একবিংশ শতাব্দীর বড় চ্যালেঞ্জ বেকারত্ব|315583|Desh Rupantor
logo
আপডেট : ১৫ সেপ্টেম্বর, ২০২১ ০০:০০
একবিংশ শতাব্দীর বড় চ্যালেঞ্জ বেকারত্ব
রায়হান আহমেদ তপাদার

একবিংশ শতাব্দীর বড় চ্যালেঞ্জ বেকারত্ব

করোনার আতঙ্ক প্রতিটি মুহূর্ত যেন তাড়া করছে। একেকটি দিন পার করা করোনামুক্ত সময়ে চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। পুরো বিশ্বে শুধু আক্রান্ত আর মৃত্যুর হারই বাড়ছে না, মানুষের স্বাভাবিক জীবন-জীবিকা হুমকির মুখে পড়ছে। স্থবির হয়ে পড়েছে কর্মসংস্থানের পথ। বাড়ছে অর্থসংকট। এরই মধ্যে ভাটা পড়েছে বিশ্ব অর্থনীতিতে। এ মন্দা স্বাভাবিক হতে কত দিন লাগবে, তাও বলতে পারছেন না অর্থনীতিবিদরা। বাংলাদেশের অন্তত ৬০ শতাংশ জনগোষ্ঠী তরুণ কর্মক্ষম। যাদের বয়স ১৮ থেকে ৪০ বছর। বিশাল এই জনগোষ্ঠীর কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে হিমশিম খেতে হয়। কর্মে সক্ষম নতুন যোগ হওয়াদের মধ্যে অর্ধেক থেকে যায় বেকার। আবার অদক্ষ, অল্প দক্ষদের বড় অংশ কাজ করে অপ্রাতিষ্ঠানিক খাতে। এমন বাস্তবতায় করোনার হানা অনেকটা ‘মড়ার উপর খাঁড়ার ঘা’। এলোমেলো অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে গেল কয়েক মাসে কর্মহীন, চাকরি হারানো বা বিদেশফেরত লোকের সংখ্যা আরও বেড়েছে। করোনায় মৃত্যুর পাশাপাশি দেশে দরিদ্র ও বেকার মানুষের সংখ্যাও বেড়ে চলেছে।

বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশিত রিপোর্ট বলেছে, মহামারীর আকারে করোনা শুরু হওয়ার আগে দেশে বেকারের সংখ্যা ছিল ২৭ লাখ। এ সময় আয় করার মতো কাজে যুক্ত ছিল ৬ কোটি ৮ লাখ মানুষ। এদিকে প্রায় দুই বছর ধরে চলমান করোনার মধ্যে কাজ বা চাকরি হারিয়েছে অন্তত ৩০ শতাংশ মানুষ। সেই সঙ্গে আয় কমেছে ৭০ শতাংশ মানুষের। তা ছাড়া করোনার আগে দেশে দারিদ্র্যের হার যেখানে ছিল ২০ শতাংশ, বর্তমানে সেখানে তা বেড়ে হয়েছে ৪০ শতাংশ। বিশ্লেষকরা সরকারের দেওয়া এই পরিসংখ্যানকে অবশ্য সঠিক মনে করেন না। তাদের মতে, বেকার এবং দারিদ্র্য উভয় হারই অনেক বেশি। ওদিকে আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থা আইএলও জানিয়েছে, বাংলাদেশে তরুণদের মধ্যে অন্তত ২৫ শতাংশই বেকার, যাদের সংখ্যা প্রায় তিন কোটি।

এমনকি করোনাকালে ঠিক কত মানুষের চাকরি বা কর্মসংস্থান হয়েছে সে ব্যাপারেও প্রকাশিত রিপোর্টে সংশয়ের প্রকাশ ঘটেছে। উদাহরণ দিতে গিয়ে রিপোর্টে বলা হয়েছে, ২০১৮-১৯ থেকে ২০২০-২১ পর্যন্ত তিন অর্থবছরে অন্তত ৩০ লাখ মানুষকে চাকরি দিয়ে বিদেশে পাঠানো সরকারের পরিকল্পনা ছিল। অন্যদিকে বাস্তবে এক লাখেরও কম মানুষকে পাঠাতে পেরেছে সরকার। স্বাভাবিক সময়ে সরকারি ও বেসরকারি খাতে প্রতি বছর অন্তত ৭ লাখ মানুষের চাকরি বা কর্মসংস্থান হয়ে থাকে। সরকারের থিংক ট্যাংক হিসেবে পরিচিত সংস্থা পরিকল্পনা কমিশনের সাধারণ অর্থনীতি বিভাগ জিইডি এবং বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর দেওয়া পরিসংখ্যানের ভিত্তিতে প্রকাশিত রিপোর্টে তথ্যটি জানানো হয়েছে। সংস্থা দুটি এক রিপোর্টে জানিয়েছে, বাংলাদেশের ৩৬ দশমিক ১ শতাংশ মানুষ বহুমাত্রিক দারিদ্র্যের শিকার।

ভারত, পাকিস্তান ও বাংলাদেশের ওপর ভর করে দক্ষিণ এশিয়ার মোট জনসংখ্যা ১৮০ কোটি। এই জনগোষ্ঠীর প্রায় অর্ধেকের বয়স ২৪ বছরের কম হওয়ায় ২০৪০ সাল পর্যন্ত বিশ্বে সবচেয়ে বেশি তরুণ জনশক্তি থাকবে দক্ষিণ এশিয়াতেই। দক্ষতা উন্নয়নে বিনিয়োগ জোরদার করা হলে এই অঞ্চল শক্তিশালী অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি বজায় থাকবে এবং একই সঙ্গে আগামী দশকগুলোতে শিক্ষা ও দক্ষতা খাতে সুযোগ প্রসারিত হবে। তবে দক্ষিণ এশিয়ার ৩২ হাজার তরুণ-তরুণীর ওপর পরিচালিত ইউনিসেফের ‘ভয়েসেস অব ইয়ুথ’ শীর্ষক সাম্প্রতিক জরিপে ২৪ বছরের কমবয়সী এই তরুণদের আধুনিক অর্থনীতির জন্য কতটা ভালোভাবে তাদের প্রস্তুত করা হচ্ছে তা নিয়ে তাদের উদ্বেগ উঠে এসেছে। জরিপের তথ্য অনুযায়ী, দক্ষিণ এশিয়ার অনেক তরুণ মনে করে তাদের শিক্ষাব্যবস্থা সেকেলে এবং এটা কর্মসংস্থানের জন্য তাদের তৈরি করে না। এমনকি স্নাতকোত্তর পর্যায়ের পড়াশোনা শেষ করার পরও কর্মসংস্থান খুঁজে পেতে মূল বাধা হিসেবে কাজের অভিজ্ঞতার ঘাটতি (২৬ শতাংশ), নিয়োগযোগ্যতা উন্নয়নে অপর্যাপ্ত সহায়তা সেবা (২৩ শতাংশ কোনো সহায়তা পায় না এবং বেশির ভাগই সমন্বিত সেবার পরিবর্তে খুবই সীমিত পরিসরে সেবা পায়) এবং ঘুষ কিংবা বৈষম্যমূলক আচরণ ও অন্যায়ভাবে বা পক্ষপাতদুষ্ট নিয়োগের প্রচলিত ব্যবস্থার (৪৪ শতাংশ) কথা উল্লেখ করে।

অর্থনীতিবিদসহ বিশেষজ্ঞরা বলেছেন, বাংলাদেশে এখনো ভোগ ব্যয় হিসেবে দারিদ্র্যের হিসাব করা হলেও বিশ্বের বহু দেশেই বহুমাত্রিক সূচকে দারিদ্র্য মাপা হচ্ছে। একে অর্থনৈতিক উন্নয়নের একটি আদর্শ মাপকাঠি বলা হয়। তার ভিত্তিতে গবেষণায় দেখা গেছে, বাংলাদেশে দরিদ্র মানুষের সংখ্যা অনেক বেড়ে গেছে। শুধু বাড়েনি, করোনার কারণে এখনো আশঙ্কাজনকভাবে বেড়েই চলেছে। উল্লেখ্য, ব্র্যাক, বিআইডিএসসহ অন্য কয়েকটি দেশীয় ও আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠান কিন্তু জিইডি এবং পরিসংখ্যান ব্যুরোর হিসাবের সঙ্গে একমত হতে পারেনি। যেমন বিআইডিএস জানিয়েছিল, করোনার কারণে দেশে দরিদ্র মানুষের হার বেড়েছে ৩০ শতাংশের বেশি। আর ব্র্যাক মনে করে, এই হার প্রায় ৩৯ শতাংশ।   অন্যদিকে, আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠান সাউথ এশিয়ান নেটওয়ার্ক অন ইকোনমিক মডেলিংয়ের পরিসংখ্যানে জানানো হয়েছে, দারিদ্র্যের হার বেড়েছে ৪০ দশমিক ৫ শতাংশ। লক্ষণীয় বিষয় হলো, শতকরা হিসাবে পার্থক্য থাকলেও সব সংস্থা ও প্রতিষ্ঠানই স্বীকার করেছে, করোনার কারণে বাংলাদেশে দরিদ্র মানুষের সংখ্যা অনেক বেড়ে গেছে।

করোনার তথা লকডাউনের কারণে দরিদ্র মানুষের সংখ্যা আট কোটি ছাড়িয়ে যাওয়ার খবর অত্যন্ত ভীতিকর। কারণ, করোনার প্রভাবে সমগ্র বিশ্বকেই বর্তমানে মহাসংকট পার হতে হচ্ছে। সংকটে পড়েছে ২১৩টি রাষ্ট্র এবং প্রায় ৮০০ কোটি মানুষ। আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থা আইএলওর হিসাবে বিশ্বের ৫০ শতাংশ মানুষ একই সংকটের শিকার হয়ে চাকরি তথা জীবিকা হারাতে পারে। বাংলাদেশেও চাকরি হারিয়ে বেকার হতে পারে কয়েক কোটি মানুষ। বাস্তবে বাংলাদেশের ক্ষেত্রে আইএলওর আশঙ্কা সত্যও হতে শুরু করেছে।  করোনার প্রভাবে সারা বিশ্বেই বেকার বাড়ছে। উন্নত দেশগুলোতে সামাজিক নিরাপত্তা সুবিধার আওতায় থাকলেও নিম্ন আয়ের দেশগুলোর বেকাররা দারিদ্র্যসীমার নিচে নেমে যাবে। এসব বলা হলেও বাস্তবে করোনাভাইরাস অর্থনীতিতে কতটা ক্ষতি করতে পারে সেটি অননুমেয়।  বিবিএসের হিসাবে ২০১৯ সাল শেষে বাংলাদেশের জাতীয় দারিদ্র্যের হার ছিল সাড়ে ২০ শতাংশ। সম্প্রতি গবেষণা প্রতিষ্ঠান সানেম এক গবেষণায় বলেছে, যদি পরিস্থিতি এ রকম চলতে থাকে সে ক্ষেত্রে সাধারণ মানুষের আয় ২৫ ভাগ কমে গেলে দেশে দরিদ্র মানুষের সংখ্যা আরও ২০ শতাংশ বেড়ে যেতে পারে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, যেকোনো দুর্যোগ অপ্রাতিষ্ঠানিক খাতের ওপরই সবার আগে নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। করোনাভাইরাসের অভিঘাতও এই শ্রেণির শ্রমিকদের ওপরই প্রথমে পড়েছে। অথচ দেশের সার্বিক অর্থনীতিতে এই অপ্রাতিষ্ঠানিক শ্রমিকদের রয়েছে বড় ভূমিকা। আর দুর্যোগ কেটে গেলেও যে কাজে ফিরবেন, সে নিশ্চয়তা নেই তাদের।

উল্লেখ্য, দক্ষিণ এশিয়ার প্রতিবেশী দেশগুলোর মধ্যে বাংলাদেশে বেকারত্বের হার বেশি। শিক্ষিত তরুণরা দেশের বোঝা নয়, মূলত দেশের সম্পদ! বেকার নারী-পুরুষ হন্যে হয়ে কাজ অনুসন্ধান করছেন, কিন্তু তারা পাচ্ছেন না। বাবা-মা হয়তো পড়াশোনা শেষ করা ছেলে বা মেয়েটির পথ চেয়ে বসে আছে, কখন তারা পরিবারে সচ্ছলতা বয়ে আনবে ও তাদের মুখে হাসি ফুটাবে। দেশের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর সেশনজট, জরাজীর্ণ শিক্ষাব্যবস্থা ও সঠিক সময়ে সঠিক পদক্ষেপ না নেওয়ার কারণে দিন দিন বেকারত্ব সৃষ্টি হচ্ছে। ইউনেসকোর এক গবেষণা মতে, শিক্ষা হলো দারিদ্র্যবিমোচনের প্রধান শর্ত। আমাদের দেশে যে শিক্ষাব্যবস্থা চালু আছে তা শিক্ষিত জাতির কাক্সিক্ষত চাহিদা পূরণ করতে কতটা ভূমিকা রাখছে তা ভেবে দেখার প্রয়োজন।

লেখক গবেষক ও কলামনিস্ট

[email protected]