন একটা প্রফেশনে পরিণত। এসব দেখে তাই মনে হয়, বিশ্ব-দরবারে মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে হলে, বাংলাদেশকে এখনো অনেকটা পথ পাড়ি দিতেই হবে। যেতে হবে বহু দূর।

লেখক : চলচ্চিত্র নির্মাতা ও লেখক